Home » অর্থনীতি » দুই ভারত দুই বাংলাদেশ (শেষ পর্ব)

দুই ভারত দুই বাংলাদেশ (শেষ পর্ব)

জনগণের সংহতি জনগণের লড়াই

আনু মুহাম্মদ

last 3 Aরাষ্ট্র ও জনগণ সমার্থক নয়। জাতীয়তাবাদী কিংবা ধর্মান্ধ আওয়াজ তুলে রাষ্ট্র নিজের পেছনে মানুষকে জমায়েত করতে চায়, সংঘাত আর বৈরীতার দেয়াল তুলতে চায় জনগণের মধ্যে। কিন্তু সবদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থ অভিন্ন। তাদের সকলেরই নদী রক্ষা করা দরকার, ভূমি বসত জীবিকা রক্ষা করা দরকার। বহুজাতিক কোম্পানি, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য এবং সামরিকীকরণ থেকে মুক্ত হওয়া দরকার।

সবদেশেই কর্পোরেট জগতের একটি অভিন্ন প্রচার আছে। যারা মানুষের জীবন জীবিকার পক্ষে দাঁড়ায়, যারা ভুল প্রতিশ্রুতিতে নির্মিত বাঁধের জন্য উচ্ছেদ হওয়া কোটি কোটি মানুষের লড়াইএ শামিল, যারা নির্বিচার রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ড, লক্ষ কোটি মানুষ উচ্ছেদ করে ‘কর্পোরেট হাব’ বানানোর বিরোধী, যারা জনগণের শিক্ষা ও চিকিৎসা অধিকার নিয়ে সোচ্চার তাদেরকেই, বাংলাদেশের মতোই, ভারতেও ‘উন্নয়ন বিরোধী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

বিদ্যমান উন্নয়ন দর্শনে রাষ্ট্রগুলোর সংহতি আছে, সেখানে কাঁটাতার নেই। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভারতের সাথে অন্যদেশের জনগণের যোগাযোগ খুবই কমমাঝখানে দৃশ্যমান অদৃশ্য অনেকরকম কাঁটাতার। সরকার ও মিডিয়া এই দূরত্ব টিকিয়ে রাখতে, আরও বাড়াতে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে নিয়োজিত।

ভারতের রঙীন চলচ্চিত্র, আইপিএল, টিভি বাক্সে জৌলুস আর বিজ্ঞাপনের সুখ সেদেশের জনগণকে যেমন নেশাগ্রস্ত রাখে তা সম্প্রসারিত হয় অন্যদেশেও। ব্যবসায়িক গ্রুপগুলোর জনসংযোগ মাধ্যম হিসেবে তাদের মিডিয়ার অবিরাম সত্যগোপন, সত্যবিকৃতি, মিথ্যাচার, খলনায়ককে নায়ক হিসেবে উপস্থাপনের আয়োজনের টার্গেট এখন ভারতের জনগণের সাথে সাথে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যদেশের জনগণও।

জল জমি জঙ্গলের মতো মাটির উপর আর নীচের সাধারণ সম্পত্তি দখল আর তার উপর ব্যক্তি মুনাফার মেশিন বসানোর বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদে প্রতিরোধে তৈরি হচ্ছে রক্তের কাহিনী। ফুলবাড়ীতে হয়েছে, হয়েছে কলিঙ্গনগর আর নন্দীগ্রামে। প্রচলিত নয়া উদারতাবাদী উন্নয়ন দর্শন যে বামপন্থীদেরও গ্রাস করেছে তার দৃষ্টান্তও দেখা যাচ্ছে সবখানেই। সেকারণে অনেকক্ষেত্রেই পুনর্বিন্যস্ত হচ্ছে মানুষ, লড়াই, সংগঠন। সারা ভারত জুড়ে এখন একদিকে দেশিবিদেশি ব্যবসায়ী সংস্থার জমি জল আর জঙ্গল দখল, উচ্ছেদ বা বিষাক্ত করে মুনাফা বানানোর নানা প্রকল্প, অন্যদিকে তার প্রতিক্রিয়াতেই মানুষের প্রতিরোধের নতুন নতুন রূপ। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও দৃশ্যপট কমবেশি একই।

সবদেশে আমরা যারা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেও অভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে লড়াই করি, তারা মানুষের জীবনকে কেন্দ্রে রেখে উন্নয়ন বিচার করি, আর তাই প্রকৃতি পানি মাটি রক্ষাও আমাদের কর্তব্য জ্ঞান করি। আমাদের কাছে শিক্ষা চিকিৎসা অধিকার, ব্যবসায়ীর পণ্য নয়। আমরা নদী, পানি, বন ও খনিজ সম্পদকে আমাদের সবার সম্পত্তি মনে করি; এগুলো কোনোভাবে মুনাফাখোরদের হাতে যেতে দিতে চাই না। আমাদের কাছে মানুষের মর্যাদা সবার ওপরে, লিঙ্গ বা ধর্ম বা বর্ণ বা ভাষা বা জাতি নয়। আমরা মনে করি, এই বিশ্বে মানুষের জন্য সম্পদের কোন অভাব নেই, কিন্তু লুটেরা দস্যুদের জন্য সেই সম্পদ মানুষের হাতছাড়া অথবা বিপর্যস্ত। তাদের দখল লোভের জন্যই যুদ্ধ সংঘাত নিপীড়ন আর এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা। এর বিরুদ্ধে মানুষের দক্ষিণ এশিয়ার কন্ঠ অভিন্ন, জীবন ও মরণ অভিন্ন লক্ষ্যে নিয়োজিত। এটা শ্রেণী সংগ্রাম, এটা জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, এটা অমানুষের বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তির অবিরাম লড়াই।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব এক জায়গায় থেমে নেই। ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার ‘দ্য এন্ড অফ হিস্ট্রি’র কথা মতো ইতিহাসের সমাপ্তি হয়নি, উদার গণতন্ত্র বিশ্বজনীন হয়নি, বরং বিশ্বব্যাপী আরও পশ্চাৎপদ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আর চীনের রূপান্তরের পর রাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিপ্লবী চিন্তার কাঠামো আর কাজ করছে না, মানুষকে কোন পথও দেখাতে পারছে না। বিশ্বে মুক্ত সমাজ মুক্ত মানুষের চিন্তা ও লড়াই নতুন পর্বে প্রবেশ করেছে। তত্ত্ব ও সংগঠন নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা ও সৃজনশীলতার তাগিদ তৈরি হয়েছে।

last 3 bআশার কথা এই যে, মানুষ নির্দিষ্ট মডেলের পতনে থেমে নেই, সবদেশেই জনগণের বিভিন্ন মাত্রার লড়াই আছে জল জমি জঙ্গলের ওপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, লড়াই আছে কর্পোরেট আগ্রাসন ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে, লড়াই আছে শ্রেণী, জাতি, ধর্মীয়, লিঙ্গীয় নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে, লড়াই আছে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে। ভারত রাষ্ট্রের আধিপত্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও লড়াই আছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সকল দেশেই। এসব লড়াই এর মধ্যে যে ঐক্যসূত্র আছে তা থেকেই আমরা একটি মুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার স্বপ্ন দেখতে পারি যেখানে কর্পোরেট স্বার্থ নয়, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মধ্য দিয়ে উন্নয়নের নতুন চেহারা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। গণতন্ত্র, সাম্য ও মর্যাদা নিয়ে নতুন ইতিহাস পর্বে প্রবেশ করবে মানুষ। কিন্তু এর জন্য জনগণের লড়াই ও মুক্ত চিন্তার যে সংহতি দাঁড় করা দরকার সেখানে বড় ঘাটতি আছে। আমাদের চিন্তা ও সক্রিয়তা এই ঘাটতি দূর করায় নিয়োজিত করা দরকার।

আমাদের নিজেদের মধ্যে তাই যোগাযোগ বাড়ানো দরকার, কথা বলা দরকার, সংহতি দৃঢ় করবার জন্য বিতর্ক করা দরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে আমরা এই যাত্রা জোরদার করতে পারি। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি ক্ষেত্রে আমরা জোর দিতে পারি:

প্রথমত, মুক্ত বিশ্বের রূপকল্পের সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে মুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার রূপকল্প দাঁড় করানো এবং তা মানুষের চিন্তার মধ্যে আনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া।

দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার সকল সম্পদ, বিশেষত খনিজ সম্পদ ও পানি সম্পদ যাতে সকল মানুষের কাজে সর্বোত্তম ব্যবহার করা সম্ভব হয় সেজন্য আঞ্চলিকভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন বা নকশা তৈরির কাজ। এটা হবে বিশ্বব্যাংক ইউএসএইড ও দেশিবিদেশি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মুনাফামুখি উন্নয়ন কৌশলের পাল্টা নকশা।

তৃতীয়ত, নদী ও পানি প্রবাহ নিয়ে, সকলের অধিকারে স্বীকৃতি দিয়ে, সমন্বিত চিন্তা ও পরিকল্পনা মূর্ত করা।

চতুর্থত, সাম্প্রদায়িকতা মৌলবাদ, শ্রেণী লিঙ্গ জাতি বর্ণগত নিপীড়ন ও বৈষম্য বিরোধী আমাদের চিন্তা ও লড়াইকে পরস্পরের কাছে পরিষ্কার রাখা, এবং সমন্বয় করা।।