Home » রাজনীতি » ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, বলা যাবে না কথা…..

ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, বলা যাবে না কথা…..

আমীর খসরু

http://www.dreamstime.com/stock-photography-tape-over-mouth-expression-image2759972পুরো দেশ জুড়েই এখন নানান কিসিমের ছোট, মাঝারি, বড় গডফাদারের উত্থান ঘটছে, ঘটেছে এবং বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে এদের অবস্থান ক্রমান্বয়ে আরও উপরের দিকে উঠতে থাকবে যেমনটা প্রমোশন হয় তার চেয়েও দ্রুত গতিতে। এদের উত্থানের জন্য যে সব বিষয়গুলো প্রয়োজন ছিল বা দরকার পরে তার মধ্যে অবাধ, নিশ্চিত, নির্বিঘ্ন পরিবেশ পরিস্থিতি এবং এই পরিস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য সহায়ক সব বিষয়াবলী। সহায়ক বিষয়াবলীর জন্য যা প্রয়োজন তাহলো আশ্রয়, প্রশ্রয় সর্বোপরি উচ্চ পর্যায়ের আর্শীবাদ। এই উচ্চ পর্যায়টা উঁচু হতে হতে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত যেতে পারলে সবচেয়ে সহায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এটা তো আর সনাতনী আর্শীবাদ নয়, আর্শীবাদের ধরণধারণ, পথপদ্ধতি সবই ভিন্ন। এর পূর্ব শর্ত হচ্ছে এসব সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি বা বেড়ে উঠায় যাতে কোনো বাধা সৃষ্টি না হতে পারে তার জন্য ক্ষমতাসীনদের উচ্চ বা সর্বোচ্চ পর্যায়ের সব ধরনের আশ্রয়প্রশ্রয়, সর্বোপরি আর্শীবাদের প্রয়োজনটি বড়ই জরুরি। আর এটা দু’পক্ষীয়।

বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডটির বর্তমান পরিস্থিতিটি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, প্রত্যেক জনপদকেই সাধারণ মানুষের জন্য এমন একেকটি দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে। দেশের এমন কোনো এলাকা নেই, কোনো স্থান নেই যেখানে ছোট কিংবা বড় সন্ত্রাসী এবং তাদের লালনপালনকারী গডফাদার নেই তা আকাড়ে বা ক্ষমতায় যে মাত্রাই হোক না কেন।

নিয়মমাফিক যে বাহিনীগুলো আছে তাদের চেইন অফ কমান্ড বা উচ্চতর পদক্রমিক বিন্যাস থাকতে হয়। এসব গডফাদারদেরও তেমনি পদক্রমিক বিন্যাস আছে, তবে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ও মাধ্যমে। নিয়মতান্ত্রিক চাকরির কর্মকাে যেমন সর্বোচ্চ উৎকর্ষতা ও দক্ষতা প্রদর্শনের প্রয়োজন পরে তেমনি এখানে দরকার পরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দক্ষতার। তবে সবকিছুই নির্ভর করে উপরের সাথে সম্পর্কের গাঢ়ত্ব এবং গভীরতার উপরে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, পুরো দেশ এদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়লেও স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের অনেকেই এখন অসহায়, নিষ্ক্রিয় জীবন ভয়ে ভীতশঙ্কিত বিধায় কোনো খবরাখবরই এখন আর চোখে পড়ে না। আরেক দল ওই গডফাদারদের তস্যদাসে পরিণত হয়ে আখের গুছিয়ে ফেলার চেষ্টায় রত। আর এ কথা সবারই জানা আছে, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে অর্থাৎ রাজধানীতে সাংবাদিকদের মধ্যে দলাদলি, অনৈক্য, দলীয় লেজুড়বৃত্তির সাথে সাথে স্বঘোষিত সেন্সরশীপ আরোপের অবস্থা সবারই জানা। একথাও জানা যে, সংবাদ মাধ্যমের অধিকাংশেরই মালিকই যেমন বর্তমান ক্ষমতাসীন পক্ষের এবং সংবাদ মাধ্যমও বাধ্য হয়ে কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বইচ্ছায় তাদের স্বাধীনতা বিসর্জন দেয়ার যে পথ বেছে নিয়েছেন তা বর্তমানকে কোন ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে তা তারা ভাবছেন বলে মনে হয় না। এটাও সত্য যে, সব সময়ই সরকারের চাটুকার একটি সংবাদপত্র মালিক এবং কথিত সাংবাদিক শ্রেণীর উত্থান পুরো স্বাধীন এবং পেশাদারী সাংবাদিকতাকে নিদারুন বিপদের মধ্যে ফেলেছে। এটা কার্যত ক্ষমতাসীনদের পক্ষেই যায় এবং বর্তমানেও যাচ্ছে।

গডফাদারদের জন্য সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি অর্জন করতে হয় তাহলো যার যার অবস্থান থেকে ঊর্ধ্বতনের আর্শীবাদ এবং আশ্রয়প্রশ্রয়ের নিশ্চয়তা। এটি বর্তমান বাংলাদেশে অতিমাত্রায় বিদ্যমান।

মাত্র কয়েকটি আগে কেউ কেউ টেলিভিশনের একটি চ্যানেলে শামীম ওসমান এবং ডাক্তার সেলিনা হায়াত আইভীর কথিত টকশোতে যে ‘টক’ দেখে এবং মহান ওসমানের শব্দবান শুনে হতবাক এবং বিমূঢ় হয়ে পড়েছেন, তবে বিস্মিত হয়েছেন এমনটা বলা যাবে না। এর চেয়েও করুণ দশা হয়েছে যারা ভিন্ন মাধ্যমে প্রায় সবটাই দেখেছেন এবং শুনেছেন তাদের। আগে নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান হিসেবে তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন পড়লেও এখন আর স্থানের নাম উল্লেখের প্রয়োজন পড়ে না। প্রমোশন বলে তো একটা ব্যাপার আছেই। এছাড়া অভিজ্ঞতার পাশাপাশি উৎকর্ষের ভিন্নতায় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন তাদের পরিবার অর্থাৎ তাকে এবং তার পরিবারকে পরিপূর্ণভাবে দেখভালের নিশ্চিত আশ্বাস প্রকাশ্যে দিয়েছেন তখন এর চেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, দায়মুক্তির নিশ্চয়তা আর কি হতে পারে? আর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন নিশ্চয়তা দেন সংসদে এবং জনসম্মুখে তার চেয়ে আর কোনো বড় প্রমাণের তো আর প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু খটকা লাগলো তখনই যখন চিন্তা করা হয় মেয়র আইভীইও তো আওয়ামী লীগার এবং তার পিতাও তো নিবেদিত প্রাণ আওয়ামী লীগার ছিলেন? তার কি হবে সে কথা কিন্তু প্রধানমন্ত্রী একবারের জন্যও প্রকাশ্যে কিংবা কারো কাছে অথবা কোথায়ও কিছু বলেননি। তাহলে ওই পুরো অঞ্চলটি যে শামীম ওসমানদের দিয়ে দেয়া হয়েছে তা আগেই নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল এবং টেলিভিশনকেন্দ্রীক কর্মকাের পরে তা এবার পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া গেল।

আর নিশ্চিত হওয়া যায় বলেই ৭ খুনের মামলার কোনো কূলকিনারা নেই। কূলকিনারা কোনোদিন হবে কিনা জানা নেই। যাকে নারায়ণগঞ্জবাসীসহ অনেকেই মূল গডফাদার বলে মনে করেন তাকে যখন পুরো বিষয়টি থেকেই উপরের নির্দেশে দূরে রাখা হয়, মামলা যখন ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধ কচ্ছপের হাটাচলার মতো হয়ে যায়, সবকিছু ওলোটপালোট মনে হয় তখন অন্যান্য অনেক ঘটনার মতো এখানেও কি ভরসা রাখা যায়? এর আগের ঘটনায় মেধাবী কিশোর ত্বকী হত্যার বিচার আজও না হওয়াসহ পুরো এলাকায় হত্যা, গুম, অপহরণ, খুনসহ যে সব ঘটনাবলী ঘটেছে তার যে বিচারআচার কোনোদিন হবে না এমনটা আশা করাই ন্যায্য, যৌক্তিক এমনটাই চিন্তা করতে হবে। যারা এসব ঘটনাকে অন্যায্য, অযৌক্তিক এবং অন্যায় বলে চিন্তাও করবেন তাদের মাথাটি শরীরের সাথে সংযুক্তি হারাবে। কারণ আর্শীবাদ, আশ্রয়প্রশ্রয় সবই আছে। আর আছে বলেই ওই ৭ খুনের মামলা, ত্বকী হত্যার মামলা ধীর থেকে ধীরালয়ে, আপছা দৃষ্টি থেকে দৃশের আড়ালে চলে যাবে তাতে খুব বেশি সময় লাগবে না। যেমন লাগেনি অতীতের অনেক ঘটনার ক্ষেত্রে। যেমন লাগেনি প্রকাশ্য দিবালোকে উপজেলা চেয়ারম্যানকে রাজপথে পিটিয়ে মারার ঘটনা, যেমন লাগেনি সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসের আগুনের লেলিহান শিখা মিলিয়ে যেতে, যেমন সময় লাগেনি বিশ্বজিতের রক্তসহ অসংখ্য রক্ত¯্রােত এবং মাথার অশ্রুধারা মিলিয়ে যেতে, মিলিয়ে যাওয়ার জন্য বাধ্য করতে। কিন্তু এই রক্ত¯্রােত এবং মাথার অশ্রুধারা কি আসলেই মিলিয়ে যায়, আসলেই কি এসব ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায় মানুষের মনজগত থেকে, হৃদয়ের গভীর হতে?

কিন্তু ওই যে আশ্রয়প্রশ্রয় তা আছে বলেই তো ফেনী হত্যাকাের ঘটনা লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রথমে দুই হাজারীর বাহাস, তারপরে সামান্য কিছু দৌড়ঝাপ, তারপরে চুপচাপ এই যে নিয়ম তার কি কোনো অন্যথা হয়েছে, হয়েছে কি কোনো কিছুর ব্যতয়? আগের জমানার এক হাজারীর স্থান এই জমানার আরেক হাজারী দখল করেছে। বরং এখন এক হাজারী বা দুই হাজারী, হাজারও হাজারীতে ছেয়ে গেছে শুধু ওই জনপদই নয়, বাংলাদেশ নামক পুরো ভূখন্ডটি। আর এতে সাধারণ মানুষ দিনে দিনে আরও বেশি সাধারণ হবেন এবং এক পর্যায়ে অতি সাধারণ হতে হতে কোথায় তারা মিলিয়ে যাবেন, মিলিয়ে যাবেন, মিলিয়ে যেতে থাকবেন

লক্ষ্মীপুরের ঘটনার কি এর চেয়ে কম কিছু? সর্বসাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের পরে অনেক হম্বিতম্বির পরেও কি হলো? অন্যথা হয়েছে কোনো কিছুর, ব্যতয় ঘটেছে যা হওয়ার তার কিছুর? না হবে না, হতে পারে না। যদি হয় তাহলে তা হবে ভুলক্রমে অথবা অন্য কোনো মতলবে। আর তাহের বা তাহের পুত্রের কিছু কি হয়েছে হয়নি, হবে না, হতে পারে না। কারণ ওই যে আর্শীবাদ, আশ্রয়প্রশ্রয়।

ময়মনসিংহের মুমিনুন্নেসা সরকারি কলেজের এক শিক্ষককে দিনেদুপুরে দিগম্বর করে শহরময় ঘোরানোসহ নানা অপকর্মের খলনায়ক স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সদ্য সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুজিবুর রহমান ফকিরের কিছু হয়েছে? হবে না, হতে পারে না। এমনকি সামান্য ভৎর্সনাটুকুও যে তাদের শুনতে হবে না এটা সে এবং তারা ভালো করে জানে বলেই এমনটা করা গেছে। আর চলতেও থাকবে যতোদিন পর্যন্ত তারা ক্ষমতাসীন থাকবেন ততোদিন পর্যন্ত। কারণ ওই যে আর্শীবাদ, আশ্রয়প্রশ্রয়।

কক্সবাজারের বদির কি হয়েছে? হয়েছে কিছু না হয়নি। হবে না, হতে পারে না। কারণ ওই একটাই। ওই যে আর্শীবাদ, আশ্রয়প্রশ্রয়।

আর এই আর্শীবাদ, আশ্রয়প্রশ্রয়ের কারণে এখন শুধু শামীম ওসমানরাই নয়, সারাদেশে ছোট, মাঝারি নানা ধরনের, নানা নামের, নানা কিসিমের শামীমে, তাহেরে, ফকিরে, বদিতে দেশ ভরে গেছে, ছেয়ে গেছে, ছেয়ে যাচ্ছে আর এসব করার জন্যই তো রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শন। কিন্তু এটাও তো ঠিক যে, রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের () দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের () দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত তাঁর অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করবেন বলে সংবিধানে বলা আছে।

আর্শীবাদ, আশ্রয়প্রশ্রয় যে একমুখী তাও নয়, নানামুখী। কারণ কথিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় হলফনামায় মন্ত্রী, সংসদ সদস্যদের আকাশেরও সীমানা ছাড়ানো সম্পদের যে বিবরণী পাওয়া গেল তাদের ক্ষেত্রে কি কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? এমন কি কোনো প্রশ্নও উত্থাপন করা হয়েছে কি করে একজনের সম্পদ শত শত গুণে বেড়ে যায় মাত্র ৫ বছরের মধ্যে? হয়নি, হবে না, হতে পারে না। বরং তথ্য প্রদানে বাধাদানসহ এর সাথে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যে ভাষায় কথা বলা হয়েছিল বা হচ্ছে তা চরম হুমকিরও অধিক। দুদক দিয়ে সামান্য লোক দেখানো কার্যক্রম চলেছিল বিদেশিদের জন্য মাত্র কয়েকদিনের তারও এখন আর কোনো খোজখবর নেই। খোজখবর থাকবে না, থাকতে পারে না। কারণ ওই যে আর্শীবাদ, আশ্রয়প্রশ্রয়।

যেমন আস্তে আস্তে মিলিয়ে দেয়া হচ্ছে পদ্মা সেতু কেলেংকারি, শেয়ার বাজার লুট, হলমার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ, রেলের কালো বিড়াল, তাজরীন ফ্যাশনস, রানা প্লাজা ধ্বস, অসংখ্য লাশ, আহত শ্রমিক, স্বজনহারা পরিজন, অসংখ্য নিখোঁজমিলিয়ে দেয়া হচ্ছে, ভুলিয়ে দেয়া হচ্ছে, বাধ্য করা হচ্ছে।

শুধু তো গডফাদারে নির্ভর করলে চলবে না, তাই চাই ভিন্ন পথ। ভিন্ন শাসনের ভিন্ন পথ, নতুন পন্থা।

দুর্নীতি, দুঃশাসন নিয়ে যাতে কোনো সংবাদ মাধ্যম লিখতে বা সংবাদ পরিবেশন করতে না পারে, না পারে এসব নির্লজ্জ সব ছবি ছাপাতে বা দেখাতে সে জন্যই তো গণমাধ্যমের উপরে একের পর এক পাহাড়সম নিয়ন্ত্রণ নেমে এসেছে এবং আসছে। ইতোমধ্যে এসেছে একধাপ, বাকি কয়েক ধাপ শুধু আসবে আসবে করছে।

এখন পরিস্থিতি দাড়িয়েছে এমন যে ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, বলা যাবে না কথা……।।