Home » আন্তর্জাতিক » নেপাল কি পারবে ‘বিগ ব্রাদার’ ভারতকে আবার ভালোবাসতে?

নেপাল কি পারবে ‘বিগ ব্রাদার’ ভারতকে আবার ভালোবাসতে?

ফাহিম ইবনে সারওয়ার

last 2গত মে মাসে ভারতের ১৫তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন নরেন্দ্র মোদী। এর এক মাসের মাথায় চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফর করেন। ভারত ঘুরে গেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এবং প্রতিরক্ষমন্ত্রী চাক হেগেলও। অন্যদিকে নিজের শপথ অনুষ্ঠানে সার্কভুক্ত দেশগুলোর প্রধানদের ডেকেছিলেন মোদী।

প্রথম বিদেশ সফরে গত জুনে মোদী ছোট্ট প্রতিবেশি দেশ ভুটান গিয়েছিলেন। এরপর আগস্টে নেপালে। আর মাঝখানে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ব্রাজিলে। ভুটান এবং নেপাল সফরে আঞ্চলিক রাজনীতি গুরুত্ব পেয়েছে। চীনা প্রভাব থেকে বাঁচিয়ে রেখে প্রতিবেশিদের ভারতমুখী করতেই যে ওই সফর তার মোদীর বক্তব্যে স্পষ্ট বোঝা যায়। আলাদা ভূখন্ডের বদলে ভুটান সবসময়ই ভারতের আশ্রিত হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। তবে ভারতের ভয় চীন সেখানে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের যথাসাধ্য চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সংলগ্ন ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকাগুলোতে চীনা প্রভাব বিদ্যমান।

নেপাল সবসময়ই ভারতের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশি। সেখানেও চীনা প্রভাব স্পষ্ট। ভারতে নরেন্দ্র মোদী একটি কট্টরপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিনিধি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। নেপাল ভ্রমণের সময় কাঠমান্ডুর পশুপাতিনাথ মন্দির সফর করেন মোদী। ভারতের সাথে নেপালের ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় যোগসূত্রের অন্যতম নিদর্শন এই মন্দির সফর। নেপালের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগন হিন্দু। কিন্তু নেপালে সরাসরি বিনিয়োগে ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে চীন। ২০১১ থেকে এবছর পর্যন্ত নেপালে চীনা পর্যটকের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুন হয়েছে। এখন বছরে ৯০ হাজার চীনা পর্যটক নেপাল ভ্রমনে যান। তিব্বতের লাসা থেকে শিগাস্তে পর্যন্ত চীনের যে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে সেটিকে আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে চীন। ২০২০ সাল নাগাদ নেপাল, ভুটান এবং সিকিমের সীমান ঘেষে চলবে রেল লাইনটি। অথচ ভারতের সাথে থাকা নেপালি সীমান্ত এলাকা সবসময় অবহেলিত এবং অনুন্নত।

নেপাল নিয়ে ভারতকে সবসময় দুটি সমালোচনা শুনতেই হয়। প্রথমত, নেপাল বলতে গেলে ভারতেরই অংশ। ১৯৯৭ সালের পর গত ১৪ বছরে মোদীই প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি নেপাল সফরে গিয়েছেন। তাঁর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে পাঠিয়ে পরিস্থিতি অনুকূলে এনেছেন মোদী। ২৩ বছর ধরে স্থবির ভারতনেপাল যৌথ কমিশনকে আবারও পুনরুজ্জীবিত করেছেন সুষমা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সুষমার সফরকে সফলই বলা চলে। এর মাধ্যমে নেপালী রাজনীতিতে চীনকে পাশ কাটানোর একটা ধৃষ্টতাও তৈরি হয়েছে। ভুটানের একজন বয়স্ক তিব্বতীয় বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর শবদাহ করার প্রক্রিয়াকে অনুমোদন করেছে নেপাল। চীন এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছিলো। কারণ এধরণের পদক্ষেপ নেপালকে চীন বিদ্বেষী এবং তিব্বতপন্থী করে তুলতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনা চাপের কাছে অনেকবার নতি স্বীকার করেছে নেপাল। নিজেদের মাটিতে তিব্বতিদের অধিকারকে অগ্রাহ্য করেছে তারা।

সুষমা স্বরাজ তার সফরে নেপালের সাথে বেশকিছু বিষয় নিয়ে আলোচনায় সম্মত হয়েছেন। অন্নপূর্ণার পাহাড়ি এলাকার কাছে পোখরায় একটি ক্রিকেট স্টেডিয়াম, ১৯৫০ সালে নেপালের সাথে করা ভারতীয় চুক্তির নিয়ে পুন:আলোচনা, যা অনেক নেপালিকেই ক্ষুব্ধ করেছিলো। দ্বিতীয় যে সমালোচনাক মোদীকে নেপাল বিষয়ে শুনতে হবে তা হলো, ভারত সবসময়ই নেপালকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে।

এটা ঠিক যে নেপালের রাজনীতিতে ভারত বরাবর অনধিকার চর্চা করে এসেছে। অনেক নেপালি বিশ্বাস করেন ২০০৬ সালে একইসাথে মাওবাদীদের ৯ বছরের গৃহযুদ্ধ এবং নেপালের সুদীর্ঘ রাজতন্ত্রের অবসানের পেছনে ভারতের হাত ছিলো। নেপালের আরোপিত সরকারগুলোর সাথে ভারতের সম্পর্ক যে খুব একটা সহজ ছিলোনা সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

নেপালের গণপরিষদ একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের কাজ করছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে নেপালের গণপরিষদে প্রতিনিধিত্ব করা প্রায় সব সদস্যই এসেছেন সমাজের উচুস্তর থেকে। ফলে সমাজের নিম্নস্তরের বিশেষ করে ভারত সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাবাসীর প্রতি তাদের দায়বোধ কম। মনে রাখতে হবে সীমান্ত এলাকার ওইসব নিম্নবিত্তের মানুষরাই কিন্তু মাওবাদীদের সশস্ত্র সংগ্রামের মূল হাতিয়ার ছিলেন।

সুষমার সফরে নেপালে পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন নিয়ে আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে দিয়ে ভারতকে নিয়ে নেপালের ভেতরে গেথে যাওয়া অবিশ্বাস হয়তো কিছুটা দূর হবে। আর ভারতীয়দের প্রতি নেপালিদের এই অবিশ্বাই চীনকে নেপালের বন্ধু করে তুলেছে।

মোদীর সফর : নানা কারণে নরেন্দ্র মোদীর নেপাল সফরটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রধানতম কারণটি হচ্ছে এক. চীনের কারণে ভারতের নিরাপত্তা কৌশলগত স্বার্থ। ভৌগোলিক কারণে চীনের অবস্থান, উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যেগুলো বিশেষ করে অরুনাচল এবং অন্যদিকে সিকিমসহ সীমানা সংক্রান্ত বিষয়ে চীনের সাথে ভারতের দীর্ঘ বৈরিতা, ওই অঞ্চলের সাথে মূল ভূখন্ডে যাওয়ার একমাত্র পথের মধ্যে ‘চিকেননেক’এর অবস্থান, তিব্বত ইস্যুসহ সব মিলিয়ে নিরাপত্তা কৌশলগত দিক থেকে ভারতের কাছে নেপাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া নেপালের জনগণের ভারত বিরোধী মনোভাব বরাবরই রয়ে গেছে। এটা প্রশমন করে নেপালের সরকারকে চীনমুখী না করার ভারতীয় যে কৌশল তাতেও মোদীর সফরটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের প্রশাসন এবং বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৭ বছর পরে মোদীর সফরটি এসব বিষয়গুলো নিষ্পত্তিতে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করেছে। দ্বিতীয়ত বিষয়টি হচ্ছে চীনপন্থী মাওবাদী কমিউনিস্টদের মধ্যে যারা এখন প্রকাশ্য রাজনীতি করছেন তারাও ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। অথচ এই মাওবাদীরাই কিছুকাল আগেও চরম ভারত বিরোধী ছিল। মাওবাদীদের এককালের প্রধান এবং বর্তমানে প্রকাশ্য রাজনীতিবিদ মি. প্রচন্ডও ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে। এটি অবশ্য নেপালের রাজনীতির একটি দিক মাত্র। তবে ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক জেনারেল অশোক মেহতা (অবসরপ্রাপ্ত) মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী মোদীর সফরটি এসব বিষয়ে পরিপূর্ণভাবে সফল হয়েছে।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, মোদী তার নেপাল সফরকালে ওই দেশের প্রাক্তন রাজা, যাকে এক সময় চরম ভারত ঘেষা বলে মনে করা হতো, সে রাজা জ্ঞানেন্দ্রের সাথেও কোনো সাক্ষাত না করে ভারত এই বার্তাটিই পৌছে দিয়েছে যে, নেপাল আর রাজতন্ত্রে ফিরে যাক দিল্লি তা চায় না। বরং বিদ্যমান যে দলগুলো আছে সেই দলগুলোই যেন ভারতের স্বার্থ রক্ষা করে চলে এমন বার্তাটিও একই সাথে দেয়া হয়ে গেল। তৃতীয়ত. যে বিষয়টি তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। নেপাল থেকে বিদ্যুৎ সঙ্কটে দীর্ঘকাল কবলিত ভারত যে পানিবিদ্যুৎ পাবে সে বিষয়টিও এই সফরকালে চূড়ান্ত করা হয়েছে। মোদী সফরের এটি একটি বড় সাফল্যই বলতে হবে। খুব শিগগিরই যে এ লক্ষ্যে অবকাঠামো নির্মাণসহ সার্বিক কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হবে ভারত তেমন কথাবার্তাই পাকা করে ফেলেছে নেপালের সাথে। কিন্তু দামদস্তুর কি হবে তা বরাবরের মতো ভারত ঠিক না করে এখন বলছে, একেবারে সঠিক দামই দেয়া হবে। এতে ভবিষ্যতে যে সঙ্কট সৃষ্টি হবে দুই দেশের মধ্যে তার ভবিষ্যদ্বাণী করা এখনই সম্ভব।

কিন্তু মোদীর নেপাল জয় বলে ভারতীয় বিশ্লেষকরা ঢাকঢোল পেটালেও এ প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে যে, এতোদিন ধরে জনমনে ভারত ভীতি এবং এ থেকে সৃষ্ট বিরোধীতার কি নিসরন হবে? যুগ যুগ ধরে যে ভারত নেপালকে আনুগত্যের নীতির মধ্যে ফেলে দিয়ে বড়ভাই সুলভ আচরণ করেছে তার কি কোনো পরিবর্তন হবে? ভারত কি পারবে কিংবা নেপালবাসীর পক্ষে কি সম্ভব হবে পূর্ব ইতিহাস মন থেকে মুছে ফেলতে এতো তাড়াতাড়ি? আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী নিউজ ম্যাগাজিন ইকোনমিস্ট তাই প্রশ্ন উত্থাপন করেছে তাদেরই এক নিবন্ধে নেপাল কি পারবে ‘বিগ ব্রাদার’ ভারতকে আবার ভালোবাসতে?