Home » বিশেষ নিবন্ধ » উত্তাল ষাটের দশক (পঞ্চম পর্ব)

উত্তাল ষাটের দশক (পঞ্চম পর্ব)

সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের ঊষালগ্নে সোহরাওয়ার্দীর কূটকৌশল

হায়দার আকবর খান রনো

Last-4১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি করাচিতে গ্রেফতার হলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। আইয়ুবের সামরিক শাসন জারি হওয়া থেকে ওই পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতারা ভালোই ছিলেন। সকলেই নিজেদের ব্যবসাবাণিজ্য বা অন্য কোন পেশায় ব্যস্ত ছিলেন। রাজনীতি থেকে বহু দূরে। সোহরাওয়ার্দী আইন পেশায় ব্যস্ত। শেখ মুজিবুর রহমান তখন একটি পশ্চিম পাকিস্তানি মালিকানাধীন বীমা কোম্পানীতে জেনারেল ম্যানেজারের চাকরি করছেন। আইয়ুব সরকারের যতো বিদ্বেষ সব কমিউনিস্টদের সম্পর্কে। ভাসানীও প্রথমদিন থেকেই কারারুদ্ধ। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী মার্কিনপন্থী বলে পরিচিত। ইতোপূর্বে সোহরাওয়ার্দী সরাসরি পাকমার্কিন সামরিক চুক্তি এবং সিয়াটোসেন্টোর পক্ষে ওকালতি করে মার্কিন প্রশাসনের আস্থাভাজন হয়েছিলেন। এই প্রশ্নে ভাসানী সোহরাওয়ার্দী বিরোধ হলে শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দী পক্ষ নিয়েছিলেন। এমনকি সোহরাওয়ার্দী পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনেরও বিরোধিতা করেছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হলো, যে শেখ মুজিবুর রহমান ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে হয়ে উঠেছিলেন বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ। তিনিও এক দশক আগে এই প্রশ্নেও সোহরাওয়ার্দীর পক্ষ নিয়েছিলেন। তাই আওয়ামী লীগ নেতারা প্রথমদিকে আইয়ুব সরকারের কোপানলে পড়েননি।

কিন্তু সামরিক শাসন উঠে গেলে বুর্জোয়া শিবিরের মধ্যেই তার প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হতে পারে এমন আশংকা ছিল আইয়ুবের মনে। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দীসহ বুর্জোয়া নেতারা ভাবছিলেন, সরাসরি মার্শাল ’ল না থাকলে তাদের রাজনীতি করার সুযোগ আসবে। তখন কি করা যায় এই নিয়ে তারা আলোচনা করেন। মুসলিম লীগ নেতা নুরুল আমীনের মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে তার বাসায় মিলিত হয়েছিলেন সোহরাওয়ার্দীসহ তদানীন্তন রাজনৈতিক নেতারা। তারা সকলেই ছিলেন দক্ষিণপন্থী। এতদিন চুপচাপ বসেছিলেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার সাহস ও ইচ্ছা কোনটাই তাদের ছিল না। এখন তারা একটু নড়েচড়ে বসতে যাচ্ছেন। কিন্তু এইটুকুও আইয়ুবের জন্য ভয়ের কারণ ছিল। তাই তিনি এর পরপরই ৩০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করলেন।

সোহরাওয়ার্দীর গ্রেফতার ছাত্রলীগের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। আমরা যারা ছাত্র ইউনিয়ন, তারা ভাবলাম, এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার নেই। এখনই ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সোহরাওয়ার্দীর গ্রেফতারের প্রতিবাদে ছাত্র ধর্মঘটের প্রস্তাব নিয়ে আমরা মধুর ক্যান্টিনে বসেছিলাম চার ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি। ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ছিলাম মহম্মদ ফরহাদ, মহিউদ্দিন আহমদ, বদরুল হক ও আমি। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে শেখ ফজলুল হক মনি ও সিরাজুল আলম খান। ছাত্র শক্তি ও এনএসএফ ছিল সরকারপন্থী ছাত্র সংগঠন। তাই স্বাভাবিক কারণেই তারা আমাদের প্রস্তাবে সম্মত হননি। রাত বারোটার সময় চার সংগঠনের এই বৈঠক কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হলো। তখন ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ বসে ঠিক করলাম, আগামীকালই ছাত্র ধর্মঘট করতে হবে। সেই রাতে আমরা হাতে লেখা পোস্টার লিখে হলে হলে সেটে দিয়ে আসলাম। পরদিন পহেলা ফেব্রুয়ারি। সকাল বেলা ইউনিভার্সিটির গেটে (তখন আর্টস ফ্যাকাল্টি ছিল এখন যেটা মেডিক্যাল কলেজের এমার্জেন্সি সেই জায়গায়) পিকেটিং করা হলো। ছাত্র ধর্মঘট সফল হলো। সামরিক শাসনের মধ্যে প্রথম ধর্মঘট। সামরিক আইনে ধর্মঘট, সভা, মিছিল ইত্যাদির জন্য কঠোর দন্ড নির্দিষ্ট ছিল। সেদিন আমতলায় (এখন সেই আম গাছটি নেই) একটি সংক্ষিপ্ত সভাও হয়েছিল। কোন সভাপতি ছিল না। কোন মাইক ছিল না। টেবিলের উপর দাড়িয়ে আমি সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা করে সামরিক শাসনের সমালোচনা করেছিলাম। আমিই ছিলাম একমাত্র বক্তা। সেটাই ছিল সামরিক শাসন বিরোধী প্রথম প্রকাশ্যে বক্তব্য। আমার জীবনেরও প্রথম রাজনৈতিক বক্তৃতা।

পরদিন ধর্মঘট ও সভার খবর কোন পত্রিকায় ছাপা হয়নি। কারণ সামরিক আইনে নিষেধাজ্ঞা ছিল। ২ ফেব্রুয়ারি দেড়শত ছাত্রের একটা মিছিল প্রেসক্লাবের সামনে খবরের কাগজ পুড়ালো। ছাত্র ইউনিয়নের নেতা রহিম আজাদ একটা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিলেন। এটাই ছিল প্রথম রাজপথের বক্তৃতা। ৩ ফেব্রুয়ারি আরেকটি ঘটনা ঘটে গেল। সেদিন আর্টস বিল্ডিংয়ের একটি রুমে আইয়ুব সরকারের মন্ত্রী মনজুর কাদের এসেছিলেন পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী। তিনি বক্তৃতা শুরুও করেছিলেন। কিন্তু শেষ করতে পারেননি। ছাত্র ইউনিয়নের নেতা জিয়াউদ্দিন মাহমুদ তাকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করে তুললেন। ‘গণতন্ত্র নাই কেন?’ ‘পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য কেন?’ ইত্যাদি। এক পর্যায়ে তিনি মন্ত্রীর কলার চেপে ধরেন এবং তাকে চলে যেতে বলেন। এই অবস্থায় তিনি পুলিশ প্রহরাধীনে দোতালা থেকে সিড়ি দিয়ে নামছিলেন। তখন তিনি চড় ঘুষিও খেয়েছিলেন এবং তার গায়ে থুথু বর্ষিত হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে রাখা গাড়িটিও অগ্নিদগ্ধ হয়েছিল। মন্ত্রীকে পুলিশের গাড়িতে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। তারপর আমতলায় এক বিশাল সভায় জিয়াউদ্দিন মাহমুদ খুব গরম বক্তৃতা দিয়েছিলেন।

৬ ফেব্রুয়ারি কার্জন হল থেকে মিছিল বেরিয়েছিল। প্রথমেই পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। ছাত্র ইউনিয়নের দুই কর্মী আবু তালেব (পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের সচিব হয়েছিলেন) এবং দিলীপ দত্ত (পরবর্তীতে প্রোটেস্টান্ট খৃস্টানদের বিশপ হয়েছিলেন) গ্রেফতার হন। ছাত্ররা কার্জন হলের সামনে রাখা পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ মিলিটারি কার্জন হলের সামনে অবস্থান নিয়েছিল। তারা পাচ রাউন্ড ফাকা গুলি ছুড়েছিল। এক সময় আমরা ঠিক করলাম মেডিক্যাল কলেজের দিক দিয়ে মিছিল বের করবো। তাই হলো। মিছিলটি পুরান ঢাকা প্রদক্ষিণ করে কার্জন হলে ফিরে আসে। দুই ঘন্টার বেশি সময় লেগেছিল। মিছিলে শুরুতে ছিল পাচশত ছাত্র। পথে পথে সাধারণ মানুষ এসে যোগ দিতে থাকে। এক পর্যায়ে মিছিলে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দাড়ায় দশ হাজারে।

পরদিন একইভাবে মিছিল বের হয়েছিল। পুরান ঢাকা প্রদক্ষিণ করে যখন নবাবপুর রোডে পৌছায় তখন রথ খোলার মোড়ে মিলিটারি বাধা দেয়। মিছিল আর অগ্রসর হতে পারেনি। অনেকে গ্রেফতার হলেন। পথের দু’পাশের সাধারণ মানুষ হাত নেড়ে মিছিলকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। টিয়ার গ্যাসের কারণে আমরা যখন তীব্র চোখের জ্বালা অনুভব করছি তখন আশপাশের বাড়ি থেকে পানির বালতি হাতে লোকজন এগিয়ে এলো আমাদের সেবায়। এই দৃশ্য ছিল অভূতপূর্ব। এই ভাবে শুরু হয়েছিল সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এক ঐতিহাসিক মাইলপোস্ট।

এক পর্যায়ে আইয়ুব খান সামরিক শাসন তুলে নিলেন এবং নতুন সংবিধান ঘোষণা করলেন। এই সংবিধান ছিল পুরোপুরি অগণতান্ত্রিক। উপরন্তু প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের কিছুই ছিল না। ফলে ছাত্ররা সংবিধানকে অস্বীকার করলো। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সংবিধান পুড়ানো হলো। ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের নেতারা তদানীন্তন রাজনৈতিক নেতাদের কাছে গিয়ে বললাম, আপনারাও এই সংবিধানকে অস্বীকার করুন। তখন Scrapping of the Constitution কথাটি ছাপা হয়েছিল। তার মানে সংবিধান ছিড়ে ফেলো। নয়জন রাজনৈতিক নেতা সংবিধান মানি না বলে বিবৃতিও দিয়েছিলেন। এটাই ছিল নয় নেতার বিবৃতি। স্বাক্ষরকারীগণ ছিলেন নুরুল আমীন (প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী), আবু হোসেন সরকার (প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী), আতাউর রহমান খান (প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী), শেখ মুজিবুর রহমান, মোহন মিয়া, মাহমুদ আলী, সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া, পীর মহসিন উদ্দিন দুদু মিয়া এবং হামিদুল হক চৌধুরী। সংবিধানকে অস্বীকার করলে যেতে হবে বিপ্লবী লাইনে। কিন্তু স্বাক্ষরকারীগণ মোটেই বিপ্লবী ছিলেন না। এমনকি তাদের মইে ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীল। তবু ছাত্রের চাপে তারা এই ধরনের বিবৃতি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

ইতোপূর্বে মৌলিক গণতন্ত্রীদের ভোটে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ ও প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ১৯৬০ সালে ঘোর সামরিক শাসনের সময় অরাজনৈতিক ও নির্দলীয় ভিত্তিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে চল্লিশ চল্লিশ আশি হাজার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এদের বলা হতো মৌলিক গণতন্ত্রী বা ইংরেজিতে বেসিক ডেমোক্রেট। তাদের হাতেই অর্পিত ছিল ইউনিয়ন পরিষদ এবং নিম্নপর্যায়ের ক্ষমতা। এরাই ছিল ডিকটেটর আইয়ুবের গণভিত্তি। এরাই প্রেসিডেন্ট, জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক আইনসভা নির্বাচন করতো। ব্যবস্থাটি এমন যে, বিরোধী দলের সরকার গঠনের কোন অবস্থাই ছিল না। গোপন কমিউনিস্ট পার্টির নিদের্শে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা সেই নির্বাচন বানচালের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন ঠিক মতো হয়ে গেল। এরপর পার্টির নির্দেশে আমরা জাতীয় সংসদের সদ্য নির্বাচিত সদস্যদের কাছে কয়েকটি আবেদন নিয়ে যাই। আমরা বলি, আপনারা আইয়ুবের মন্ত্রীসভায় যোগদান করবেন না। রাজবন্দীর মুক্তি এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য পার্লামেন্টের মধ্যেই সোচ্চার হবেন। আমরা সবুর খান, বগুড়ার মহম্মদ আলী প্রমুখের বাসায় গিয়েছিলাম। তারা আইয়ুব বিরোধী অনেক বড় বড় কথা বলে মন্ত্রীত্ব না নেবার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু ঠিকই মন্ত্রীত্ব নিয়েছিলেন। আমার রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই অভিজ্ঞতা হয়েছিল, কিভাবে বুর্জোয়া নেতারা প্রতারণা করে থাকেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত সাংসদদের একটি প্লেনে করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। খবর পেয়ে আমরা কতিপয় ছাত্র বিমান বন্দরে গিয়েছিলাম। সেখানে কাজী জাফর আহমদ খুব গরম বক্তৃতা রেখেছিলেন। মোনেম খা ছাত্রদের হাতে অপদস্ত হয়েছিলেন। কয়েকটা ঘুষি, থুথুর ছিটা ও গা ধাক্কা খেয়েছিলেন। শোনা যায় সেই জন্যই আইয়ুব খান তাকে পুরস্কৃত করেছিলেন প্রথমে মন্ত্রীত্ব দিয়ে ও পরে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর বানিয়ে। আইয়ুবের পার্লামেন্টে মশিউর রহমান যাদু মিয়া এবং রেল শ্রমিক নেতা মাহবুবুল হক বিরোধী অবস্থানে থেকে কড়া কড়া বক্তৃতা দিয়েছিলেন। আমরা অবশ্য আইয়ুবের সংবিধান ও জাতীয় সংসদকে স্বীকৃতি দিতে চাইনি। অবস্থাটির পরিবর্তন হলো সোহরাওয়ার্দীর মুক্তিলাভের পর।

আইয়ুব সরকার বিরোধী ছাত্রদের রাজনৈতিক আন্দোলন চলতে চলতেই এর সঙ্গে যুক্ত হলো ছাত্রদের শিক্ষা আন্দোলন। আইয়ুব খান যে শরিফ কমিশন গঠন করে শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার এনেছিলেন, তার বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন। এই শিক্ষা নীতিতে উচ্চ শিক্ষা সীমিত করার এবং স্কুল কলেজে ছাত্র বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব ছিল। আরও ছিল বছরে বছরে পরীক্ষার ব্যবস্থা। আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই তখন মনে হয় বছর বছর পরীক্ষার ব্যবস্থাটি খারাপ নয়, ভালোই ছিল। আজকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে যেভাবে ব্যয়বহুল করে তোলা হয়েছে এবং শিক্ষার বাণিজ্যকরণ যেভাবে হয়েছে তার তুলনায় শরিফ কমিশনের রিপোর্ট এতো খারাপ ছিল না। তবু ছাত্র সমাজ তা গ্রহণ করেনি। শিক্ষানীতি নিয়ে এতো ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন আমাদের দেশে আর কখনো হয়নি। প্রত্যেকটি স্কুল কলেজের প্রায় সকল ছাত্রছাত্রীরা এতে অংশ নিয়েছিল। দুর্গম গ্রামাঞ্চলেও তা ধাক্কা দিয়েছিল। শিক্ষা আন্দোলনের একটি পর্যায়ে ডাকা হলো ঢাকা শহরে সাধারণ ধর্মঘট। ১৭ সেপ্টেম্বর। সেদিন পুলিশ কয়েক জায়গায় গুলি চালিয়েছিল। ওয়াজিউল্লাহ বাবুল শহীদ হয়েছিলেন। ১৭ সেপ্টেম্বর এখন শিক্ষা দিবস হিসাবে পালিত হয়।

সোহরাওয়ার্দী সাহেব তার আগের দিন ঢাকা পৌছেছেন। করাচি থেকে প্লেনে করে ঢাকায়। তার কয়েকদিন আগে তিনি মুক্তিলাভ করেছেন। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন যৌথভাবে বিমানবন্দরে সংবর্ধনার ব্যবস্থা করেছিল। বিমান বন্দরেই সংবর্ধনার জবাবে সোহরাওয়ার্দী সাহেব নয় নেতার বিবৃতিকে বাতিল করে দিলেন। তিনি বললেন, ‘এখন আর নয় নেতা নয়, আমি বলি নয় কোটি নেতা।’ বস্তুত নয় নেতা তার টার্গেট ছিল না। তার লক্ষ্যস্থল ‘নয় নেতার বিবৃতি’ যেখানে Scrapping of the Constitution বলা হয়েছে। ছাত্রদের চাপে পড়ে নয় নেতা ইচ্ছার বিরুদ্ধে এমন বিবৃতি স্বাক্ষর করেছিলেন। দক্ষিণপন্থী নেতা সোহরাওয়ার্দী এই কৌশল বদলাতে চেয়েছিলেন। সম্ভবত এমন একটা সমঝোতার ভিত্তিতেই তার মুক্তি হয়েছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, মওলানা ভাসানী তখনো জেলে রয়েছেন।

সোহরাওয়ার্দী আরও বললেন, সংবিধান ছিড়ে ফেলা নয় বরং কৌশল হবে সংবিধানের গণতন্ত্রীকরণ, ইংরেজিতে Democratisation of the Constitution। তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বললেন, এই সংবিধান মেনে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিভিন্ন ধারা এমনভাবে সংশোধন করা হবে যাতে এক পর্যায়ে নতুন সংবিধান তৈরি হয়ে যাবে। এর মধ্যে ওকালতি বুদ্ধি ছিল। কিন্তু একই সাথে তা ছিল বিপ্লব অভিমুখী সংগ্রামের ধারার গতি মুখ পরিবর্তন করা।

ষাটের দশকের শুরুতেই ছাত্র আন্দোলন যেদিকে যে গতিতে চলছিল তাতে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে প্রবল বিপ্লবী ধারায় পরিণত হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। তা যেমন আইয়ুব খানকে যেমন ভীত করে তুলেছিল, তেমনই সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক নেতাদের মনেও ভীতির সঞ্চার করেছিল।

১৭ সেপ্টেম্বর হরতালের দিন শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল। ছাত্র নেতাদের নামে হুলিয়া জারি হয়েছিল বলে শোনা গেল। আমরা জানতে পারলাম মুসলিম লীগ নেতা নুরুল আমীনের বাসায় রাজনৈতিক নেতারা বৈঠকে বসেছেন। সেখানে সদ্য কারামুক্ত সোহরাওয়ার্দী সাহেবও আছেন। হুলিয়ার ঝুকি নিয়েও আমরা কজন ছাত্র নেতা সেখানে গেলাম এই প্রস্তাব নিয়ে যে গুলি হত্যার প্রতিবাদে পরদিন হরতাল দেয়া হোক। কাজী জাফর আহমদ, মহম্মদ ফরহাদ, শেখ ফজলুল হক এবং আরও কয়েকজন (আমিসহ) নুরুল আমিনের বাসায় গিয়েছিলাম আমাদের এই প্রস্তাব নিয়ে। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী সাহেব একটি নরমসুরে লেখা বিবৃতি ছাড়া আর কিছুতেই রাজী হলেন না। আমরা, বিশেষ করে কাজী জাফর আহমদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে মুখে মুখে তর্ক করলেন। শেখ মনি সোহরাওয়ার্দীর লোক হলেও তিনিই বা কম যাবেন কেন? তিনিও মাঝে মধ্যে আমাদের সিদ্ধান্তের স্বপক্ষের কিছুটা তর্ক করলেন। রাজনৈতিক নেতাদের সকলেই চুপ। একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমান কখনো আমাদেরকে শান্ত হতে, কখনো বা আমাদের পক্ষ হয়ে সোহরাওয়ার্দীকে বোঝাচ্ছেন। এক পর্যায়ে সোহরাওয়ার্দী বলে বসলেন, ‘I am not a politisian to be dictated by kids like you.’

তিনি বললেন, যুদ্ধে অনেকে মারা যায়। কিন্তু তাদেরকে তো জিন্দা করা যায় না। তিনি গভর্নরের সাথে দেখা করে বন্দী ছাত্রদের মুক্ত করার ব্যবস্থা করবেন এবং আর যা যা দাবি আছে তা আদায়ের চেষ্টা করবেন।

এই ভাবেই পরিসমাপ্তি ঘটেছিল ’৬২এর ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের। বুর্জোয়া রাজনৈতিক নেতারা আন্দোলনের সম্ভাব্য পরিণতির পথ রুদ্ধ করে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। কিন্তু স্বল্পকালের জন্যই। ’৬২এর আন্দোলন ’৬৮-’৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের রূপ নিয়েছিল। মধ্যের সাত বছরে একদিকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, অপরদিকে শ্রমিক কৃষকের শ্রেণী আন্দোলন তীব্রতর হয়ে উঠেছিল।।

(চলবে…)