Home » অর্থনীতি » ইতিহাস অনুসন্ধান :: যুদ্ধকালের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ

ইতিহাস অনুসন্ধান :: যুদ্ধকালের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

last 2Tajuddin Ahmed, 46 Prime Minister, a lawyer has been a chief organizer in the Awami League seems its founding in 1949. He is an expert in economics is considered one of the party’s leading intellectual.” (source: Time Magazine’s cover story Bangladesh: Out of War, a nation is born, December 20, 1971)

ছোটখাট, ছিমছাম আপাদমস্তক একজন বাঙালী তাজউদ্দীন আহমেদের স্বল্পকায় কিন্তু গভীর অর্থবহ এই পরিচয়টি টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ কাহিনীতে লেখা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বরে। সেখানে তাকে বর্ণনা করা হয়েছিল The Premier of Battle day বা যুদ্ধদিনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। বাঙালী জাতির সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে তিনি সরকার ও যুদ্ধের ময়দানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অসামান্য দৃঢ়তা ও সাফল্যের সাথে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। কোন উপলক্ষই তাঁকে লক্ষ্যবিচ্যুত করতে পারেনি, দল ও দলের বাইরে তাঁর সকল শত্রু বা শত্রুপক্ষের জন্য সেটি ছিল একটি মর্মযাতনার কারণ। দলের অভ্যন্তরে প্রকাশ্য অথবা লুকানো শত্রুরা স্বাধীনতা লাভের দু’বছর পরে অবশেষে সফল হয়। ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিব তাঁকে অত্যন্ত অসম্মানজনকভাবে মন্ত্রীসভা থেকে বিদায় করেন। বলা হয়ে থাকে, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব নিজেই জীবনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুলটি করেন। যার পরিনামে ১৯৭৫ সালে ঐতিহাসিক ট্রাজেডির পথ তৈরী করে দিয়েছিল। এখানেই শেষ নয়, ট্রাজেডির ধারাবাহিকতায় তাজউদ্দিন নিজেও ১৯৭৫ সালে ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিহত হয়েছিলেন।

রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, সংগঠক, প্রশাসক, সর্বোপরি রাষ্ট্রনায়ক সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠেছিলেন মানুষ তাজউদ্দীন আহমেদ। বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার প্রাণপুরুষদের একজন হলেও ক্ষমতার রাজনীতিতে বর্তমান আনুগত্যমুখী মেধাহীন ধারায় তাঁর নাম এখন বিস্মৃতপ্রায়। এ কারনে আওয়ামী লীগ বলি বা মহাজোটের বর্তমান শাসনামলে ইতিহাস বর্ণনায় ২৫ মার্চ ১৯৭১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এই নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ মাত্র এক লাইনে উল্লেখ করা হয়। সবিস্তার বর্ণনা পাওয়া যায় না। কারন এই ইতিহাস বর্ণনার প্রতি মূহুর্তেই তাজউদ্দীন হয়ে উঠবেন আরো মূর্তবর্নিলউজ্জ্বল। সেজন্যই পাঠ্য বইয়ের বর্ণনায় তিনি ছিলেন “১৯৭১ সালের প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী।” নতুন প্রজন্মের কাছে তাজউদ্দিনের এই হচ্ছে পরিচিতি, যা একবাক্যেই শেষ। তাঁকে যারা জানতেন, রাজনৈতিক সহকর্মীবৃন্দ বা যে দলে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁরাও তাজউদ্দীনকে স্মরণ করতে অনেক কুন্ঠাবোধ করেন, নাকি ভয় পান? তাদের অনেকের মনের গভীরে শ্রদ্ধা থাকতে পারে, কিন্তু সেটি অপ্রকাশিত। কারন তাজউদ্দীন আহমেদকে স্মরণ করতে গেলে যে ইতিহাসের অনেক অপ্রিয় সত্যের অবতারনা করতে হবে, যা নক্ষত্রচ্যুত করতে পারে কাউকে কাউকে এবং সে সব প্রসঙ্গ বললে রাজনীতির নানা ধরনের লাভালাভ থেকে বঞ্চিত হবেন তারা।

১৯৭২ সালে মন্ত্রীসভার সবচেয়ে যোগ্য, দক্ষ ও প্রতিভাবান, পরীক্ষিত রাজনৈতিক সহকর্মীকে বলি দেন শেখ মুজিব নিজেই। মাত্র দুই বছর দশ মাসের মাথায় ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর অর্থ, বন, মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তাজউদ্দীন। বলা হয়ে থাকে, শেখ মুজিব ও তাজউদ্দিনের সেই দুরত্ব এবং তাঁর নীরবে সরে যাওয়াকে দলের অনেক নেতাকমী ভয় পেয়েছিলেন। প্রায় ৪০ বছর পরে সেই ভয় এখনও সচল, সবল এবং তীব্র। ফলে তাজউদ্দিন আহমেদ রাজনীতির চলমান ইতিহাস থেকে অপসৃত হতে থাকেন একটু একটু করে। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বাণীটি রেখে গিয়েছিলেন ৭১ সালে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবার পরপরই, “আসুন আমরা এমনভাবে কাজ করি ভবিষ্যতে যখন ঐতিহাসিকরা বাংলাদেশের ইতিহাস রচনা করবেন, তখন যেন আমাদের খুঁজে পেতে কষ্ট হয়।” তার কথাটি ফলে গেছে কৃতঘœ সহকর্মী ও দলদাসদের জন্য। কারন একজনকে মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সকল কৃতিত্ব দিতে গিয়ে এখন খুঁজে পেতে কষ্ট হচ্ছে মাওলানা ভাসানী ও তাজউদ্দীন আহমেদের মত প্রাত:স্মরণীয় নেতৃবর্গকে। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে খুঁজে নিয়েছে এবং তাঁদের সঠিক অবস্থান নির্নয় করে দিয়েছে।

শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারকে নেতৃত্ব দিয়ে তাজউদ্দীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছেন। কার সাধ্য, তাঁকে বিস্মৃতির গর্ভে নিয়ে যায়? কার সাধ্য, তাঁকে ইতিহাসের পাতায় এক লাইনের মাঝে সীমাবদ্ধ করে দেয়? বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে হয়তো তাঁকে বিস্মৃতির অতলে ঠেলে দেবার চেষ্টা চলছে। কিন্তু তাঁকে ঠিকই চিনে গিয়েছিল সত্তর দশকে পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক নীতিনির্ধারকরা। তাঁকে আরো ভাল চিনেছিলেন পাকিস্তানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টো। তাজউদ্দীন আহমেদকে পাকিস্তানীরা, বিশেষ করে ভূট্টো ও তার সহকর্মীরা কি পরিমান সমীহ করতেন, সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরীর বর্ণনায় তা উঠে এসেছে। ১৯৭১ সালে মার্চে মুজিবইয়াহিয়ার বৈঠকের সে রুদ্ধশ্বাস দিনগুলির কথা তিনি বলছেন এভাবে, “ভূট্টোও এসেছেন ঢাকায়। আছেন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে। কড়া মিলিটারী পাহারায়। আমরা ক’জন বাঙালী সাংবাদিক তার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি পেয়েছি। মুজিবইয়াহিয়ার আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বেশি কিছু বলতে চাইলেন না। দু’জন সহকর্মীর সাথে তিনি উত্তেজিত কন্ঠে আলাপ করছিলেন। এক সময় আমাদের উপস্থিতি ভুলে গিয়ে উর্দুতে বলে উঠলেন, ইমোশনাল এপ্রোচে মুজিবকে কাবু করা যায়। কিন্তু তার পেছনে ফাইল বগলে চুপচাপ যে নটোরিয়াস লোকটি বসে থাকে তাকে কাবু করা শক্ত। দিস তাজউদ্দিন, আই টেল ইউ, উইল বি ইয়োর মেইন প্রবলেম।”

তাজউদ্দীনকে ভূট্টো জীবিত অবস্থায় ক্ষমা করেননি। ক্ষমা করেনি পাকিস্তানীরাও। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব গ্রহন করার পরে তখনকার পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক আইন প্রশাসক ও গভর্নর লে. জেনারেল টিক্কা খানের প্রচার দপ্তর থেকে একটি প্রচারপত্র বের করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, তাজউদ্দীন আসলে ভারতীয় ব্রাহ্মণ, তার আসল নাম তেজারাম। মুসলমান নাম গ্রহন করে তিনি অনুপ্রবেশ করেছেন পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করার জন্য। এই প্রচার চালিয়ে তাজউদ্দীন সম্পর্কে বাংলাদেশের সরলপ্রান মানুষকে সে সময়ে জান্তা বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল। ১৯৭২ সালে দেশ স্বাধীন হবার পরেও দলের অভ্যন্তরে শেখ মুজিবের আস্থাভাজন তরুন তুর্কী ও মোশতাকের নেতৃত্বাধীন ষড়যন্ত্রকারীদের ক্রমাগত অপপ্রচারের শিকার হচ্ছিলেন। প্রকাশ্যে বলা হচ্ছিল, তিনি চাননি ‘বঙ্গবন্ধ’ু পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফিরে আসুন। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, কালক্রমে শেখ মুজিব এটি বিশ্বাস করেছিলেন এবং তিনি কখনই তাজউদ্দীনের কাছে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস নিয়ে কোন কৌতুহল প্রকাশ করেননি, কিছুই জানতে চাননি। আরো বিষ্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে যে, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার যেখানে শপথ নিয়েছিল, সেই মেহেরপুরের মুজিবনগরে তিনি কখনই যাননি। অন্যদিকে, মোশতাকের নেতৃত্বে ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁকে চিহ্নিত করেছিল রাশিয়া ও ভারতের দালাল এবং রটানো হয়েছিল তিনি ভারতের সঙ্গে গোপন চুক্তি করেছেন।

কে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমেদ? কেন তাজউদ্দীন আহমেদ সব সময় প্রাসঙ্গিক ও বিবেচ্য বিষয়? এই প্রশ্নগুলি এইজন্যই উঠতে থাকবে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এখনও তিনি অমিমাংসিত একজন মানুষ এবং এই রাষ্ট্র গঠনের সম্পর্কটিও তাঁর সাথে জড়িত। কেন তাঁকে ইতিহাসের আড়ালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং আর দশজনের কাতারে ফেলে দাঁড় করানোর প্রয়াস এইসব প্রসঙ্গ ঘুরেফিরেই আসতে থাকবে যদ্দিন না তাজউদ্দীন আহমেদ প্রতিস্থাপিত হবেন দেশকালের গন্ডি ছাড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি জাতির মুক্তি অর্জনের সফল কান্ডারী হিসেবে। একটি রক্তাক্ত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম হওয়া এই রাষ্ট্রের সে সময়ে একটি সরকার ছিল। ঐতিহাসিক বা সাংবিধানিক বিবেচনায় সেটিই ছিল প্রথম সরকার। সেই সরকারের প্রধান নির্বাহী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর হাতে শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পরে তাঁর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ আর সরকারের নেতৃত্ব দিয়ে তাজউদ্দিন এই নতুন রাষ্ট্রের জন্মদিনে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। কি ছিল সে সময়ের প্রেক্ষাপট? শেখ মুজিবের কি দিক নির্দেশনা ছিল দলের সাধারন সম্পাদকের কাছে? নাকি ছিল দলের মধ্যে দল, ঘটনার মধ্যে ঘটনা, তরুন তুর্কীরা ছিল কি শেখ মুজিবের আরো বেশি আস্থাভাজন?

এই প্রশ্নগুলি ঘুরেফিরে আসতেই থাকবে। কারণ এর সাথে যুক্ত রয়েছে আমাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালের বাংলাদেশের সুদীর্ঘ ইতিহাস। জানা যাচ্ছে, ২৫ মার্চের কালো রাতে তাজউদ্দীন যখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যান শেখ মুজিবকে বের করে নিয়ে আসতে, ইতিহাসের সেই যুগসন্ধিক্ষণে তিনি সাড়া দিতে ব্যর্থ হলেন। তাজউদ্দীনকে তিনি বললেন, ‘বাড়ি গিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকো, পরশুদিন (২৭ মার্চ) হরতাল ডেকেছি’। মুজিবের এই উক্তিতে তিনি বিষ্ময় ও বেদনায় বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। মুজিব বললেন, ‘তোমরা যা করবার করো। আমি কোথাও যাব না’। তাজউদ্দীন বললেন, ‘আপনার অবর্তমানে দ্বিতীয় কে নেতৃত্ব দেবে এমন ঘোষণা তো আপনি দিয়ে যাননি’। নেতার অনুপস্থিতিতে দ্বিতীয় ব্যক্তি কে হবে দলকে তো জানানো হয়নি। ফলে দ্বিতীয় কারো নেতৃত্ব প্রদান দুরহ হবে এবং মুক্তিযুদ্ধকে এক অনিশ্চিত ও এক জটিল পরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়া হবে। মুজিব এমনকি স্বাধীনতার ঘোষণায় স্বাক্ষর দিতে রাজী হননি। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন এটি তার বিরুদ্ধে দলিল হয়ে থাকবে। এর জন্য পাকিস্তানীরা তাকে দেশদ্রোহের জন্য বিচার করতে পারবে (সূত্র: তাজউদ্দীন আহমেদ, নেতা ও পিতা, লেখক : শারমিন আহমদ, ঐতিহ্য প্রকাশনী পৃ: ৫৯৬০)

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসছে, শেখ মুজিব তার ইনার সার্কেলের বাইরে তাজউদ্দিনকে কতোটা বিশ্বাস করতেন? এ প্রশ্নের কিছুটা উত্তর পাওয়া যাবে স্বাধীনতা ঘোষণা পত্রের রচয়িতা ব্যারিষ্টার আমির উল ইসলামের সাক্ষাতকারে। তিনি জানাচ্ছেন, ‘আমার মনে হয় উনি স্বাধীনতা ঘোষণার সাথে কোন লিংক রাখতে চাননি। বঙ্গবন্ধু হয়তো কোন নেগোসিয়েটেড সেটেলমেন্ট চাচ্ছিলেন। আমরা আন্ডারগ্রাউন্ডে যেয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের যে পথটা বেছে নিয়েছিলাম তার ফলাফল নিশ্চিত ছিল না। উনি হয়তো ভাবছিলেন যে উনি বন্দী হবার পরেও স্বাধীনতার জন্য নেগোসিয়েটেড সেটেলমেন্ট করা সম্ভব। উনি জানতেন যে উনাকে হত্যা করা হবে না।’ শেখ মুজিবের এই দোদুল্যমনতা অথবা অন্তরের গহীন ইচ্ছা পরবর্তীকালে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে প্রতিফলিত হয়েছিল নানাভাবে। যেমনটি মইদুল হাসান বলেছেন দার মূলধারা ’৭১ গ্রন্থের ১৬, ১৭, ১৮ নং পৃ: রিখেছেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের বলে বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হলেও শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে দলের প্রভাবশালী যুবনেতারা ঐ সরকারকে কখনই মেনে নেয়নি। ১০ এপ্রিল রাতে বেতারে তাজউদ্দীনের ভাষণ প্রচারের আগে শেখ মনি তাজউদ্দীনকে জানান, বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তার পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য লিখিত নির্দেশ রয়েছে। শোনা যায় ঐ চিঠি তিনি ভারত সরকারের পদস্থ কর্মকর্তাদেরও দেখিয়েছিলেন। ভাষণটি যাতে প্রচার না হয়, সেজন্য শেখ মনি ৪২ জন এমএনএ ও নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে এরপরেও ভাষণটি প্রচার হয়’। মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে শেখ মনি গ্রুপকে গোপনে নির্দেশ দেবার প্রসঙ্গে ব্যারিষ্টার ইসলাম সাক্ষাতকারে আরো বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হয়তো চেয়েছিলেন, একটা সো কলড স্ট্রাগল হবে এবং যার ভিত্তিতে নেগোসিয়েশন হবে’।

একদিকে শেখ ফজলূল হক মনিসহ যুব নেতাদের বিরুদ্ধাচরন, খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে লাগাতার ষড়যন্ত্র এবং ভারত সরকার ও তাদের সরকারের ভেতরকার সরকারকে মোকাবেলা করে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদকে সরকার ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়েছে। জানা যাচ্ছে, আগষ্টে দিল্লি সফরকালে তাজউদ্দীন প্রথমবারের মত রিসার্চ এন্ড এ্যানালাইসিস উইং ()-এর সহায়তায় গড়ে ওঠা মুজিব বাহিনীর ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেন। মূলত:এই র‌্যাডিক্যাল বাহিনী গঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকারী বামপন্থীদের প্রতিহত করার জন্য। গোড়া থেকেই মুজিব বাহিনী বাংলাদেশ সরকার গঠনে তীব্র বিরোধিতা করে এসেছে এবং নিরবিচ্ছিন্ন প্রচারণা চালিয়ে এসেছে যে, তারা এই সরকারকে স্বীকার করে না। পরবর্তীকালে এটিই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাজউদ্দীনের জন্য। এইচ টি ইমাম, যিনি বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা, তিনি তার বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ গ্রন্থে ৮৬ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘আমি অবশ্যই বলব খন্দকার মোশতাক এবং অনুগামীদের মূল লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে অপসারণ এবং ক্ষমতা গ্রহণ। এর সাথে কাজ করেছে তার প্রতিহিংসাপরায়নতা এবং নীচ স্বভাব। …. বঙ্গবন্ধুর আপনজনদের মধ্যে শেখ মনিরও একটা ভূমিকা ছিল মনে হয়, না বুঝে মুজিবনগর সরকারের প্রতি মনির একটা প্রচন্ড বিদ্বেষ ছিল, যার বহি:প্রকাশ আমি কয়েকবার দেখেছি (একবার প্রকাশ্যে আগরতলায়)। মনি ছিলেন উচ্চাভিলাষী এবং প্রচন্ড রাগী মানুষ। তাকে ক্ষেপানো খন্দকার মোশতাকের গয়রহের বাম হাতের কাজ’।

তাজউদ্দীনের নিজের ভাষায়, ‘নেতা যখন অসৎ, অযোগ্য, দুর্নীতিপরায়ন ও সুবিধাবাদীদের কাছে টেনে নেন এবং তাদের প্রশয় দেন তখন তার ভয়াবহ পরিনাম শুধু তার ভাগ্যেই ঘটে না, পুরো জাতিকেই তার মাশুল দিতে হয়। জাতি পিছিয়ে যায় শতবছর’। ৭৪ সাল থেকে তার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুরু করেছিলেন, লিলি তুমি বিধবা হতে চলেছো। মুজিব ভাই বাঁচবে না। আমরা কেউই বাঁচবো না। দেশ চলে যাবে স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে (সূত্র: তাজউদ্দীন আহমেদ, নেতা ও পিতা, পৃ: ১৭৫”। রাষ্ট্রনায়কোচিত আসামান্য দুরদর্শিতায় নিজের এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যত যেন দিব্যচোখে তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন। তাহলে কি তিনি স্বেচ্ছামৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন অসম্ভব বেদনাকে সঙ্গী করে! এই কথাগুলোর উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করেও তাঁর সময়ের অন্যতম একজন অগ্রবর্তী মানুষ হিসেবে তাজউদ্দিনের পূর্বাপরতার সাথে মেলানো যায়নি। অসম্ভব মেধাবী, প্রতিভাবান, জাতীয়তাবাদী কিন্তু সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী এই মানুষটি অনেক রহস্য রেখে গেছেন। ৬০৭০ দশকে এরকম উদার গণতন্ত্রী, মহান জাতীয়তাবাদী ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী নেতৃত্ব বা নেতাদের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কোন দেশেই বিকশিত হতে দেয়নি। পরিনামে হয় তারা বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হয়েছেন অথবা পরবর্তীকালে রূপান্তরিত হয়েছেন সাম্রজ্যবাদের সেবাদাস হিসেবে। এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আমাদের দেশের একজন প্রাত:স্মরণীয় মানুষ প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর একটি নিবন্ধে কিছুটা আলোকপাত করেছেন। সে নিবন্ধের কিছু উদ্বৃতি দিয়ে এ লেখাটি শেষ করতে চাই;

Intellectually, the socialists were more advanced than the nationalists, and their participation in the liberation movement was in no way less significant than that of the nationalists. In the eyes of the Pakistani collaborators, Moulana Bhasani was a more dangerous enemy than even Sheikh Mujibur Rahman, because whereas the Sheikh could be expected to be prevailed upon to compromise the Moulana, they feared, would remain beyond their reach. This, in fact, is what Ghulam Azam, the arch collaborator, had said to an audience he addressed in Lahore in mid-1971. Thus the leftists were exposed to attacks from the reactionary nationalists as well as the fascist Pakistani rulers and their heinous Bengali collaborators.

Because of disunity among themselves the socialists were not in the leadership of the national liberation movement which was taken over by the nationalists. Indeed they were in a precarious situation throughout the period of liberation war and even after. This is illustrated by the animosity Tajuddin Ahmed, the Head of the Provisional Government, had to encounter. Being a strong nationalist with socialist leaning, he was perilously vulnerable. The Mujib Bahini activists hated and defied him and the Pakistani killers vilified him, calling him Hindu-born”. (source: The Daily Star. Retrieved 31 December 2013 written by Dr. Serajul Islam Choudhury, Professor Emeritus, University of Dhaka)

আওয়ামী লীগে, শুধু আওয়ামী লীগেই নয়, বাঙালী জাতির মুক্তিযুদ্ধকালীন নেতৃত্বে এখানেই ছিল তাজউদ্দীন আহমেদের ব্যতিক্রম। সে কারনেই তিনি দেশকালকে ছাপিয়ে তাঁর সময়কে অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। সে সময়ের প্রধান নেতৃত্ব এটিকে মেনে নেওয়ার জন্য কখনই প্রস্তুত ছিল বলে মনে হয়নি। সে কারনেই তাজউদ্দীন হয়ে পড়েছিলেন একা, নি:সঙ্গ এবং ঝঞ্জাবিক্ষুদ্ধ সময়ের মাল্লা, বলা যায় a man who came before his time, সেজন্য তিনি চলেও গেছেন তাঁর সময়ের আগেই। নিশ্চয়ই, তিনি ফিরে আসবেন ইতিহাসের হাত ধরে বারবার, পুনর্বারতার কাছে যে গোটা বাঙালী জাতি রক্তঋণে আবদ্ধ।।