Home » বিশেষ নিবন্ধ » উত্তাল ষাটের দশক (ষষ্ঠ পর্ব)

উত্তাল ষাটের দশক (ষষ্ঠ পর্ব)

কৃষক আন্দোলন এবং ইতিহাসের তথাকথিত মহানদের ভূমিকা

হায়দার আকবর খান রনো

last 3১৯৬২ সাল। যে সময়ের কথা বলছি সেই সময় রাজনীতিতে দুটি ধারা পাশাপাশি ছিল। একটি ধারার প্রতিনিধিত্ব করছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এই ধারাটি ছিল দক্ষিণপন্থী, প্রতিক্রিয়াশীল, সংগ্রাম বিমুখ। কিছু চাপ সৃষ্টি করে আইয়ুব সরকারের কাছ থেকে কিছু আদায় করা যায় কিনা, এই ছিল তাদের রাজনীতির একমাত্র লক্ষ্য। আন্দোলনের রাশ টেনে ধরা, আন্দোলন যাতে বুর্জোয়া গন্ডির বাইরে গিয়ে বিপ্লবাত্মক পথ না ধরে, সেই ব্যাপারে খুব সজাগ ছিলেন শ্রেণী সচেতন সোহরাওয়ার্দী ও তার তৎকালীন সঙ্গী নেতারা, যাদের মধ্যে মুসলিম লীগ নেতা নুরুল আমীন, আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খান প্রমুখ ছিলেন। তারা ছিলেন কমিউনিস্ট বিরোধী এবং মার্কিনসহ পশ্চিমাদের কৃপাকাঙ্ক্ষী।

অন্য একটি ধারা ছিল সংগ্রামী। ষাটের দশকের তরুন প্রজন্ম, যারা প্রধানত ছাত্র আন্দোলনের মধ্যদিয়ে বিকশিত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও প্রধানত সংগ্রামী ধারাকে অনুসরণ করতেন। সেটা ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে ছাত্র ইউনিয়ন ছিল কমিউনিস্ট মতাদর্শ দ্বারা অনেকখানি প্রভাবিত, অধিকতর র‌্যাডিক্যাল এবং সেক্যুলার ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। রাজনৈতিক জগতে এই ধারার প্রতিনিধিত্ব করতেন মওলানা ভাসানী ও আত্মগোপনকারী কমিউনিস্টরা। ছাত্রলীগ নীতির ক্ষেত্রে অতটা অটল ছিল না। যেমন তারা ছাত্র ইউনিয়নকে পরাজিত করার জন্য আইয়ুবের ছাত্র সংগঠন এনএসএফএর সাথে জোট করেছে, এমন যথেষ্ট উদাহরণ আছে। আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী নিয়ে মাথা ঘামাতেন না এবং সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে নির্বিকার ছিলেন। যতোদিন সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন ততোদিন তারা কোন প্রগতিশীল ও সংগ্রামী ভূমিকা নিতে পারেননি। অবশ্য পরবর্তীতে সোহরাওয়ার্দীর অবর্তমানে শেখ মুজিবুর রহমান যখন দলের হাল ধরলেন তখন ছাত্রলীগ কিছুটা অন্য রূপ ধারণ করলো। বিশেষ করে ১৯৬৬ সালে ছয় দফার পর ছাত্রলীগ জাতীয়তাবাদী সংগ্রামী দলে রূপান্তরিত হয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা এবং কিছুটা আবছা সমাজতান্ত্রিক ধ্যান ধারণাও ছাত্রলীগের অগ্রসর একটি অংশ গ্রহণ করতে শুরু করে। ছাত্রলীগের মধ্যে সংগ্রামী জাতীয়তাবাদী (বাঙালি) চেতনার বিস্তার ঘটানোর এবং সমাজতান্ত্রিক চেতনার উন্মেষ ঘটানোর ক্ষেত্রে যিনি প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি হচ্ছেন সিরাজুল আলম খান। এদেরই একটা বড় অংশ পরবর্তীতে জাসদ গঠন করেছিলেন।

সোহরাওয়ার্দীই ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের বিরোধীতা করেছিলেন এবং সিয়াটো সেন্টো ও পাক মার্কিন সামরিক চুক্তির পক্ষে ওকালতি করেছিলেন। এই নিয়েই তো ভাসানীসোহরাওয়ার্দী বিরোধ তৈরি হয়েছিল। সেদিন যদি শেখ মুজিবুর রহমান ভাসানীর পক্ষ নিয়ে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেন তাহলে হয়তো ইতিহাস অন্য রকম হতো।

ফিরে আসি ’৬২ সালে। সোহরাওয়ার্দী মুক্ত হয়েছেন, কিন্তু ভাসানী এবং কমিউনিস্ট নেতাকর্মীরা জেলে। সোহরাওয়ার্দী জেল থেকে বের হয়ে আন্দোলনের রাশ ধরে রাখতে চাইলেন। কিভাবে? তার কতকগুলো উদাহরণ দেয়া যাক। প্রথমত. ১৯৬২ সালের আগুনঝরা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে আইয়ুবের সংবিধান মানি নাএই যে স্লোগান উঠেছিল, সোহরাওয়ার্দী সেই স্লোগানের বদলে আনলেন সংবিধানের পদ্ধতি মেনেই সংবিধানের গণতন্ত্রীকরণের (যা কখনই সম্ভব ছিল না) তত্ত্ব। দ্বিতীয়ত. রক্তক্ষয়ী ১৭ সেপ্টেম্বরের পর আর কোনো হরতাল বা প্রতিবাদ সভা কোনোটাই করতে তিনি রাজী হলেন না। তৃতীয়ত. ১৭ সেপ্টেম্বরের শহীদদের জন্য গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ উপচে পড়েছিল। সেই জানাযা যেন ছিল ক্ষোভ ও প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ। সেই জানাযায় পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন নেতারা ছাড়াও পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক নামকরা নেতাও উপস্থিত ছিলেন। এসএম হল প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত জানাযা এক ঘন্টার বেশি অপেক্ষা করা হলো সোহরাওয়ার্দীর আগমনের জন্য। কিন্তু তিনি এলেন না। আমার মনে আছে, সর্বদলীয় ছাত্র কমিটির পক্ষ থেকে আমি গিয়েছিলাম কাকরাইলস্থ মানিক মিয়ার বাড়ীতে নেতা সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে আসতে। আমি মানিক মিয়ার (ইত্তেফাকের সম্পাদক) সাথে দেখা করে বললাম, সবাই অপেক্ষা করছেন, সোহরাওয়ার্দী সাহেব যাতে তাড়াতাড়ি পৌছাতে পারেন তার ব্যবস্থা করুন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব আমার সাথে দেখা পর্যন্ত করলেন না। আমি কিন্তু তখন ছাত্র আন্দোলনের নেতৃস্থানীয়দের একজন ছিলাম। যারা আন্দোলন করেছেন, সেই ছাত্র নেতাদের সাথে দেখা করার তিনি প্রয়োজন মনে করেননি। কিছুক্ষণ পর মানিক মিয়া ঘরের ভিতরে গিয়ে ফিরে এলেন মলিন মুখে। আমাকে বললেন, ‘স্যার যাবেন না। কিছু মনে করো না। স্যার গেলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। তাতে ক্ষতিই হবে। বুঝলে তো?’’

একটু বিস্তারিত ঘটনাটি বর্ণনা করলাম, এইটুকু বোঝানোর জন্য যে, সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ নেতারা গণআন্দোলনকে কতোটা ভয় করতেন।

সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী লীগ পুনর্জীবিত করার পক্ষে ছিলেন না। কারণ সরাসরি কোন রাজনৈতিক দল করতে পারতেন না। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করা দরকার।

আইয়ুব খান কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে এবডো জারি করেছিলেন। এবডো মানে Elective Body’s Disqualification Ordinance। অর্থাৎ এ যাবত যারা শাসন ক্ষমতায় ছিলেন, তাদের মধ্যে যাদের সম্বন্ধে দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আছে, তাদের উপর এই আদেশ প্রযোজ্য হবে। পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য তাদের রাজনৈতিক দল করার ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। এই এবডোর মধ্যে সোহরাওয়ার্দী, আতাউর রহমান খান প্রমুখ পড়েছিলেন। সেই কারণে সোহরাওয়ার্দী রাজনৈতিক দল গঠন করার বা আওয়ামী লীগ পুনর্জীবিত করার বিপক্ষে ছিলেন। আইন এড়িয়ে তিনি রাজনৈতিক দল না করে গঠন করলেন আন্দোলনের ফ্রন্ট National Democratic Front বস্তুত এটা কোন আন্দোলনের ফ্রন্ট ছিল না। এটা ছিল জনবিচ্ছিন্ন কিছু নাম করা দক্ষিণপন্থীদের মিলনকেন্দ্র মাত্র। সোহরাওয়ার্দী মুসলিম লীগের নুরুল আমীন প্রমুখ প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিবিদদের নিয়ে রাজনীতির আসর জমানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে সোহরাওয়ার্দী বৈরুতে বিলাসী অবসর জীবন কাটাচ্ছিলেন। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

১৯৬২ সালের ২৬ অক্টোবর হঠাৎ শোনা গেল বন্দী অবস্থায় মওলানা ভাসানী পাটের ন্যায্য মূল্য, বন্যা কবলিত মানুষের জন্য রিলিফ এবং এই ধরনের কিছু জনদাবী নিয়ে অনসন ধর্মঘট শুরু করেছেন। মওলানা ভাসানীর রাজনীতির একটু ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছিল। শুধু আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্রই নয়, তিনি রাজনীতির মাঠে নিয়ে আসেন শ্রমিক কৃষক গরিব মানুষের শ্রেণীগত দাবিও। এ পর্যন্ত বড় বড় রাজনৈতিক নেতারা। এমনকি সাহসী সংগ্রামী ছাত্ররাও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সুখদুঃখ ও জীবনজীবিকার সংগ্রামের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। আর এই সবই থাকতো ভাসানীর বক্তৃতার ও রাজনীতির প্রধান বিষয় রূপে। তিনি নিজেও বাস করতেন গ্রামে। কুড়ে ঘরে। জীবন যাপন করতেন গরিব কৃষকের মতোই। সেই জন্য মওলানা ভাসানীকে বলা হতো মজলুম জননেতা।

ভাসানীর অনসনের খবরে রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য শুরু হলো। আমতলায় ছাত্র সমাবেশ হলো ভাসানীর মুক্তি দাবিতে। আমি সেই সময় লক্ষ্য করেছি, রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে কী ধরনের ঈর্ষা কাজ করতো। সোহরাওয়ার্দী অবশ্য ন্যাপ কর্মী ও ছাত্রদের চাপে পড়ে ভাসানীর মুক্তির দাবিতে একটা জনসভা ডাকলেন। কিন্তু জনসভার সকাল বেলায় সরকার ভাসানীকে মুক্তি দিলেন। এটা সকালের খবর। সাথে সাথে সোহরাওয়ার্দী অন্য কারোর সাথে পরামর্শ না করেই সভা বাতিল করলেন।

মওলানা ভাসানী শুধু নিজের মুক্তি নয়, কৃষক ও বন্যাপীড়িত মানুষের দাবি নিয়েও অনশন করছিলেন। অতএব যে সভা ডাকা হয়েছে, লোকজনও সভায় আসার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, সেই সভা বাতিল করার কোন কারণই থাকতে পারে না। সম্ভবত সোহরাওয়ার্দী ভেবেছিলেন, মওলানা ভাসানী তার চেয়ে বড় নেতা হয়ে যায় নাকি? শ্রেফ ঈর্ষাজনিত কারণে তিনি সভা বাতিল করলেন একক সিদ্ধান্তে। যে সকল বুর্জোয়া নেতাদের মহান করে প্রচার করা হয় আমি আমার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে বলতে পারি, আসলে তারা মোটেও মহান ছিলেন না।

সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর সব ব্যাপার তিনি মনে মনে মানতে পারতেন না। সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পুরোপুরি প্রতিক্রিয়াশীল সংগ্রাম বিমুখ উপরতলার নেতা। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন মাটির মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত নেতা যিনি সংগ্রামের মধ্যদিয়েই বেড়ে উঠেছিলেন।

সোহরাওয়ার্দীর অতীতও ভালো নয়। ১৯৪৩ সালে বৃটিশ অনুসৃত যে নীতির কারণে বাংলায় দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, বৃটিশ অনুগত রূপে সেই পোড়া মাটি নীতি কার্যকরি করেছিলেন মুসলিম লীগ মন্ত্রীসভার নাজিমউদ্দিন ও সোহরওয়ার্দী। বিশেষ করে সোহরাওয়ার্দীকেই বেশী দায়ী করা হয়। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট জিন্নাহর ডাকা ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’তে যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়েছিল সে জন্য তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীকেই সর্বাধিক দায়ী করা হয়। ১৯৫০ সালে করাচীতে বসে জিন্নাহ মুসলিম লীগের সভাপতি হিসাবে সেই সোহরাওয়ার্দীই উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা উচিত বলে বিবৃতি দিয়েছিলেন। এই সোহরাওয়ার্দীই ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের বিরোধীতা করেছিলেন এবং সিয়াটো সেন্টো ও পাক মার্কিন সামরিক চুক্তির পক্ষে ওকালতি করেছিলেন। এই নিয়েই তো ভাসানীসোহরাওয়ার্দী বিরোধ তৈরি হয়েছিল। সেদিন যদি শেখ মুজিবুর রহমান ভাসানীর পক্ষ নিয়ে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেন তাহলে হয়তো ইতিহাস অন্য রকম হতো। তিনি নিলেন, কিন্তু দশ বছর পর ১৯৬৬ সালে। সেই সম্পর্কে পরে আসছি।

শেখ মুজিবুর রহমান এনডিএফ নিয়ে খুশি ছিলেন না। তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘এনডিএফ একটা খিচুড়ি, এমন খিচুড়ি যে ক’দিন পর কাউয়াও খাবে না।’ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগ পুনর্জীবিত করেছিলেন।

সোহরাওয়ার্দী নিজে এবডো থাকার জন্য সরাসরি রাজনৈতিক দল করতে পারতেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে এবডো ছিল না। তাই তিনি আওয়ামী লীগ পুনর্জীবিত করার পক্ষেই ছিলেন। কিন্তু তার নেতা সোহরাওয়ার্দীর কারণে পারেননি। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগ পুনর্জীবিত করেছিলেন।

প্রায় একই সময় মওলানা ভাসানী ন্যাপ পুনর্জীবিত করেছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, আইয়ুব শাসনের প্রথম থেকেই ভাসানী কারারুদ্ধ ছিলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে এবডো ছিল না। থাকার কথাও নয়। কারণ এবডো ছিল তাদের বিরুদ্ধে যারা সরকারি পদে (যথা মন্ত্রী) থেকে দুর্নীতি করেছেন বা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ ছিল। দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদীদের নিয়ে গড়া জোট এনডিএফএর ব্যাপারে ভাসানী কখনই উৎসাহী ছিলেন না। এনডিএফএর কোনো সভাতে তিনি কখনই যাননি। কিন্তু তার মুক্তির পূর্বেই সোহরাওয়ার্দী এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছেন যে, কোন রাজনৈতিক দল পুনর্জীবিত করা সম্ভব ছিল না। করলে তা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিভক্তি সৃষ্টি হবে বলে অপপ্রচার করা হতো।

মওলানা ভাসানী মুক্তির পর তাই ন্যাপ পুনর্জীবিত করলেন না, আবার এনডিএফএর সাথেও থাকলেন না। তিনি বললেন, এখন তিনি কৃষক আন্দোলনে মনোনিবেশ করবেন। করলেনও তাই। কৃষক সমিতি পুনর্জীবিত হলো।

এই কৃষক সমিতির একটু পেছনের ইতিহাস আছে যা বলা দরকার। বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে খুব জোরদার কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল বৃটিশ যুগেই। ১৯৪৬ সালের তেভাগা আন্দোলন, মনি সিংহ, অজয় ভট্টাচার্য, লালা শরদিন্দু দে, বারীন দত্ত প্রমুখের নেতৃত্বে ময়মনসিংহ ও সিলেটে জমিদার ও নানকার প্রথা বিরোধী আন্দোলন, পঞ্চাশের দশকে নাচোলে ইলা মিত্রের নেত্রীত্বে কৃষক আন্দোলন আমাদের ইতিহাসের উজ্জ্বল অধ্যায়। কিন্তু হিন্দু কমিউস্টিদের ওপর মুসলিম লীগ সরকারের বর্বর অত্যাচারের কারণে এই সকল আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিকতা রক্ষা করে আর অগ্রসর হতে পারেনি। নতুন করে কৃষক আন্দোলন গড়ে তুললেন মওলানা ভাসানী। ১৯৫৬ সালে যমুনার পারে ফুলঝড়ি ঘাটে এক কৃষক সম্মেলনের মধ্যদিয়ে নতুন কৃষক সমিতি জন্মলাভ করেছিল। ভাসানী সভাপতি এবং হাতেম আলী খান সাধারণ সম্পাদক। গ্রামেগঞ্জে কাজ করা কমিউনিস্টরা দলে দলে এতে যোগ দিলেন। তখনো পর্যন্ত আওয়ামী লীগ কৃষক আন্দোলন অথবা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে ভালো চোখে দেখতো না। অন্যদিকে আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের মধ্যেও কেউ কেউ শ্রেণী সংগ্রামের ওপর বেশি জোর দেয়াকে সঠিক মনে করতেন না। তারা মনে করতেন, এতে বুর্জোয়ার সাথে ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাতে পাকিস্তানের মতো সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই দৃষ্টিকোণ থেকে সাময়িকভাবে হলেও কমিউনিস্ট পার্টি বিলোপ করা দরকার, এমন তত্ত্বও দিয়েছিলেন দুই একজন কেন্দ্রীয় নেতা। এখানে উল্লেখ্য যে, কমিউনিস্ট পার্টি তখন বেআইনি ও আত্মগোপনে ছিল। পরবর্তী পার্টি ভাঙনের পেছনে এই সকল বিষয়ও কাজ করেছিল।

যে কথা বলছিলাম। ১৯৬২ সালের অক্টোবরে মওলানা ভাসানী কারামুক্তির পর প্রধানত কৃষক সমিতি গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৫৬ সালে গঠিত কৃষক সমিতি কাজ করার সুযোগ পায়নি। কারণ ১৯৫৮ সালেই সামরিক শাসন জারি হয়েছিল। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত সব ধরনের রাজনৈতিক ও গণসংগঠনগত তৎপরতা বন্ধ ছিল। কয়েক বছরের মধ্যেই কৃষক সমিতি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছিল। সেই সময় একটাই মাত্র কৃষক সংগঠন ছিল। কৃষকদের মধ্যেও এক ধরনের চেতনা বিকাশ লাভ করছিল। নিশ্চল গ্রাম এবার আলোড়িত হতে শুরু করলো। উত্তাল ষাটের দশকে কৃষক ও গ্রামীণ গরিবজনের যে বিরাট ভূমিকা ছিল তা সাধারণত সংবাদ মাধ্যমে অথবা তথাকথিত পন্ডিতি গবেষণায় উপেক্ষিত হয়ে থাকে। পাকিস্তান আমলেই কৃষকের মধ্যে বিভাজন দেখা দিয়েছিল। তবু নিঃস্ব, গরিব, মধ্য ও ধনী কৃষক মিলিয়ে যে বিশাল কৃষক সমাজ, তার জাগরণ ষাটের দশকেই শুরু হয়েছিল এবং ১৯৬৯এর গণঅভ্যুত্থান ও তার পরবর্তী সময়ে এই জাগরণ অনেক বড় আকারে আত্মপ্রকাশ করেছিল। ’৭১এর মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি যারা অংশ নিয়েছেন, বীরত্বের সাথে দেশের ভেতরে থেকে যুদ্ধ করেছেন তারাই হচ্ছেন আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী কৃষক সমাজ।।

(চলবে…)