Home » অর্থনীতি » গুজরাট উন্নয়ন মডেল :: যা রটেছে, যা আসলে ঘটেছে

গুজরাট উন্নয়ন মডেল :: যা রটেছে, যা আসলে ঘটেছে

জয়তী ঘোষ, ফ্রন্টলাইন

অনুবাদ: ফাহিম ইবনে সারওয়ার

last 4ভারতে গত এক বছরের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক প্যাকেজ ‘উন্নয়নের গুজরাট মডেল’। এই মডেলের প্রচারণাই নরেন্দ্র মোদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামকের ভূমিকা রেখেছে। প্রচারণার মূল কাজটি করেছে গণমাধ্যম। কার্যকরী সরকার ব্যবস্থা এবং ব্যবসাবান্ধব অর্থনৈতিক নীতিমালার জন্য গুজরাট মডেলের ‘সুখ্যাতি’ রয়েছে। মিডিয়ার মাধ্যমে অধিক প্রচারিত উন্নয়নের এই মডেল আসলে কতোটা বাস্তব সেটা কিন্ত ধোয়াশায়ই রয়েছে। মোদি বিরোধীরাও তাদের প্রচারণায় বিজেপিকে কটাক্ষ করার জন্য গুজরাট মডেলকে টেনে এনেছেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তো পাল্টা বলেই ফেলেছেন পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন মডেল গুজরাটের চেয়ে বেশি বাস্তব। গুজরাট শুধুই প্রচারণা সর্বস্ব।

আসলেই কি গুজরাটে উন্নয়ন হয়েছে। ভারতের বাকি রাজ্যগুলোর চেয়ে গুজরাটের অধিবাসীরা কি বাড়তি সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন? গুজরাটের উন্নয়ন মডেলের মূল অর্থনৈতিক এজেন্ডাগুলো কি? কিসের ওপর ভিত্তি করে গুজরাটের উন্নয়ন আর তা সুবিধা ঘরে তুলেছে কারা?

ভারতীয় মিডিয়ার মতো অর্থনীতিবিদ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও কোন কোন সময় গুজরাট মডেলের পালে হাওয়া দিয়েছেন। কিন্তু এর গভীরে কেউ সেভাবে যাননি। নিরেট তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে গুজরাট মডেলকে এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্ত অবস্থান দেয়া যায়নি। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসএ দুটো বিষয়কে গুজরাট মডেলের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে গণ্য করে থাকে বিজেপি। তবে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় এখনো গুজরাটে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আনুপাতিকভাবে বেশি। দারিদ্র্য হয়তো কমছে ঠিকই, তবে তার গতি বেশ শ্লথ। খালি চোখে যা দেখা যাচ্ছে তার প্রায় পুরোটাই শহুরে অঞ্চলে, আর গুজরাটের গ্রামগুলো আর সব প্রদেশের গ্রামগুলোর মতোই এখনো অবহেলিত।

তবে উন্নয়ন যে হয়নি সে কথাও মোটা দাগে বলা যায়না। সাধারণ মানুষের উন্নয়নের চেয়ে কর্পোরেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পকেটই ভারী হয়েছে বেশি। এসব কিছু নিয়ে মাঠ পর্যায়ের তথ্য নিয়ে গবেষণা করে চলতি বছর একটি বই প্রকাশ করেছে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। বইটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন ইন্দিরা হিরওয়ে, আমিতা শাহ এবং ঘনশ্যাম শাহ। গত এক দশকে গুজরাটের উন্নয়নের অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ এবং সচেতন তথ্য পাওয়া যাবে এই বইয়ের মাধ্যমে। বইটির বিভিন্ন অধ্যায়ে সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গুজরাট মডেল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বইটিতে লেখকরা উল্লেখ করেছেন, নব্য উদারপন্থী অর্থনৈতিক কর্মসূচীর জন্যই গুজরাটের তথাকথিত উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। এতে কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তা ছিলো নিঃসন্দেহে। তবে গত দুই দশকে এই কর্মসূচীতে পরিবর্তন এসেছে। প্রথম দশকে জোর দেয়া হয়েছিলো কাঠামোগত উন্নয়নের ওপর। এর সাথে জড়িত ছিলো কৃষির উৎপাদন বাড়ানো, বিপুল জনশক্তিকে দক্ষ করে তোলা এবং সামাজিক খাতকে শক্তিশালী করা।

কৃষিখাতকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন কার্যকরী কর্মসূচী হাতে নেয়া হয় যার মধ্যে রয়েছে মহাত্মা গান্ধী রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি এবং রাইট টু এডুকেশন অ্যাক্ট। কাঠামোগত উন্নয়নে জোর দেয়া হয়েছে বেশি। বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষিকে এগিয়ে নিতে পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সুলভে কৃষি জমি লাভ এবং কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতার কারণে কৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগ করেছে ব্যবসায়ীরা। গত দশকে বেসরকারি খাতে বিপুল পরিমানে শিল্পোন্নয়ন হয়েছে। বিপুল পরিমান বিনিয়োগ হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সরবরাহ খাতে, রাস্তা নির্মানে, নদী ও স্থল বন্দর নির্মানে। গড়ে তোলা হয়েছে শিল্প নগরী এবং বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা (স্পেশাল ইকোনোমিক জোন, এসইজেড)। ফলে শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনে গুজরাট নির্ভরযোগ্য রাজ্য হয়ে ওঠে। এসব কাঁচামাল রপ্তানিও করা হয়। সেসব দিয়েই পুরো পণ্য প্রস্তুত করা হতো। তবে শুধু কাঁচামাল সরবরাহ করার ফলে তৈরিপণ্য বিক্রির মাধ্যমে যে মুনাফা আসে তা ঘরে তুলতে পারেনি গুজরাট। সম্পূর্ণ শিল্প গড়ে তুলতে পারেনি রাজ্যটি। কাঁচামাল সরবরাহ করেছে শুধু। বৃহৎ শিল্প স্থাপনে ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। রাজ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর জন্য সরকার এই উদ্যোগ নিলেও বৃহৎ শিল্প স্থাপনের পর কর্মসংস্থানের হার তেমন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।

তবে রাজ্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু ব্যবসায়ী পুরো ভারতের ব্যবসা বাণিজ্যে নিজেদের আধিপত্য গড়ে তুলেছেন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে শ্রমিকদের মজুরি কমিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু ক্ষুদ্র এবং মাঝারি ব্যবসায়ীরা কোন ঋন সহায়তা পাননি। সামাজিক খাতে বিনিয়োগের জন্য জনগনের সঞ্চয় কমেছে। সে কারণে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় গুজরাটের মাথাপিছু আয়ের হার কম। শিল্পোন্নয়নের জন্য বেসরকারি খাতে ভর্তুকি দিতে গিয়ে ঋনের জালে জড়িয়ে পড়েছে রাজ্য সরকার। যা পরিশোধ করতে হবে গুজরাটের সাধারণ মানুষকেই।

কৃষিক্ষেত্রে মোদি সরকারের সফলতা রয়েছে। কৃষিপণ্য উৎপাদনের প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন করা হয়েছে, উৎপাদন বেড়েছে, সঠিক দাম নির্ধারণের ব্যাপারে জোর দেয়া হয়েছে। তবে এসবের সুফল অপেক্ষাকৃত গরীব অঞ্চলগুলোতে পৌঁছায়নি। খাল এবং ভূগর্ভস্থ পানিকে কাজে লাগিয়ে যারা সেচের সুবিধা কাজে লাগাতে পেরেছেন শুধু মাত্র ধনী কৃষকরাই। তবে এর মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরাও যে সামান্য লাভবান হয়েছেন, সে কথা মোটেই ভুল নয়।

ভারতের ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভে অর্গানাইজেশন জানিয়েছে, ভারতের মোট গড় মাথাপিছু আয়ের তুলনায় গুজরাটের মাথাপিছু আয় গড়ে ২০ শতাংশ হারে বেড়েছে বটে, তবে বাস্তব চিত্র হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে শ্রমিকদের মজুরি কমেছে ২০ শতাংশ আর শহরাঞ্চলে কমেছে ১৫ শতাংশ।

নগরায়নের ক্ষেত্রেও গুজরাটের অবস্থান এবং পরিকল্পনা দূর্বল। শহর থেকে বস্তি উচ্ছেদের মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন শহরে বাস করার দরিদ্র জনগোষ্ঠী। বেসিক সার্ভে ফর দ্য পুওর প্রকল্পের আওতায় গ্রাম থেকে আসা মানুষদের শহরে পুনর্বাসিত করা হয়েছে, যার কারণে নিজেদের কর্মস্থল থেকে বিচ্ছিন্ন্ হয়ে পড়েছে গ্রামীণ শ্রমিকরা।

স্বাস্থ্যখাতেও গুজরাটের পরিস্থিতি অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় নাজুক। মিলিনিয়াম ডেভলপমেন্ট গোল পূরণে হিমশিম খেতে হচ্ছে রাজ্য সরকারকে। রোগ প্রতিরোধে শিশুদের টিকা কর্মসূচী চলছে ধীরগতিতে, শিশুরা ভূগছে অপুষ্টিতেও। শিশুমৃত্যু এবং মাতৃমৃত্যু রোধে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। স্বাস্থ্যখাতে ভারতের ১৭ রাজ্যের মধ্যে গুজরাটের অবস্থান ১৩। উড়িষ্যা এবং উত্তর প্রদেশের চেয়েও পিছিয়ে গুজরাট। ৫ বছরের কমবয়সী শিশুদের প্রায় ৪৫ শতাংশই ভুগছে অপুষ্টিতে।

শিক্ষাখাতে গুজরাটে কাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে প্রচুর। বিদ্যালয়গুলোর জন্য নতুন ভবন, বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। তবে বিশুদ্ধ পানি, টয়লেট এবং পাঠাগার অপ্রতুল। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও ছাত্রশিক্ষকের অনুপাতে রয়ে গেছে বড় ফারাক। শিক্ষকের অভাবে ভালো ফল দেখাতে পারছেনা প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা। সুবিধা বাড়লেও শিক্ষার মান সেভাবে বাড়াতে পারেনি রাজ্য সরকার।

গুজরাটের উন্নয়ন হয়নিএটা যেমন মিথ্যা, তেমনি গুজরাটের উন্নয়নের যতোটা প্রচার হয়েছে তাও পুরোপুরি সত্য নয়। এই দুটো বাস্তবতার মাঝে গুজরাট উন্নয়ন মডেলের প্রকৃত চিত্র অনেকটাই সাদামাটা। তাই এই ফর্মুলায় পুরো ভারতকে পাল্টে দেবেন মোদিসে ভাবনা অবাস্তব।।