Home » আন্তর্জাতিক » তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি শুরু হয়ে গেছে (পঞ্চম পর্ব)

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি শুরু হয়ে গেছে (পঞ্চম পর্ব)

কেমন হবে ২০৩৪ সালের বিশ্বযুদ্ধ?

আমাদের বুধবার বিশ্লেষণ

last 5বিশ্ব দুটি বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে। এটা ছিল ইউরোপভিত্তিক। অবশ্য এর আঁচ বিশ্বের সব জায়গাতেই লেগেছিল। আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ যদি বাঁধেই খুব সম্ভবত তা হবে এশিয়ায় এবং তা হবে বর্তমান প্রধান শক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং তার প্রধান চ্যালেঞ্জার চীনের মধ্যে। কয়েকটা কারণেই দেশ দুটি মুখোমুখি অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো স্থানে সময়ই যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। তবে ভালো খবর হলো, চীন এই মুহূর্তে কিংবা অদূর ভবিষ্যতেও যুদ্ধ চায় না। চীন জানে, এখন পরিস্থিতি তার প্রতিকূলে এবং সে প্রস্তুত নয়। তবে যদি এখন থেকে ২০ বছর পরের সময়ের দিকে তাকানো হয়, তবে ভিন্ন পরিস্থিতি দেখা যাবে।

খুব তাড়াতাড়ি যুদ্ধ যে বাঁধবে না, তার কারণ তিনটি। এগুলো চীনের পক্ষ থেকে যুদ্ধ বিলম্বিত করার কারণ হতে পারে। প্রথমত, প্রতিরক্ষা বাজেট দুই অঙ্কের হলেও চীনের সামরিক বাহিনী এখনো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক পেছনে রয়েছে। নিকট প্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রজাপান মিত্র শক্তির সমান অবস্থায় পৌঁছাতে চীনের ১৫ থেকে ২০ বছর লাগবে।

দ্বিতীয়ত, বর্তমান বিশ্বে সব দেশে অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল। তবে সমান মাত্রায় নয়। পারস্পরিক নির্ভরশীলতার অনেক কথা বলা হলেও আমেরিকার ওপর চীন অনেক বেশি নির্ভরশীল। এখনো চীনা রফতানি বাণিজ্য প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, জাপান এবং তাদের মিত্র দেশগুলোতে হয়ে থাকে। সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর চীনের নির্ভরশীলতা অনেক বেশি, জিডিপিতে তার হার ৫৩ শতাংশ। চীন তেল ও লোহার আকরিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল আমদানি করে।

চীনা আমদানি সামগ্রীর বেশির ভাগই আসে সমুদ্রপথে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংঘাতের ক্ষেত্রে নৌ অবরোধে চীন মারাত্মক বিপাকে পড়বে। অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উভয় কারণেই চীনা সরকার বিদেশি বাজারের ওপর থেকে দেশের নির্ভরশীলতা কাটানোর লক্ষ্যে প্রবৃদ্ধির রফতানিমুখী মডেল থেকে অভ্যন্তরীণ সূত্রের দিকে এগোচ্ছে। এছাড়া নৌপথের ওপর নির্ভরশীলতা কাটাতে মধ্য এশিয়া, রাশিয়া বা মিয়ানমারের মতো দেশ ও অঞ্চল থেকেও কাঁচামাল আমদানির দিকে ঝুঁকছে চীন। এগুলোর মাধ্যমে জরুরি অবস্থায় টিকে থাকার মতো একটা ব্যবস্থা হয়তো করা যাবে। কিন্তু তার পরও পাশ্চাত্য প্রাধান্য বিশিষ্ট বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চীনের নির্ভরতা আরো ১৫ থেকে ২০ বছর থাকবে।

তৃতীয়ত, কেবল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই নয়, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং সম্ভবত ভারতের মতো মার্কিন মিত্রদের বিরুদ্ধেও চীন সঙ্ঘাতে যেতে চাইবে না। বড় ধরনের লড়াইয়ে যেতে হলে চীনের অন্তত একটি পরাশক্তি এবং কয়েকটি ছোট ছোট মিত্র প্রয়োজন। চীন যদি রাশিয়ার সাথে স্থায়ী মিত্রতা স্থাপন করা গেলে তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রবল চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারবে। চীন সেদিকেই যাচ্ছে। রাশিয়াও এদিকে আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলায় এ ধরনের জোট এখনই অনেকটা দৃশ্যমান। আগামীতে এটা আরো জোরদার হবে।

এসব কারণে স্বাভাবিকভাবেই আগামী ১৫ থেকে ২০ বছরে এশিয়ায় বড় ধরনের যুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা কম। আর কোনো কারণে যদি যুদ্ধ বেঁধেই যায়, তবে তা হবে খুবই সংক্ষিপ্ত। বর্তমানে যুদ্ধ হলে সামরিক শক্তিতে অনেক এগিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রই জয়ী হবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তবে ২০৩০ সাল নাগাদ চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হবে। তখন লড়াই হতে পারে সমানে সমান।

অবশ্য, ভবিষ্যতে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এশিয়াতেই শুরু হবে এমনটা যেমন নিশ্চিত নয়, আবার এশিয়ায় হবেই না, এমনটাও বলা যায় না। ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের চিত্র কেমন হতে পারে, তা আমরা ভেবে দেখতে পারি।

এশিয়ায় ভারতকে নিয়েই চীন সম্ভবত সবচেয়ে চিন্তিত। ২০৩০ সাল নাগাদ চীনকে পেছনে ফেলে ভারত হবে বিশ্বের সবচেয়ে জনবসতিপূর্ণ দেশ। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনের চেয়ে ভারতের জনসংখ্যা তরুণ, অর্থনীতিও গতিশীল। তাছাড়া দেশটি চীনের চেয়েও দ্রুতগতিতে সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়ন করছে। আবার ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা মানে জাপানকেও এতে টেনে আনা। জাপানও সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে। তারা পারমাণবিক শক্তিও সঞ্চয় করছে। তবে চীন একা থাকবে তাও সত্যি নয়। খুব সম্ভবত ইউরেশিয়ান চুক্তিতে সাক্ষর করে চীন, রাশিয়া, বেলারুশ, কাজাখিস্তান, কিরগিজস্থান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও পাকিস্তান এক কাতারে দাঁড়াবে।

২০ শতকের যুদ্ধগুলোর চেয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার একটি বৈশিষ্ট্য হবে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রধান দেশগুলোর সবাই হবে পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ। তবে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করলে কী হতে পারে তা জানায়, তারা তা ব্যবহার করতে সংযত থাকবে। সব পক্ষই চেষ্টা করবে, একেবারে শেষ চেষ্টা হিসেবে এই অস্ত্রটি ব্যবহার করতে।

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকাও থাকবে। গত কয়েক দশকে যেসব সংস্থা গড়ে ওঠেছে, সেগুলো পুরোপুরি ব্যর্থ হবে, এমনটা আশা করা যায় না। এসব সংস্থা যুদ্ধ শুরু করতে ব্যর্থ হলেও এর তীব্রতা হ্রাস করার চেষ্টা করবে। এমনকি শত্রুদের মধ্যে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনও কিছুটা হলে অব্যাহত থাকবে। এর ফলে এটাই বোঝা যাবে যে, অর্থনৈতিক আন্তনির্ভরশীলতা এবং যুদ্ধ একে অপরকে বর্জন করতে পারে না।

হয়তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে সব পক্ষই সংযমের পরিচয় দেবে। কিন্তু এই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না যে সব পক্ষই তাদের পূর্ণ শক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি ভয়াবহ মাত্রায় বাড়বে। এমনকি পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর তার পরিণাম হবে, আমরা আজ যে বিশ্বকে চিনি, জানি, সেটার আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।।

(ওয়েবসাইট অবলম্বনে)