Home » অর্থনীতি » উত্তাল ষাটের দশক (দ্বাদশ পর্ব)

উত্তাল ষাটের দশক (দ্বাদশ পর্ব)

বৈরীকালে পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন

হায়দার আকবর খান রনো

last 4যখন কোন জাতির মধ্যে জাগরণ দেখা দেয়, তখন সেই জাগরণ সর্বক্ষেত্রে বিস্তার লাভ করে। ষাটের দশক ছিল রাজনৈতিকভাবে উত্তাল দশক। উত্তাল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পাশাপাশি শ্রমিক, কৃষকের উত্থানও ঘটেছিল। ছাত্র আন্দোলনের তীব্রতা তো ছিলই। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ও জাগরণও ষাটের দশকে পরিলক্ষিত হয়েছিল।

৪৭ সালে ইসলামী তমদ্দুনের যে স্রোত বাঙ্গালী সত্তাকে মুছে দিতে চেয়েছিল, পঞ্চাশের দশকেই সেই স্রোত প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। ১৯৫৬ সালেই অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলার স্বীকৃতি এসেছিল পাকিস্তানের সংবিধানে। তবু বাংলা বিদ্বেষী আইয়ুব সরকার চেয়েছিল বাংলার সংস্কৃতিকে হিন্দু সংস্কৃতি বলে, বিজাতীয় সংস্কৃতি বলে বাতিল করতে। ষাটের দশকের শুরুতেই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তীব্র হয়ে উঠেছিল রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনকে কেন্দ্র করে। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মের একশত বছর পূর্ণ হয়েছে। রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ পালন করার প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমরা কজন ছাত্র। পরে অবশ্য এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হন কবি জসিমউদ্দিন, অধ্যাপক মনসুর উদ্দিন, . মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী মোতাহার হোসেন, . গোবিন্দ চন্দ্র দেব প্রমুখ বিখ্যাত ব্যক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক কর্মকাই ছিল না, এটা ছিল রীতিমতো রাজনৈতিক সংগ্রাম। সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন এনএসএফ গুন্ডামী পর্যন্ত করেছিল। রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের বিরুদ্ধে আজাদ পত্রিকা ধারাবাহিকভাবে লিখে চলেছিল। রবীন্দ্রনাথ হিন্দু কবি, মুসলিম বিদ্বেষী, তাই পাকিস্তানের শত্রু ইত্যাদি। এর জবাব অবশ্য ইত্তেফাকে দেয়া হয়েছিল। আবদুল গাফফার চৌধুরীসহ অন্যান্যরা লিখেছিলেন।

রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের জন্য কমিটি গঠন করতে হবে। সে জন্য একটা সভা করা দরকার। সভা করার জায়গা খুজে পাওয়া যায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট (এবং দর্শনের অধ্যাপক) . গোবিন্দ চন্দ্র দেব তার প্রোভাস্টের বাসায় সভা করার জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন। কমিটি করাও বেশ কঠিন ছিল। কারণ অনেকেই কমিটির অন্তর্ভুক্ত হতে চাননি। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের বিচারপতি মোর্শেদকে সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র ইংরেজীর শিক্ষক খান সরওয়ার মুরশীদকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠিত হয়েছিল। পরে অবশ্য আরও দুটি উদযাপন কমিটি হয়ের্ছিল। একবার বাধা অতিক্রম করা গেলে ক্ষীণ ¯্রােত ক্রমাগত প্রবলতর হয়ে উঠতে থাকে।

বেশ উৎসাহের সাথে তিনদিন ধরে তখনকার সবচেয়ে বড় হল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মিলনায়তনে উৎসব হলো। কবিতা, আবৃত্তি, গান, নাটক। অবশ্য গুন্ডাদের দ্বারা আক্রমণের আশঙ্কা সব সময় ছিল। আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। প্রথম দিন কমিটির সভাপতি বিচারপতি মোর্শেদ ইংরেজীতে বক্তৃতা দিয়ে উদ্বোধন ঘোষণা করলেন। এখন ভাবতে অবাক লাগে যে, বাংলাদেশে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। সেখানে উদ্বোধনী ভাষণ হচ্ছে ইংরেজীতে।

রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের মধ্যদিয়ে একটি নতুন সাংস্কৃতিক ¯্রােত তৈরি হয়েছিল। শাসকবর্গের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বাঙ্গালী সংস্কৃতিকে তুলে ধরা এবং বিশেষ করে রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চার তাগিদ তৈরি হয়েছিল। তার থেকেই জন্ম নিল ‘ছায়ানট।’ ছায়ানটের প্রথম সভানেত্রী হয়েছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল।

কমিউনিস্ট পার্টিতে ভাঙ্গন সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও বিভক্তি এনেছিল। তখন চীনপন্থী বলে পরিচিত বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিক কামাল লোহানী ছায়ানট থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হলেন। কামাল লোহানীর নেতৃত্বে আরেকটি বামপন্থী সাংস্কৃতিক সংগঠন আত্মপ্রকাশ করলো নাম ‘ক্রান্তি।’ ছায়ানট ছিল কিছুটা উচ্চ মধ্যবিত্তমধ্যবিত্তের সংগঠন যেখানে রবীন্দ্র চর্চা ও বাঙ্গালী সংস্কৃতির উপর জোর দেয়া হতো। পাকিস্তান আমলে এই রকম সংগঠনেরও রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল। কিন্তু ক্রান্তি এগিয়ে এলো শ্রেণী সংগ্রামের সহযোগী ভূমিকা নিয়ে।

এই দেশের বাম প্রগতিশীল আন্দোলনের ক্রান্তির ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ক্রান্তি একদিকে বহু পুরাতন বিপ্লবী গান (বিশেষ করে ভারতের গণনাট্য সংঘের, হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও সলিল চৌধুরীর গান) পরিবেশন করছে, অপরদিকে তেমনই নতুন সংগ্রামী ও বিপ্লবী গান রচনায় উৎসাহিত করেছে যা ক্রান্তির অনুষ্ঠানে গাওয়া হতো। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কামাল লোহানীর ছিল অবাধ বিচরণ। তিনি অনেক প্রতিভাবান শিল্পীদের জড় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আলতাফ মাহমুদ (৭১ সালে শহীদ হন), শেখ লুৎফর রহমান, সুখেন্দু চক্রবর্তী, আবদুল লতিফ, আরিফুল হক, অজিত রায়, নিজামুল হক, শাহনাজ রহমতউল্লাহ (স্বল্প সময়ের জন্য ছিলেন), মনিরুল আলম মনু, আবেদা বেগম লবি, মালা, শামীম আহমদ, মাহমুদুন্নবী প্রমুখ। পরের দিকে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ফকির আলমগীরও এসে যোগ দেন।

ক্রান্তি’ গান, নাটক, নৃত্যনাট্য রচনা ও পরিবেশন করেছিল। এই সকল, গান, নাচ ও নাটকের মধ্যে ছিল শ্রেণী সংগ্রাম ও বিপ্লবের বিষয়বস্তু। একটি নৃত্যুনাট্যের নাম ছিল ‘জ্বলছে আগুন ক্ষেতে খামারে।’ কৃষক আন্দোলনের উপর ভিত্তি করে রচিত। ক্রান্তি পল্টন ময়দানে দুই লাখ শ্রোতাদর্শকের সামনে গান, নাটক ও নৃত্যনাট্যের অনুষ্ঠান করেছিল। টঙ্গীর শিল্প এলাকায় ক্রান্তির অনুষ্ঠান উপভোগ করেছিলেন শ্রমিকরা মধ্যরাত পর্যন্ত। আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, ক্রান্তির অনুষ্ঠান শ্রমিকদের রাজনৈতিক চেতনা বিকাশে বিশেষ সহায়তা করেছিল। ক্রান্তির শিল্পীরা শিল্পাঞ্চলে, কৃষক আন্দোলনের এলাকায় যেতেন এক ধরনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিয়ে। তারা ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণীতে ভ্রমণ করতেন এবং স্বল্প ব্যয়ে রিহার্সাল ইত্যাদি করতেন। চেষ্টা করতেন শ্রমিককৃষকের সাথে একাত্ম হতে।

এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করতে চাই। একবার ক্রান্তির একদল গিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের ছাত্র সংগঠনের সম্মেলনে গান পরিবেশন করতে। নিকটেই মওলানা ভাসানী থাকতেন সন্তোষে। ক্রান্তির দলটি ভাসানীর সাথে সাক্ষাত করতে গিয়েছিল। তারা ভাসানীকে কয়েকটা গান শুনিয়েছিলেন। আমিও সাথে ছিলাম। মওলানা ভাসানী খুব মনোযোগ সহকারে গান শুনছিলেন। তারপর তিনি একটু হেসে বললেন, ‘খুব ভালো গান। কিন্তু কিষাণ মজুরকে এই গান বুঝতে হলে তো হয় তোমাকে গিয়ে অনুবাদ করতে হবে, না হয় আমার কৃষককে বিএ পাস করতে হবে।’ মওলানা ভাসানীর কথাটার মধ্যে কিছুটা সত্য আছে। ক্রান্তি যে গণসঙ্গীত গাইতো তার ভাষা ও সুরের সাথে নিরক্ষর কৃষকশ্রমিক পরিচিত নয়। ভাষা ও সুর শিক্ষিত মধ্যবিত্তকে উদ্দীপ্ত করে। কিন্তু এই অভিযোগ তো সলিল চৌধুরী বা ভারতীয় গণনাট্য সংঘ প্রসঙ্গেও প্রযোজ্য। ভাসানীর বক্তব্যটি তাই আংশিক সত্য। শ্রমিক কৃষকের মানকেও উন্নত করতে হবে। পল্লী সঙ্গীতের যে সুর ও যে ধরনের কথা সরাসরি গ্রামীণ শ্রমজীবীকে আকৃষ্ট করে, তাকে বাদ দেয়া ঠিক হবে না। সেগুলোও উৎকৃষ্ট। একবই সাথে ক্রান্তির গণসঙ্গীতেরও প্রয়োজনীয়তা আছে। অন্তত টঙ্গীর শ্রমিকদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলতে পারি যে, তা শ্রমিকদের চেতনার মান উন্নত করতে বেশ কাজে লেগেছিল।

ক্রান্তির জন্য গান রচনা করেছেন কয়েকজন তরুণ কবি। তাদের মধ্যে দুজনের নাম উল্লেখ করতে হয়। বুলবুল খান মাহবুব ও ফারুক আলমগীর। তরুণ কবিদের কয়েকটি বিপ্লবী গানের নমুনা দেয়া যাক।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি বিপ্লবী ও একই সাথে ব্যঙ্গাত্মক গান রচনা করেছিলেন বুলবুল খান মাহবুব – ‘ডলার এল দেশে।’ সুর দিয়েছিলেন এবং গেয়েছিলেন শেখ লুৎফর রহমান। গানটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। ফারুক আলমগীরের একটি গান

ওরে আয় রে বেলা যায় রে

মুক্তি মিছিলে এই সবে আয় রে…’

সুর ও কণ্ঠ দিয়েছিলেন মাহমুদুন্নবী।

ক্রান্তির গানের আসরে খুবই বিপ্লবী একটি গান গাওয়া হতো

বাংলার কমরেড বন্ধু

এই বার তুলে নাও হাতিয়ার

ভূমিহীন কৃষক আর মজদুর

গণযুদ্ধের ডাক এসেছে।’

গানটি রচনা করেছিলেন ও সুর দিয়েছিলেন সাধন ঘোষ। গানটি গাইতেন মনিরুল আলম মনু।

বিপ্লবের রক্তে রাঙ্গা ঝান্ডা ওরে আকাশে’ গানটি লিখেছিলেন কবি আবু বকর সিদ্দিকী। শেখ লুৎফর রহমান এই গানটি গাইতেন।

আরেকটি গান ‘বাংলা এবার স্বাধীন হবে, চেয়ে দেখ পূব আকাশ’। এই গানে সরাসরি স্বাধীনতার কথা ছিল।

মেহনতী মানুষের স্বপক্ষে বিপ্লবী সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সর্বাধিক করেছে ক্রান্তি। তবে ক্রান্তির প্রতিষ্ঠার আগেও ঘোর সামরিক শাসনের মধ্যেও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মধ্যদিয়ে প্রগতিশীল রাজনৈতিক প্রচারের কাজটি শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। ১৯৬২ এর সামরিক শাসন বিরোধী ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলন বরফ গলানোর কাজটি করেছিল। তার আগে গোপন কমিউনিস্ট পার্টি ও প্রগতিশীল ছাত্ররা (নিষিদ্ধ ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা) সাংস্কৃতিক মাধ্যমকে ব্যবহার করেছিলেন। তাদের সাংস্কৃতিক হাতিয়ার ছিল ‘সংস্কৃতি সংসদ’। ১৯৬১ সালেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংস্কৃতি সংসদের এক সভা ডাকা হয়েছিল। প্রায় শ’দুয়েক কর্মী উপস্থিত হয়েছিলেন। যদিও এটি ছিল প্রকাশ্যে অরাজনৈতিক এবং নিছক সাংস্কৃতিক সংগঠন, তবু সরকারের চোখে এটি ছিল সাংঘাতিক ব্যাপার। কে বা কারা এই সভা সংগঠিত করেছিল তার খোজখবর নেবার জন্য সরকারি গোয়েন্দা বিভাগ তৎপর হয়ে উঠেছিল। ১৯৬১ সালে সংস্কৃতি সংসদের পক্ষ থেকে একটি মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান করা হয়েছিল ঢাকা কলেজের অডিটোরিয়ামে। এটিও নিছক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না। সামরিক শাসনের কড়াকড়ির মধ্যেও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আসল উদ্দেশ্য। ১৯৬৫ সালে ছাত্র ইউনিয়ন বিভক্ত হলে মেনন গ্রুপের পক্ষ থেকে বাংলা একাডেমীর প্রাঙ্গনে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই সময়ের জন্য সেটাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গণসঙ্গীত ছাড়াও একটি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী নাটক অভিনীত হয়েছিল। নাটকটি লিখেছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। পরবর্তীকালে তিনি একজন খ্যাতিমান নাট্যশিল্পী ও নাট্যকার হয়েছিলেন। কয়েক বছর আগে তিনি প্রয়াত হয়েছেন।

ষাটের দশকে কিছু প্রতিভাবান তরুণ কবির আবির্ভাব ঘটে যারা বামপন্থী ধারায় বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ এবং মেহনতী মানুষের মুক্তি তথা সমাজতন্ত্রের পক্ষে কলম ধরেছিলেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র আসাদ চৌধুরী (পরবর্তীতে তিনি কবি হিসাবে আরও খ্যাতি অর্জন করেছেন) কঙ্গোর স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শহীদ পেট্রিস লুমুম্বার উপর একটি অসাধারণ কবিতা লিখেছিলেন – ‘ইতিহাসের আরেক নায়ক’। (এই কবিতার কথা প্রথম পরিচ্ছেদে উল্লেখ আছে)

ষাটের দশকে যে সকল বড় মাপের কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পী এই দেশের শিল্প সাহিত্য জগতকে সমৃদ্ধ করেছিলেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কবি জসিমউদ্দিন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, পটুয়া কামরুল আহসান, কথা সাহিত্যিক শওকত ওসমান, রণেশ দাস গুপ্ত, সত্যেন সেন, শহীদুল্লাহ কায়সার, জহির রায়হান, সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ প্রমুখ। তাদের মধ্যে শহীদুল্লাহ কায়সার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। রণেশ দাস গুপ্ত, সত্যেন সেন ও শহীদুল্লাহ কায়সার মস্কোপন্থী অংশের সাথে ছিলেন। জহির রায়হান কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ পার্টির পিকিংপন্থী অংশের সাথে যুক্ত ছিলেন। উপরে উল্লেখিত অন্যান্য শিল্পীসাহিত্যিকগণ সরাসরি পার্টি সদস্য না হলেও তারা গণতান্ত্রিক ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিলেন যা তাদের রচনা ও শিল্পকর্মের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছিল।

সেই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকজন শিক্ষক ছিলেন, যারা ছিলেন খুবই উচুমানের মানুষ। অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। তারা প্রত্যেকেই ছিলেন গণতন্ত্রমনা এবং বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। ষাটের দশকের বৌদ্ধিক জগত নির্মাণে তারা প্রত্যেকেই কোন না কোনভাবে অবদান রেখেছেন।

সেই সময় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় একেবারে সামনে চলে এসেছিল। জাতিগত নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এত তীব্র আকারে এসেছিল যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে পাকিস্তান সম্পর্কে মোহ কাটতে শুরু করে। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ এই ভাবেই তৈরি হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও অর্থনীতিবিদ এই ব্যাপারে বেশ বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। অধ্যাপক আবু মাহমুদ, আখলাকুর রহমান, রেহমান সোবহান প্রমুখ এই ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। আখলাকুর রহমান ছিলেন মার্কসবাদী। পূর্ব পাকিস্তানের উপর অর্থনৈতিক নিপীড়নের ব্যাপারেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে তিনি জাসদের রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছিলেন এবং জেলও খেটেছিলেন। ড. আবু মাহমুদের বাসায় একদল ছাত্রের নিয়মিত আড্ডা হতো। পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করা হচ্ছে, এ কথা তিনি খুব জোরের সাথে বলতেন। তিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন হতে হবে, এ কথা তিনি অনেকটা প্রকাশ্যেই বলতেন। একই সাথে তিনি মাকর্সবাদ ও সমাজতন্ত্রের প্রচারও করতেন। আইয়ুব খানের ছাত্র সংগঠন এনএসএফ কর্তৃক তিনি দৈহিকভাবে প্রহৃত হয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষক ছিলেন মাজেদ খান। তার বাসাতেও ছাত্রদের বৈঠক হতো। সেখানেও পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তির প্রশ্নটি আলোচিত হতো। অধ্যাপক রেহমান সোবহান সেই সময় ফোরাম নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা করতেন। এই পত্রিকায় উপরোক্ত অর্থনীতিবিদগণ ও অন্যান্য বুদ্ধিজীবীরা লিখতেন। সেই সব লেখায় পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বৈষম্য এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসনের দাবির বিষয়টি এসেছিল।

একাডেমিক সার্কেলের বাইরেও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ছিল, যেখানে পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তির দাবি উচ্চারিত হতো। যেমন চার্টার্ড অ্যাকাউট্যান্ট ফজলে আলীর বাসায় আড্ডা বসতো। সেখানে উপস্থিত হতেন ব্যারিস্টার ভিকারুল ইসলাম, চিত্র পরিচালক আলমগীর কবীর, রফিকুল ইসলাম, খয়ের খান প্রমুখ। তাদের চিন্তার মধ্যে বাম ও র‌্যাডিক্যাল ছাপ ছিল। তবে তারা মধ্যবিত্তসুলভ শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে যেতে পারেননি। তারা সাইক্লোস্টাইলে ছাপা পত্রিকা বের করতেন, যেখানে পূর্ব পাকিস্তানের বঞ্চনার কথা প্রচার করা হতো। সেই সময় একাডেমিক মহলে দুই অর্থনীতির কথাটি বহুল প্রচারিত হয়েছিল এবং বেশ সমর্থন পেয়েছিল। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুই অর্থনীতি হতে হবে। ছয় দফার মধ্যে এই চিন্তার প্রতিফলন পাওয়া যায়। শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা পেশ করলে উপরোক্ত বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশ শেখ মুজিবও ছয় দফার সমর্থক হয়ে ওঠেন।

এই ভাবে ষাটের দশকে সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি তৈরি হয়েছিল, যার মধ্যে বাম ধারাও প্রবল ছিল।।

(চলবে…)