Home » অর্থনীতি » রাজনীতি আর প্রতিরোধের এনজিওকরণ

রাজনীতি আর প্রতিরোধের এনজিওকরণ

অরুন্ধতী রায়

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

last 2গণআন্দোলনগুলো যে বিপদের মুখে পড়েছে তা হলো প্রতিরোধের এনজিওকরণ। আমি যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি, সেটাকে সহজেই বিকৃত করে সব এনজিও অভিযুক্ত বলে চালিয়ে দেওয়া যেতে পারে। সেটা হবে বোকামি। ভুয়া এনজিও’র বেড়াজাল কিংবা অনুদানের অর্থ সরিয়ে নেওয়া কিংবা কর ফাঁকি (বিহারের মতো রাজ্যে যৌতুক হিসেবে দেওয়া হয়) ঘিনঘিনে নোংরার মধ্যেও নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, মূল্যবান কাজ করছেএমন অনেক এনজিও রয়েছে। তবে সাধারণভাবে এনজিও বিষয়টিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করাটাই গুরুত্বপূর্ণ।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতে তহবিলপুষ্ট এনজিও’র বিপুল বিকাশ ঘটে ১৯৮০এর দশকের শেষ দিকে এবং ১৯৯০এর দশকে। ভারতের বাজার নব্যউদারবাদের জন্য খুলে দেওয়ার ঘটনাও ঠিক ওই সময়ে ঘটেছিল। তখন ভারতীয় রাষ্ট্রটি কাঠামোগত সমন্বয়ের জন্য বিশ্বব্যাংক ও আইএমফের শর্তপূরণের লক্ষ্যে পল্লী উন্নয়ন, কৃষি, জ্বালানি, পরিবহন ও গণস্বাস্থ্য খাত থেকে তহবিল প্রত্যাহার করে নিচ্ছিল। রাষ্ট্র তার ঐতিহ্যবাহী ভূমিকা থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রেক্ষাপটে এনজিওগুলো ঠিক এসব এলাকাতেই কাজ করতে নেমে পড়ে। পার্থক্য অবশ্যই ছিল। তা হলো সরকারি ব্যয় প্রকৃত পক্ষে যতটুকু কমানো হয়েছিল, তার অতি ক্ষুদ্র অংশ পাওয়া যাচ্ছিল।

বিপুল তহবিলপুষ্ট বেশির ভাগ এনজিও’র অর্থায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা করে নানা ধরনের সাহায্য ও উন্নয়ন সংস্থা, সেগুলো আবার তহবিল পায় পাশ্চাত্যের বিভিন্ন সরকার, বিশ্বব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ এবং কিছু কিছু বহুজাতিক করপোরেশনের কাছ থেকে। সব সংস্থা ঠিক একই রকম না হলেও তারা নিশ্চিতভাবেই শুরুতেই সরকরি ব্যয় বিপুলভাবে হ্রাস করার দাবি জানানো নব্যউদার প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে থাকা একই শিথিল রাজনৈতিক কাঠামোর অংশবিশেষ ছিল।

এসব সংস্থা কেন এনজিওগুলোতে তহবিল দেয়? স্রেফ পুরনো আমলের মিশনারি উদ্দীপনার কারণে? অপরাধবোধে তাড়িত হয়ে? না, এর চেয়ে অনেক বড় কারণে। এনজিওগুলো এই ধারণা দিচ্ছে যে তারা সঙ্কোচনশীল রাষ্ট্রের ফাঁকা করা শূন্য স্থান পূরণ করছে। তারা করছে, তবে বস্তুগতভাবে অকিঞ্চিতকর পন্থায়। তাদের প্রকৃত অবদান হলো, তারা রাজনৈতিক ক্ষোভ প্রশমন করছে এবং লোকজন যেটা অধিকার হিসেবে পেতে পারত, সেটা পাচ্ছে সাহায্য বা দান হিসেবে। তারা জনগণের মনমানসিকতা বদলে দিচ্ছে। তারা লোকজনকে নির্ভরশীল বানিয়ে ফেলছে, তাদেরকে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ভোঁতা প্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে। এনজিওগুলো সরকার এবং জনগণের মধ্যে এক ধরনের বাফার জোন সৃষ্টি করছে। সাম্রাজ্য ও এর প্রজার মধ্যে দাঁড়াচ্ছে। তারা পরিণত হয়েছে মধ্যস্ততাকারী, ব্যাখ্যাকারী ও সহায়তাকারীতে।

দীর্ঘ মেয়াদে এনজিওগুলো যেসব লোকের মধ্যে কাজ করে তাদের কাছে নয়, তাদের দায়বদ্ধতা তাদের তহবিলদাতাদের কাছে। বৃক্ষবিদেরা যেটাকে নির্দেশক প্রজাতি হিসেবে অভিহিত করে, তারা তাই। এনজিও’র প্রাদুর্ভাব নব্যউদারবাদের ভয়াবহ বিপর্যয়ের মতোই কিংবা এর চেয়েও ঢের বেশি। এটাকে সবচেয়ে মর্মভেদী পন্থায় বর্ণনা করা যায় এভাবে যে, কোনো দেশ আক্রমণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি নিয়ে একইসঙ্গে তাব আড়াল করতে এনজিওকে যাওয়ার জন্য তৈরি করে ফেলল। তাদের তহবিল এবং যেসব দেশের সরকার তাদেরকে তাদের ইচ্ছানুযায়ী কাজ করার সুযোগ দেয় তারা যাতে ঝুঁকিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে এনজিওগুলো কমবেশি রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে অগভীর কাঠামোতে তাদের কার্যক্রম উপস্থাপন করে। যেকোনোভাবেই তা অস্বস্তিকর ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

গরিব দেশ এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অরাজনৈতিক (প্রকৃতপক্ষে চরম রাজনৈতিক) পীড়াদায়ক প্রতিবেদনগুলোতে কার্যত ওইসব অন্ধকার দেশের অন্ধকার লোকদেরকে অপ্রকৃতিস্থ বলে মনে হয়। আরেকটি অপুষ্টির শিকার ভারতীয়, আরেকটি বুভুক্ষু ইথিওপিয়ান, আরেকটি আফগান উদ্বাস্তু শিবির, আরেকটি পঙ্গু সুদানিরসাদা লোকের সাহায্যের দরকার পড়ে। তারা অজ্ঞভাবে বর্ণবাদী বদ্ধমূল ধারণাকেই আরো জোরদার করে এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার অর্জন, যন্ত্রণামুক্তি ও করুণার (কঠোর ভালোবাসা) কথা বারবার জাহির করে।

চূড়ান্ত পর্যায়ে অপেক্ষাকৃত ছোট, তবে অনেক ক্ষতিকরভাবে এনজিওগুলো যে মূলধন পায়, তা বিকল্প রাজনীতিতে সেই ভূমিকাই রাখে # – যা গরিব দেশগুলোতে প্রবাহমান ফটকাবাজারি মূলধন করে। এটা এজেন্ডা নির্দেশ দিয়ে শুরু করে। এটা সঙ্ঘাতকে সমঝোতার আলোচনায় পরিণত করে। এটা প্রতিরোধকে বিরাজনীতিকরণ করে। ঐতিহ্যগতভাবে আত্মনির্ভর স্থানীয় লোকদের আন্দোলনকে এটা বাধাগ্রস্ত করে। এনজিও’র তহবিল আছে, যা ওইসব স্থানীয় লোককে চাকরি দিতে পারে, যারা অন্যথায় প্রতিরোধ আন্দোলনে সক্রিয় হতে পারত। কিন্তু চাকরি পেয়ে তারা মনে করে তারা সরাসরি সৃষ্টিশীল কাজে নিয়োজিত (জীবিকা অর্জন করছে, যদিও এনজিওগুলো করছে ভিন্ন কাজ)

প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিরোধ এ ধরনের কোনো সংক্ষিপ্ত পথ ধরে না। রাজনীতির এনজিওকরণ প্রতিরোধকে সুবেশধারী, পরিমিত, বেতনভুক, ৫টা অফিসে পরিণত করার হুমকি সৃষ্টি করেছে। সামান্য বাড়তি কিছু ছুঁড়ে দিয়ে। প্রকৃত প্রতিরোধের সত্যিকারের ফল আছে। তাতে কোনো বেতন নেই।।

পামবাজুকা ডট ওআরজি