Home » শিল্প-সংস্কৃতি » মুক্ত চিন্তা আর জ্ঞান নিষিদ্ধে স্বৈরাচারের ভূমিকা নিয়ে চলচ্চিত্র

মুক্ত চিন্তা আর জ্ঞান নিষিদ্ধে স্বৈরাচারের ভূমিকা নিয়ে চলচ্চিত্র

ফ্লোরা সরকার

last 6ফ্রাসোয়া ক্রফোর ফারহেনহাইট ফোর ফিফটি ওয়ানএবং নবারুণ ভট্রাচার্যের খেলনানগরযেন ভিন্ন বয়ানে এক হিম শীতল নগরের গল্প বলে। ফারহেনহাইট ছবির শহর এবং খেলনানগর গল্পের শহর যেন একই শহর। দুটোতেই কোন জনমানবের চিহ্ন আমরা পাইনা। যেসব মানুষকে পাই, তারা যেন সব খেলনা পুতুলের মতো ঘোরফেরা করে। দম দেয়া পুতুলের মতো তারা রাষ্ট্রের নির্দেশ মেনে চলে। খেলনা নগর এমনই এক হিম শীতল নগর যেখানে খুন, গুম হয়ে গেলেও কেউ মুখ খোলেনা। বিষাক্ত নদীর পানি পান করে তারা বেঁচে থাকে। তাই একটা চরিত্রের মুখে আমরা বলতে শুনি খেলনানগরে কখনও বোমা পড়বে না। হয়ত আমরা ধুঁকে ধুঁকে মরব। কিন্তু বোমায় পুড়ে মরতে হবেনা।যেসব খুন,গুম হয়, সেসব ঘটনা বহু বহু বছর পর এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয় যখন তার প্রকাশঅপ্রকাশের মাঝে কোনো ভেদ থাকেনা। কিছু যায় আসেনা। তবে অন্যায় দেখে যাওয়া এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মতো মানুষ সব যুগে সব স্থানে থাকে। অধিকাংশ মানুষই অন্যায় দেখে যায়, সাহসের অভাবে। কিছু মানুষ শুধু প্রতিবাদী এবং সাহসী হয়ে ওঠে। খেলনানগরে যেমন আমরা পাই ৮ এবং ৯ নামে দুটো প্রতিবাদী চরিত্র, ফারহেনহাইটে তেমনি পাই মনটাগকে। মনটাগ দমকল বাহিনীর একজন কর্মী। তবে এই দমকল আগুন নেভাবার কাজে ব্যবহৃত হয়না, আগুন জ্বালাবার কাজে ব্যবহৃত হয়। মনটাগ এবং তার দমকল বাহিনীর কাজ হলো, শহরের বাড়িঘর, দোকানপাট, রাস্তাঘাট, পার্ক সহ যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময়ে যখন বই পাওয়া যায়, দমকল বাহিনী নিয়ে ৪৫১ ফারহেনহাইট উত্তাপে সেগুলো পুড়িয়ে ফেলা। এই দমকল বাহিনী যেন সুসংঘঠিত এক গেস্টাপো বাহিনী, রাষ্ট্র যার পরিপোষক। এটা এমন এক শহর, যেখানে রাষ্ট্রের কড়া আইনে বই পড়া নিষিদ্ধ, রাষ্ট্রের কড়া নির্দেশ যেখানে যেখানে বই পাওয়া যাবে সেখানে সেখানে চড়াও হয়ে বই পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু বই পোড়াবার এই উৎসব কেনো?

হীরক রাজার দেশেছবির রাজা পাঠশালা বন্ধের আগে মন্ত্রীদের বলেন এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে। বেশি জেনে যাওয়াকে রাষ্ট্রের বড় ভয়। কারণ জানা মানেই বোঝা আর বুঝে ফেলার অর্থ রাষ্ট্রের সব অন্যায় কর্ম ধরা পড়া। ধরা পড়ার অর্থ রাষ্ট্রীয় অন্যায়শোষণনিপীড়ন মানতে অস্বীকার করা। মনটাগের প্রতিবেশী ক্ল্যারিস যখন মনটাগকে জিজ্ঞেস করে বই পড়া নিষিদ্ধ কেনো, মনটাগ উত্তরে জানায়, বই মানুষকে অসুখী করে, বিরক্ত করে আর অসামাজিক কোরে তোলে। এক বৃদ্ধার বাড়িতে বিপুল পরিমাণ বই পোড়াবার সময়, মনটাগের সিনিয়ার অফিসার আরেক কাঠি এগিয়ে বলে বইয়ের ভেতরে আসলে বলার কিছু নেই। এই যে দেখছো (ক্যামেরার ক্লোজে শেক্সপিয়ারের ওথেলো এবং মার্চেন্ট অফ ভেনিস দেখানো হয়) এসব নাটকের চরিত্রগুলো কখনো বাস্তবে পাবেনা। এসব পড়ার পর পাঠকের নিজের কাছে তার জীবনকে অসুখী মনে হয়, তখন তারা এসব কাল্পনিক চরিত্রের কাল্পনিক জীবনকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকতে চায়। এই যে বইগুলো (পর্দায় দর্শনের বই দেখা যায়) এগুলো উপন্যাসের চেয়েও নিকৃষ্ট। প্রতিটা দার্শনিক মনে করে সে যা বলে সেটাই ঠিক, বাকিরা বেঠিক। এক যুগে এক দল দার্শনিক এসে বলে, সবকিছু পূর্ব নির্ধারিত হয়ে আছে, আরেক যুগে আরেক দল এসে বলে, মানুষের নির্বাচন করার স্বাধীনতা আছে । এভাবেই বই পোড়াবার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে জায়েজ করা হয়। চমৎকার সব যুক্তি দিয়ে মানুষকে মানতে বাধ্য করা হয় যে, বই পোড়ানো অত্যন্ত একটা পবিত্র কাজ। বই পড়ার আগ্রহ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়ার জন্যে পরিচালক ক্রুফো চমৎকার একটি মেটাফোর ব্যবহার করেন। এবং তা হলো টেলিভিশন নামক যন্ত্র। ছবিটি যখন নির্মিত হয় (১৯৬৬) সে সময় ইলেকট্রনিক মিডিয়া হিসেবে টেলিভিশনের উদীয়মান সময়। সিনেমার পাশাপাশি টেলিভিশন মানুষকে আকর্ষণের এক উচ্চ জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। ক্রফো এর সুদূর প্রসারি প্রভাব তখনই ধরতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, ভবিষ্যতে অত্যন্ত শক্তিশালী মিডিয়া হিসেবে টেলিভিশন গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নেবে। এই মিডিয়া যা শেখাবে, যা পড়াবে দর্শক তাই গ্রহণ করবে। বর্তমানে আমরা দেখতে পাই এই টিভিমিডিয়া কীভাবে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি পরিচালনা করছে। বিজ্ঞাপনের মোড়কে কীভাবে ভোগবাদী সমাজের দিকে মানুষকে ক্রমেই গ্রাস করে নিচ্ছে। সর্বাধুনিক মিডিয়া ইন্টারনেট যেন টিভি মিডিয়ার আরেক উন্নততর সংস্কৃরণ। এখন আর ভোক্তাকে ভোগের জন্যে দোকানে ছুটে যেতে হয়না, ঘরে বসেই সে বিভিন্ন জিনিস বাছাইয়ের মধ্যে দিয়ে ইন্টারনেটে ক্রয় করে। কর্পোরেট দুনিয়ার বদৌলতে মানুষ এখন পড়াশোনার চেয়ে ভোগটাকেই মূল্য দেয় অধিক পরিমাণে। তাছাড়া কর্পোরেট পৃথিবীতে ঢুকবার জন্যে এখন আর অতো পড়াশোনা (এখানে পড়াশোনা বলতে বোঝানো হয়েছে, সিলেবাস বর্হিভূত বইপত্র) করতে হয়না। ব্যংকিং আর মার্কেটিং ভালো করে পড়লে এবং বুঝলেই সারাজীবনের জন্যে একটা নিশ্চিন্ত জীবন পাওয়া যায়। কার অত দায় পড়েছে ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতি ঘাটবার?

ছবিতে আমরা দেখি মনটাগের স্ত্রী লিন্ডা দিনের প্রায় অধিকাংশ সময় টিভি অনুষ্ঠান নিয়ে মগ্ন থাকে। টেলিভিশানে নাগরিকের জীবনযাপন কেমন হওয়া উচিত এসব পাখি শেখানো বুলির আকারে শেখানো হয়। লিন্ডা সেসব শোনে আর তাতে সে বিশ্বাস স্থাপন করতে থাকে। টেলিভিশানই যেন শিক্ষার একমাত্র আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়ায়। ইতিমধ্যে মনটাগের মাঝে ধীরে অথচ অত্যন্ত গোপনে এক বিশাল পরিবর্তন সূচিত হতে থাকে। সে গভীর রাতে বই পড়া শুরু করে। বই পোড়াবার সময় মাঝে মাঝে সে কিছু বই চুরি করে নিয়ে আসতো সাধারণ কৌতুহলবশত। বাড়ির গোপন কুঠরিতে সেসব বই রেখে, রাতের গভীরে সেগুলো পড়া শুরু করে। যতই পড়ে তার ভেতরে পরিবর্তন সূচিত হতে থাকে। বই পোড়ানো এক কর্মী থেকে সে ধীরে ধীরে বই জাগ্রত কর্মীতে রূপান্তরিত হতে থাকে। একদিন লিন্ডার কাছে ধরা পড়লে সে বলে একটা বই মানে একটা জীবন। আর কখনো আমার বই পড়া নিয়ে কিছু বলতে আসবেনা। একদিন অফিস থেকে ফিরে সে দেখতে পায় লিন্ডা তার তিন বান্ধবী নিয়ে টিভি দেখছে। টিভিতে পাখি পড়ানো বুলি শেখানো হচ্ছে। মনটাগ টিভি বন্ধ করে একটা উপন্যাসের একটা অংশ তাদের পড়ে শোনায়। উপন্যাসের গল্প তাদের একজনের জীবনের গল্পের সঙ্গে এমন ভাবে মিশে যায় যে সেই নারী শুনতে শুনতে কেঁদে ফেলে। মনটাগ তাদের বলে আপনারা অন্তসারশূন্য ছাড়া আর কিছু নন। আপনারা আপনাদের স্বামীর মতোই মূর্খ। আপনারা দিন যাপন নয়, দিন গুজরান করছেন। এটাকে বেঁচে থাকা বলেনা। ছবির গতি যতই এগিয়ে যায় মনটাগকে ততই প্রতিবাদী হতে দেখি। বইয়ের ভেতর দিয়ে মানুষের জ্ঞানের যে উন্মোচন ঘটে, উপলব্ধির যে উন্মেষ ঘটায়, বোধের যে গভীরে নিয়ে যায়, মনটাগ যেন ধীরে ধীরে সেই গভীরতায় প্রবেশ করতে থাকে। বই পোড়ানোর স্বতঃস্ফুর্ততা তার মাঝে আর দেখা যায়না। বই পোড়ানোর কাজে তার মন বসেনা আর। এর মাঝে মনটাগের সেই প্রতিবেশী ক্ল্যারিসের বাড়ির বই সব পুড়িয়ে দেয়া হলে, ক্ল্যারিস তাকে জানায়, সে শহর ছেড়ে চলে যাবে নদীর ওপারে। যেখানে আছে আরেক বিস্ময়। ছবির এখানে এসে আমরা প্রবেশ করি ক্রফোর আরেক বিশ্ব।

ক্ল্যারিসের যাবার পরে মনটাগও নদীর ওপারে পালিয়ে যায়। কেননা ইতোমধ্যে মনটাগের বাড়ির বইও পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং মনটাগ যে বইয়ের দ্বারা আলোকপ্রাপ্ত তা অফিসে জানাজানি হয়ে যায় তারই স্ত্রী লিন্ডার মাধ্যমে। নদীর ওপারে যেয়ে মনটাগ বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করে বই এবং তার শব্দভান্ডার ধরে রাখার এক অভিনব পদ্ধতি। এখানে যারা ইতিপূর্বে পালিয়ে এসেছে, তারা সবাই স্মৃতিতে অতিযত্নেধরে রাখছে একেকটা বই। এভাবে একে একে মনটাগের সঙ্গে দেখা হয়, প্লেটোর রিপাবলিক, বাইরনের কোসি, লিউইস ক্যারলের এ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড, স্যামুয়েল বেকেটের ওয়েটিং ফর গডো, জেন অস্টিনের প্রাইড এ্যান্ড প্রিজুডিস, চার্লস ডিকেন্সের পিক উইক পেপার সহ আরও অনেক বই। প্রত্যেকে তাদের স্মৃতিতে একেকটা বই ধারণ করে রেখেছে। যে মানুষটি যে বই স্মৃতিতে ধরে রেখেছে তার নাম সেই বই বা লেখকের নামানুসারে রাখা হয়েছে। সেখানে ক্ল্যারিসের সঙ্গেও মনটাগের দেখা হয়। ক্ল্যারিস মনটাগের হাতে একটা বই দেখে, যে বইটি সে পালিয়ে আসার সময় নিয়ে এসেছিলো। ক্ল্যারিস তাকে জানায় বইটি অতিসত্ত্বর পড়ে ফেলতে কেননা বইটি পুড়িয়ে ফেলা হবে। মনটাগ বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে চায় এখানেও কেনো বই পোড়ানো হবে। ক্ল্যারিস তাকে বলে হ্যা,আমরা পোড়াই যাতে কেউ যেন আমাদের স্মৃতি থেকে জ্ঞান কেড়ে নিতে না পারে। আমরা এই জ্ঞান মস্তিষ্কে ধারণ করে রাখি, যাতে স্মৃতি থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারে না। ঠিক তারপরেই আমরা দেখি অগনিত নারী পুরুষ বনের ভেতর, নদীর ধারে পায়চারি করে আর পৃথিবীর নানান ভাষার নানান বই মুখে মুখে বলে যায়। চিনা, জাপানি, ইংরেজি, জার্মান, ফরাসি সব দেশের, সব ভাষার, সব জ্ঞান যেন একসঙ্গে মিলিত হয়ে আছে এখানে। আমরা বুঝতে পারি জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার মৃত্যু নেই। জ্ঞানের স্রোতকে কখনো বন্ধ করে রাখা যায় না। আমরা আরও বুঝতে পারি, কোন রাষ্ট্র তার কর্তৃত্ব বা আইনের দ্বারা কোন লেখকের বই বা লেখা, বাজেয়াপ্ত বা পুড়িয়ে ফেললেও মানুষের চিন্তার স্রোত বা জ্ঞানের স্রোতকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা যায় না। তখনই আর্নেস্ট হেমিংওয়ের দ্য ওল্ড ম্যান এ্যন্ড দ্য সির সেই বুড়োর কথা মনে পড়ে যে বলেছিলো মানুষকে ধ্বংস করা যায়, কিন্তু পরাজিত করা যায় না। মানুষের মুক্ত চিন্তার কাছে রাষ্ট্র তাই নতজানু হয়েই থাকে।।