Home » বিশেষ নিবন্ধ » হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও গানের বাহিরানা (শেষ পর্ব)

হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও গানের বাহিরানা (শেষ পর্ব)

গুরু একজন নয়, গণসমষ্টি

(গণমানুষের শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্ম ১৯১২ সালের জানুয়ারিতে এবং মৃত্যু ১৯৮৭ সালের নভেম্বরে। প্রখ্যাত এই গণসঙ্গীত শিল্পীর প্রতি আমাদের বুধবারএর শ্রদ্ধা।)

আনু মুহাম্মদ

last 2রমেশ শীল পূর্ববঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের এক ভাষণে যা বলেছিলেন তা এক নির্মম বাস্তবতাকে আমাদের সামনে উপস্থিত করে। একইসঙ্গে এটাও দেখায় যে, কেন লোককবি লোকশিল্পীর সব সৃষ্টি জনগণের পক্ষে যায় না? কেন শিল্পীজগতে ধ্বস নামে যা আমরা এখনও প্রত্যক্ষ করি। রমেশ শীল বলেছিলেন, ‘গ্রামের চাষী গরীব হইল, ফুলিয়া ফাঁপিয়া উঠিল জমিদার মহাজনের দল, চাষীরা আর গ্রাম্য কবি ও লোকশিল্পীদের অন্নসংস্থান করিতে পারে না। গ্রাম্য কবিগণ পেটের দায়ে এবং মোটা অর্থের প্রলোভনে জমিদার মহাজনদের উৎসব মন্ডপে আসিয়া ভিড় জমাইল। বাউন্ডুলে ইয়ারদোস্ত পরিবৃত ধনী জমিদার বাবুদের মনোরঞ্জন করিতে গিয়া গ্রাম্যকবিগণ অশ্লীল ভঙ্গীতে নাচিল, গান গাহিল। নারীজাতির কুৎসা রটনা করিয়া তথাকথিত পুরুষপুঙ্গবকে পরিতৃপ্ত করিল। আমার ব্যক্তিগত কবিজীবনে অসংখ্যবার এইভাবে নাচিয়াছি। অশ্লীল গান গাহিয়াছি।…’

বর্তমান বাংলাদেশে বহুসংখ্যক টিভি চ্যানেল, এফএম রেডিও, ইন্টারনেট, সিডি ডিভিডি করবার অনুকূল পরিস্থিতি গানের শিল্পজগতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে বহুগুণ। বাজার লক্ষ্য হলেও গানের জগতে নানা পরিবর্তনও লক্ষ্যণীয়। সুর ও কথায় লোকসঙ্গীত বা শেকড় সন্ধান একটি বড় প্রবণতা। কিন্তু এই লোক সঙ্গীত আশ্রয়ে যে ধারাটি সবচাইতে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে সেটি হল মৃত্যুর ধারা, জীবনের নয়। কেন মৃত্যু, আত্মসমর্পণ আর হতাশা কিংবা ব্যক্তি বিচ্ছিন্নতার কথা ও সুর জনপ্রিয় গানের মূল ধারা তৈরি করে? এমনকি ব্যান্ড সংগীত বলে পরিচিত ধারাও কেন মৃত্যুর জয়গান করতে থাকে? কেন বাণিজ্যিক স্রোতও এগুলো ঘিরেই আবর্তিত হয়? কেন বাণিজ্যিক তৎপরতা শিল্পীর সকল সৃজনশীলতা গ্রাস করতে উদ্যত হয় এবং সফলও হয়?

প্রশ্নটি একটু ঘুরিয়ে হেমাঙ্গ বিশ্বাসেরও। তিনি চীন, রাশিয়া বা ইউরোপের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে বলছেন, ‘শোষক শ্রেণীর ভাবাদর্শের সঙ্গে সংঘাতই লোক সংগীতের বিচার ও বিকাশের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু এদেশে, বিশেষত বাংলার লোকসংগীত জীবনবিমুখী অধ্যাত্মবাদের দ্বারা এমন আচ্ছন্ন কেন?’

অদৃষ্টবাদ, আধ্যাত্মবাদ, তিনি বলছেন, ‘আত্মসমর্পণের জীবনযান, জীবনের অনিত্যতার দর্শন জনজীবনকে প্রভাবিত করতে লাগলো

বড় সাধে বাইন্ধাছ ঘর, বড় করছাও আশা

রজনী পরভাত কালে পঙ্খী ছাড় বাসা।’

হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলছেন, ‘কিন্তু প্রশ্ন জাগে, লোকসংগীতে তার (কৃষক বিদ্রোহের) প্রতিধ্বনি সেরকম আমরা পাই না কেন? তিতুমীর দুদুমিঞা বা সমশের গাজীদের নিয়ে ‘ব্যালাড’ বা গীতিকা পেলাম না কেন? ভাবজগতে অধ্যাত্মবাদের অপ্রতিহত ক্ষমতাই কি তার একমাত্র কারণ? তাছাড়াও অন্য প্রশ্ন মনে জাগে।’

বাংলাতেও অন্যায় নিপীড়ন শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে অসংখ্য গান, প্রবাদ, প্রবচন, শ্লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মতে, সমস্যাটা অনেকটা গবেষক ও সংগ্রাহকদের, তাদের মানসিকতায়, মতাদর্শে। এই মধ্যবিত্ত, ইউরোপের চোখে দেখা ভারতকে, তার ‘আত্মসমর্পণ, আধ্যাত্মিক তত্ত্বমূলক ধারাটিকেই ভারতীয় ধারা বলে সনাক্ত করেছেন।’ কিন্তু তিনি অনেক দৃষ্টান্ত দিয়ে বলছেন, ‘সামান্য অনুসন্ধান করলে আজও অনেক টুকরো ছড়া, গানের ভাঙাকলি, গীতিকার ছিন্নমালা খুঁজে পাওয়া যায়শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতের সর্বত্র।’ হেমাঙ্গ বিশ্বাস অনেকগুলো দৃষ্টান্ত দিয়েছেন যেখানে সিরাজউদ্দৌলা, ঝাঁসির রাণী, নীলবিদ্রোহ, প্রজাবিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহের বিষয়ে জনঅনুভূতি, উপলব্ধি আছে আছে বিদ্রোহের এবং অস্বীকারের চেতনা। বলাই বাহুল্য, পরবর্তী সময়ে কে কোন ধারাকে গ্রহণ করবে তা নির্ভর করে তার মতাদর্শ ও সামাজিক অবস্থানের উপর।

.

সবসময় স্পষ্ট আকারে না হলেও সাধারণভাবে নারী, নিপীড়িত মানুষ, সংখ্যালঘু মানুষের গানে কথায় যে ব্যক্তিক অনুভূতি প্রকাশিত হয় তাতে এই জগতে তাঁদের জীবন সংগ্রামের ক্ষোভ, হতাশা আর বেদনার ছাপ পাওয়া যায়। তাতে যে সবসময় সরবে বিদ্রোহের কথা আছে তা নয়, কিন্তু সমষ্টির ভেতর প্রচলিত এসব নানাগানে জনসমাজের ভেতরকার মুক্তির আকুলতা এবং জীবন আকাঙ্খা প্রকাশিত হয়। হেমাঙ্গ বিশ্বাস দেখেছেন বিভিন্ন ধরনের গানে এর বিবিধ প্রকাশ ঘটে। যেমন ছাদঢালা গানে অপূরিত আকাঙ্খা, নদীর যাত্রায় প্রকৃতির অনিশ্চয়তা, ভাটিয়ালিতে সাগরের বিশালত্ব, অনিশ্চয়তা, ডাকাতের ভয়, জমিদার বিরোধী ক্ষোভ, ভাওয়াইয়ায় নারীর বেদনা, একই সঙ্গে বঞ্চনার ক্ষোভ ও পরাণ পোড়া আর্তি।

ও মনরে ভবেরি বাজারে আইলাম

ষোল আনা লইয়া

আমার সর্বস্বধন লুইট্যা নিল

ডাকাইতে লগ পাইয়া।’

কিংবা,

 

ও মনরে ভবসাগরের ঢেউ দেখিয়া

প্রাণপাখি যায় উড়িয়া রে

শূন্যঘাটে পইড়্যা রইলাম

ভাঙাতরী লইয়া রে।।…’

 

হেমাঙ্গ বিশ্বাস এই গান সম্পর্কে বলেন, ‘ভবের বাজারে সর্বস্ব অপহরণকারী কে? আর সর্বস্ব হারিয়ে ভাঙাতরী নিয়ে শূন্যঘাটে পড়ে থাকার কারণটি কি? এর পেছনে যারা আধ্যাত্মিকতা খুঁজে বেড়ান খুঁজুন, কিন্তু আমরা জানি এর পিছনের ইতিহাসটা।’ বলেন, ‘যাকে আধ্যাত্মিক বলা হয়, সেই সব গানে জীবনের বঞ্চনাই ব্যক্ত।’

কিংবা গুরু বা মুর্শিদের কাছে কী নালিশ করে কৃষক?

 

গুরু ও আমার বাড়ির চারিধারে

ডাকাইতের দল বসত করে

মনা ডাকাইত দলের সর্দার,

তারা লুটে করে ছারখার।।

গুরু ও আমার সাতপুরুষের বাড়িখানা

তাতে জমিদারের খাজনা দেনা

আমায় কখন জানি উচ্ছেদ করে

খাজনার যমরাজা তহশিলদার।।’

 

কিংবা,

মুরশিদ ও কারো বা আছে দলান গো কুঠা

আমার আছে ভাঙা ডেরা

ডেরায় মেঘ মানে তুফান মানে না

শুনেন গো মুরশিদ…..।।’

 

হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ব্যাখ্যা, ‘কিন্তু আমাদের অর্ধউপনিবেশিক সমাজে, ভূমিতে চিরস্থায়ী ব্যবস্থায় নব্য ভূম্যধিকারীর নিরঙ্কুশ শোষণে পল্লী জীবনের কৃষি সংকটের আবদ্ধ জলাশয়ের গেঁজলায় বাউল তত্ত্বেরও সামাজিক চেতনার বহির্মুখীতা তন্ত্রাচারী যোগাসনের গুহ্য দুর্বোধ্যতা এবং অর্থহীনতায় ডুবে গেল। যে বাউলরা বলতেন, ‘দেবের দুর্লভ মানবজন্ম তোমার’ সেই বাউলরা আবার যখন দেখলেন, ‘মানবজনম সফল হইল না’ তখন তাঁর ভাগ্যের কাছে বৈষ্ণবীয় আত্মসমর্পণের আশ্রয় নিলেন। দোষী করলেন ‘ষড়রিপুকে’, তাকাতে পারলেন না পরশ্রম অপহরণকারীদের দিকে। উৎপাদনকারী শ্রমজীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মরতিতে নিমগ্ন হলেন। এমনকি যে লালন পরজন্মের চিন্তাকে নস্যাৎ করে মনুষ্যজীবনকে শ্রেষ্ঠ জীবন বলেছেনদীর্ঘজীবী সেই লালনকে দেখি পরপারের ভাবনায় আকুল।’

নারীর ক্রন্দন, আর্তি, বাসনা, প্রেম কীভাবে গানে গানে নানাভাবে ছড়িয়ে আছে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। প্রেম ও প্রকৃতির অবিচ্ছিন্নতা কতভাবে প্রতিফলিত, তা নারীর দৃষ্টিতে আরও স্পষ্ট হয়। হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলছেন, ‘কৌম গোষ্ঠীসমাজের সমানাধিকারের স্থলে এল সামন্তসমাজের পুরুষ প্রাধান্য, বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ, বৈধব্য প্রথা, বংশকৌলীন্য, শাঁখা, সিঁদুর, পর্দাপ্রথা ইত্যাদি। তারই সমর্থনে এল নতুন নতুন মূল্যবোধ, নতুন ধ্যান ধারণা ও ধর্মচিন্তা। কিন্তু শ্রমজীবী সমাজ তা সহজে মেনে নিল না। এই সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ গানে, গল্পে, গাথায় নানাভাবে ধ্বনিত হয়ে উঠল।’ কখনও রূপকে কখনো সরাসরি।

নাইওর নিয়েও বহু ভাওয়াইয়া গান আছে। হেমাঙ্গ বিশ্বাস ভাওয়াইয়া গানকে ‘সামন্ত সমাজের বিরুদ্ধে নারী জাতির প্রতিবাদের গান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।’ বৃদ্ধ স্বামীর চাইতে দেবর, বিবাহিত অবস্থায় বন্ধুর জন্য আনচাল অস্থিরতা, ভাইএর জন্য পরাণ পোড়া, প্রবাসী স্বামীর জন্য বিরহ, নির্যাতক স্বামীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ সবই এসব গানে পাওয়া যায়।

হেমাঙ্গ বিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, ‘ব্রাহ্মণ্য ধর্মশাসিত সমাজের জাতিকূলধর্মের নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধেই একদিন বৈঞ্চব জাগরণ এসেছিল এবং জনসাধারণের মধ্যে তা ব্যাপ্তি লাভ করেছিল। প্রেম যেখানে প্রতিবাদী; সেটুকুই লোকসংগীত গ্রহণ করেছে। প্রেম যেখানে ভক্তিমার্গে অধ্যাত্মবাদী, লোকসংগীতে তার প্রতিফলন অত্যন্ত ক্ষীণ এবং তা এসেছে অনেক পরে।’

 

.

মনে রাখা দরকার যে, গণসঙ্গীত আর দেশাত্মবোধক গান সবসময় এক নয়। এ দুটোর পার্থক্য সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে হেমাঙ্গ বিশ্বাস ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে লিখছেন, ‘বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম স্বদেশচেতনা এবং পরাধীনতার বেদনাবোধে যে গীতের জন্ম তাকে আমরা স্বদেশী সংগীত কিংবা দেশাত্মবোধক সংগীত বলে থাকি। সেই স্বদেশী সংগীতের একটা বড় অংশ ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনবাদের প্রভাবে আচ্ছন্ন ছিল, অনেক সময় আবার জাতীয় চেতনা সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের আদর্শে প্রভাবিত ছিল। সেসব গানে দেশাত্মবোধের আবেদন ও বেদনা থাকলেও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহের চেতনা ছিল না। দেশের মুক্তির সঙ্গে শোষণমুক্তির চিন্তার মিলন ঘটেনি।স্বদেশ চেতনা যেখানে গণচেতনায় মিলিত হয়ে শ্রমিকশ্রেণীর আন্তর্জাতিকতার ভাবাদর্শের আকারে মিশলো সেই মোহনাতেই গণসংগীতের জন্ম।’

তেভাগা আন্দোলন, অক্টোবর বিপ্লব, কমিউনিস্ট দর্শনের প্রভাব এদেশে গণসংগীতের নতুন ধারা তৈরী করে। যা খুব স্পষ্টভাবে সাম্রাজ্যবাদ ও শ্রেণীগত শোষণ নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের রাজনৈতিক সংগ্রামের চেতনাকে কথা, সুর ও মঞ্চে উপস্থিত করে। গণনাট্য সংঘ এই ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে। সলিল চৌধুরী ও হেমাঙ্গ বিশ্বাস, বিজন ভট্টাচার্য্য, ঋত্বিক ঘটক ছিলেন এসব তৎপরতার নেতৃত্বের ভূমিকায়। এর ধারাবাহিকতা পরে অক্ষুণœ থাকেনি। কেননা গণসঙ্গীত মানুষের বিপ্লবী লড়াইএর আশ্রয়ে, তাপেই গড়ে উঠে। এই আন্দোলন দুর্বল হয়ে গেলে গণসঙ্গীতের ধারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ’৭০ দশকে পশ্চিম বাংলায় সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আরেকটি নবজাগরণ দেখা যায়, সেটা হয় নকশালবাড়ী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। আমরা এই সময়ে যাদের পাই তাদের মধ্যে প্রতুল মুখোপাধ্যায় অন্যতম।

৫০ ও ৬০ দশকে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ কালীন বাংলাদেশে সংগ্রামী অনেক গান রচিত হয়েছে। তবে তার বেশিরভাগ ভাষা আন্দোলন ও জাতিগত নিপীড়ন বিরোধী বাঙালী জাতির লড়াই এর গান। এগুলো এই সময়কালের লড়াইএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আলতাফ মাহমুদ, শেখ লুৎফর রহমান, আবদুল লতিফ এসময়ে এই ধারা সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। খেয়াল করলে তুলনামূলক কম পরিচিতি পাওয়া গানের সন্ধানও এখন আমরা পাই পাহাড়ীসহ সংখ্যালঘু জাতিজনগোষ্ঠীর গানে, যেখানে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও বাঙালী শাসক শ্রেণীর জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদী চেতনা, ক্ষোভ ও লড়াইএর সংকল্প ধ্বনিত হয়েছে।

 

.

প্রতুলের ‘আমি বাংলায় গান গাই’ এখন বিজ্ঞাপনের গান, শুধু এটাই নয়, ‘জাগরণের গান’ নামের প্যাকেজে অনেক সংগ্রামী গান এখন মোবাইল কোম্পানির বিজ্ঞাপনী প্রকল্পের অংশ। শুধু গানও নয়, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার চিঠি, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, নারীর লড়াই, শিশুর স্বপ্ন ও লড়াই, দারিদ্র পীড়িত শিল্পী, সংগঠক সবাই সবকিছু এখন বিজ্ঞাপনের মডেল। সৃজনশীল ক্ষমতার অধিকারী অনেক কন্ঠশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, নাট্যকার এখন উৎকৃষ্ট মানের বিজ্ঞাপন রচনায় ব্যস্ত। অনেক মেধাবী তরুণ এখন কিছু টাকার বিনিময়ে কিংবা ক্যারিয়ার গড়বার আশায় বিজ্ঞাপন অর্থাৎ মিথ্যাচার ও প্রতারণার মাধ্যমে জনগণের মাথা গুলিয়ে কতিপয় কোম্পানির মুনাফা বাড়াতে ব্যস্ত। আর তা করতে গিয়ে জনগণের দীর্ঘদিনের রক্তমাখা স্মারক গান আর প্রতিষ্ঠানকে মডেল বানাতেও তাদের দ্বিধা হচ্ছে না। এটাই তাদের সফল ক্যারিয়ারের শীর্ষবিন্দু। স্পনশরশীপের জাল ক্রমেই শিল্প সংস্কৃতি জগতকে আস্ট্রেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে। এখন নাট্য উৎসব, সঙ্গীত উৎসব, স্বাধীনতার গান, নারী দিবস, মে দিবস সবকিছু হয়ে উঠছে গ্রামীণ ফোন, বাংলালিংক, ওয়ারিদ, রবি, বা কোন হাউজিং সোসাইটির প্রচারণা কর্মসূচির বাহন। শিল্পী সংস্কৃতি কর্মীদের অনেকে সন্তুষ্টচিত্তে নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছেন পুঁজির পদতলে।

এরকম একটি আগ্রাসনের কালেও মানুষ তো আর অদৃশ্য হয়ে যায়নি। তাই লড়াইও থেমে যায়নি। মানুষ যদি থাকে, তার চেতনা যদি থাকে তবে তার লড়াইএর ভাষাও নানাভাবে নির্মিত হতে থাকে। সেকারণে গত এক দশকে বাংলাদেশে নিপীড়ন আধিপত্য দখল ও বৈষম্য বিরোধী অনেকগুলো লড়াই সংগ্রাম দৃশ্যমান হয়েছে। বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজির আগ্রাসন শিল্পী জগতের অনেককে যেমন পরাজিত দাসে পরিণত করেছে তেমনি এর কারণেই মুক্তির আকুতি নিয়ে, প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে অনেক তরুণও সামনে আসতে চেষ্টা করছে। ইরাক, আফগানিস্তানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী নারকীয়তা ও তার বিরুদ্ধে চেতনার বিস্তার, বাংলাদেশে গার্মেন্টস শ্রমিকসহ নিপীড়িত মানুষদের জীবন ও সংগ্রাম, সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত নিপীড়নের নানা পর্ব ও তার বিরুদ্ধে লড়াই, নারীর নিপীড়ন ও তার বিরুদ্ধে লড়াইএর নতুন পর্ব, সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের শিল্পকৃষি, গ্যাসকয়লাসহ জাতীয় সম্পদ দখল তৎপরতা ও তার বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য লড়াই এই সবই আমাদের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা। ফুলবাড়ীতে জাতীয় সম্পদ রক্ষায় জীবনদান ও গণঅভ্যুত্থান মুক্তির সংগ্রামে নতুন নিশানা ও সাহস নির্মাণ করেছে।

এইসব অভিজ্ঞতা বর্তমান প্রজন্মের মুক্ত শিল্পীদের সামনেও নতুন তাগিদ তৈরি করেছে। দানবদের প্রতি ঘৃণা আর তার পাশাপাশি মানুষের লড়াই ও স্বপ্নের এসব অধ্যায় বর্তমান সময়ের পুঁজির আধিপত্য মুক্ত সৃজনশীল শিল্পীদেরও নতুন নিশানা দিয়েছে। তাই আমরা এই সময়কালে অনেক নতুন গান, নাটক রচিত হতে দেখি যেগুলো মানুষের প্রাণ ও গানের শৃঙ্খলমুক্ত প্রকাশ ঘটিয়েছে।

এই সময়ে অমল আকাশ ও সমগীত, কফিল আহমদ, কৃষ্ণকলি, অরূপ রাহী সহ আরও অনেক তরুণ শিল্পী বর্তমান সময়ে গানের জগতে নতুন প্রাণ উপস্থিত করেছেন। তাঁদের মেধা ও অঙ্গীকার, কথা ও সুর এবং উপস্থাপনায় সর্বোপরি তাদের সৃষ্টিতে, জনসমুদ্রের ভেতর থেকে মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শৃঙ্খলমুক্তির আকাঙ্খার সরব প্রকাশ আমরা দেখতে পাই। গণ আন্দোলনের বিস্তার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে না। তার প্রথম শর্ত দাসত্ব ও শৃঙ্খলকে অস্বীকারের চেতনা। এই চেতনাই আবার অন্যদিকে গণসঙ্গীতের প্রাণ। তারপর উদ্যোগ, সংগঠন ও রাজনীতি। পুঁজির সর্বব্যাপী আগ্রাসনের মধ্যেও আমরা এর স্পষ্ট স্বাক্ষর পাচ্ছি গানে, লড়াইএ। তৈরি হচ্ছে নতুন গান, নতুন প্রাণ এবং হেমাঙ্গ বিশ্বাসের যোগ্য উত্তরসূরী।

সম্প্রতি রচিত একটি গানের সরল উচ্চারণে তরুণ প্রজন্মের নতুন উপলব্ধিই যেন ঘোষণা করা হয়েছে:

ডানে মেঘ ছুঁয়ে যায় অট্টালিকা

ডানে মানুষগুলো পিপীলিকা

ডানে টাকার বড় ঝনঝনানি

ডানে আলগা রূপের ঠনঠনানি

ডানে টিকেট কেটে পাহাড় দেখা

ডানে ঘাসফড়িংটা বেচতে শেখা

ডানে খেলার মাঠে মুনাফা খোঁজা

ডানে নরম ঘাসে ইটের বোঝা

…………..

ডানে পাল্লা দিয়ে ছুটছে সবাই

ডানে পাল্টে দেবার স্বপ্নটা নাই

ডানে পানির দরে ঘামটা বেচা

ডানে পণ্য নিয়ে খ্যামটা নাচা

ডানে বাজার হল খোদার কালাম

ডানে মানুষ করপোরেটের গোলাম

বাঁয়ে আমজনতা দিচ্ছে সেলাম

বন্ধু তাইতো আমি বামেই গেলাম

বাঁয়ে রোদেলা দিন দিচ্ছে সেলাম’

বন্ধু তাইতো আমি বাঁয়েই গেলাম।

(মাহা মীর্জা: ডান ও বামের গান)