Home » আন্তর্জাতিক » বৃহৎ শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টায় মোদি

বৃহৎ শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টায় মোদি

রাহুল বেদি, জেনস ডিফেন্স উইকলি

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

last 6ক্ষমতায় এসে সময় নষ্ট না করে ভারতের নতুন নেতা নরেন্দ্র মোদি নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্ভাবনাময় অংশীদারদের সাথে সম্পর্ক জোরদার করার কাজ শুরু করে দিয়েছেন। বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন চীন, জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে।

মে মাসে দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর থেকে মোদি দিল্লির স্থায়ী ‘কৌশলগত নিরপেক্ষতা’ অক্ষুণœ রেখেই অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ওই তিনটি দেশের সঙ্গেই ভারতের নিরাপত্তা সম্পর্ক নতুন করে বিন্যস্ত করার কাজ করে আসছেন।

গত আগস্টে তিনি তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফরে টোকিও গিয়ে জাপানের সাথে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা চুক্তি জোরদার করেন, আগামী পাঁচ বছরে ভারতের অবকাঠামো খাতে ৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি লাভ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো জাপানের প্রতিরক্ষা রফতানির কথাও ঘোষিত হয়। ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য ১৫টি মার্কিন২আই উভচর অনুসন্ধান ও উদ্ধার বিমান বিক্রি করতে রাজি হয় জাপান। দুই দেশ আরো জানায়, যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে তাদের বার্ষিক ত্রিদেশীয় নিরাপত্তা সংলাপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে ‘উন্নীত’ হবে।

হিমালয়সম অচলাবস্থা

মধ্য সেপ্টেম্বরে মোদি নয়া দিল্লিতে চীনা প্রেসিডেন্ট জি জিনপিংকে তিন দিনের জন্য স্বাগত জানান। তারা ভারতের অবকাঠামো ও নির্মাণখাতে ২০ মার্কিন ডলার চীনা বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করেন। উত্তর হিমালয়ে দুই দেশের সেনাবাহিনী তাদের বিতর্কিত সীমান্তে মুখোমুখি থাকা অবস্থাতেই এই আলোচনা হয়।

লাদাখের চুমারদেমচুক অঞ্চলে উভয় দেশের প্রত্যেকে প্রায় দুই হাজার সৈন্যের শোডাউন শুরু হয় সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে। ভারত দাবি করে, পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) সদস্যরা ভারতের ৩৫ কিলোমিটার অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ করেছে। বেইজিং এটা অস্বীকার করে বলেছে, ,০৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সত্যিকারের সীমান্তরেখা (লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোলএলওএসি) এখনো অমীমাংসিত ও শনাক্তহীন অবস্থায় রয়ে গেছে।

দেশে ফিরে ২২ সেপ্টেম্বর চীনা প্রেসিডেন্ট ‘তথ্য প্রযুক্তির যুগে আঞ্চলিক যুদ্ধে জয়ী হতে যুদ্ধ প্রস্তুতি উন্নত করতে এবং সামর্থ্য বাড়াতে’ বিএলএ সদস্যদের নির্দেশ দেন। অন্যদিকে এই অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে দিল্লি পক্ষের পদক্ষেপ ছিল ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল দলবীর সিংয়ের ভুটান সফর বাতিল।

ভারসাম্যের পুনর্বিন্যাস’

নরেন্দ্র মোদি যেসব কর্মসূচি নিয়ে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে আলোচনার জন্য আমেরিকা গিয়েছিলেন, তার অন্যতম ছিল মার্কিন অস্ত্র ভারতে উৎপাদন। যুক্তরাষ্ট্রে মোদির অন্যতম ইস্যু ছিল বহুল আলোচিত ‘ভারসাম্যের পুনর্বিন্যাস।’ এশিয়াপ্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মার্কিন পরিবর্তিত নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতিও মোদির সমর্থনের আশ্বাস ছিল হাতে।

স্ট্যাটেজিক ইনিশিয়েটিভ ফোরামের চীনা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার (অব.) অরুন সেগাল বলেন, ‘মোদির দরকার এশিয়াপ্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার কৌশলগত আয়তক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করা, যেখানে চীন ছাড়াও মূখ্য খেলোয়াড়দের মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্রের মতো গণতান্ত্রিক দেশ এবং আসিয়ানভুক্ত ১০টি দেশ।’ তিনি বলেন, ‘কিন্তু চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিকবাদ ও কর্তৃত্ববাদী নীতি, আঞ্চলিক উচ্চাভিলাষ এবং সম্প্রসারণশীল সামুদ্রিক সক্ষমতা আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ানোর ফলে এশিয়ার কৌশলগত পরিবর্তন অব্যাহত থাকার প্রেক্ষাপটে মোদির কাছে প্রতিরোধমূলকব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া বিকল্প আছে সামান্যই।’ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মনে করেন, ভারত সরকারি চীনের সঙ্গে সরাসরি সঙ্ঘাতে কুলিয়ে ওঠতে পারবে না। এ কারণে চীনের আঞ্চলিক প্রধান ম্লান করার জন্য মোদির দরকার বেইজিংয়ের সাথে ভারতের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং এমনকি সামরিক সম্পর্ক জোরদার করা।

ভারতের সামরিক বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) শেরু থাপলিয়াল বলেন, ‘এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে লাদাখের মতো চলমান অচলাবস্থার মুখে চীনা আগ্রাসন রুখতে ভারতের বিকল্পগুলো ব্যবহার করতে মোদিকে বেশ বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হচ্ছে। এটা মোদির প্রথম বড় ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্চ।’

১৯৬২ সালের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর চীনকে নিয়ে ভারতের মধ্যে যে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে, মোদি অনেকটা তার আলোকেই চালিত হচ্ছেন। চীন ও ভারতের মধ্যকার সীমান্তটি বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ ও জটিল। ভারত অভিযোগ করে আসছে, চীন হিমালয় অঞ্চলে তার ৩৮ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে আছে। কিন্তু বেইজিং তা মানতে রাজি নয়। সে বরং দাবি করছে যে, ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের অরুনাচল প্রদেশসহ ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা তার। চীন তার মানচিত্রে এই অঞ্চলকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ হিসেবে অভিহিত করছে। ভারত এটাকে ‘আলোচনাযোগ্য বিষয় নয়’ বলে জানিয়েছে। এই অচলাবস্থা নিরসনে ২০০৩ সাল থেকে ১৭ দফা আলোচনা হলেও কোনো ফল আসেনি। এছাড়া ১৯৯৬ সাল থেকে আস্থা সৃষ্টিকারী চারটি সমঝোতা স্বাক্ষরিত হলেও সেগুলো কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আনেনি। অধিকন্তু, চীনের সামরিক আধুনিকায়ন এবং তিব্বতে অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্বিগ্ন করছে দিল্লিকে। সীমান্তে ভারতের অপর্যাপ্ত অবকাঠামোতে ভারতের এই উদ্বেগ প্রতিফলিত হয়ে থাকে।

ভারতের আইওআর পদক্ষেপ

সমুদ্র এলাকায় চীনা কার্যক্রমও ভারতে অস্বস্তি জাগিয়েছে। এ কারণেই বন্দর ও মিত্রতার মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর নতুন সমুদ্র সিল্ক রোড চালুর চীনা উদ্যোগে যোগ দিতে উৎসাহ বোধ করেনি ভারত। দিল্লির সামরিক পরিকল্পনাবিদেরা এটাকে চীনের ‘মুক্তামালা’ কৌশলেরই আরেক রূপ হিসেবে দেখছেন। চীন এবং বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো ভারত মহাসারগীয় অঞ্চলের (আইওআর) দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা চুক্তিগুলোকে দিল্লির বিশ্লেষকেরা ভারতকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনার অংশ মনে করছেন।

দিল্লি মনে করে, সমুদ্র সিল্ক রোডের মূল উদ্দেশ্য হলো চীনের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি প্রয়োজন মেটানো, উপসাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত তার সামরিক অবস্থান বাড়ানো এবং আইওআর অঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতি সম্প্রসারণ করা। পাকিস্তানের আরব সাগরীয় উপকূলীয় বন্দর গোদারের উন্নয়ন করছে চীন, বাংলাদেশেও একই কাজ করছে। মালদ্বীপ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও আফ্রিকান দেশগুলোতেও একই ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। এতে করে চীনের বন্দর ও প্রতিরক্ষা সামর্থ্য বাড়বে।

এমন এক পরিস্থিতিতে মোদি হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে টোকিও, ওয়াশিংটন গেছেন, দেশে অস্ট্রেলিয়া ও ভিয়েতনামি প্রধানমন্ত্রীদের স্বাগত জানিয়েছেন। দিল্লিতে উভয় দেশের সাথে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন।।