Home » আন্তর্জাতিক » জাতীয় স্বার্থ, ভূ-রাজনৈতিক কৌশল এবং মওলানা ভাসানী

জাতীয় স্বার্থ, ভূ-রাজনৈতিক কৌশল এবং মওলানা ভাসানী

আমীর খসরু

bhasani 5মওলানা ভাসানীর পুরো জীবনটাই কেটেছে সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, সমান্তবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং কৃষকশ্রমিক মজলুমদের স্বার্থে আন্দোলনসংগ্রামের মধ্যদিয়ে। তার এই আন্দোলনসংগ্রামের সবগুলো ঘটনাই গুরুত্বপূর্ণ নিঃসন্দেহে। তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের তৎকালীন কিছু ঘটনাবলীতে মওলানা ভাসানীর সঠিক উপলব্ধি এবং ভূমিকার বিশ্লেষণে এই বিষয়টি এতো যুগ পরে এসেও স্বীকার করতেই হবে তিনি ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইসংগ্রাম করেছেন মুসলিম লীগের হয়ে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে এসে তিনি সঠিকভাবে উপলব্ধি করলেন শাসক বদল বা হাতবদল হয়েছে মাত্র। সাম্রাজ্যবাদের বিপদটি তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ঊষালগ্নেই বুঝেছিলেন। মওলানা ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয় তো দূরের কথা স্কুলকলেজে প্রথাগত বিদ্যা অর্জন করেননি বা তিনি কোনো নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকও ছিলেন না সত্যি, কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে কেমন করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই তিনি ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তাপ্রতিরক্ষার কূটকৌশলগুলো এবং শাসক শ্রেণীর মোনাফেকী সঠিকভাবে ধরতে পেরেছিলেন। সঠিকভাবে, নিপুণভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন শত্রুকে। বুঝতে পেরেছিলেন দেশটিকে এই শাসকরা কিভাবে তুলে দিচ্ছে অন্যের হাতে। এ কারণেই মওলানা ভাসানী সেন্টোসিয়াটোসহ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। ওই সময়ের অনেক রাজনীতিবিদ, সেনা ও বেসামরিক আমলারা কিভাবে নিজের দেশের স্বার্থকে, স্বাধীনতাকে বিকিয়ে দিচ্ছিল তাও তিনি উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তার পক্ষেই উচ্চারণ করা সম্ভব হয়েছিল – … ওই চুক্তি করে ওরা যদি বেহেস্তে যায়, তা হলে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি, ওদের সঙ্গে বেহেস্তেও যেতে চাই না।’ মনেপ্রাণে দেশের স্বাধীনতাসার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সাম্রাজ্যবাদ দখলদারীর বিরুদ্ধে অন্তরের গভীর থেকে চাওয়া এ এক অসীম উচ্চারণ। এক গভীর উপলব্ধি।

১৯৪৭এর পাকিস্তানের স্বাধীনতার লাভের মাত্র চার বছরের মাথায় এসে ১৯৫১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং ওই দেশের প্রেসিডেন্ট হেরী ট্রুম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেন, ওই দেশেরই আমন্ত্রণে। একদিনেই বৈঠকের প্রেক্ষাপটটি যে তৈরি হয়েছিল তা নয়, এটা তৈরি করা হয়েছিল গোপনে গোপনে সময় নিয়েই। ওই সময়ের কিছু রাজনীতিবিদ, সামরিকবেসামরিক আমলা বেশ কিছুদিন ধরে কমিউনিস্টরা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এই তত্ত্ব দিতে লাগলেন। সুতরাং তাদের মতে এই কমিউনিস্টদের ঠেকানো এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তা কৌশলগত দিক বিবেচনায় পাকিস্তান বিপদে পড়তে যাচ্ছে বলে বিকল্প আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন জরুরি বলে তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। লিয়াকত আলী ওই সামরিকবেসামরিক আমলা এবং রাজনীতিবিদদের সঙ্গে হাত মেলান। লিয়াকত আলী খান প্রথমে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন বলে অনেক বিশ্লেষক অবশ্য বলছেন। যাই হোক, পাকিস্তানের (পূর্ব এবং পশ্চিম) ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তাপ্রতিরক্ষা কৌশলগত অবস্থানের গুরুত্ব যে কতো ব্যাপক, তা সামরিকবেসামরিক আমলা ও রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও উপলব্ধি করেছিল। বরং যুক্তরাষ্ট্র একটু বেশি মাত্রায়ই বুঝতে পেরেছিল। ওই সময়ে পাকিস্তানের শাসকরা সামরিক সাহায্যের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। আর তারই প্রেক্ষাপটে লিয়াকত আলী খান ছাড়াও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, সেনাপ্রধান আইয়ুব খান, অর্থমন্ত্রী গোলাম মোহাম্মদ, প্রতিরক্ষা সচিব ইস্কান্দার মির্জাসহ বিশেষ দূত এবং কর্মকর্তারা ১৯৫০৫৩ সময়কালের মধ্যে কয়েক দফায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করে সামরিক সাহায্য পাওয়ার জোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন। এরই ফল হিসেবে সামরিক সাহায্য পাওয়া শুরুও হয়েছিল। এর বাইরেও খাদ্য সাহায্যের জন্য চেষ্টা চলছিল এবং তাতে ওই শাসকরা কামিয়াবও হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুটো কাজ পেছনে পেছনে সম্পন্ন হতে থাকলো। এক. পাকিস্তানের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্কের উন্নয়নে সেন্টোসিয়াটো চুক্তি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হলো। দুই. পাকিস্তান এর প্রথম আলোতেই বিদেশি ঋণের অশুভ চক্রের মধ্যে স্থায়ীভাবে ঢুকে পড়লো। পাকিস্তান ১৯৫৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স এ্যসিসটেন্টস এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষর করে। ওই সময়কালেই পাকিস্তানের পেশোয়ারে একটি বিমান ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হয়। ১৯৫৫ সালে গঠিত হয় Central Treaty Organisation বা CENTO এবং এর সদস্য ছিল পাকিস্তান, ইরান, ইরাক, তুরস্ক এবং যুক্তরাজ্য। সেন্টো গঠনের আগে এর নাম ছিল ‘মিডল ইস্ট ট্রিট্রি অর্গানাইজেশন বা মেটো’। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান South East Asia Treaty Organisation বা SEATOতে যোগ দেয়।

এই দুটো সংস্থা গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তার। শীতল যুদ্ধের যুগে এসব সংস্থাগুলোর প্রভাববিস্তারী ভূমিকা তো ছিলই, এর সুদূর প্রসারী দিকও ছিল। বিশেষ করে সেন্টো গঠনের মধ্যদিয়ে পুরো তুরস্ক থেকে পাকিস্তান, অন্যদিকে মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল অংশের উপরে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যই ছিল মূল লক্ষ্য। এখানে এসব দেশগুলোর প্রত্যেকটির আলাদা আলাদা কৌশলগত অবস্থানের যে গুরুত্ব তা স্বল্প পরিসরে আলোচনা সম্ভব নয়। তবে এটুকু বলা যায়, ওই সব অঞ্চল তো রয়েছেই, এর বাইরে আরব সাগর, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল অতি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী, গুরুত্বপূর্ণ তুরস্কের বসফরাস প্রণালী, সাইপ্রাস, অন্যদিকে ইউরোপ সব মিলিয়ে এসব বিষয়গুলো এবং যে সব দেশের কথা উল্লেখ করা হলো তার অবস্থানের কৌশলগত গুরুত্বের দিকগুলো হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।

আবার সিয়াটো চুক্তির ফলে চীনকে মাথায় রেখে পুরো দক্ষিণপূর্ব এশীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কৌশল এবং ওই অঞ্চলের দেশগুলোর উপরে প্রভাব বিস্তারের বিষয় রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ চীন সাগর, এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বর্তমানে যে বৈরিতা বিদ্যমান এবং ভারত মহাসাগর নিয়ে যে লড়াই তার হিসাবনিকাশও শুরু হয়েছিল তখন থেকেই।

এখানে একটি বিষয় বলা প্রয়োজন, পাকিস্তান যখন এসব কূটকৌশলের মধ্যে জড়িয়ে পড়ছিল, ভারত তখন যে কারণেই হোক জোট নিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করে নিজ দেশের স্বাতন্ত্র বজায় রাখার চেষ্টা চালাচ্ছিল। যদিও অল্প কালই ভারত তা ধরে রাখতে পেরেছিল। সে আর এক দিক এবং এ নিয়ে পৃথক আলোচনার প্রয়োজন বোধ করি।

পাকিস্তানকে নিয়ে এই যে ষড়যন্ত্রচক্রান্ত, আন্তর্জাতিক খেলাধূলা পর্দার আড়ালে হচ্ছিল মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীই তা সঠিকভাবে উপলব্ধি এবং বুঝতে পারছিলেন। তিনিই একমাত্র নেতা যিনি কিনা এ সমূহ বিপদ সম্পর্কে দেশবাসীকে সজাগ করে দিচ্ছিলেন এবং প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছিলেন, ঘোর বিরোধিতার মধ্যেও। কিন্তু সেদিন পাকিস্তানের শাসকরা তো অবশ্যই সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান পর্যন্ত সেন্টোসিয়াটো চুক্তি ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তিসহ পাকিস্তানের পুরো পররাষ্ট্রনীতিকে নির্দ্বিধায় সমর্থন দিয়েছিলেন এবং প্রকাশ্য বিরোধিতায় নেমেছিলেন মওলানা ভাসানীর। এমনকি আওয়ামী লীগকে পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হলো। যদি সে সময় মওলানা ভাসানীর সঠিক উপলব্ধি এবং সঠিক সময়ে সঠিক বিষয়টিকে বুঝতে পারাকে উড়িয়ে না দিয়ে তার কথা মতো ওই সব চুক্তির মধ্যে পাকিস্তান ঢুকেনা পরতো তাহলে কয়েকটি বিপদের ঘটনা পাকিস্তানে ঘটতো না বলেই বিশ্বাস। এক. ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনটি যার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল আগে থেকেই তা আসতে পারতো না। এবং পাকিস্তানে একটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকতো। দুই. পাকিস্তানকে স্থায়ীভাবে বৈদেশিক ঋণ চক্রের মধ্যে ওই সময়েই ঢুকে পড়তে হতো না। পাকিস্তানে নিজস্ব পুঁজিতে একটি বুর্জোয়া শ্রেণী গড়ে উঠতে পারতো। বৈদেশিক ঋণ নির্ভর একটি ফটকা উচ্চবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভভ তখনই হতো না। পুরো বিষয়টি মিলিয়ে বলতে হয়, পশ্চিম এবং পূর্ব পাকিস্তানের ভবিষ্যত এবং এর গতিধারা ভিন্ন পথে পরিচালিত হতো, এটা নিশ্চিত করে বলা চলে। কিন্তু যারা বলেন, যদি দিয়ে ইতিহাস হয় না, তাদের জন্য বলা প্রয়োজন এই যদি সেই যদি নয়, এটাই উচিত ছিল। আর হয়নি বলেই যারা এসব কূটকৌশলের কুশীলব তারা দেশের জন্য এক সীমাহীন ক্ষতি করে দিয়েছিলেন যার জের এখনো সাধারণ মানুয টানছে। মওলানা ভাসানীই একমাত্র ব্যক্তি যিনি বুঝতে পেরেছিলেন স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী বিপদ সম্পর্কে এক ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার মতোই।

পাকিস্তানের নানা রাজনৈতিক ঘটনাবলীতে মওলানা ভাসানী সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৬৯৭০, এমনকি মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মওলানা যদি ভূমিকা না রাখতেন, তাহলে বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডটি আমরা পেতাম কিনা সন্দেহ। এ কারণে মওলানা ভাসানীই বাংলাদেশের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পরে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিপদ সম্পর্কেও মওলানা ভাসানী সঠিক সময়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তখন থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি যদি বটবৃক্ষের মতো দেশের স্বাধীনতাসার্বভৌমত্ব রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে ভূমিকা না রাখতেন তাহলেও বাংলাদেশের ভাগ্যে কি ঘটতে পারতো তা বলা মুশকিল। মওলানা ভাসানী এখানেও ভূরাজনৈতিক, নিরাপত্তা কৌশলগত অবস্থান ও দিকসহ সামগ্রিক পরিস্থিতি ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার মতো বুঝতে পেরেছিলেন। এখানেও বলি, যদি সেদিন মওলানা ভাসানী না থাকতেন, প্রতিবাদ না করতেন, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে হুঙ্কার না দিতেন, ময়দানে বেরিয়ে না পরতেন, জনগণকে বিপদ সম্পর্কে অবহিত না করতেন, এগিয়ে আসতে না বলতেন তাহলে কি হতে পারতো বা কি হতো সে বিষয়টিও ভেবে দেখা প্রয়োজন।

ভূরাজনৈতিক, নিরাপত্তাপ্রতিরক্ষা কৌশলের ক্ষেত্রে মওলানা ভাসানী নিজের মতো করে যতোটা স্বচ্ছ, স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিলেন তার দেশকে, দেশের মানুষকে অন্য কোনো নেতা তা পারেননি। শুধু এদেশ কেন, বিশ্বের হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন নেতাই তা পেরেছিলেন। মওলানা ভাসানী এটা পেরেছিলেন বলেই তিনি অনন্য, অসাধারণ এবং একমাত্র।

আবারও বলি যদি আজ মওলানা ভাসানী বেঁচে থাকতেন, তাহলে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে, এর অসহায় বিপন্ন জনগণকে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিজ স্বাধীনতা নিয়ে ভাবতে হতো না। ভাবতে হতো না সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ আর কর্পোরেট পুঁজির বিপদ সম্পর্কেও।।

(পুনঃমুদ্রণ)