Home » শিল্প-সংস্কৃতি » সুতরাং সুভাষ দত্ত…

সুতরাং সুভাষ দত্ত…

ফ্লোরা সরকার

last 7বানিজ্যিক ধারার সিনেমা নির্মাণে অবস্থান করেও সুভাষ দত্ত ছিলেন একজন সফল চিত্রপরিচালক। এই দেশে সব থেকে অধিক প্রচলিত এবং চলচ্চিত্র শিল্পকে ধরে রাখার অবদান থাকা সত্ত্বেও বানিজ্যিক ধারার ছবিগুলো অনেকদিন থেকে নন্দিত হবার চেয়ে নিন্দিত হয়েছে বেশি। একমাত্র ষাট এবং সত্তরের দশক ছাড়া এদেশে তেমন কোনো ভালো ছবি নির্মাণের ইতিহাস আমরা খুঁজে পাবোনা। বানিজ্যিক ধারার সমান্তরালে বিকল্প ধারা হিসেবে পরিচিত গত আশি এবং নব্বইয়ের দশকে আর্ট ফিল্ম নামে যেসব চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে তারও যে খুব একটা উন্নয়ন ঘটেছে তা কিন্তু নয়। আসলে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র বলতেই বা আমরা কি বুঝি? এক কথায় প্রথাপ্রতিষ্ঠান বিরোধী অবস্থান গ্রহণ অর্থাৎ বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্কৃতির অধীনে থেকে যান্ত্রিক,পুনরাবৃত্তিতে পূর্ণ, লোভ এবং মুনাফার উদ্দেশ্যে যেসব ছবি নির্মিত হয়ে থাকে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এবং সমান্তরালে গড়ে ওঠা এক শিল্প প্রচেষ্টা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো এসব বিকল্প ধারার ছবির জন্যে বিকল্প ধারার দর্শকেরও প্রয়োজন পড়ে, যারা মূলত সমাজের এলিট শ্রেণী থেকে আগত। সাধারণ দর্শক এসব ছবির রসাস্বাদন করতে পারে খুব কম। তাতেও অসুবিধা ছিলোনা, কিন্তু আর্ট ফিল্ম নির্মাণের ক্ষেত্রে যা দেখা গেলো তা হলো, শুধু আর্ট অর্থাৎ ফর্ম নিয়েই অধিক ঘাটাঘাটি হলো, কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু হারিয়ে গেলো বা ছবিতে তেমন ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলো না। অন্যদিকে বানিজ্যিক ধারার ছবিগুলি ফর্মে দুর্বল হলেও তার বিষয়বস্তুতার কারণে পায়ে পায়ে এগিয়ে ছিলো।

দর্শক পর্দায় কীভাবে দেখতে চায় থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কি দেখতে চায় ? অবশ্যই পরিবেশনা বা ফর্মের একটা আলাদা মূল্য আছে কিন্তু তা অবশ্যই বিষয়বস্তুকে ছাড়িয়ে না। এই বিষয়বস্তুতার কারণেই বিগত ষাট এবং সত্তরের দশকে হল উপচে পড়া দর্শকের ভীড় হতো, যা এখন আমরা সেভাবে দেখতে পাইনা। সুভাষ দত্ত সেই সময়ের একজন প্রতিষ্ঠিত চিত্রনির্মাতা ছিলেন। যার ছবি আজও আমরা এক বসায়, পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেখে উঠতে পারি। মনে হয়না সেই সময়ের কোনো নির্মিত ছবি। সুভাষ দত্তের জন্ম দিনাজপুরের মুনশীপাড়ায় ১৯৩০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। তিনি শুধু নির্মাতা ছিলেন না, ছিলেন একাধারে অভিনেতা,প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার এবং শিল্প নির্দেশক। ছবির সঙ্গে তার প্রথম সংযোগ ঘটে, ১৯৫১ সালে, বোম্বেতে (মুম্বাই), ছবির পাবলিসিটি ডিজাইনার হিসেবে কাজের মধ্যে দিয়ে। ‘মুখ ও মুখোশ (১৯৫৬)’ ছবিতে পোস্টার ডিজাইনার হিসেবেও তিনি কাজ করেন। ‘মাটির পাহাড় ( ১৯৫৯)’ ছবির শিল্প নির্দেশক ছিলেন। প্রথম অভিনীত ছবি এহতেশাম পরিচালিত ‘এদেশ তোমার আমার(১৯৫৯)’। মৃণাল সেনের ‘কোলকাতা৭১’এও তাকে আমরা পাই।বিভিন্ন ছবিতে অভিনয়ের পর ১৯৬৪ সালে ‘সুতরাং’ ছবির মধ্যে দিয়ে অবির্ভূত হন পরিচালক হিসেবে, যে ছবি তাকে সর্বাধিক পরিচিতি এনে দেয়। সুতরাং এর পর আরো ২৬ টা ছবির পরিচালনা সহ অভিনয়,প্রযোজনা এবং চিত্রনাট্যের কাজ চালিয়ে যান। গত ১৬ নভেম্বর ছিলো তার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। আজ এই মহান শিল্পী এবং নির্মাতার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।

সুভাষ দত্ত তার আটাত্তরতম জন্মদিনে চ্যানেল আইকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে স্বামী বিবেকানন্দের একটি উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন যা তার জীবনের আদর্শ হিসেবে মনে করতেন “You have to die. So do something for people, don’t waste time, time is going faster” – (তোমাকে মরতে হবে। কাজেই মানুষের জন্যে কিছু করো। সময় নষ্ট করোনা, সময় বড় দ্রুত বয়ে যায়) সময়ের এই গতিময়তা থেকেই শুরু হয় তার সুতরাং ছবির শুরু। ছবির শুরুতেই আমরা দেখি একজন হকার দৈনিক সংবাদপত্র বিক্রির জন্যে দৌঁড়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষন পর একজন মানুষের কাছে সংবাদপত্র বিক্রির সময তার কাছে সময় জানতে চায়। সে যখন জানায় সকাল নটা, হকার ব্যস্ত হয়ে বলে, তাকে এখনি কয়েকটা শিশুকে স্কুলে পৌঁছে দিতে হবে। সে আবার দৌঁড়ে বেরিয়ে যায়। এই হকারই ছবির নায়ক জব্বর খান রূপি সুভাষ দত্ত। পরের দৃশ্যেই আমরা দেখি তাকে নাইট গার্ড হিসেবে কাজ করতে। অর্থাৎ সারাদিন ধরে সে নানান কাজে ব্যস্ত থাকে। এই ব্যস্ততার কারণ আমরা ছবির আরো কিছু পরে যেয়ে জানতে পারি। গ্রামের দুই সহজ সরল নরনারীর মিস্টি প্রেমের কাহিনী সুতরাং। যে সরল ভালোবাসা রোমান্টিক আবেগে পূর্ণ। যে সরল ভালোবাসা দর্শককে সেই পথে ধাবিত করে, উজ্জীবিত করে। ছবির গতিময়তার কারণে এবং গল্পের নিপুণ বুনটে ছবিটি আরো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সুভাষ দত্তের ছবির সব থেকে যা বড় বৈশিষ্ট তা হলো, তার ছবিতে নির্দিষ্ট ভাবে কোনো খলনায়ক থাকেনা। পরিবেশ এবং পরিস্থিতির কারণে একজন মানুষ মন্দ লোকে রূপান্তরিত হয়। ঘটনার বিন্যাস তাকে সেই পথে ধাবিত করে। হঠাৎ করে কোনো ঘটনা বা চরিত্র এসে হাজির হয়না, যা এখনকার ছবিতে দেখা যায়। বাস্তবতা আর যুক্তির আলোকে নির্মাণ করেন তার কাহিনী। সুতারং এ তাই আমরা দেখতে পাই জরিনার মদ্যপ স্বামী (উল্লেখ্য জরিনা চরিত্রে কবরী এবং তার স্বামীর চরিত্রে বেবি জামান দুজনেরই এই ছবি দিয়ে তাদের চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু) প্রথম দিকে রূঢ় হলেও পরবর্তীতে সে তার ভুল বুঝতে পারে। যদিও সেই ভুল কোনো সমাধান নিয়ে আসেনা। একই ভাবে জরিনার গ্রাম্য মোড়ল বাবাও তার গ্রামীন আভিজাত্যের কারণে মেয়েকে ভুল জায়গায় বিয়ে দেয়ায় পরবর্তীতে সে তার ভুল স্বীকার করে জরিনার প্রেমিক জব্বরের কাছে। এই ভুল স্বীকারের মধ্যে দিয়ে মানুষের নেগেটিভ অ্যাটিচুড থেকে পজিটিভিটির দিকে গমন যেন ভিন্ন মাত্রার এক শিক্ষা দেয় মানব জীবনের জন্যে। দর্শক সচেতন হয়ে ওঠে, যে সচেতনতা চলচ্চিত্র নির্মাণের অন্যতম এক উদ্দেশ্য। সুভাষ দত্ত পরিচালিত আরেকটা ছবি ‘আবির্ভাব (১৯৬৮)’ এ দেখি শহুরে আভিজাত্য এবং ঐশর্য্যরে অহংকারে গর্বিত বাবার কারণে একটা সংসার ভেঙ্গে যেতে। এখানেও আমরা পাই ঘটনার স্বাভাবিক গতিময়তা। যেন ঘটনাগুলো এভাবেই ঘটার কথা ছিলো। ছবিতে দেখা যায় শর্মিলী এবং আজিম দুজন স্বামীস্ত্রী, কোনো সন্তান না হবার কারণে তারা বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে শাহানার (কবরী) সঙ্গে রাশেদের (রাজ্জাক) বিয়ে হলেও রাশেদের বাবা (নারায়ন চক্রবর্তী) তা মেনে নিতে পারেনা। শাহানা বিতাড়িত হয় তার সংসার থেকে। সন্তানকে কোনো এক রাতে কোথাও রেখে দিয়ে সে আত্মহত্যার পরিকল্পনা করে। সে তার সন্তানকে যখন আজিমের দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে রেখে দেয়, ঠিক তখন আমাদের মনে পড়ে যায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফার পানাহির ‘সারকাল’ ছবির কথা। দারিদ্রের কারণে এভাবেই কত মা তাদের সন্তানকে ফেলে দিতে বাধ্য হয়। অথচ মাতৃত্বের মমতার কোনো কমতি থাকেনা তাদের মাঝে। যদিও সারকাল ছবিতে মা তার সন্তানকে আর ফিরিয়ে নিতে আসেনা কিন্তু আবির্ভাব ছবিতে আমরা দেখি শাহানা সন্তানকে ফেলে রেখে যখন আত্মহত্যা করতে যায়, একটা শিশুর তীব্র কান্নায় তার ঘোর ভাঙ্গে। সে আবার সেখানে ছুটে আসে, কিন্তু ততোক্ষণে গাড়িটি চলে যায়। ছবির শেষ দিকটি আমাদের আরও স্পর্শ করে। সেই শিশু একটু বড় হবার পর, শাহানা এবং রাশেদ তাদের নিজেদের ভুল বোঝাবুঝির অবসানের পর সন্তানকে ফিরে পেলেও, সন্তান তার পালিত বাবামা অর্থাৎ আজিম আর শর্মিলীর কাছেই থাকতে চায়। শাহানা এবং রাশেদ তাদের সন্তানকে ফিরিয়ে দেয়। সন্তান শুধু পেটে ধারণ করলেই হয়না, পরম স্নেহ আর মমতায় যারা পালন করেন, তাদের অধিকারের প্রতি সম্মান রেখেই হয়তো ছবিটি এভাবে শেষ হয়। ফলে ছবিটি আরো মানবিক হয়ে ওঠে।

মুক্তিযুদ্ধের উপর যত ছবি নির্মিত হয়েছে সুভাষ দত্তের ‘অরুনোদয়ের অগ্নিসাক্ষী (১৯৭২)’ তার মধ্যে অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধের ছবি হলেও একেবারেই ভিন্ন আদলে নির্মিত। প্রথম সাড়ে চারমিনিটের মাথায় পরিচালক তার নিপুণ দক্ষতায় একদিকে সুজলা সুফলা গ্রামের শান্ত দৃশ্যের পরেই বৈদুত্যিক খুঁটির এক ভয়াবহ চিত্র দেখান, তার পরেই আমরা দেখি একটা হাত উঠে যেতে, গুলির শব্দ, হাতের উপর রক্তের ফোঁটা পড়ে, হাত মুষ্টিবদ্ধ হয় এবং পরের শটেই দেখি সেই হাতে বন্দুক। এতো অল্প সময়ে একটা ভয়াবহ যুদ্ধের আগমন বার্তার ইঙ্গিত আমরা কোনো ছবিতে দেখিনা। ধর্ষণের মেটাফোর হিসেবে শুধু বুটের শব্দ ভয়াবহ এক আবহ সৃষ্টি করে। ছবির বিস্তারিত আলোচনা এখানে করা সম্ভব নয়। শুধু একটা চরিত্র নিয়ে আলোচনা না করলেই না আর তা হলো আনোয়ার হোসেনের চরিত্র। ছবিতে আনোয়ার হোসেনকে আমরা অভিনেতা আনোয়ার হোসেনকেই পাই। যাকে ছবির চরিত্ররা আনুভাই বলে ডাকে। আনোয়ার হোসেনকে যখন মিলিটারিরা ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে, ফ্ল্যাশব্যাকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ছবির চমৎকার মেটাফোর ব্যবহার করেন পরিচালক সুভাষ দত্ত। আনোয়ার হোসেন শুধু শিল্পী বলেই মিলিটারিরা তাকে ছেড়ে দেয়। আনোয়ার হোসেন ভারতে পালিয়ে যান। কলকাতায় ঘুরে বেড়ান। বন্ধুদের সঙ্গে তাস খেলেন। কিন্তু তার যে আত্মশোচনা, অনুশোচনা আমরা দেখতে পাই তা যেন বাস্তব অনেক আনোয়ার হোসেনের চরিত্রদের আমাদের সামানে দাঁড় করিয়ে দেয়। যারা এভাবেই ভারতে যেয়ে সময় কাটিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। যুদ্ধের পর সেই বাস্তব আনোয়ার হোসেনদের কতটুকু অনুশোচনা হয়েছিলো আমাদের জানা নেই, কিন্তু ছবির আনোয়ার হোসেন স্বাধীনতার পর যখন দেশে ফিরেন তখন তার সেই অনুশোচনার সমাপ্তি ঘটান ধর্ষিতা রোমেনাকে (ববিতা) বিয়ে করে। যে রোমেনাকে পাকিস্তানি মিলিটারিরা ধর্ষন করে এবং পরে অন্তঃসত্ত্বা হয় এবং একটি সন্তান জন্ম দেয়। যুদ্ধ শিশুকে, যুদ্ধ শিশু হিসেবে বরণ না করে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের শিশু হিসেবে কোলে তুলে নেন ছবির আনোয়ার হোসেন। মানবতার আরেক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন পরিচালক সুভাষ দত্ত। আমাদের মাথা তার জন্যে নত হয়ে আসে। সিনেমার পরিচালক নয়,একজন কর্মী হিসেবে যিনি নিজেকে আজীবন দাবী করেছেন। সিনেমার দীর্ঘ পথের অভিজ্ঞতার নাম যার কাছে ‘সততা’। সততার সঙ্গে চলেছিলেন বলেই আমরা তার হাতে এতো অজস্র সার্থক সিনেমা উপহার পেয়েছি। আজও তাই বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে তাকে স্মরণ করি এবং করে যাবো।।

১টি মন্তব্য

  1. Ato shundor kore likecho tumi,j filmgulo punoraye na dekhlle mon bhorebe na,khallo dukho roye gello r kono din ki amra aro ekjon Shubhash Dutta-k ki pabo amader desh Bangladesh-e….