Home » অর্থনীতি » উত্তাল ষাটের দশক (চতুর্দশ পর্ব)

উত্তাল ষাটের দশক (চতুর্দশ পর্ব)

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান :: মওলানা ভাসানীর আন্দোলন ও শেখ মুজিবের মুক্তি

হায়দার আকবর খান রনো

last 5ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা প্রণয়ন করেই ব্যাপক প্রচারে নেমেছিল এবং বিপুল সাড়া পেয়েছিল। ১৭ জানুয়ারি ১৯৬৯ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে ছাত্র সভা থেকে এই প্রচারাভিযান শুরু হয়েছিল। তখন রাস্তায় ১৪৪ ধারা জারি ছিল। ১৮ জানুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের হলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং কাদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। ১৯ জানুয়ারি আবারও মিছিল বেরিয়েছিল। সেদিন পুলিশ গুলি করেছিল। আসাদুল হক নামে একজন (পরবর্তীতে শহীদ আসাদুজ্জামান নন) গুলিবিদ্ধ হন। পরদিন ২০ জানুয়ারি আবারও ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের হলে চারখানপুলের মোড়ে অবস্থিত একটি পুলিশজিপ থেকে মিছিলকে লক্ষ্য করে জনৈক পুলিশ অফিসার গুলি ছোড়ে। মিছিলের সামনের কাতারে ছিলেন আসাদুজ্জামান (আসাদ)। তিনি সাথে সাথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

আসাদ তখন ছিলেন ঢাকা সিটি ল কলেজের ছাত্র। ইতোপূর্বে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্স (১৯৬৬) এবং এমএ (১৯৬৭) পাস করেছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা হলের (এখন শহীদুল্লাহ হল) মেনন গ্রুপ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। তিনি চীনপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির সাথেও সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তিনিই ইতোপূর্বে (১৯৬৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর) মওলানা ভাসানীর ডাকা হাট হরতাল সফল করতে গিয়ে মনোহরদী থানার হাতিরদিয়া বাজারে আহত হয়েছিলেন।

আসাদের শহীদ হওয়ার খবর দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। সারাদেশ একদিকে শোকাভিভূত, অপরদিকে চরমভাবে বিক্ষুব্ধ। এই শোক আর ক্ষোভ থেকে জন্ম নিল মহান গণঅভ্যুত্থান। যা ছিল স্ফুলিঙ্গ তা বৃহৎ দাবানলে পরিণত হলো।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পরদিন হরতালের ডাক দেয়। জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতালের ডাকে সাড়া দিয়েছিল। ২১ জানুয়ারির হরতালের পর দুই দিন বাদ দিয়ে আবার ২৪ জানুয়ারি হরতাল ডাকা হয়েছিল। ২৩ জানুয়ারি রাতে বিশাল মশাল মিছিল বের হয়েছিল। দৈনিক আজাদের রিপোর্ট অনুযায়ী ঢাকার বুকে স্মরণকালের বৃহত্তম মশাল মিছিল। তখনো শহরে ১৪৪ ধারা জারি ছিল। কিন্তু কেউ পরোয়া করেনি। উক্ত মশাল মিছিলে কবি সুফিয়া কামাল, জোহরা তাজউদ্দিন, হাজেরা মাহমুদ, কামরুন নাহার লাইলী, বেগম ইদ্রিস, রোকেয়া মহিউদ্দিন প্রমুখ বিশিষ্ট মহিলারাও যোগ দিয়েছিলেন। রাস্তার দুই পাশের জনতা হাত নেড়ে অভিনন্দন জানিয়েছিল। আশপাশের বাড়ি থেকে লোকজন স্বতঃস্ফূর্তভাবে মশালের জন্য কেরোসিন বা পেট্রোল সরবরাহ করেছিল। মিছিলটি সারা ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করেছিল।

১৯৬৯এর গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে ভালো রিপোর্ট পাওয়া যাবে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় (যদিও কাগজটি ছিল মুসলিম লীগের মুখপত্র)। সেই সময় আজাদে অনেক প্রগতিশীল সাংবাদিক কাজ করতেন। সেই রাতের মশাল মিছিল সম্পর্কে আজাদ পত্রিকার (রিপোর্ট লেখকের নাম জানা যায়নি) রিপোর্ট থেকে কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করা যাক।

এমন মিছিল কোথাও দেখেনি কেউ। দিকে দিকে উঠেছে অবাধ্যতার ঢেউ। ছাত্রছাত্রী ছাড়াও এ মিছিলে শরীক হয়েছে কারখানার শ্রমিক, পথের রিকশাওয়ালা, গঞ্জের মহাজন, স্টেশনের কুলি, ঘরের গৃহিণী, অফিসের কেরানী, নৌকার মাঝি এক কথায় সবস্তরের মানুষ তাদের বুলন্দ আওয়াজে থর থর করে কেপে উঠছে রাজধানীর গগনচুম্বী ইমারত।সর্বত্র এক আওয়াজ, আসাদ ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না। উক্ত রিপোর্টে মিছিলের লোকসংখ্যার একটা হিসাব দেয়া হয়েছে। মিছিলটি সবচেয়ে বড় হয়েছিল শান্তিনগরের কাছে। প্রতি মিনিটে ৮০ জন অতিক্রম করার হিসাবে সে সময় মিছিলে যোগদানকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৬ হাজার।

পরদিন ২৪ জানুয়ারি তো শুধু হরতাল নয়। গণঅভ্যূত্থান। এমন অভ্যূত্থান আমাদের দেশে ইতোপূর্বে আর কখনো দেখা যায়নি। মিছিল আর মিছিলে ভরে গেছে সারা শহর। সরকারি অফিস থেকেও অফিসার কর্মচারীরাও বেরিয়ে এসেছেন। বড় বড় আমলারাও কর্মচারীদের চাপে বেরিয়ে এসে কিছুক্ষণ মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। ওয়াপদার চেয়ারম্যান মাদানী সাহেব ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি এবং জাদরেল আমলা। তিনিও অফিস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেদিনও রাস্তায় রাস্তায় গুলি হয়েছিল। সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছিল সরকার। সেনাবাহিনী রাস্তায় মেশিন গান নিয়ে গাড়ি করে টহল দিচ্ছে। সেদিন কিশোর মতিউররুস্তমসহ সাতজন শহীদ হন। কিন্তু অকুতোভয় জনতাকে আইয়ুবশাহী দমন করতে পারেনি। জনতা স্লোগান দিচ্ছে দিকে দিকে আগুন জ্বালো, শহীদের রক্ত বৃথা যাবে না, আসাদ ভাইয়ের রক্ত বৃথা যাবে না ইত্যাদি। ঢাকা শহর সেদিন জনতার দখলে ছিল।

২৪ জানুয়ারির পর রাজনৈতিক চিত্র একেবারে পাল্টে গেল। এরপর প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও মিলিটারীপুলিশের সাথে জনতার সংঘর্ষ হচ্ছে। শহীদের তালিকা বেড়েই চলেছে। তবু অবাধ্য জনতাকে দমন করা আর সম্ভব হচ্ছে না।

জানুয়ারির শেষ আর ফেব্রুয়ারির প্রথমদিকে প্রশাসন একেবারে ভেঙ্গে পড়েছিল। সর্বত্র যেন অঘোষিত জনতার রাজত্ব। কেউ খাবে আর কেউ খাবে না তা হবে না তা হবে না স্লোগানটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে সাম্য আর সমাজতন্ত্রের সুরটি পাওয়া যায়। শ্রমজীবীর মধ্যে নতুন করে শ্রেণী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল। ১৯৬৯এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে তিনটি চেতনা মিলেমিশে ছিল গণতান্ত্রিক (আইয়ুবের সামরিক শাসন বিরোধী সংগ্রাম), জাতীয় (ছয় দফার মধ্যে জাতীয় চেতনা) এবং কিছুটা পরিমাণে সমাজতান্ত্রিক চেতনা।

আরও একটি স্লোগানও খুব বেশি করে উচ্চারিত হতো। জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো। বস্তুত দিকে দিকে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল। বাস্তবেই জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আগুন দিয়েছিল সরকারি মন্ত্রীদের বাসভবনে এবং আগরতলা মামলার বিচারপতির বাসভবনে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে, এই সময় কোন লুটতরাজ হয়নি। এমনকি যে সব বাড়িতে জনতা আগুন দিয়েছে, সেখানেও টাকা পয়সা বা কোন মূল্যবান জিনিসে কেউ হাত দেয়নি। বিপ্লবী অভ্যুত্থান সাধারণ মানুষকে যে উন্নত মানুষে পরিণত করে সেই অভিজ্ঞতা আমরা পেয়েছি ১৯৬৯এর বিপ্লবী দিনগুলোতে। এদিকে বিদ্রোহের আগুন, বিপ্লবের আগুন ছড়াচ্ছেন মওলানা ভাসানী। নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে ছাপা হলো ভাসানীর ছবি, নিচে লেখা প্রফেট অফ ভায়োলেন্স। এক পর্যায়ে ভাসানীকে বলতে হয়েছিল কলকারখানা বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করবেন না, কারণ এগুলো জনগণের সম্পদ। তিনি আরও বললেন, বনের আগুন নেভানো যায়, মনের আগুন নেভানো যায় না। উচ্চবিত্তরা বলতে শুরু করলো, ভাসানী দেশটাকে অরাজকতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এখন আইয়ুব খানের উচিত স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা।

আইয়ুব খানের উপরও ব্যবসায়ী ও সামরিক আমলাদের চাপ তৈরি হলো, পদত্যাগ করে অথবা সমঝোতা করে পরিস্থিতিকে শান্ত করো, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করো। চাপের কারণে বাধ্য হয়ে আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি গোলটেবিল বৈঠকের ডাক দিলেন। কিন্তু তেমন সাড়া পাওয়া গেল না। মওলানা ভাসানী গোলটেবিল বৈঠকের আমন্ত্রণকে প্রত্যাখ্যান করলেন। ইতোমধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর উত্থান ঘটেছে। তিনিও একই ভাবে গোলটেবিল বৈঠক বয়কট করলেন। আওয়ামী লীগের নেতারা বললেন, শেখ মুজিবকে ছাড়া গোলটেবিলে যাবে না। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান তো রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার আসামী। বন্দী।

পূর্ব পাকিস্তানে তখন সর্বত্র স্লোগান উঠেছিল গোলটেবিল না রাজপথ রাজপথ, রাজপথ। অর্থাৎ আলোচনার আর অবকাশ নেই। বিপ্লবী অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে আইয়ুবকে সরিয়ে গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এদিকে পরিস্থিতি ক্রমাগত উত্তপ্ত হচ্ছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দী আগরতলা মামলার আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হক গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হলেন। বলা হলো তিনি নাকি পালাবার চেষ্টা করছিলেন। তাই পাকিস্তানি সিপাহীরা তাকে গুলি করে হত্যা করেছিল।

পরদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি মওলানা ভাসানী ঢাকার পল্টন ময়দানে পূর্ব নির্ধারিত এক জনসভায় ঘোষণা করলেন মুজিবকে মুক্ত না করলে বাস্তিল দুর্গের মতোই ক্যান্টনমেন্টের পতন ঘটানো হবে। এক লাখ মানুষ নিয়ে আমি ক্যান্টনমেন্ট থেকে মুজিবকে মুক্ত করে নিয়ে আসবো। তিনি আরও বললেন, আমাকে যদি আজ প্রশ্ন করা হয়, শান্তি না ভায়োলেন্স, আমি জবাব দেই ভায়োলেন্স, ভায়োলেন্স, ভায়োলেন্স।

বস্তুত মওলানা ভাসানীর বক্তৃতা যখন চলছে তার আগেই ভায়োলেন্স শুরু হয়ে গেছে। শ্রমিকদের একটি বিশাল মিছিল আসছিল পল্টন ময়দানের দিকে। মিছিলের এক মাথা যখন পল্টন ময়দানে প্রবেশ করেছে, তখন আরেক মাথা ছিল প্রেসক্লাবের কাছে। প্রেসক্লাবের কাছেই ছিল জনৈক মন্ত্রীর বাসা। মিছিল থেকে সেই বাসায় আক্রমণ চালানো হয়। পুলিশ গুলি করে। গুলিবিদ্ধ হয় মিছিলকারীরা। সারা পল্টন ময়দান উত্তেজনায় কাপছে। সেদিন শহরের বিভিন্ন জায়গায় আগুন জ্বলেছিল। প্রধানত সরকার দলীয় লোকজনের বাসায়। সন্ধ্যা বেলা কারফিউ জারি করা হলো।

পরদিন ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় যখন কারফিউ চলছে, তখন রাজশাহীতে একটি মিছিলে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা। এই রকম একটার পর একটা ঘটনা ঘটতেই থাকে।

১৬ ফেব্রুয়ারি (১৯৬৯) সন্ধ্যা থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির রাত পর্যন্ত টানা কারফিউ। ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর এক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটলো। কারফিউতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বস্তির শ্রমজীবী মানুষ। আয়উপার্জন নেই। খাবার নেই। তার উপর পানিরও সংকট। কারণ ঘরের বাইরে বের হতে পারছে না। এই রকম অবস্থায় মগবাজার, মালিবাগ, খিলগাও এই সকল এলাকার বস্তিবাসী কারফিউ ভঙ্গ করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। কোন রাজনৈতিক দল বা কোন ছাত্র সংগঠন তাদের সংগঠিত করেনি। তারা নিজেরাই সংগঠিত হয়ে রাস্তায় বেরিয়েছিল। কারফিউ ভঙ্গকারী মিছিলের সংখ্যা ছিল দশ হাজারের মতো। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আইয়ুব বিরোধী স্লোগান দিয়েছিলেন। শেখ মুজিবের মুক্তি চাই, ভাসানীমুজিব জিন্দাবাদ এই সকল স্লোগান দিয়েছিল। তারা রাস্তার দুই পাশের দালান বাড়িতে বাস করা লোকদেরও মিছিলে যোগ দিতে বলেছিলেন। দালান বাড়িতে বাস করে মধ্যবিত্ত। তাদের কেউ কেউ এই মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। আমি অন্তত একজন ব্যাংক কর্মচারীর কথা জানি (নাম তার মতিউর রহমান) যিনি নিজের বন্দুকটা সাথে নিয়ে মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন।

মিলিটারি গুলি করেছিল। মিছিল থেকেও দুই একটা পাল্টা গুলি হয়েছিল। সেই রাতে কতোজন যে মারা গিয়েছিলেন, তা জানা যায়নি। মওলানা ভাসানী সেদিন রাতে ন্যাপ নেতা সাইদুল হাসানের (তিনি ১৯৭১ সালে শহীদ হন) বাসায় ছিলেন। (কাজী জাফর আহমদ ও আমিও সেই রাতে সেই বাসায় ছিলাম)। মওলানা ভাসানী পত্রিকা অফিসে টেলিফোনে একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন। বিবৃতিতে তিনি বললেন, জনগণকে এই ভাবে মরতে দিতে পারি না। যদি এখনই কারফিউ প্রত্যাহার না করা হয় তাহলে আমিও কারফিউ ভঙ্গ করে জনগণের সাথে মিছিলে যোগ দেবো।

সেই রাতেই কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এদিকে মওলানা ভাসানী খাজনা, ট্যাক্স বন্দের আহবান জানিয়েছেন জনগণের প্রতি। খাজনা, ট্যাক্স নেবে কে? সমস্ত প্রশাসনই তো অচল হয়ে গেছে।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ জাতীয় সংসদ সদস্য এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিডি সদস্যদের পদত্যাগের আহবান জানিয়েছে। বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা পদত্যাগ করলেন। অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানও পদত্যাগ করলেন। অনেকে আবার ভয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে আশ্রয় নিয়েছে।

এই রকম পরিস্থিতিতে আইয়ুব খানের উপর আরও চাপ তৈরি হলো। হয় পদত্যাগ করো, না হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করো। চাপটা এসেছিল পাকিস্তানের বৃহৎ পুজিপতিদের কাছ থেকেও। শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খান বাধ্য হলেন শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নিতে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কোন মামুলি মামলা ছিল না। পাকিস্তানের শত্রু দেশ ভারতের সহযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার মতো রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা। গণঅভ্যুত্থান কতো শক্তিশালী ছিল যে এমন মামলাও তুলে নিতে বাধ্য হল পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। ২২ ফেব্রুয়ারি (১৯৬৯ সাল) শেখ মুজিবর রহমানসহ আগরতলা মামলার সকল আসামী মুক্তি লাভ করলেন। এর আগে ১৩ ফেব্রুয়ারি সকল রাজবন্দীকে আইয়ুব সরকার মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল। এবার শেখ মুজিবুর রহমান শুধু মুক্তি লাভই করলেন না, তিনি আবিভূর্ত হলেন ইতিহাসের এক মহানায়করূপে।।