Home » অর্থনীতি » কর্পোরেটরা কেন উগ্র হিন্দুত্ববাদী মোদীকে সমর্থন করে?

কর্পোরেটরা কেন উগ্র হিন্দুত্ববাদী মোদীকে সমর্থন করে?

সাক্ষাতকারে অরুন্ধতী রায়

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

last 4ভারত সম্পর্কে বিশেষ করে এই দেশটির যাবতীয় জটিলতা নিয়ে সত্যিকারের পর্যালোচনামূলক আলোচনা বিরল। সাধারণভাবে যা দেখা যায়, তার বেশির ভাগজুড়ে থাকে ইন্ডিয়া শাইনিং বিপণন প্রচারকাজ কিংবা বলিউডি নর্তনকুর্তন। আর ভারতের সরকারগুলো মূলত বাণিজ্য ও বিনিয়োগের দিকেই নজর দিয়ে থাকে। বুকার পুরস্কারজয়ী ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রায় এমন একজন যিনি এসব বাগাড়ম্বরতা ছুঁড়ে ফেলে বহুল কথিত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশটির আসল চেহারা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে অকুতভয়।

অরুন্ধতী রায় প্রথমে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছিলেন তার দ্য গড অব স্মল থিংকসএর মাধ্যমে। তবে কলম হাতে তিনি অর্থনৈতিক উন্নতি ও সুশাসনের ভারতীয় মডেলের স্বরূপ উন্মোচন করার ব্যাপারেও ব্যাপক সফলতা দেখিয়েছেন। হেমার্কেট বুকস সম্প্রতি তার অন্তর্ভেদী, রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত ননফিকশন প্রবন্ধগুলো নিয়ে ক্যাপিটালিজম : এ্য ঘোস্ট স্টোরি প্রকাশ করেছে। ভ্যানকুভারে তিনি TheTyee.caঅনলাইনের ডেরিক ওকিফি ও জাহানজেব হোসাইনের সাথে ওই বই এবং প্রাসঙ্গিক অনেক কিছু নিয়ে মতবিনিময় করেছেন।

প্রশ্ন: শুরু করা যাক আপনার সাম্প্রতিকতম বইটির শিরোনাম নিয়ে। বর্তমানে বৈশ্বিক পুঁজিবাদের কাহিনীতে ভূত আসলে কী বা কারা?

অরুন্ধতী: ভূতের বিষয়টি আমার মাথায় আসে আমি যখন মুম্বাইয়ে ভারতের সবচেয়ে ধনী রিলায়েন্স ইন্ড্রাস্ট্রিজ পরিচালনাকারী মুকেশ আম্বানির ২৭ তলা ভবনটির গেটের বাইরে দাঁড়াই তখন। ভারতে এ যাবৎকালের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বাসভবনটিতে পার্কিংয়ের জন্য আছে ছয়টি তলা, ৯০০ চাকর, অন্যান্য কিছুও এমন ধরনেরই।। তবে ভবনটি বানানোর পর তারা কিন্তু এখানে ওঠেননি, কারণ তারা তখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে, তাতে ভূতের আছর রয়েছে।

তারা আসলে মোটামুটিভাবে আমার চোখ খুলে দিয়েছে যে ভারতে আসলে কী হচ্ছে। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে ভবনটিতে দেখলাম যে এক দিকে ২৭ তলা উঁচু একটা খাড়া লন রয়েছে, আর লনের কিছু অংশ নিম্নগামী হয়েছে। আর আমি বললাম, চুইয়ে পড়া তত্ত্ব কাজ করছে না, বরং দ্রুত ওপরে ওঠা চলছেই।

ভারতে ১০০ ব্যক্তি ২৫ শতাংশ জিডিপির সমান সম্পদের মালিক। ভারতে পুঁজিবাদ সম্পর্কিত পুরো বিতর্ক এটা নিয়ে। এখানে যা ঘটছে, অতীতে ঠিক তাই ইউরোপ ও আমেরিকায় ঘটেছিল। দেশটি প্রান্তিক পর্যায়ে উপনীত হচ্ছে এবং নিজেকে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার দাবি করতে চাইছে।এই দেশটির একটি এলিট শ্রেণি আছে যারা বাইরের পরিমন্ডলে ছিটকে গেছে। সেখান থেকে তারা গ্রামবাসী আর আদিবাসী জনগণের বাস করা ভূমির দিকে, বক্সাইডের দিকে, লোহার খনির দিকে, পানির দিকে, বনের দিকে নজর দিচ্ছে। তারা কেবল বলছে, তাদের পাহাড়গুলোতে আমাদের বক্সাইড সেখানে পড়ে আছে কেন? তাদের নদীতে আমাদের পানি কেন?এটা হলো শোষণের অর্থনীতি। আর সেখানেই এই যুদ্ধের সূচনা হচ্ছে, এটা সেটা নিয়েই

ভারত এমন একটি দেশ যেখানে ১৯৪৭ সাল থেকে এমন একটি বছরও নেই যখন ভারতীয় সেনাবাহিনী তার নিজের জনগণের বিরুদ্ধে মোতায়েন হয়নি। যুদ্ধ হয়েছে মনিপুর, নাগাল্যান্ড, কাশ্মির, জুনাগড়, পাঞ্জাব, হায়দরাবাদে। এখন সুবিধা লাভের জন্য যুদ্ধ সরে এসেছে কেন্দ্রভূমিতে। আর তাই তারা গরিবদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করছে। ওই সব এলাকার হাজার হাজার মানুষ এখন কারাগারে আছে, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং সরকারের অবকাঠামো নির্মাণের বিরোধিতা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে তারা মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে কিভাবে লড়ছে? তারা কিভাবে অন্য চিন্তাশীলদের বিরুদ্ধে লড়ছে? সর্বপ্রথমে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে মগজ ধোলাই করছে। তারপর যা করা হচ্ছে তা হলো, এসব খনি কোম্পানি এখন চলচ্চিত্র উৎসব এবং সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করছে। এসবের মাধ্যমে ধীরে ধীরে লোকজনের চিন্তাচেতনা বদলে দিয়ে তাদেরকে এসব প্রকল্প গেলানো হচ্ছে।

প্রশ্ন: তাহলে এটা একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক প্রকল্পও?

অরুন্ধতী: এটা সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্প, সেইসঙ্গে সাম্প্রদায়িক প্রকল্পও। মূলত, যা হচ্ছে তা হলো, ১৯৮০ ও ১৯৯০এর দশকে আফগানিস্তানের পর্বতমালায় সোভিয়েত সমাজতন্ত্র যখন যুদ্ধে পরাজিত হলো, সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্র ভারত তখন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল প্রভৃতি দেশের সাথে গাটছড়া বাঁধে। পরিণতিতে নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির ভারত তার বাজার আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার কাছে খুলে দেয়। আর দেশটি যখন বাজার উন্মুক্ত করে দিচ্ছিল, ঠিক তখনই সে ১৪ শতকের বাবরি মসজিদের তালাও খুলে দেয়। সেটা বিতর্কিত বলা হলো, কারণ হিন্দুরা বলছিল যে, প্রভু রাম সেখানে জন্মেছিলেন।

এই দুই তালা খুলে দেওয়ায় দুই ধরনের সঙ্ঘাতের সৃষ্টি হয়। একটি সঙ্ঘাতের সূচনা হয় অর্থনৈতিক সামগ্রিকতাবাদ, মুক্ত বাজার ইত্যাদি থেকে এবং অপরটি ছিল হিন্দু মৌলবাদের উত্থান। আর উভয় সঙ্ঘাতই ইসলামি সন্ত্রাসী ও মাওবাদী সন্ত্রাসী নামে দুই ধরনের সন্ত্রাসী প্রস্তুত, তৈরি ও সৃষ্টি করে। ক্ষমতায় কংগ্রেস কিংবা আরো বেশি ডানপন্থী বিজেপি ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তারা উভয়েই এই দুই ধরনের সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দিয়েছে, তবে এটাকে ব্যবহার করে তারা বেশি বেশি সামরিকায়ণ ঘটিয়েছে।

প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্রের মতো কানাডা সরকারও ক্রমবর্ধমান হারে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর মতো পাশ্চাত্যের নেতারা ইসলামী উগ্রবাদের বিপদ নিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেও তারা কেন কখনোই বিশেষ করে ভারতের মতো পার্লামেন্টারি গণতান্ত্রিক দেশে হিন্দু অতি ডানপন্থী রাজনীতি নিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন না?

অরুন্ধতী: কারোর হিন্দু ফ্যাসিবাদ নিয়ে কথা না বলার কারণ হলো, হিন্দু ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটেছে ভারতীয় উন্মুক্ত বাজারের উত্থানের সাথে তাল মিলিয়ে। আপনার যখন ১০০ কোটি লোকের সম্ভাবনাময় বাজার থাকবে, তখন আপনি কোনো কিছু নিয়েই সমালোচনা মুখর বা উদ্বিগ্ন হবেন না। বস্তুত, আমরা এমন এক দেশে বাস করছি, সেখানে ১৯৮৪ সালে রাস্তায় রাস্তায় তিন হাজার শিখকে হত্যা করা হয়েছিল, গুজরাটে হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল, গণধর্ষণ করা হয়েছিল কিংবা জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিলএই নৃশংসতা গুরুত্ব পায় না।

প্রশ্ন: গুজরাট গণহত্যার ব্যাপারে আসা যাক, নরেন্দ্র মোদি (তখন তিনি ছিলেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী) মুসলমানদের বিরুদ্ধে দলিতদের ক্ষেপাতে পেরেছিলেন। তিনি সেটা কিভাবে করতে পারলেন এবং ভারতের অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্কের কোন বার্তা দিচ্ছে এটা?

অরুন্ধতী: শুনুন, মুসলিম হত্যায় বিপুলসংখ্যক দলিত জড়িত এমনটা বলা আসলে অতি ব্যবহৃত কথার কথা। ভারতবর্ষ বিভক্তির সময়ও এমনটা ঘটেছিল। তবে ওই সময়ের অনেক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব স্থানে মুসলিম ও দলিতরা একসাথে বসবাস করেছিল, সেখানে তাদের মধ্যে গোলযোগ হয়নি। দলিতদের কাঁধগুলো বন্দুক রাখার বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারেযখন গ্রেফতার করতে হয়, তখন তাদের বেশির ভাগ হয় দলিত।

হিন্দুৎভা বা হিন্দুত্ববাদী শক্তির দলিতদের সঙ্ঘবদ্ধ করার একটা দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে ঠিক যেমন ভারতবর্ষ বিভক্তির আগে বিভিন্ন স্থানে ঘটেছিল। হিন্দুৎভার তাদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্র এটি। তাদের এটা বলা যে, তোমরা তো হিন্দু, তাই তোমরা কেন আমাদের হয়ে কিছু হত্যাকান্ড ঘটাও না। তবে এটা জটিল বিষয়। কারণ তারা সবসময় সফল হয় না। দলিতদের জন্যও এটা কঠিন ব্যাপার। কারণ শেষ পর্যন্ত তারাই কোপানলে পড়ে। মোদি যখন তার গেরুয়া জোব্বা খুলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে তার চকচকে বেনিয়া স্যুট পরিধান করে মুসলমানদের জড়িয়ে ধরে বলেন যে, তিনি ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। তখন কিন্তু তিনি ব্যবস্থা নেন দলিতদের বিরুদ্ধে।

প্রশ্ন: গুজরাট গণহত্যায় মোদির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকলেও ভারতীয় আদালত তার ব্যাপারে কিছুই করতে পারছে না কেন?

অরুন্ধতী: কারণ তারা তা চায় না। মোদি অনেক বেশি বড় হওয়ায় মোদির মতো লোকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপে সফল হওয়া সম্ভব নয়, যদি না ওই সময়ে ফিরে যাওয়া যায়।ভারতকে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে অভিহিত করা হলেও নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সময় সেটা হয়ে যায় হত্যার মওসুম। এটা ঘটে তখন যখন লোকজন তাদের নিজস্ব ক্ষেত্র তৈরি করতে চায় এবং আমাদের বনাম তাদের ধারণা জোরদার করার লক্ষ্যে খুনখারাবিতে মত্ত হয়। এমনটাই ঘটেছিল ২০০২ সালে। ওই সময় গুজরাট নির্বাচনের আগে মোদি সত্যিই মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছিলেন। কিন্তু ওই গণহত্যার পর তিনি বিপুলভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন। একই বিষয় ঘটেছে উত্তর প্রদেশ, মোজাফফরনগরেও। আর যে দুই রাজনীতিবিদ মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল (হাজার হাজার লোককে তাদের গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেয়া হলো, তাদের জমি হিন্দুরা দখল করে নিল, বিতাড়িত মুসলমানরা এখন গেটোর ও কনসেন্ট্রশন ক্যাম্পে বাস করছে, তাদের বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বন নেই) তাদেরকে বিজেপির টিকেট দেওয়া হলো। অর্থাৎ পুরোটাই নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যাপার।

প্রশ্ন: আপনি খুবই সফল একটি উপন্যাস লিখেছিলেন, আর বর্তমানে আরেকটি লেখায় ব্যস্ত রয়েছেন। কাশ্মির, নক্সাল বিদ্রোহ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করার চেয়ে আরেকটি উপন্যাস রচনা করা অবশ্যই আপনার ওপর অনেক বেশি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বাণিজ্যিক সফলতা সত্ত্বেও আপনি কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলেন? আপনি কিভাবে বুঝলেন যে এ ধরনের লেখা দরকার?

অরুন্ধতী: আমি সফল হতে বা ধনী হওয়ার জন্য কখনো কোনো উপন্যাস লিখিনি। আমি স্রেফ লেখার জন্য লিখেছি। একটা সফলতা পাওয়ার পর আরেকটা সফলতার দিকে ছুটে চলার ইচ্ছাও আমার কখনো ছিল না। বিষয়টা এমন নয় যে আমি দ্য গড অব স্মল থিঙ্কস লেখার আগে কখনো রাজনৈতিক বিষয়ে কলম ধরিনি। তবে আপনারা জানেন, ভারতে হঠাৎ করেই আবহাওয়া বদলে গেছে। বিজেপি হঠাৎ করেই এই নোংরা, বাজে ভাষার জাতীয়তাবাদ নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। সব কিছুই হঠাৎ করে বদলে গেল, আমি কিছুতেই শচিন টেন্ডুলকার ও মিস ওয়ার্ল্ডের মতো নিজেকে ব্র্যান্ড ইন্ডিয়ার মতো কিছুর সাথে ব্র্যান্ডিং করতে পারছিলাম না। ফলে আমাকে গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসতেই হলো এবং বললাম, ধন্যবাদ, তবে আমি আগ্রহী নই।আমি এই প্রকল্পে নেই। তারপর লেখালেখিই আমাকে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে নিয়ে যাওয়া শুরু করে। আমার প্রবন্ধগুলো স্রেফ পরিকল্পনাহীন, ব্যক্তিগত ইচ্ছাঅনিচ্ছায় নয়, এগুলো বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কিত। এগুলো আরেক দৃষ্টিতে বিশ্ব দেখার বিষয়।

প্রশ্ন: আপনার সম্পর্কে একটি বিখ্যাত উক্তি হলো : অন্য পৃথিবী কেবল সম্ভবই নয়, তিনি আছেন তার পথে। কোনো নির্ঝঞ্ঝাট দিনে আমি তার শ্বাসপ্রশ্বাস শুনতে পাই। স্টিফেন লুইস এমনকি তার এই প্রশংসা জ্যাক লেটনের প্রতি প্রয়োগ করেছেন। এই ২০১৪ সালে আপনি কোথা থেকে আশাবাদ দেখতে পাচ্ছেন, যখন আরব বসন্ত মিশরে রক্তের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে, ভারতে হিন্দু ডানপন্থীর উত্থান ঘটছে, পাকিস্তানে তালেবানের দাঙ্গা সৃষ্টি হয়েছে এবং যুদ্ধ, দখলদারিত্ব, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আলকায়েদার পুনরুত্থান ঘটেছে?

অরুন্ধতী: আমার ফিল্ড নোটস অন ডেমোক্র্যাসি গ্রন্থটি ওইসব লোককে উৎসর্গ করা হয়েছে, যারা বিচারশক্তি থেকে প্রত্যাশাকে আলাদা করেছে। যা কিছু ঘটছে, তা লোকজন পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে। সমস্যা হলো এ নিয়ে কী করতে হবে। তবে আমি মনে করি, বিশ্বকে দেখার স্বচ্ছতা এবং আমেরিকান নীতি, আলকায়েদা, ভূরাজনীতি ও বিশ্বায়ন দেখতে পারাটা দারুণ বিষয়, সম্মিলিত অর্জন। ১২ বছর আগের একটা ঘটনা আমার মনে আছে, আমি ওই সময় ভারতে বেসরকারিকরণ নিয়ে লিখছিলাম, তখন আমি উন্মাদ হয়ে গেছিবলে লোকজন আমাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে বলেছিল।

বাস্তবতা হলো, আমার মনে হয় সাধারণ মানুষের মধ্যেই রয়েছে বিজ্ঞতা। অবশ্য উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতের মতো স্থানে আপনি যদি অন্য দৃষ্টিতে দেখেন (পত্রপত্রিকায় বিষয়টা পড়া বেশ হতাশাজনক), দেখবেন বিশ্বের সবচেয়ে গরিব মানুষেরা সবচেয়ে ধনী করপোরেশনগুলোর যাত্রা রুখে দিতে সক্ষম হয়েছে। করপোরেশনগুলো এখন কেন নরেন্দ্র মোদিকে সমর্থন করছে? তাকে সমর্থন করার কারণ হলো, তারা তার মধ্যে এমন লোককে দেখতে পাচ্ছে যিনি রক্তপাত (যা তিনি গুজরাটে করেছিলেন) দেখে হতবিহ্বল হন না, নৈতিক বিষয়টা যাই হোক না কেন, করপোরেশনগুলো তার মধ্যে এমন মানুষ পেয়েছে, যিনি ছত্তিশগড়ে সেনাবাহিনী পাঠাতে পারেন, তিনি তাদের ভাষায় প্রকাশ্য সমর্থক, অ্যাক্টিভিস্ট, সাংবাদিকদের মোকাবিলা করতে যাচ্ছেন, তাদেরকে চুপ করাতে যাচ্ছেন, এবং খনি করপোরেশনগুলোর জন্য বনজঙ্গল উন্মুক্ত করে দিচ্ছেন। তাদের তাকে গ্রহণ করার কারণ হলো প্রতিরোধের কারণে ২০০৪ সাল থেকে সাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকগুলোর কোনোটিই তারা বাস্তবায়িত করতে সক্ষম হয়নি।

জনগণ বুঝতে পারে, তারা জানতে পারে কী ঘটতে যাচ্ছে, এনজিওগুলো আসলে কী জন্য, করপোরেশন আসলে কী, সাহিত্য আর চলচ্চিত্র উৎসবগুলো কী করছে, বুদ্ধিজীবীরা কী করছে। ফলে কোনো না কোনোভাবে ছবিটা বেশ পরিষ্কার। তবে এই বোধগম্যতার পাশাপাশি বেড়েছে নজরদারি, সামরিকায়ন, কারাগারগুলোতে কয়েদির সংখ্যা বাড়ছে, হেফাজতে মৃত্যু বৃদ্ধি পাচ্ছে। আপনারা যদি আমাকে প্রশ্ন করেন, আমি যৌক্তিকভাবেই বলতে পারব না আশাবাদের বাসা কোথায়, তবে আমি মনে করি সেটা রয়েছে প্রত্যেকের ডিএনএতে।।