Home » বিশেষ নিবন্ধ » সৃজনশীল শিক্ষা উচ্ছেদে সৃজনশীল কৌশল

সৃজনশীল শিক্ষা উচ্ছেদে সৃজনশীল কৌশল

ফারুক আহমেদ

dis 5বাংলাদেশে যতগুলো শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাগাড়ম্বর এবং সবচেয়ে বেশি ঢাকঢোল পেটানো হয়েছে ২০০৯ সালে ক্ষমতাসীন মহাজোটের নামে আওয়ামী লীগের শিক্ষানীতি প্রণয়নে। এ শিক্ষানীতির ঢাকঢোলের আওয়াজ যত বেশি তার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন এর সৃজনশীল মোড়ক। এ মোড়কের নির্মাণ কৌশল সৃজনশীলতায় এমনই সুদৃঢ় তা যে কোনো কৌশলকেও হার মানায়। এ কৌশলে বাংলাদেশের বহু জ্ঞানীগুণী এমনভাবে ধরাশায়ী হলেন যে, শিক্ষানীতির কৌশলী প্রশ্নে ধরাশায়ী জ্ঞানীগুণীগণ এখনও সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ধরা থেকে উঠতেই পারলেন না। গুণীদের মাথা ঘোলা করা সেই প্রশ্ন হলোআপনি কি সৃজনশীলের পক্ষে নন?

বাংলাদেশের জনগণের বহুদিনের দাবি একটি একমূখী বিজ্ঞানভিত্তিক সর্বজনীন শিক্ষানীতি। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০এ কি জনগণের সেই দাবি পূরণের পক্ষে সুপারিশ করা হয়েছে? হতদরিদ্রদের শিক্ষার নামে যে পশ্চাদপদ মাদ্রাসার মধ্যে আটকে রেখে তাদের সাথে রাষ্ট্রীয় প্রতারণা করা হচ্ছে তাকে সাধারণ শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসবার জন্য কি শিক্ষানীতি ২০১০এ কোন প্রস্তাব আছে ? শিক্ষানীতি ২০১০এ কি গ্রামশহরের শিক্ষার আকাশ পাতাল বৈষম্য দুর করার কোন প্রস্তাব আছে? গ্রামাঞ্চলে এক একটি এনজিও তাদের স্বার্থে এবং প্রয়োজনে যেমন খুশি তেমন শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, শিক্ষানীতি ২০১০এ শিক্ষাকে স¤পূর্ণরূপে রাষ্ট্রের দায়দায়িত্বের আওতায় নিয়ে আসার কোন প্রস্তাব করা হয়েছে ? শহরাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মাঠ, বিল্ডিং দখল থেকে মুক্ত করে সাধারণের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার কোন প্রস্তাব আছে কি? ধনীদের জন্য উচ্চ মানের এবং সাধারণ মানুষের জন্য নিম্নমানের শিক্ষার বৈষম্য কমানোর কোন প্রস্তাব এই শিক্ষানীতির মধ্যে আছে কি? বাস্তব অবস্থা হলো প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত সর্বস্তরে শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণের মহোৎসব চলছে। অথচ শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধে কোন প্রস্তাব আছে কি? সাধারণ মানুষের এরকম বহু প্রশ্ন শিক্ষা নীতির সৃজনশীর মোড়ক ভেদ করে ভিতরে প্রবেশ করতে পারেনি।

শিক্ষানীতি ২০১০ এর মোড়ক কি উপাদানে তৈরী? এই মোড়কের সবচেয়ে রগরগে উপাদান হলোশিক্ষার মান বৃদ্ধিতে সৃজনশীল পদ্ধতি। অন্যান্য উপাদানগুলোর মধ্যে আছে প্রাথমিক স্তরে দুটি পাবলিক পরীক্ষা সংযোজন, সর্বস্তরে বই পুস্তকের আমূল পরিবর্তন। শিক্ষানীতির মোড়কের এসব উপাদানের প্রত্যেকটিই চাতুরী এবং প্রতারণা।

প্রাথমিক স্তরে পঞ্চম শ্রেণি এবং অষ্টম শ্রেণি শেষে দুটি পাবলিক পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে। এ পরীক্ষা বিশেষ করে পঞ্চম শ্রেণির শিশুদের ওপর এক মস্তবড় জুলুম।এ জুলুম হচ্ছে শিশুদের শৈশব কেড়ে নিয়ে তার স্বাভাবিক বিকাশ এবং সৃজনশীল শিক্ষার সকল পথকে দুমড়েমুচড়ে রূদ্ধ করার জুলুম। এই প্রতারণার ধরণ হলো সার্টিফিকেটের লোভ দেখানো। শিক্ষাকে লোভের দ্বারা তাড়িত করে কিভাবে সার্টিফিকেট সর্বস্ব করে তোলা যায় তার দৃষ্টান্ত হলো এই দুটি পাবলিক পরীক্ষার আয়োজন। প্রথমেই প্রতারণার জাল জনগণের সামনে আসেনি। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই জনগণ বুঝেছে শিক্ষার নামে জনগণের সাথে মস্তবড় প্রতারণা। তারা দেখছেন ছোট শিশুদের পাবলিক পরীক্ষার নামে শিক্ষা বাণিজ্য কোন পর্যায়ে পৌছেছে। এসবের জন্য কোচিং, গাইড বই, বিদ্যালয়ে বাড়তি পরীক্ষা ফি, বিশেষ কোচিং সবকিছুর জন্য পকেটে যে টান পড়ছে তা থেকেই জনগণ বুঝছেন শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ কি। যারা এসব খরচ বহন করতে অক্ষম হচ্ছেন তাদের সন্তানের শিক্ষার এখানেই ইতি টানতে হচ্ছে। কিন্তু যারা এসব ব্যয় বহন করে টিকে থাকছেন তারাও ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না যে, তারা আসলে শিক্ষার নামে শিশুর জন্য কি কিনছেন। শুধু ভুক্তভোগী জনগণই নন শিক্ষানীতি প্রণেতাদের কেউ কেউ মর্ম পীড়ায়ই হোক, আর পরিস্থিতি বুঝে মতলবাজীতেই হোক এখন ইনিয়ে বিনিয়ে বলছেন পঞ্চম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষার আয়োজন সঠিক হয়নি। সম্প্রতি ড. জাফর ইকবাল শিশুদের শৈশব ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলে এক প্রবন্ধ লিখে এর দায় এড়াতে চেয়েছেন।

সর্বস্তরে বইপুস্তকের আমূল পরিবর্তনের নামে যা করা হয়েছে তা সুষ্ঠু শিক্ষাকেই উচ্ছেদের শামিল। মতলববাজ ছাড়া কেউ এভাবে বই পুস্তকের সর্বনাশ করতে পারে না। শিক্ষামন্ত্রীও ঢালাওভাবে এই সৃজনশীলতার পক্ষে গান গেয়ে যাচ্ছেন। সৃজনশীল পাঠ্যপুস্তকের নামে জনগণের টাকা খরচ করে শিশুদের ওপর আবর্জনার স্তুপ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের ওপর যে আবর্জনার স্তুপ চাপানো হয়েছে তাতে তারা কোন রকমের শিক্ষা গ্রহনের সুযোগ তো নয়ই স্বাভাবিক বিচার বোধও হারিয়ে ফেলতে বাধ্য। মূল শিক্ষা থেকে বহু দুরে নানা নামের বিষয় চাপিয়ে দিয়ে তাদের আক্রান্ত করা হয়েছে। সপ্তম শ্রেণির একজন শিশুর ওপর চৌদ্দটি বিষয় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোন শ্রেণির বই সেই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে তাদের জন্য রচনা করা হয়েছে বলে কেউই মনে করতে পারবেনা। ভুলে ভরাতো আছেই তার সাথে আছে আলোচনার দুর্বোধ্যতা। ভুল শুধু বানানে নয় বিষয়বস্তুতে এবং নীতিপদ্ধত্তিতেও ব্যাপক ভুল। এমনকি দেখা গেছে কোন কবির মূল কবিতার সাথে পাঠ্যবইয়ে প্রদত্ত কবিতার বক্তব্যে মিল নেই। অষ্টম শ্রেণিতে লালন ফকিরের একটি জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ গানকে মানব ধর্ম নাম দিয়ে কবিতারূপে পাঠ্য করা হয়েছে। গানের বক্তব্যকে বিকৃত করে এবং ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। শুধু তাই নয় এই ভুল অংশ থেকেই পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নও করা হয়েছে। বই পুস্তকের এই পরিবর্তনে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে নোট বই আর মূল বইয়ের মধ্যে আর কোন ভেদ রেখা নেই। এখানে সব বইই এখন নোট বই। বইপুস্তকের যে দশা করা হয়েছে এই আমূল পরিবর্তনের পক্ষে একটি যুক্তি দেওয়াও সম্ভব নয়।

শিক্ষার এইসব ভয়াবহ অবস্থাকে বাইরের যে শক্ত মোড়ক দিয়ে আটকিয়ে দেওয়া হয়েছে তার নাম হলো সৃজনশীল পদ্ধতি। সৃজনশীল শিক্ষার সাথে এ পদ্ধতির কোন স¤পর্ক নেই। পরীক্ষায় প্রশ্ন কিভাবে প্রণীত হবে তার ওপর শিক্ষার সৃজনশীলতা নির্ভর করে না। এই পদ্ধতিতে প্রশ্ন যেভাবে করা হচ্ছে তাতে তার বিভিন্ন নাম দিয়ে প্রশ্নের বহুমাত্রিকতা থেকে সরে গিয়ে তাকে একমাত্রিক করে তুলে শিক্ষার্থীদের চিন্তার বহুমাত্রিকতাকেই প্রকারান্তরে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করা যায়। সে আলোচনায় না গিয়ে শুধু এটুকু বলা যেতে পারে আমাদের দেশ্ইে যারা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ালেখা করে তাদের জন্য তথাকথিত সৃজনশীল পদ্ধতি নেই কেন ? এই পদ্ধতিতে শিক্ষিত দেশগুলো যাচ্ছে না কেন?

শিক্ষার এই ব্যবস্থার পুরোপুরি বাণিজ্যিকীকরণ সম্পন্ন হয়েছে। সর্বস্তরে শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণ তো আছেই তার সাথে শিক্ষা নিয়ে মহাপরিকল্পনাও আছে। বিশ্বব্যাংক শিক্ষার যে কৌশলপত্র হাজির করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, তাদের লক্ষ্য হলো কর্পোরেট পুঁজির দক্ষ সেবক তৈরী করা। মানব সমাজ কর্তৃক অর্জিত জ্ঞানে সমৃদ্ধ বিকশিত মানুষ তৈরী বিশ্বব্যাংকের লক্ষ্য কখনই নয়। আসল উদ্দেশ্য কর্পোরেট পুঁজির সেবক তৈরী করা। আর ওই কর্পোরেটদের সেবক কতিপয় ব্যক্তি এবং বাংলাদেশের শাসকরা সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাংকের কৌশলপত্র বাস্তবায়নের জন্য এই দেশকে এক উর্বর ক্ষেত্র হিসেবেই গণ্য করছে। এখন প্রয়োজন এর বিরুদ্ধে সবাইকে রুখে দাড়ানো।।