Home » বিশেষ নিবন্ধ » উত্তাল ষাটের দশক (পঞ্চদশ পর্ব)

উত্তাল ষাটের দশক (পঞ্চদশ পর্ব)

গোলটেবিল বৈঠকে ভাসানীর না, শেখ মুজিবের যোগদান

হায়দার আকবর খান রনো

last 3শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির সংবাদে সারাদেশ আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। তার মুক্তির ঘন্টা খানেকের মধ্যেই আমি তার বাসভবনের ভেতরে (কিন্তু বিল্ডিংয়ের ভেতরে নয়, বিল্ডিংএ তালা দেয়া হয়েছিল) গিয়েছিলাম তখনো সকলে খবর পায়নি। বাড়ির সামনে কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান দোতালা বাড়ির ব্যালকনি থেকে মাইকে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেন। তিনি ছয় দফার প্রতি দৃঢ় আনুগত্য ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন, ‘আমি শোষিত মানুষের পক্ষে। পশ্চিম পাকিস্তানেও শোষিত মানুষ আছে। আমি তাদেরও পক্ষে।’

সেদিন সন্ধ্যায় তিনি অকস্মাৎ বিনা নোটিশে ন্যাপ নেতা সাইদুল হাসান সাহেবের বাসায় উপস্থিত হলেন যেখানে মওলানা ভাসানী ছিলেন। তিনি মওলানা সাহেবকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে তাকে সাথে করে তার শোবার ঘরে ঢুকলেন। দরজাটা ভিড়িয়ে দিলেন। তখন সেখানে ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ তোয়াহাও ছিলেন। শেখ মুজিব ও তোয়াহা পরস্পরের বন্ধু। তোয়াহার সাথে তিনি কিছু হালকা রসিকতা করলেন। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক আলাপ করেননি। মওলানা ভাসানীর সাথে একাকী মিনিট বিশেক কি কথা বলেছিলেন তা জানা যায়নি।

পরদিন রেসকোর্স ময়দানে তিনি জনসভায় ভাষণ দিলেন। বস্তুত এটা ছিল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত সংবর্ধনা সভা। পাঁচ লক্ষাধিক লোক জমায়েত হয়েছিল। ইতোপূর্বে এতো বড় জনসভা আর হয়নি। মনে রাখতে হবে তখন ঢাকার লোকসংখ্যা ছিল দশ লাখের মতো। ঢাকার আশপাশ থেকেও স্বউদ্যোগে মানুষ এসেছিল তাদের নেতাকে দেখতে। এই সংবর্ধনা সভায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ডাকসুর সহসভাপতি তোফায়েল আহমদ শেখ মজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান করলেন। সেই থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু নামে পরিচিত।

বিশাল জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা ও ১১ দফার প্রতি তার অঙ্গীকার পূর্নবার ব্যক্ত করলেন। তিনি বললেন, ‘আজ আমি বেরিয়েছি, মোনেম খাকে এখন বিদায় নিতে হবে।’ মোনেম খা তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন। শেখ মুজিব শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান রাখলেন।

সেই সময় তিনি বিশাল উচ্চতায় উঠে গেছেন। তখনই তিনি বাংলাদেশের জনগণের প্রায় একচ্ছত্র অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছেন। জনগণ তার কাছ থেকে জানতে চায়, পরবর্তী কর্মসূচি কি। সে সম্পর্কে তিনি কিছু বললেন না। তিনি বললেন, ‘আমি গোলটেবিলে যাবো। আমি কি আইয়ুব খানকে ভয় করি?’

তার এই বক্তব্যটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেই সময় সারাদেশে একস্বরে স্লোগান উঠেছিল ‘গোলটেবিল বর্জন করো’ ‘গোলটেবিল না রাজপথ রাজপথ রাজপথ’। আওয়ামী লীগছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও এই স্লোগান দিয়ে বেড়াচ্ছেন। গোলটেবিলে যোগদানের সিদ্ধান্ত ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের একক সিদ্ধান্ত। এমনকি তিনি তার দলের সাথেও আলোচনা করেননি। দলের কোনো নেতার সাথেও পরামর্শ করেননি।

গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের একটু পূর্ব ইতিহাস আছে। ভাসানী এবং ভুট্টো যখন গোলটেবিল বৈঠক বয়কট করেছেন, তখন শেখ মুজিবুর রহমানকেও বাদ দিয়ে যে বৈঠক হবে তার কোন তাৎপর্য থাকবে না। তাই শেখ মুজিবুর রহমানকে গোলটেবিলে নেয়ার জন্য আইয়ুব খান তৎপর ছিলেন। কিন্তু তিনি তো রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামি। তাহলে কি করা যায়? তাকে মুক্ত না করেও প্যারোলে গোলটেবিলে যোগদানের ব্যবস্থা করা যায় কিনা তা পরখ করে দেখছিলেন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান। শোনা যায়, বন্দী শেখ মুজিবুর রহমান প্যারোলে যাবার জন্য রাজীও হয়েছিলেন। তাকে পশ্চিম পাকিস্তানে নেয়ার জন্য ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই একটি প্লেন প্রস্তুত ছিল।

প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরীর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা’ থেকে আমরা জানতে পারি যে, শেখ মুজিবুর রহমান প্যারোলে যেতে এক রকম সম্মত হয়েছিলেন। তিনি ক্যান্টনমেন্টে বন্দী থাকা অবস্থায় বাইরের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা করতে পারেননি। গাফফার চৌধুরীর ভাষ্য অনুযাী, প্যারোলে গোলটেবিল বৈঠকে যাওয়ার ব্যাপারে বাধা দিয়েছিলেন তার স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব। তিনি এবং তার পরিবারবর্গ ২১ ফেব্রুয়ারি ক্যান্টনমেন্টে বন্দী শেখ মুজিবের সাথে দেখা করেছিলেন। বেগম মুজিব তার স্বামী বঙ্গবন্ধুকে নাকি একথাও বলেছিলেন, প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আইয়ুব খানের সাথে বৈঠক করলে ৩২ নম্বরের (অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর বাড়ী) বাসার দরজা শেখ মুজিবের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বাইরের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পেরে শেখ মুজিবুর রহমান তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন এবং দাবি করেন যে, পরিপূর্ণ মুক্ত না হলে তিনি গোলটেবিলে যাবেন না।

ঠিক এই প্রেক্ষাপটে আইয়ুব খান সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আগরতলা মামলা তুলে নিয়ে শেখ মুজিবকে মুক্তি প্রদান করতে। গণআন্দোলনের জোয়ার কতো তীব্র হলে মিলিটারি শাসক এতোটা নামতে পারে। রাষ্ট্রদ্রোহীতার এই মামলা প্রত্যাহার করা মানে হলো আইয়ুব খানের বড় রকমের পরাজয়। আইয়ুব খান সম্ভবত বুঝে গেছেন যে, তিনি আর ক্ষমতায় থাকতে পারছেন না।

২৩ ফেব্রুয়ারির বিশাল সমাবেশের পরদিনই অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান সদলবলে লাহোর পৌছালেন। সাথে ছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মিজানুর রহমান চৌধুরী প্রমুখ। বঙ্গবন্ধু তাদের সাথেও আলোচনা করেননি গোলটেবিলে যোগদানের প্রশ্নে। এদিকে ভাসানী এবং ভুট্টো বয়কট করেছেন। মোজাফফর ন্যাপ এবং ডাকের অন্যান্য পার্টিগুলো গোলটেবিলে যোগ দিয়েছিল। ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে মাত্র ১০ মিনিটের জন্য। কুশল বিনিময়ের পর ১০ মার্চ পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছিল।

১০ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবার সদলবলে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করলেন। ইতোমধ্যে তিনি ডাক থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। ন্যাপ (মোজাফফর) ডাক থেকে বের হয়নি, আবার ডাকের কোন সভায় উপস্থিত হয়নি। তারাও গোলটেবিলে গিয়েছিলেন। ডাকের সদস্য পার্টিগুলোও বৈঠকে ছিল। বলাই বাহুল্য ডাকের সেই দলগুলো ছিল চরম প্রতিক্রিয়াশীল। গোলটেবিল বৈঠকে ডাকের পক্ষ থেকে দাবি ছিল দুটি (এক) আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসনসহ ফেডারেল পদ্ধতির সরকার, (দুই) মৌলিক গণতন্ত্রী ব্যবস্থার বদলে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ব্যবস্থা। ভাসানী এবং ভুট্টো এবারও গোলটেবিল বর্জন করলেন।

গোলটেবিল বৈঠক ১০ মার্চ (১৯৬৯) থেকে ১৩ মার্চ পর্যন্ত চলেছিল। শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দাবি উত্থাপন করলেন যা আর কেউ সমর্থন করেননি। তিনি পূর্ব ও পাকিস্তানের বৈষম্যের কথা বললেন। তিনি বললেন, ছয় দফা ভিত্তিক সংবিধান প্রণীত হলে পাকিস্তানের দ্ইু অংশের জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়বে। গোলটেবিলের বক্তৃতায় তিনি তার নিজের ও তার গুরু সোহরাওয়ার্দীর পাকিস্তান আন্দোলনে বিশেষ অবদানের কথাও উল্লেখ করেছিলেন। তা পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল নেতাদের মধ্যে কোনো সাড়া জাগায়নি। ন্যাপ (ওয়ালীমোজাফফর)-এর কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল না।

শেখ মুজিবুর রহমান আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করেন যা বিশেষ ব্যাখ্যার দাবি রাখে। তাহলো জনসংখ্যার ভিত্তিতে পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্বের দাবি।

পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ বাস করতো পূর্ব পাকিস্তানে। তাহলে পার্লামেন্টের আসনের ৫৫ শতাংশ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া উচিত। কিন্তু ১৯৫৬ এবং ১৯৬২ সালের (আইয়ুবের) সংবিধান উভয় সংবিধানেই বলা হয়েছিল, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সমান সংখ্যক প্রতিনিধি থাকবে। অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে অস্বীকার করা হলো। এটাকে বলা হয় ‘প্যারিটি’ বা সংখ্যাসাম্য নীতি। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান হচ্ছে পাকিস্তানের দুটি ইউনিট মাত্র। অতএব দুই ইউনিট থেকে সমান সংখ্যক প্রতিনিধি থাকবে এই ছিল ওদের যুক্তি। ১৯৫৬ সালেই মওলানা ভাসানী প্যারিটি ও পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিটের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তখন সোহরাওয়ার্দী প্যারিটি এবং পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট মেনে নিয়েছিলেন।।

(চলবে…)