Home » শিল্প-সংস্কৃতি » খান আতাউর রহমান এবং ‘আবার তোরা মানুষ হ’

খান আতাউর রহমান এবং ‘আবার তোরা মানুষ হ’

ফ্লোরা সরকার

last 6পরিচালক খান আতাউর রহমান (১৯২৮১৯৯৭) শুধু চলচ্চিত্র পরিচালকই ছিলেন না, একাধারে তিনি ছিলেন চলচ্চিত্র প্রযোজক, সঙ্গীত পরিচালক, গায়ক, গীতিকার, কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপকার, আবৃত্তিকার,পরিবেশক, নাট্যকার, লেখক এবং সর্বপোরি একজন শক্তিমান অভিনেতা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে এতো বহুগুনের সমন্বিত প্রতিভাবান ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া বিরল। ১ ডিসেম্বর এবং ১১ ডিসেম্বর প্রতিভাবান এই পরিচালকঅভিনেতার মৃত্যু এবং জন্মবার্ষিকী। কর্মজীবন শুরুর আগে খান আতা ঢাকার কলেজিয়েট স্কুল এবং ঢাকা কলেজে পড়ার সময়েই অভিনেতা, গায়ক এবং আবৃত্তিকার হিসেবে পরিচিতি পান। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্যে কোলকাতা, বম্বে, লাহোর ও পরবর্তীতে ব্রিটেনে অভিনয়, সঙ্গীত এবং বিভিন্ন রকমের প্রশিক্ষণে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ১৯৫৭ সালে ঢাকায় ফিরে এলে, .জে.কারদার পরিচালিত ‘জাগো হুয়া সাভেরা (১৯৫৯)’ ছবিতে অভিনেতা হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন। অভিনয়ের পাশাপাশি একই সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় চলচ্চিত্রের ওপর লেখালেখি, সঙ্গীত পরিচালনা ও গীতিকার হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৪ সালে ‘অনেক দিনের চেনা’ ছবির মাধ্যমে প্রথম চিত্র পরিচালক, কাহিনীকার এবং প্রযোজক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর নবাব সিরাজউদ্দৌলা, সোয়ে নদীয়া জাগে পানি, অরুণ বরুণ কিরনমালা, সুজন সখী, ঝড়ের পাখি, দিন যায় কথা থাকে সহ প্রচুর ব্যবসা সফল এবং রুচিশীল ছবির পরিচালক, প্রযোজক, সঙ্গীত পরিচালক, অভিনেতা হিসেবে আমৃত্যু কাজ করে যান। ১৯৯৭ সালে মৃত্যুর আগে তার শেষ ছবি ছিলো ‘এখনো অনেক রাত’। কালজয়ী এই প্রতিভাবান শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধ নিবেদনের জন্যে তার নির্মিত অন্যতম ছবি ‘আবার তোরা মানুষ হ’র দিকে একটু ফিরে তাকানো যাক।

ছবির প্রেক্ষাপট স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ। কেন্দ্রীয় চরিত্রে যুদ্ধফেরত টগবগে তরুণ সাতজন মুক্তিযোদ্ধা এবং কলেজের অধ্যক্ষ। প্রেক্ষাপট যাই থাক, ছবিটি যেন উপন্যাসের ম্যাজিক রিয়ালিজমের মতো পেছনের কাহিনী সামনে নিয়ে এসেছেন পরিচালক খান আতা। আজকের বাংলাদেশের চিত্র যেন আমরা সেই ছবিতে আগেই একে ফেলতে দেখি। কীভাবে দেখি তা ছবির আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তা দেখতে পাবো। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের অসহায় চিত্র পরিচালক ছবির শুরুর মাত্র প্রথম তিনটি দৃশ্যের মাধ্যমে খুবই মুনসীয়ানায় তুলে ধরেন। প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দৃশ্যে যথাক্রমে আমরা দেখি ওষুধের দোকানে ওষুধ নেই, রেশন দোকানে রেশন নেই এবং কেরোসিন তেলের দোকানে তেল নেই। এই ‘নেই’ দিয়ে সবই যে ‘আছে’ তা তুলে ধরার জন্যে একটি মাত্র অস্ত্র ব্যবহার করা হয় তা হলো ‘যুদ্ধাস্ত্র’। কেননা, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে দেশ গড়ার পরিবর্তে সবাই তখন কালোবাজারী আর চোরা পথে নিজেদের গড়ে তুলছে। স্বাভাবিক নিয়মে অর্থনীতি না চললে নীতিহীন অর্থনীতি সেখানে স্থান করে নেয়। ফলে পণ্যের মালিকেরা একদিকে যেমন পণ্য মজুদ করে উচ্চ মূল্যে তা বিক্রির পথ করে নিতে থাকে, ঠিক তেমনি ভাবে সোজা পথে পণ্য না পেয়ে কাঞ্চন, রতন, হিরা, মানিক, সোনার মতো মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র ঠেকিয়ে পণ্য উদ্ধারের পথ করে নিতে থাকে। স্বাধীন দেশে যা অবশম্ভাবী এবং স্বাভাবিক ছিলো, তা যেন ক্রমশ অসম্ভব ও অস্বাভাবিক হয়ে উঠতে থাকলো। মূল্যবোধের অবক্ষয় শুরু হলে তা কাউকে রেহাই দেয়না। দেশ স্বাধীন করা সত্ত্বেও, স্বাধীন দেশে এই অসহায় মুক্তিযোদ্ধারা দেখলো অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান সহ জীবনের মৌলিক চাহিদার কাছে দিন দিন তারা পরাধীন হতে চলেছে। পরাধীনতার এই শৃঙ্খলমুক্তি খোঁজে তারা অস্ত্র দিয়ে দাবী আদায়ের মাধ্যমে। কিন্তু এটা কখনোই মুক্তির পথ হতে পারেনা। আর তাই বঙ্গবাণী কলেজের অধ্যক্ষ (খান আতা) তারই কলেজের ছাত্র, যারা একদিন মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো সেই মানিক, সোনা, হিরাদের একদিন ডেকে বলেন – ‘তোরা না একেকজন আগুনে পোড়া সোনার টুকরো ? —তোরা না ইতিহাস তৈরি করেছিলি ? আমি জানি, এখনো অনেক দুঃখ আছে। অনেক অন্যায়। অনেক অবিচার। মুক্তিযুদ্ধে বিধ্বস্ত এই দেশে কোথায় একে অপরকে হাত ধরে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করবে, তা না করে, কে কাকে খুন করে বড় হবে সেই হিংসায় উন্মত্ত। শতবর্ষের পরাধীনতার গ্লানি এতো সহজে কাটে নারে। সময় লাগে, অনেক সময় লাগে।’ কিন্তু অত সময় দেয়ার মতো ধৈর্য এই দেশের তরুণ যুবকদের নেই। ধৈর্য নেই সেই যুবকদের বাবামা’দেরও। মুক্তিযোদ্ধা সোনাকে তাই শুনতে হয়, যক্ষা আক্রান্ত বাবার ধিক্কার – ‘তুই আমাকে বাবা বলে ডাকবিনা। তুই আমার যক্ষা। আমার মরণ’। অর্থাৎ যে যোদ্ধা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে সেই এখন সেই দেশের যক্ষা আর মৃত্যু। স্বাধীনতার জন্যে এমন অবমাননাকর উক্তি এর চাইতে আর কিছু হয়না। কাঞ্চন এবং হিরা একদিন সস্তা সিগারেট কিনতে যায়। দুজনের পয়সা ভাগাভাগি করে এক প্যাকেট কেনার জন্যে দাঁড়াতেই দেখে, গাড়ি থেকে আরেক যুবক নেমে বিদেশি দামী ব্রান্ডের পুরো এক কার্টুন সিগারেট মুহূর্ত্তে কিনে নিয়ে যায়। দুজনকে হতবাক হতে দেখে দোকানদার হেসে বলে ‘ কি দেখতাছেন স্যার ? দ্যাশ স্বাধীন হইছে অগোর লাগি। আপনি আর আমি তো মশা আর মাছি।’ দেশটা কাদের জন্যে স্বাধীন হয়েছে পরিচালক ছোট্ট এই দৃশ্যসহ আরো বেশকিছু দৃশ্যে তুলে ধরেন।

ছবির নায়ক মুক্তিযোদ্ধা মানিকের (সরকার ফিরোজ) প্রেমিকা নীলা (ববিতা), ধনী ঘরের মেয়ে। অন্যদিকে অধ্যক্ষের ছেলে মিজানের সঙ্গে নিলার বাবার (ওবায়দুল হক সরকার) অন্তরঙ্গতা। দেশটা কাদের জন্যে স্বাধীন হয়েছে তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পরিচালক এই দু’জনের সংলাপের মধ্যে দিয়ে বুঝিয়ে দেন

বাবা আদর্শ কাকে বলে ? রোজগার করবো, আরামে থাকবো, তা সে যেভাবেই হোক। তোমার বাবার সঙ্গে এই আদর্শ নিয়ে আমার তর্ক হয়।

মিজান বাবা তো ব্যাকডেটেড মানুষ। তার কথা ছাড়–ন। আমার দরকার টাকা। মানি ক্যান বাই এভিরিথিং।

বাবা এক্সজাকলি, তাহলে আমি যা যা বললাম সব জোগাড় করতে পারবে তো? (অর্থাৎ কালোবাজারীর পণ্য)

মিজান মিজান পারেনা এমন কিছু নেই। (বলে পকেট থেকে ভুয়া মুক্তযোদ্ধার সার্টিফিকেট বের করে) এই দেখুন মুক্তিবাহিনীর সার্টিফিকেট। আরো দেখতে চান ? (পকেট থেকে লাইসেন্সহীন অবৈধ পিস্তল বের করে) — টাকা এখন বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে। ধরতে পারলেই হলো।

ছবির এই মিজান আর নীলার বাবাদের মতো চরিত্ররা বর্তমান বাংলাদেশে কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তা আমরা ডেসটিনি, হলমার্ক এবং শেয়ার বাজারের কেলেঙ্কারীর মতো ঘটনা দিয়ে বুঝতে পারি। ঘুষদুনীর্তি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আদর্শহীনতাই এখন আদর্শ। অধ্যক্ষ যখন তার ছেলের জালিয়াতি, লাম্পট্য ইত্যাদি ধরতে পারলেন, তখন স্থির করলেন, নিজের ছেলে নয়, যাদের পরিচর্যা করলে মানুষ হবে, দেশ গড়তে পারবে, সেই প্রকৃত দেশপ্রেমিক, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের যতেœ লালন করবেন। আমরা দেখি বাইজি বাড়িতে দুই মুক্তিযোদ্ধা গেলে, নর্তকী যখন একজনের গায়ের ওপর ঢলে পড়তে যায় তখন ছেলেটি হুঙ্কার দিয়ে ওঠে – ‘ খবরদার গায়ে হাত দেবেনা। নষ্ট হয়ে গেছি, কিন্তু পঁচে যাইনি’। সত্যিই সেদিনের সেই মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশে নষ্ট হয়ে গেলেও তারা তাদের পঁচন ঠেকাতে পেরেছিলো, যে পঁচন স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর পর আজ আমরা আর ঠেকাতে পারছিনা। বিবেকের তাড়না তখনও সেই যোদ্ধাদের তারিয়ে নিয়ে যেতো। তাই ছিনতাই করা গাড়িতে হিরা, সোনা কোন এক রাতে শহীদ মিনারে যেয়ে বলে – ‘তোরা ভালোই আছিস। আমরা বেঁচে থেকে নষ্ট হয়ে গেছি। তোদের সাথে একসারিতে দাঁড়িয়ে যত কসম খেয়েছিলাম, সব ভেঙ্গে ফেলেছি। আমাদের তোরা ক্ষমা করে দিস।’ ক্ষমা চাইবার মতো যে ঔদার্য সেদিনের সেই যোদ্ধাদের মাঝে ছিলো তার সবই আজ বিলুপ্ত প্রায়। এখন যে যত অন্যায় করে, তার তত সম্মান। কারণ অন্যায়ই আজ ন্যায়। ন্যায়অন্যায়ের এই মিশেল শুরু হয়েছিলো তখন থেকেই । আর আজ মোটা দাগে ন্যায়কে অন্যায়ের স্থানে প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে শুধু।

একটা সমাজে যখন ন্যায়অন্যায়, সত্যমিথ্যা, উচিতঅনুচিত এসব একাকার হয়ে যায় সেখানে তখন নানা ধরণের মিথ তৈরি হতে থাকে। এমনই এক মিথ তৈরি হচ্ছিলো সেদিন থেকে স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনের মিথ। আর মিথ যেখানে থাকে সেখানে সত্যমিথ্যার জাল দ্রুত বিস্তার ঘটায়। সত্যমিথ্যার জাল যত বিস্তৃত হয়, বিশ্বাসঅবিশ্বাসের ভীত তত নড়বড়ে হয়ে ওঠে। তাই পরবর্তীতে দেখা গেলো যে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সমানাধিকারকে সামনে রেখে এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম সংঘঠিত হয়েছিলো তা যেন বিশ্বাসঅবিশ্বাসের দোলায় দুলতে থাকলো। শুধু তাই না, সেই গণতন্ত্র গড়ার নামে আরো রক্তক্ষয় আরো প্রাণহানি ঘটতে থাকলো অব্যাহত গতিতে। যে মৃত্যুসংখ্যার গণনা করা সত্যি আজ দুস্কার। শুধু তাই না, এভাবে সমাজ থেকে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস, আস্থা, শ্রদ্ধা উঠে গেলে একদিন আমাদের গ্যাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘নিঃসঙ্গতার একশত বছর’ এর মতো বলতে হবে – ‘অন্তহীন বৃষ্টিতে জনসাধারণের যে ক্ষয়ক্ষতি হয় তা পূরণ করার জন্যে সামরিক আইন বজায় রাখা হয়, তবে সৈন্যরা ব্যারাকেই থাকে। রাতে টেলিফোনটেলিগ্রাফে আড়িপেতে খবর সংগ্রহ করার পর, রাইফেলের বাটের ঘায়ে দরজা ভেঙে ফেলে, সন্দেহভাজন লোকজনকে টেনে বের করে নিয়ে আসে বিছানা থেকে, তারপর নিয়ে যায় তাদের সেই যাত্রায় যেখান থেকে কেউ কখানো ফিরে আসেনা। নিখোঁজদের খোঁজে কমান্ডান্টের বাড়ির দরজায় ভিড় জমানো আত্মীয়স্বজনদের কাছে সামরিক কর্তৃপক্ষ সেসব খবর অস্বীকার করে, বলে – ‘তোমরা নিশ্চয়াই স্বপ্ন দেখছিলে। মাকোন্দোতে কিছুই ঘটেনি, কখনোই কিছু ঘটেনি, কখানেই কিছু ঘটবে না। এটা একটা সুখী শহর।’ গণতন্ত্র অর্জনের নামে সামরিকবেসামরিক প্রতিটি সরকারের সময়েই হুবোহু একই চিত্র পাই আমরা। যে চিত্র ক্ষুদ্র আকারে শুরু হয়েছিলো স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তা স্ফীত হয়ে আজ এতো বড় আকার ধারণ করেছে। এই গণতন্ত্র, স্বাধীনতাসহ বেঁচে থাকার নূন্যতম অধিকারটুকু পর্যন্ত লুঠ করে নিয়েছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষাসংস্কৃতি, সমাজনীতি তো বটেই এমনকি আমাদের গৃহকোণও আজ নিরাপদ নয়। মিজানকে কঞ্চন খুন করা সত্ত্বেও বঙ্গবাণী কলেজের অধ্যক্ষ পুলিশের কাছে নিজে খুন করেছেন বলে ধরা দেন। ধরা দেন এই আশায় যাতে, পরবর্তী প্রজন্ম দ্বারা আর কোনো অন্যায়, অবিচার সংঘঠিত হতে না পারে। আবার যাতে তারা মানুষ হবার অভিপ্রায় নিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর পর, আমরা কি বলতে পারছি, আমরা আবার উঠে দাঁড়িয়েছি? আবার মানুষ হয়েছি?