Home » আন্তর্জাতিক » ইবোলা প্রতিরোধ না আফ্রিকার তেল লুণ্ঠন পরিকল্পনা

ইবোলা প্রতিরোধ না আফ্রিকার তেল লুণ্ঠন পরিকল্পনা

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ওয়েবসাইট অবলম্বনে

last 2যে কোনো দেশের বিশেষ করে আমেরিকান সামরিক বাহিনী যখন অন্য কোথাও যায়, তার অতি সরল অর্থ হতে পারে, বড় ধরনের কোনো পরিকল্পনার শেষ ধাপ বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে আসল ঘটনাটি আড়াল করা হয় নানা প্রচারপ্রপাগান্ডা আর মিডিয়ার ধূম্রজাল সৃষ্টির মাধ্যমে। তাই যখন শোনা গেল, পশ্চিম আফ্রিকার ইবোলা প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে তিন হাজার সৈন্য পাঠাচ্ছে, তখন ধরে নিতেই হয়, বড় ধরনের কিছু ঘটতে যাচ্ছে। কী হতে পারে সেটা?

তা বিশ্লেষণ করার আগে মার্কিন বাহিনী পাঠানোসংক্রান্ত খবরটির দিকে একটু চোখ বোলানো যাক। নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে মার্কিন প্রশাসন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, পশ্চিম আফ্রিকায় প্রাণঘাতী ভাইরাস ইবোলা প্রতিরোধে আরো কিছু করার প্রবলতর দাবির মুখে প্রেসিডেন্ট ওবামা সেখানে সামরিক ও চিকিৎসা সম্পদ পাঠাচ্ছেন। কেবল আমেরিকা নয়, তার মিত্র পাশ্চাত্যের আরো কয়েকটি দেশও আফ্রিকায় সামরিক বাহিনী পাঠিছেয়েছে বা পাঠাচ্ছে।

ইবোলা মোকাবিলার জন্য ব্যাপক আর্থিক ও স্বাস্থ্য পরিচর্যা সহায়তাই ছিল অপরিহার্য। কিন্তু এর বদলে পাঠানো হচ্ছে সৈনিক। কেন ? বলা হচ্ছে, পাশ্চাত্যের সৈন্যরা জরুরি ভিত্তিতে ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণে সহায়তা করবে। তাদের আরেকটি যুক্তি, ২০১৫ সাল পর্যন্ত ইবোলা আক্রান্ত দেশগুলোকে কঠোর পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। এসব দেশ থেকে ভাইরাসটি যাতে অন্য কোথাও যেতে না পারে সেটা নিশ্চিত করা। পাশ্চাত্যের সামরিক বাহিনী জলেস্থলেঅন্তরীক্ষে টহল দিয়ে বেড়াবে। একটি কাকপক্ষীও যাতে এপাড়ওপাড় হতে না পারে। তাদের মতে, আগামী বছর নাগাদ ইবোলা প্রতিষেধক পাওয়া যাবে। তখন বিধিনিষেধ শিথিল করলেও চলবে। বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তার প্রথম ও একমাত্র আফ্রিকান উপনিবেশ লাইবেরিয়ায় সৈন্য পাঠানো বাবদ আগামী ছয় মাসে ব্যয় করবে ৭৫০ মিলিয়ন ডলার। অপারেশনটি পরিচালনা করবে ইউএস আর্মড ফোর্সেস আফ্রিকা কমান্ড (এএফআরআইসিওএম)

লাইবেরিয়া কিন্তু আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে। এখানেই আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র স্বীকৃত ড্রোন ঘাঁটি রয়েছে। এখান থেকেই ইয়েমেন, সোমালিয়া ও পূর্ব আফ্রিকায় ড্রোন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলে। যুক্তরাষ্ট্র যখন আফ্রিকায় সৈন্য পাঠাচ্ছে, তখন তার একান্ত বশংবদ ব্রিটেন পেছনে থাকবে, তা তো হতে পারে না। ব্রিটেনও সৈন্য পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে, তারা ঘাঁটি গাড়বে সিয়েরা লিয়নে। বিশ্বের অন্যতম হীরক খনিসমৃদ্ধ দেশ সিয়েরা লিয়ন ১৯৬১ সাল পর্যন্ত ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ। আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের প্রেক্ষাপটে এখন সিয়েরা লিয়ন হতে যাচ্ছে বিদেশে ব্রিটেনের বৃহত্তম ঘাঁটি। ব্রিটেন তিন হাজার সৈন্য পাঠাবে। এদের মধ্যে ইবোলা চিকিৎসার জন্য আর্মি মেডিক্যাল স্টাফ থাকবে মাত্র ৯১ জন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, দরিদ্র দেশ কিউবা সৈন্য না পাঠালেও চিকিৎসক পাঠিয়েছে ২৫৬ জন। আর ফ্রান্স সৈন্য পাঠাচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম বক্সাইটসমৃদ্ধ দেশ গিনিতে। জার্মানির অবস্থান হবে সেনেগালে। তারা ১০০ সৈন্য মোতায়েন করবে দেশটিতে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের যে প্রতিবেদনটির কথা আগে উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে যা বলা হয়নি তা হলো, বিশ্বজুড়ে যত নতুন তেলক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, তার এক তৃতীয়াংশ পশ্চিম আফ্রিকায়।

গত মে মাসে বিজনেস ডে পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরের দিকেও নজর দেওয়া যেতে পারে : পশ্চিম আফ্রিকা অঞ্চলে বিশেষ করে নাইজেরিয়ার নাইজার বদ্বীপ অববাহিকা ও গিনি উপসাগরীয় এলাকায় বিশ্বের নতুন তেলক্ষেত্রগুলোর এক তৃতীয়াংশ আবিষ্কৃত হয়েছে। ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে অনুযায়ী পশ্চিম আফ্রিকান উপকূলীয় প্রদেশে আনুমানিক ৩,২০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আছে। ২০০৭ সালে তুলু ওয়েল ঘানার জুবিলি ক্ষেত্রে (মহাদেশটিতে সাম্প্রতিক আবিষ্কৃত ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে বৃহত্তম) তেল পাওয়ার পর পশ্চিম আফ্রিকা উপকূলে তেল অনুসন্ধান ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিয়নে নতুন নতুন তেল ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, গত দশকে মৌরিতানিয়ায় আবিষ্কৃত খনিগুলোতে মজুত বাড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। নাইজার এখন তেল উৎপাদনকারী দেশ, মালি তার দেশে বাণিজ্যিক হাইড্রোকার্বন আবিষ্কারের প্রতীক্ষা করছে।

সিয়েরা লিয়ন, লাইবেরিয়া, গ্যাবন মনে করছে শিগগিরই তাদের দেশে বড় বড় তেলক্ষেত্র আবিষ্কৃত হতে যাচ্ছে। তুলু এখন গিনিতে ভূকম্প সার্ভে চালাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, সেখানে ১০ বিলিয়ন ব্যারেলের মজুত পাওয়া যাবে। সিম্বা নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান অনুসন্ধান চালাচ্ছে গিনি, ঘানা, মালি ও লাইবেরিয়ায়। আইভরি কোস্টে বেশ কয়েকবার সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু তেল পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখেও রাশিয়ার লুকওয়েল সেখানে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে।

এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন, আমরা পূর্ব ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য যে যুদ্ধ দেখছি, পশ্চিম আফ্রিকায় কি তেমন কিছু দেখা যাবে?

আফ্রিকায় যা ঘটছে, তা সত্যিই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিজনেস ডে পত্রিকার ওই একই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে : এখন পূর্ব আফ্রিকার দিকে নজর সরে গেছে। মোজাম্বিক, কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগান্ডার সাম্প্রতিক আবিষ্কার ওই অঞ্চলের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। ওইসব আবিষ্কারের পর সেখানে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে। ২০১২ সালে পূর্ব আফ্রিকায় যে অর্ধ শতাধিক অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে, তাতে বিশ্বজুড়ে অর্ধেক তেল ও গ্যাসের মজুত পাওয়া গেছে।

আর ২০১২ সালে চাইনিজ স্টাডিজ সেন্টার প্রকাশিত পলিসি পেপার চায়নাস রোল ইন দ্য ইস্ট আফ্রিকান ওয়েল অ্যান্ড গ্যাস সেক্টর : এ্য নিউ মডেল অব এনগেজমেন্ট?থেকে জানা যায়, পূর্ব আফ্রিকার তেল ও গ্যাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য চীন কী ধরনের সক্রিয় ও কৌশলগত নীতি অবলম্বন করেছে।

আফ্রিকান সম্পদের গুরুত্ব সম্পর্কে আরো কিছু ধারণা পাওয়া যায় প্যান আফ্রিকান ব্যাংক ইকোব্যাংকের মধ্য আফ্রিকান জ্বালানিবিষয়ক প্রকাশনা থেকে। এর শিরোনাম পশ্চিম আফ্রিকা এলাকায় অনুসন্ধান ২০১৪ সালে ৯ বিলিয়ন ব্যারেলের খোঁজ দিতে পারে?

পলিসি পেপারের শুরুতেই বলা হয়েছে : পশ্চিম আফ্রিকার কম অনুসন্ধান করা দেশগুলো বিশেষ করে গাম্বিয়া, গিনি, গিনিবিসাউ, সেনেগাল, সিয়েরা লিয়ন ও লাইবেরিয়ায় তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো গত চার বছরে ২০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।

এখন কেউ যদি একটি মানচিত্রের ওপর আরেকটি মানচিত্র স্থাপন করে, তবে আনায়াসেই বুঝতে পারবে, পশ্চিম আফ্রিকায় তিন হাজার আমেরিকান সৈন্য পাঠানোর পরিকল্পনাটি আসলে উপকূলীয় তেল সম্পদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য, ইবোলা মোকাবিলা স্রেফ আসল পরিকল্পনা গোপন করার একটা মাধ্যম।

সব মহাপরিকল্পনা ও কৌশলের মতো এখানেও কার্যসিদ্ধির ব্যবস্থা করা হয়েছে কয়েকটি ধাপে। এমন একটা ধারণা প্রচলিত আছে এবং বেশ দৃঢ় প্রমাণও রয়েছে বলে অনেকে দাবি করছেন যে, ইবোলা ভাইরাস তৈরি ও বিস্তৃতি ঘটানো হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। আগের মহামারীগুলোর পরিণতি বিশ্লেষণ করে আনায়াসেই বলা যায়, এবার এটি করা হচ্ছে বৈশ্বিক ইক্যুইটি মার্কেট বন্ধ করে দেওয়া এবং পশ্চিম ও পূর্ব আফ্রিকাজুড়ে কৌশলী সামরিক শাসন জারির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। এটা নিশ্চিতভাবেই বহুধাপ বিশিষ্ট নতুন আর্থিক ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার ব্যবস্থা করবে। তাছাড়া ব্যর্থ পুরনো ব্যবস্থার স্থানে নতুন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য জনসাধারণ যে আন্দোলন করছে, সেটাও অকার্যকর করে দিতে পারে এই ইবোলা। অর্থাৎ যে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল, ইবোলাজনিত কারণে সেটা অত্যন্ত মন্থর হয়ে পরার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

ইউক্রেন ও ইরাকে প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে ছায়া যুদ্ধ চলছে। এখন পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে একই যুদ্ধ আরেকটি ফ্রন্টে শুরু হলো বলে ধরে নেওয়া যায়।

তবে যদি যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম আফ্রিকান ক্ষেত্রগুলো এবং চীনা নিয়ন্ত্রিত পূর্ব আফ্রিকান ক্ষেত্রগুলো শেষ পর্যন্ত মধ্য আফ্রিকায় মুখোমুখি হয়, তবে কী হবে? তখন যে যুদ্ধ হবে, তার স্বরূপ কেমন হবে? তখন হয়তো লাইবেরিয়ার মতো উত্তর আফ্রিকার দেশ আরো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে, যা এত দিন বোঝা যায়নি।।