Home » শিল্প-সংস্কৃতি » ১৩তম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব

১৩তম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব

ফ্লোরা সরকার

last 5১৯৮৮ সাল থেকে এদেশে আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের যে যাত্রা শুরু হয়েছিলো, তার ১৩তম উৎসব শুরু হয়েছে গত ৪ ডিসেম্বর থেকে। উৎসব চলবে আগামী ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। আগে যা ছিলো শুধু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব, এবার তার নাম কিছুটা দীর্ঘ করে রাখা হয়েছে স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব। উৎসবের স্লোগানও রাখা হয়েছে মুক্ত চলচ্চিত্র, মুক্ত প্রকাশ। স্লোগান যাই থাক না কেনো, এসব চলচ্চিত্র কতটা মুক্ত এবং প্রকাশিত তা অনেকটাই নির্ভর করে, আয়োজকদের উপর। অর্থাৎ শর্ট ফিল্ম ফোরামের সদস্যদের যাচাইবাছাইয়ের উপর। এবারের উৎসবে প্রায় ৫০টা দেশের ছবির কথা থাকলেও তাদের লিখিত সিডিউলে ৩২টা দেশের নাম পাওয়া যায়, যার মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, শ্রীলঙ্কা, জার্মানির মতো নিয়মিত দেশের ছবি ছাড়াও ইউক্রেন, আজারবাইজান, ইরাক,ক্রোশিয়া,আর্মেনিয়ার মতো অনিয়মিত দেশসহ প্রায় দুইশ ছবি স্থান পায়। উদ্বোধনী দিনে ইরাকের বাগদাদ মেসি, আর্জেন্টিনার ফাদার, বাংলাদেশের পেশেন্স এবং রাশিয়ার দা উডেন হর্স দেখানো হয়। তাছাড়া যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত প্রামান্য নির্মাতা কিম লংগিনট্টোর রেট্রোসপেকটিভ উপলক্ষে তার সাতটি ছবি প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়। উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে রাখা হয়েছে, শ্রীলঙ্কার প্রখ্যাত উদীয়মান পরিচালক প্রসন্ন ভিথানা এবং ভারতের শক্তিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা শ্যাম বেনেগালের উপস্থিতি এবং তাদের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের আয়োজন। উৎসবের নানা ছবি নিয়ে আমাদের এবারের বুধবারের আয়োজন।

বিদায় অভিনেতা খলিল

বাংলাদেশের শক্তিমান অভিনেতা খলিল উল্লাহ খান গত ৭ ডিসেম্বর, সকাল ১০টায় স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। বিদায় নেন অগনিত দর্শক, পরিবারের প্রিয়জন ও আত্মীয়স্বজন এবং রূপালী পর্দা থেকে। পারিবারিক নাম খলিলউল্লাহ খান খলিল। জন্ম ১৯৩৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, ভারতের মেদিনীপুরে। তার বাবা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। একই বিভাগে চাকরি করার আগ্রহ থাকলেও, স্কুলজীবনেই অভিনয়ের প্রতি তার আগ্রহ গড়ে উঠে। কলিম শরাফী ও জহির রায়হান নির্মিত সোনার কাজল ছবিতে নায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রে প্রথম পদর্পণ করেন। তারপর বেশকিছু ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেও, এস.এম. পারভেজের বেগানা ছবিতে খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয়ের পর, দর্শক তাকে সেভাবেই গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে একের পর এক খলনায়কের চরিত্রেই অভিনয় করেন। প্রায় ৩০০ ছবিতে তিনি অভিনয় করেন এবং সার্থক তার অভিনয় জীবন। একজন দক্ষ অভিনেতা, যেকোনো চরিত্রে রূপ দিতে পারেন। খলিল ছিলেন সেই মাপের অভিনেতা। ছবিতে যেমন তাকে আমরা পাই, পরবর্তীতে টিভি নাটকেও সেভাবে পাই। আবদুল্লাহ আল মামুনের সংশপ্তক নাটকটি যারা দেখেছেন, তারা কখনোই তার অভিনয় ভুলতে পারবেন না। অভিনয়ের পাশাপাশি ছবি প্রযোজনা, এফডিসির শিল্পী সমিতির সভাপতি হিসেবেও কাজ করেন এবং সেই সময়ে শিল্পীদের কল্যাণমূলক অনেক কাজ করেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার সহ নানা পুরস্কারে তিনি ভূষিত হন। মহান এই শিল্পী আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও রেখে গেছেন, তার অগনিত ছবি। অভিনেতা খলিল, তার সেসব অভিনীত ছবির মাধ্যমে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন চিরদিন।

এবারের উৎসবে বিদেশী ছবির পাশাপাশি বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতাদের হাত ধরে বেশকিছু ভালো ছবি আমরা দেখতে পেয়েছি। এর মাঝে, ভিন্ন যে ব্যতিক্রম আমরা লক্ষ্য করি তা হলো, প্রথম বারের মতো একজন রাখাইন পরিচালক অং রাখাইনের ছবি আমার সাইকেল বা মাই বাইকেল নামে কাহিনী নির্ভর ছবি। তরুণ এই নির্মাতা প্রথম ছবি হিসেবে বেশ ভালো কাজ দেখিয়েছেন। খুব সাধারণ একটা গল্প নিয়ে তার ছবি। একজন সদ্য চাকরিচ্যুত গার্মেন্স কর্মী একটা সাইকেল কিনে গ্রামে ফিরে আসে। এই সাইকেল ঘিরে ছবির গল্প আবর্তিত। রাঙামাটির এমন এক গ্রাম বেছে নেয়া হয়েছে, যেখানে কোনো যানবাহন নেই। পায়ে চলার পথে মানুষজন তাদের নিত্যদিনের কাজ সম্পন্ন করে। শুরুতে এই বেকার যুবক, ছবির নায়ক, তার সাইকেলে চড়িয়ে গ্রামের মানুষদের বাজারে পৌঁছে দেয়ার সৌখিনতা করলেও, শেষে তার এই সাইকেলই তার জীবিকা অর্জনের একটা উপায় হয়ে দাঁড়ায়। ছবির শেষে আমরা দেখতে পাই, কোনো এক হিংসার বশবর্তী হয়ে তার সাইকেলটি কেউ ভেঙে দেয় এবং সাইকেল মেরামতের জন্যে তাকে আবার এক সংগ্রামে নিয়োজিত হতে হয়। ছবির সব থেকে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো, গল্পের স্বাভাবিকতা বজায় রাখা। কাহিনী যেন তার সরল সাবলীল গতিতে এগিয়ে যায়। গল্পের শুরুতে দেখা যায়, বেকার যুবকটির বউ তার স্বামীর বেকারত্বের জন্যে সব রাগ গিয়ে যেন পড়ে সাইকেলের উপর। আবার এই সাইকেল যখন জীবিকা অর্জনের বাহন হয়ে দাঁড়ায়, বউ তখন সাইকেলের বিশেষ যত্ন নিতে শুরু করে। একজন গ্রামবাসীকে, যুবকটি একদিন তার ভাড়া করা সাইকেলে বাড়ি পৌঁছে দেয়ার সময় সাইকেলসহ পড়ে যায়। লোকটির পা ভেঙে গেলে, সালিশ বসে বিচারের জন্যে। বিচারের রায়ে বলা হয়, এখন থেকে সেই যুবক কোনো মানুষকে তার সাইকেলের বাহন করতে পারবেনা, শুধু জিনিসপত্র ভাড়া করে নিয়ে যেতে পারবে। এখানেও আমরা দেখি কোনো কঠিন শাস্তি তা আর দেয়া হয় না, আবার শাস্তি মওকুফও করা হয়না। ছবির সব ঘটনাই এরকম এগিয়ে যায়। তাছাড়া ছবির ডিটেইলের প্রতি পরিচালকের সতর্ক দৃষ্টি আমরা দেখতে পাই। বেকার যুবকটি যখন সাইকেলে করে কোথাও যায়, গ্রামের ছোট ছোট শিশুরা সাইকেলের পিছু পিছু ছোটে। গ্রামের বাউন্ডেলে যুবকেরা তার সাইকেলের ভাড়া করা টাকার প্রতি নজর দেয়, টাকা দাবী করে। যখন সাইকেলে করে যুবক তার ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দেয়, শিশুরা অবাক বিস্ময়ে যন্ত্রটির দিকে তাকিয়ে থাকে। কোনো অঘটন ঘটার নিদর্শন হিসেবে দৃশ্যের শুরুতে ওয়াইড অ্যাঙ্গেলের ব্যবহার যেন এক ভিন্ন মাত্রা এনে দেয় ছবিতে। অভিনয় শিল্পীদের মাঝে অতি অভিনয় বা কম অভিনয় করতে দেখা যায় না। গ্রামের মানুষজন ঠিক যেভাবে কথাবার্তা, চলাফেরা করে ঠিক সেভাবেই তারা নিজেদের উপস্থাপন করে। ছবির শেষ দৃশ্যটি ছিলো সব থেকে চমৎকার। তবে পরিচালক দৃশ্যটি বেশি টেনে না নিয়ে গেলে ভালো করতেন। সাইকেলটা ভেঙে যাবার পর, নৌকায় যখন সেটা নিয়ে যাওয়া হয়, বিপরীত দিক থেকে আরেকটা নৌকায় মোটরসাইকেল নিয়ে আসতে দেখা যায়। অর্থাৎ অযান্ত্রিক যানের স্থান দখল করতে আসছে যন্ত্রচালিত যান। ঠিক এখানটায় ছবিটা শেষ হলে আরো অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতো। কিন্তু তারপরেও আমরা দেখি ব্যথাতুর যুবক সাইকেলের জন্য শোক করতে। বেশ অনেক ক্ষন যাবার পর ছবিটি শেষ হয়। তাছাড়া, ছবির শব্দ সংযোজনের প্রতি পরিচালক আরেকটু যত্নশীল হলে ভালো করতেন। তবু সব মিলিয়ে, অং রাখাইন নির্মিত প্রথম ছবি দেখতে ভিন্ন এক স্বাদ এবং ভালো লাগা কাজ করেছে।

ফারজানা ববির বিষকাঁটা প্রামাণ্যচিত্রটিও বেশ ভালো হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত বিরাঙ্গনাদের নিয়ে নির্মিত ছবিটিতে, অনেক বাস্তব সত্য তুলে আনা হয়েছে। সাহসী এই নারীরা এই প্রথম ক্যামেরার সামনে নিজেদের তুলে ধরে অন্যান্য নারীদেরকেও সাহসী করেছেন। চৈতালী সমদ্দারের, পাঁচ মিটিনের স্বল্পদৈর্ঘ্য পেশেনস্ ছবিটি দর্শককে বেশ চমকে দেয়। একজন জুতাপালিশওয়ালার দৃষ্টিকোন থেকে, মাত্র একটা শটে নির্মিত এক্সপেরিমেন্টাল ছবিটি আমাদের যেন অভিভূত করে। দর্শক যখন ধৈর্যহারা হয়ে পড়ে, ঠিক তখনই তারা বুঝতে পারে ঘটনা কি ঘটেছে। ইরানের নির্মাতা আলী আজগারির মোর দ্যান টু আওয়ার ছবিটি ইরানের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ব্যবস্থার প্রতি যেন কটাক্ষ করে। আগামী পর্বে আমরা এই ছবি সহ আরো ছবির আলোচনা নিয়ে আসবো।।

(চলবে…)