Home » বিশেষ নিবন্ধ » উত্তাল ষাটের দশক (সপ্তদশ পর্ব)

উত্তাল ষাটের দশক (সপ্তদশ পর্ব)

মার্শাল ল’র মধ্যেও ব্যাপক শ্রমিক আন্দোলন

হায়দার আকবর খান রনো

last 4শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির পরও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। যদিও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য তিনি জনগণকে বার বার আহ্বান জানিয়েছিলেন। আন্দোলনও থেমে থাকেনি, বরং অন্যদিকে মোড় নিয়েছিল।

এতদিন পর্যন্ত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অথবা রাজনৈতিক দলের ডাকা কর্মসূচিতে শ্রমিক শ্রেণী অংশ নিয়েছেন। শ্রমিক শ্রেণীর ব্যাপক অংশগ্রহণের কারণেই ১৯৬৭ সালের ৭ জুনের হরতাল অভূতপূর্ব সফল হয়েছিল। ভাসানীর ডাকা ১৯৬৮ সালের ৭ ও ৮ ডিসেম্বরের হরতালেও শ্রমিক জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিলেন। তাই হরতাল এতো সফল হয়েছিল। শ্রমিক শ্রেণীর ব্যাপক অংশগ্রহণের কারণেই তো ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকা ২৪ জানুয়ারির (১৯৬৯) হরতাল অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল।

কিন্তু এই পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণী নিজস্ব দাবি কখনই সামনে আসেনি ১৯৬৯এর ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শ্রমিক শ্রেণী নিজস্ব দাবি নিয়ে সংগ্রামের মাঠে নামলেন। এর শুরুটা হয়েছিল টঙ্গী শিল্পাঞ্চল থেকে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে। এক বিকেলে টঙ্গীর মিল বাজারে অবস্থিত অলিম্পিয়া টেক্সটাইল মিলের শ্রমিকরা মিল কর্তৃপক্ষকে অফিসের মধ্যে ঘেরাও করে চাকুরিচ্যুত শ্রমিক নেতাদের চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি জানালেন। তখন কাজী জাফর আহমদ ও আমি টঙ্গীতে শ্রমিক আন্দোলন করতাম। ঠিক ওই সময় আমরা দুজনেই টঙ্গীর মিল বাজারে অবস্থান করছিলাম। খবর পেয়ে আমরা অলিম্পিয়া মিলের ভেতরে ঢুকলাম। এই প্রথম আমরা টঙ্গীর কোন মিলের ভেতরে ঢোকার সুযোগ পেলাম। আর আগে মিল কর্তৃপক্ষ ও তাদের পাহারাদাররা আমাদেরকে কখনই মিলের ভেতরে ঢোকার অধিকার দেয়নি। এমনকি আমাদের শ্রমিক ফেডারেশন অথবা শ্রমিকদের সত্যিকারের ইউনিয়নকে স্বীকৃতি দিতে চায়নি। ঠিক এখন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে যে ধরনের অবস্থা বিরাজ করছে তখন টেক্সটাইল কারখানাতেও একই ধরনের পরিস্থিতি ছিল। মালিকরা ট্রেড ইউনিয়নকে স্বীকার করতে চাইতো না। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি একেবারে বদলে গিয়েছিল। দেশের প্রশাসন সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়েছে। থানার পুলিশও শ্রমিকের বিরুদ্ধে কোন এ্যাকশন নিতে ভয় পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মিল মালিকরা অসহায় বোধ করছিল।

এখানে উল্লেখ্য যে, পূর্ব পাকিস্তানে যখন গণঅভ্যুত্থান চলছে, তখন পশ্চিম পাকিস্তানেও কোনো কোনো শিল্প এলাকায় শ্রমিক আন্দোলনেও বেশ তীব্র হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তখনকার পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে কোন যোগাযোগ ছিল না।

যে কথা বলছিলাম। টঙ্গীর অলিম্পিয়া টেক্সটাইল মিল থেকে ঘেরাও আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। প্রথমে চাকুরিচ্যুতদের চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি দিয়ে শুরু হলেও পরে তার সাথে বেতন বৃদ্ধি ও অন্যান্য দাবিও যুক্ত করা হয়েছিল। মিল ম্যানেজার ও মালিকের পক্ষ থেকে অন্যান্য যারা ছিলেন, তারা তৎক্ষণাৎ দাবি মেনে নিলেন। অথবা বলা ভালো, মেনে নিতে বাধ্য হলেন। শ্রমিক প্রতিনিধি ও মিল কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। তখনকার দিনে এই ধরনের চুক্তি ইংরেজিতে লেখার নিয়ম ছিল। তাই লিখিত চুক্তির ব্যাপারে কাজী জাফর আহমদ ও আমি সাহায্য করেছিলাম। পরদিন সকালে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে মিল কর্তৃপক্ষ বর্ধিত বেতন পরিশোধ করেছিল। বাস্তবে মিলের প্রশাসনও তখন শ্রমিকদের হাতে চলে এসেছিল। কারখানায় তারা লাল পাতাক উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে একথা বলা দরকার যে, অলিম্পিয়ার শ্রমিকরা প্রথমে নিজেরাই এই ঘেরাও শুরু করেছিলেন। পরে তারা আমাদেরকে (কাজী জাফর ও আমাকে) অবহিত করেছিলেন। এই আন্দোলনকে ঘেরাও আন্দোলন বলা হলেও বাস্তবে এটা ছিল এক ধরনের ‘ওকুপাই ফ্যাক্টরি’ আন্দোলন।

ঘেরাও আন্দোলনের মাধ্যমে যে সকল চুক্তি (প্রথমে অলিম্পিয়া টেক্সটাইল মিলে, পরে অন্যান্য মিলে) স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার বিস্তারিত বিবরণ এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। সবটা আমার মনেও নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তিনটি বিষয়। এক. মজুরি বৃদ্ধি, দুই. মাসের বেতনের সমান বার্ষিক বোনাস, . ট্রেড ইউনিয়ন করার কারণে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত শ্রমিক নেতাদের চাকরিতে পুনর্বহাল।

কারা কারা ট্রেড ইউনিয়ন করার কারণে চাকরিচ্যুত হয়েছেন তার তালিকাও শ্রমিকরা তৈরি করেছিলেন। মালিকরা বিনা বাক্যব্যায়ে তাদের সকলকে পুনর্বহাল করেছিল। এমনকি অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত হওয়ার জন্য চাকরিবিহীন সময়ের বকেয়া বেতনও মালিক পরিশোধ করতে বাধ্য হয়েছিল। এ যেন শ্রমিকদের জয় জয়কার।

তখন টেক্সটাইল সেক্টরে নিম্নতম মজুরি ছিল মাসিক ৭২ টাকা মাত্র। আমরা বললাম, নিম্নতম মাসিক মজুরি হবে ১২৭ টাকা। মালিকরা তাতেই রাজি হল। বস্তুত রাজি না হয়ে আর কোনো উপায়ও তাদের ছিল না। তখন থেকে মিলের প্রশাসন শ্রমিকদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল। ১৯৬৯এর ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৭১এর ২৫ মার্চ পর্যন্ত টঙ্গীর শিল্প এলাকা আমাদের অর্থাৎ বাংলা শ্রমিক ফেডারেশন তথা কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটির নিয়ন্ত্রণে ছিল। অনুরূপভাবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্প এলাকাও আবুল বাশারের নেতৃত্বাধীন ফেডারেশনের তথা পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণে ছিল।

তখন বেশির ভাগ শিল্প কলকারখানার মালিক ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী। উত্তাল গণআন্দোলনের মুখে তারা অসহায় বোধ করছিল। আমাদের দেশের ইতিহাসে শ্রমিকদের জন্য এতো চমৎকার পরিস্থিতি আর কখনো আসেনি। সেদিন শিল্প এলাকায় যেন শ্রমিক শ্রেণীর রাজত্ব কায়েম হয়েছিল।

ঘেরাও আন্দোলন অলিম্পিয়া থেকে শুরু হলেও তা দ্রুত অন্যান্য কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। টঙ্গীর বাইরেও বিভিন্ন এলাকায় ছড়াতে থাকে। ঘেরাও করা যেন একটা হিড়িকে পরিণত হলো। টঙ্গীর আশপাশের এলাকার শ্রমিকরাও ম্যানেজমেন্টের লোকদের ঘরে আটক করে ছুটে আসতো টঙ্গীতে। আমাদেরকে সেখানে যাবার জন্য আহ্বান জানাতো। কাজী জাফর আহমদ অথবা আমি সেই সব জায়গায় যেতাম। টঙ্গীর পদ্ধতিতে মালিককে বাধ্য করা হতো চুক্তি স্বাক্ষর করাতে। অবস্থা এমন দাড়িয়েছিল যে, আমাদের দুজনের যেন মুখ ধোয়াখাওয়ারও সময় ছিল না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটার পর একটা মিলে ঘেরাও চলছে। টঙ্গীর খবর দূরদূরান্তে পৌছে গিয়েছিল। সেখান থেকেও শ্রমিক প্রতিনিধি আসতেন টঙ্গীতে। আমরা সব জায়গায় বিশেষ করে দূর এলাকায় যেতে পারতাম না। তবে ইংরেজিতে টাইপ করা ঘেরাও চুক্তির একটা কপি দিয়ে দিতাম এবং টঙ্গীর অভিজ্ঞতা বলতাম।

এভাবে ঘেরাও আন্দোলন চললো কয়েকদিন ধরে। চারিদিকে এ যেন শ্রমিক শ্রেণীর বিজয় উৎসব চলছে। পরবর্তী মার্চ মাসে শ্রমিকরা চুক্তি মোতাবেক বর্ধিত হারেই বেতন ভাতা পেয়েছিল। এমনকি তার পরেও সামরিক শাসন ঘেরাও চুক্তিকে অস্বীকার করতে পারেনি। ১৯৬৯ সালের ঘেরাও আন্দোলন শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

সেই সময় যে স্বল্পসংখ্যক বাঙ্গালী মালিক ছিল, তারাও কিন্তু ঘেরাও আন্দোলনের ভয়ে ভীত হয়ে উঠেছিল। এই প্রসঙ্গে আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলার লোভ সংবরন করতে পারছিল না।

টঙ্গী এলাকায় অবস্থিত জনৈক বাঙ্গালী মালিকের কারখানা। ঢাকা ডাইং ফ্যাক্টরি। তখন ঘেরাও আন্দোলন প্রায় সকল কারখানাকে স্পর্শ করেছিল। ঢাকা ডাইংএর শ্রমিকরা তাদের বাঙ্গালী মালিককে ঘেরাও করে তার সামনে একটা চুক্তিপত্রের কপি তুলে ধরে বললেন, ‘স্বাক্ষর করুন।’ ইংরেজিতে টাইপ করা চুক্তি পত্রের কপি তারা আগেই সংগ্রহ করেছিলেন। মালিক কিছুতেই সই করতে রাজি না।

সেদিন সকাল বেলা। আমি ছিলাম মিল বাজারে। ঢাকা ডাইং ফ্যাক্টরি থেকে বেশ দূরে। সেই কারখানার কয়েকজন শ্রমিক আমার কাছে এলেন। তারা বললেন, তারা মালিককে ঘেরাও করে তারই অফিস রুমে আটক করে রেখেছেন। কিন্তু বেয়াড়া মালিক কিছুতেই চুক্তিতে সই করবে না। আমি রিকশা করে ঢাকা ডাইং কারখানায় গেলাম। (তখন আমাদের কারোরই গাড়ি ছিল না)। উক্ত মালিক আমার পূর্ব পরিচিত। তিনি আমাকে দেখে অভিযোগের সুরে বললেন, ‘ওরা আমাকে আটকে রেখেছে, পানিও খেতে দেয়নি, ফোনও করতে দিচ্ছে না।’ আমি বললাম, ‘পানি খেতে পারবেন। শ্রমিক শ্রেণী মালিক শ্রেণীর মতো অমানবিক নয়। ফোনও করতে পারবেন। এমনকি বাইরেও যেতে পারবেন। তবে তার আগে চুক্তিতে সই করুন। এখন ব্যাংক খোলা আছে, চুক্তি মোতাবেক বর্ধিত বেতনবোনাস পরিশোধ করুন।’

এরপর তিনি আমার অনুমতি নিয়ে একটা ফোন করলেন। যাকে ফোন করেছিলেন তিনি আমার বন্ধু। পেশায় আর্কিটেক্ট। প্রগতিশীল ব্যক্তি। তখন ন্যাপ (মোজাফফর) করতেন। মিল মালিক আমাকে সেই ভদ্রলোকের সাথে ফোন লাগিয়ে দিলেন। আমার পিতার বন্ধু সেই ভদ্রলোক আমাকে ফোনে বললেন, ‘দেখ বাবা, এই মিলের মালিক একজন বাঙ্গালী উদ্যোক্তা। অনেক কষ্ট করে পশ্চিমাদের সাথে লড়াই করে মিলটি দাড় করিয়েছেন। তোমরা একটু দেখো।’ আমি তার প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলেছিলাম, ‘আপনি যখন বলছেন, তখন আমি মেনে নিচ্ছি, ভদ্রলোক অনেক কষ্ট করে মিলটা দাড় করিয়েছেন। কিন্তু কারখানার শ্রমিকরাই তো কষ্ট করে তার জন্য মুনাফা তৈরি করে দিচ্ছেন। আমরা তো এই মুহূর্তে মিলের মালিকানা দাবি করছি না। এখন যেটা ন্যায্য মজুরি বলে মনে করছি, সেটাই দাবি করছি।’

যাই হোক, বাঙ্গালী মালিক ভদ্রলোক কিছুতেই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে রাজি হলেন না। অবশেষে আমি বলতে বাধ্য হলাম, ‘তাহলে ঘরে আটকে থাকুন। আপনাকে পানি এবং খাবার সরবরাহ করা হবে। মনে রাখবেন, শ্রমিকরা পুজিপতি মালিকদের মতো অমানবিক নয়। তবে ফোন করতে পারবেন না। আর যখন চুক্তি সই করতে সম্মত হবেন, তখন কাউকে দিয়ে আমাকে খবর দেবেন।’ এখন ভাবতে হাসি পায়। দশ মিনিটও যায়নি। তিনি খবর পাঠালেন, চুক্তিতে সই করতে এবং এখনি শ্রমিকের বর্ধিত বেতন মিটিয়ে দিতে রাজি হয়েছেন।

ঘেরাও আন্দোলন এক রকম জবরদস্তির বিষয় বৈকি। কিন্তু পুজিপতি যে শ্রমিক শোষণ করে তাও তো পুলিশ, মিলিটারি ও রাষ্ট্রের জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থার কারণেই করতে পারে। ঘেরাওর ব্যাপারটি শ্রমিকদের আন্দোলনের একটি কৌশল, তাদের নিজস্ব উদ্ভাবন ছিল।

ফেব্রুয়ারির পর মার্চ মাস এলো। মার্চ মাসেও মালিকরা ঘেরাও চুক্তি মোতাবেক বর্ধিত বেতন ও অন্যান্য শর্ত মেনে চলেছিল। বাঙ্গালীঅবাঙ্গালী সকল মালিকই।

১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ সামরিক শাসন জারি হল। ইয়াহিয়া খান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও প্রেসিডেন্ট হলেন। ক্ষমতায় বসার সাথে সাথেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, ঘেরাওর মাধ্যমে জবরদস্তিমূলকভাবে চাপ দিয়ে শ্রমিকরা যে সকল অর্থনৈতিক দাবি আদায় করেছে, মালিকদের তা মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ ঘেরাও চুক্তি আইন সঙ্গত হয়ে গেল। কোন সামরিক বা বেসামরিক সরকার যে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তা এখন ভাবতেও অবাক লাগে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল যে, সরকারের পক্ষে তা না মেনেও উপায় ছিল না। একেই বলে বিপ্লবী পরিস্থিতি।

সামরিক শাসন জারি হলেও কলকারখখানায় শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়নি। সামরিক শাসনে সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ হলেও বিভিন্ন শ্রমিক এলাকায় শ্রমিকরা তা মেনে চলছিলেন না। পাকিস্তানি মালিকরা আশা করেছিল, মার্শাল ল’ তাদের উদ্ধার করবে। কিন্তু সামরিক সরকার দুই এক জায়গায় কঠোর হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল। বাঙ্গালী মালিকরা আশা করেছিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্তত বাঙ্গালী বুর্জোয়াদের বাচাবেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানালেও বিশেষ কোন পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী ছিলেন না।

অল্পদিন পর ইয়াহিয়া সরকারের মন্ত্রী নূর খান নতুন শ্রম আইন ঘোষণা করলেন। নূর খানের শ্রম আইন (১৯৬৯এর আইআরও অথবা স্ট্যাডিং অর্ডার) এ যাবতকালের সবচেয়ে ভালো শ্রম আইন ছিল (যদিও সেই আইনও ত্রুটিমুক্ত নয়)। বিশাল অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক সরকার শ্রমিকদের খুশি করতে চেয়েছিল। নূর খান পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নিম্নতম মজুরি ঘোষণা করলেন, মাসিক ১২৫ টাকা। এর নিচে কোন শ্রমিককে কেউ মজুরি দিতে পারবে না। এটা সামরিক সরকারের ঘোষণা। পাঠক লক্ষ্য করুন এর আগে শ্রমিকরা ঘেরাও করে যে নিম্নতম মজুরি আদায় করেছিল তা ছিল মাসিক ১২৭ টাকা। শ্রমিকরা দুই টাকার ব্যবধান মেনে নিলেন। বস্তুত সামরিক সরকারের এই ঘোষণা ছিল একভাবে ঘেরাও আন্দোলনেরই স্বীকৃতি।

এবার মালিকরা অন্য রকম ষড়যন্ত্র আরম্ভ করলো। তারা বললো, বেশ নিম্নতম মজুরি ১২৫ টাকা দেব। কিন্তু উচ্চতর আয়ের শ্রমিকদেরও এর বেশি দেব না। বড়জোর এক দুই টাকা বেশি দেবো। শ্রমিকরা বললেন, সকলকে ‘ফ্ল্যাটরেটে’ ৫৫ টাকা বেশি দিতে হবে। এই সমস্যা এবং পিসরেট শ্রমিকের মজুরির বিষয় নিয়ে নতুন সমস্যা দেখা দিল (এই বিষয়টি একটু জটিল বিধায় তা ব্যাখ্যা করা হচ্ছে না)। মালিকরা কিছুতেই সকলের জন্য ৫৫ টাকা মজুরি বৃদ্ধি করতে রাজি হলো না। তাছাড়া নূর খানের ঘোষণায় বোনাস সম্পর্কে কিছু বলা ছিল না। মালিকরা ঘেরাও চুক্তি মোতাবেক দুটি বোনাস দিতে রাজি হলো না।

এবারও টঙ্গীর শ্রমিকরা পথ দেখালেন। প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য ৫৫ টাকা মাসিক মজুরি বৃদ্ধি এবং দুই মাসের বেতনের সমান বাৎসরিক বোনাসের দাবিতে শ্রমিকরা নতুন আন্দোলন শুরু করলেন। এবং সামরিক শাসনের মধ্যেই। লেবার ডিরেক্টরের মাধ্যমে শুরু হল আলোচনা। সাধারণত শ্রমিক পক্ষকে প্রতিনিধিত্ব করতাম কাজী জাফর আহমদ ও আমি। অন্যদিকে মালিক পক্ষকে প্রতিনিধিত্ব করতেন হানিফ আদমজী ও অন্যান্য পশ্চিম পাকিস্তানি মিল মালিকরা। এক পর্যায়ে আলোচনা ভেঙ্গে গেল। কিছুদিন আগে যে মালিকরা অভ্যুত্থানের মুখে একেবারে নির্জীব প্রাণীতে পরিণত হয়েছিল এবার তারা মার্শাল ল’র জোরে পুরনো চেহারায় ফিরে এসেছে।

এক পর্যায়ে টঙ্গীর শ্রমিকরা সিদ্ধান্ত নিলেন ৫৫ টাকা হারে বর্ধিত বেতন না নিলে তারা বেতনই নেবেন না। সারা টঙ্গীতে বেতন নেয়া বন্ধ হয়ে গেল। তারপর শুরু হলো ‘প্রোডাকশন স্লো’ কৌশল। শ্রমিকরা আট ঘন্টা কাজ করছেন ঠিকই কিন্তু খুব ধীরগতিতে। এদিকে মালিকের অন্যান্য খরচ ঠিকই থাকছে। কিন্তু উৎপাদন একচতুর্থাংশে নেমে এসেছে। আমাদের দেশের আইনে প্রোডাকশন স্লো ডাউন (ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরে গতিতে কাজ করা) দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু আমরা যুক্তি দিলাম যেহেতু শ্রমিকরা বেতন নিচ্ছেন না, সেহেতু তারা ভালোভাবে খেতেও পারছেন না, অতএব গায়ের শক্তি কম। তাই উৎপাদনও কম হচ্ছে।

প্রোডাকশন স্লোডাউন কৌশল মালিকদের পাগল বানিয়ে দিল। তারা মার্শাল ল’ কর্তৃৃপক্ষের কাছে ধরনা দিতে লাগল। কিছু একটা করুন। একদিন ঢাকা জেলা মার্শাল ল’ প্রশাসক লে. কর্নেল আকাববার হোসেন (তিনি পশ্চিম পাকিস্তানী পাঠান অথবা পাঞ্জাবী) কয়েকজন সৈনিক (তারাও পশ্চিম পাকিস্তানী) সাথে নিয়ে সোজা চলে এলেন আদমজী মিল, মেঘনা টেক্সটাইল মিলে। চারজন শ্রমিককে কর্নেল গ্রেফতার করলেন। সাথে সাথে মেঘনার শ্রমিকরা যা করলেন, তা ছিল বিস্ময়কর ও অভূতপূর্ব। শ্রমিকরা সৈনিকসহ কর্নেল আকাববর হোসেনকেই ঘরের মধ্যে আটকে টেলিফোন লাইন কেটে দিলেন। অর্থাৎ সামরিক প্রশাসক নিজেই গ্রেফতার হলেন শ্রমিকদের হাতে।

এই ঘটনাটি ঘটেছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে। ঘটনাটি যখন ঘটে তখন কাজী জাফর আহমদ ও আমি ছিলাম কিছুটা দূরে মিলবাজারে। কাজী জাফর দ্রুত ছুটে গেলেন মেঘনায় কর্নেল সাহেবের সাথে কথা বলতে। হঠাৎ করে সংঘর্ষে তো যাওয়া যায় না। কোনো একটা সমঝোতায় তো আসতে হবে। ঠিক হলো কাজী জাফর কথা বলবেন কর্নেলের সাথে। আর আমি টঙ্গীর অন্যান্য কারখানায় দ্রুত খবর দিয়ে সকল কারখানায় তাৎক্ষণিক ধর্মঘটের ব্যবস্থা করলাম। ধর্মঘট করে পুরো এলাকার কয়েক হাজার শ্রমিক জড়ো হলেন মেঘনার গেটে।

ঢাকা জেলা সামরিক প্রশাসক সম্ভবত পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছেন। আমরা কর্নেলকে আটক অবস্থা থেকে মুক্ত করলাম। অন্যদিকে কর্নেলও প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন যে, টঙ্গীতে আর কোনো শ্রমিককে গ্রেফতার করা হবে না। আর তিনি আমাদেরকে দিয়ে প্রতিশ্রুতি আদায় করালেন যে, আমরা যেন বেতন গ্রহণ করি। আমরা রাজি হলাম। তার আরও একটি কারণ এই ছিল যে, বেতন না গ্রহণ করে তো শ্রমিকরা বেশিদিন চলতে পারেন না। অন্যদিকে মালিকরাও চাচ্ছিল আমরা যাতে তাদের মতো করে দেয়া বেতন গ্রহণ করি। আমরা অবশ্য তাতে রাজি হয়নি। আমরা ৫৫ টাকা হারে বর্ধিত বেতনের দাবি ত্যাগ করিনি। ফলে আমরা জানালাম ঠিক আছে, আংশিক বেতন নিচ্ছি। সকলে একশত টাকা আংশিক বেতন গ্রহণ করেছিলাম। বাকিটা রয়ে গেল চূড়ান্ত ফয়সালার অপেক্ষায়।

এক পর্যায়ে টঙ্গীর শ্রমিকরা সামরিক আইনকে অগ্রাহ্য করে ধর্মঘটেই চলে গেলেন। বাংলা শ্রমিক ফেডারেশনের এমন চমৎকার নেটওয়ার্ক ছিল যে, আমরা যে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি তা মালিক পক্ষ ও গোয়েন্দা বিভাগ জানতেও পারেনি। এক সন্ধ্যায় ঢাকার পল্টন ময়দানে বসে টঙ্গীর আঞ্চলিক কমিটি (সভাপতি কাজী জাফর আহমদ, সাধারণ সম্পাদক হায়দার আকবর খান রনো) সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পরদিন সকাল ছয়টা থেকে ধর্মঘট শুরু হবে। আমাদের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক এবং শ্রমিকদের শৃঙ্খলাবোধ এতই উন্নত ছিল যে, সেই রাতের মধ্যেই সকল শ্রমিকের কাছে ধর্মঘটের সংবাদ পৌছে গেল। ভোর ছয়টায় একজন শ্রমিকও মিল গেটে আসেনি। অথচ মালিক ও পুলিশ ধর্মঘটের খবর পেল সকাল নয়টাদশটার দিকে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, শ্রমিক শ্রেণী অন্য যেকোনো শ্রেণীর চেয়ে অনেক বেশি সুশৃঙ্খল এবং সাংগঠনিক যোগ্যতাও তাদের অনেক বেশি।

এই ধর্মঘট মালিক ও প্রশাসনকে চমকে দিয়েছিল। এত সংগোপনে হাজার হাজার শ্রমিকের ধর্মঘট সংগঠিত হতে পারে তা তারা ভাবতেও পারেনি। তারা দালাল তৈরি করতে চেয়েছিল। পারেনি। এক পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানের ডেপুটি মার্শাল ল’ প্রশাসক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীও দুই পক্ষের সমঝোতার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু সমঝোতা হয়নি। সামরিক শাসনে ধর্মঘট দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু সামরিক সরকার কোন এ্যকশন নিতেও সাহস পায়নি। অবশেষে দুই মাস টানা ধর্মঘটের পর (১৯৬৯এর ডিসেম্বর এবং ১৯৭০এর জানুয়ারি) মালিকরা নতিস্বীকার করলো। শ্রমিকদের পুরো দাবি অর্থাৎ ৫৫ টাকা বর্ধিত বেতন এবং দুই মাসের বেতনের সমান বোনাস মেনে নিয়ে চুক্তি করতে বাধ্য হলো।

কোন ধর্মঘটে শতকরা একশ ভাগ দাবি আদায় সাধারণত বিরল ঘটনা। সেই দিক থেকে শ্রমিকের এই বিজয় ছিল সত্যিই অভূতপূর্ব। যদিও প্রধানত টঙ্গীর শ্রমিকরা এই সংগ্রামটি করেছিলেন। কিন্তু তার অর্থনৈতিক সুবিধা অন্যান্য অঞ্চলের শ্রমিকরা পেয়েছিলেন। সর্বোপরি সামরিক শাসনকে অগ্রাহ্য করে এই ধর্মঘটের সাফল্য শ্রমিক শ্রেণীর জন্য ছিল এক মহান বিজয়। ষাটের দশকের শ্রমিক শ্রেণীর এই ধরনের একাধিক বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম আজকের প্রজন্মের শ্রমিকদেরও জানানো দরকার। আজকের প্রজন্মের শ্রমিক শ্রেণী তা থেকে শিখবেন, অনুপ্রাণিত হবেন।।

(চলবে…)