Home » প্রচ্ছদ কথা » গণতন্ত্রের বিদায় দিবস কোনটি?

গণতন্ত্রের বিদায় দিবস কোনটি?

আমীর খসরু

এক.

coverপ্রখ্যাত দার্শনিক, চিন্তাবিদ বার্ট্রান্ড রাসেল তার ‘পাওয়ার’ বইয়ে একটি গল্পের উল্লেখ করেছেন। গল্পটি হচ্ছে এই রকম থাই পর্বতের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কনফিউসিয়াস কবরের পাশে ক্রন্দনরত এক মহিলাকে দেখতে পেলেন। জুলু বললেন, ‘আপনার কান্না দুঃখের পর দুঃখ ভোগকারী লোকের মতো’। উত্তরে মহিলা বললেন, ‘হ্যা, তাই। একবার আমার শ্বশুড় এখানে বাঘের শিকারে পরিণত হন। আমার স্বামীর ভাগ্যেও একই পরিণতি ঘটেছিল। এখানে আমার ছেলে একই পথে মারা গিয়েছে’। প্রভু বললেন, ‘তুমি এই জায়গা ত্যাগ করছে না কেন’? উত্তরটি ছিল – ‘এখানে কোনো অত্যাচারী সরকারের অস্তিত্ব নেই’। প্রভু তখন বললেন, ‘ওহে আমার সন্তানেরা স্মরণ কর, অত্যাচারী সরকার বাঘের চেয়েও ভয়ানক’।

দুই.

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি গঠন এবং এর সংবিধান রচনার সময়ে এই প্রত্যয়ই ব্যক্ত করা হয়েছিল যে, রাষ্ট্রটি গণতান্ত্রিক রীতিনীতি, প্রথা প্রতিষ্ঠানকে মেনে প্রকৃত প্রজাতন্ত্র হিসেবেই চলবে জনগণের আশাআকাঙ্খা অনুযায়ী। ওই সময় অনেকেই অতীতের গণতন্ত্রহীনতার তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকেই আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন ব্যাপক মাত্রায়। কিন্তু স্বল্পসময়ের মধ্যেই সে আশাবাদ আর স্বপ্ন ফিকে হতে শুরু করে। মানুষের আশাআকাঙ্খা, গণতান্ত্রিক প্রথা প্রতিষ্ঠান তো দূরের কথা, খোদ গণতন্ত্রকে নিয়েই প্রথম পর্যায়েই টানাহেঁচড়া শুরু হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার বছর দেড়েকের মাথায়ই নানা নিবর্তনমূলক কালাকানুনসহ জরুরি অবস্থান বিধান সংবিধানে সন্নিবেশিত করা হয়। ক্রমান্বয়ে গণতন্ত্র বিদায় নিতে থাকে মানুষের চোখের জলে। বিরোধী দল, মত, পথ নির্মূল যেমন একদিকে চলতে থাকে, অন্যদিকে খাদ্যাভাব, দুর্ভিক্ষ, আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতির অবনতি, চোরাচালান, লুণ্ঠন, দুর্নীতিসহ জনজীবনে দেখা দেয় এক চরম দুর্ভোগ এবং গড়ে উঠে গভীর হতাশা। বিরোধী পক্ষ বিশেষ করে বামপন্থী নেতাকর্মীদের নিধন ও নির্যাতনের জন্য রাষ্ট্রীয় সব বাহিনীকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি গড়ে তোলা হয় রক্ষী বাহিনী। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় ভারতের সাথে স্বাক্ষরিত হয় ২৫ বছর মেয়াদী মুজিবইন্ধিরা চুক্তি এবং এই চুক্তির বলে দেশের প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ক্ষেত্রে ভারতের উপর নির্ভরশীলতাসহ নানা বিষয়ে ওই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিটি হয়। এছাড়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি, ফারাক্কা বাধ চালুসহ নানা ঘটনা ঘটতে থাকে ওই সময়ে।

এরই মধ্যে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি তৎকালীন জাতীয় সংসদে চতুর্থ সংশোধনী পাস হয় যার মাধ্যমে গঠিত হয় একদলীয় শাসন বাকশাল এবং দেশের শাসন ব্যবস্থাটি হয়ে পড়ে সংসদীয় থেকে রাষ্ট্রপতি শাসিত। সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়। কার্যত দেশটি এক নেতা, এক দল, এক মত, এক চিন্তার দেশে পরিণত হয়। আর গণতন্ত্র যৎকিঞ্চিৎ বাকী ছিল তাও বিদায় নেয়।

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি এবং এর জনগণ সেই যে প্রথম নিদারুন ধাক্কা খেয়ে আশা ভঙ্গের বেদনায় জর্জরিত হয়েছিল, হয়েছিল নিদারুন হতাস তার ধারাবাহিকতা দীর্ঘদিন চলতে থাকে। কখনো প্রত্যক্ষ আবার কখনো পরোক্ষ সামরিক শাসনের মধ্যদিয়ে দেশটি চলতে থাকে।

এ কথাটি বলতেই হবে যে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সবসময় গণতন্ত্রকামী এবং এর জন্য যে কোনো ত্যাগ শিকারে তারা প্রস্তুত। এ দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে স্বৈরাচার এবং অগণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইসংগ্রাম করে টিকে আছে সত্যি, কিন্তু বড় অদ্ভূত তারা কখনো আশা ছাড়ে না। এরই ফলাফল হিসেবে ১৯৯০এ এসে আবার মানুষের মনে আশা জেগেছিল। একটি মন্দের ভালো হলেও বেসামরিক শাসন চলতে শুরু করেছিল তা অনুদার গণতন্ত্রই হোক অথবা বাংলাদেশী মার্কা গণতন্ত্রই হোক। অন্তত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলটি হচ্ছিল নিয়মিত এবং দ্বিদলীয় একটি শাসন ব্যবস্থা জন্ম নিতে শুরু করে ওই সময়ে। এখানে এ কথাটিও মনে রাখতে হবে যে, নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। নির্বাচন গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য উপায় মাত্র। প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম করতে গেলে মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক রীতিনীতি কড়ায়গন্ডায় মেনে, প্রথা প্রতিষ্ঠানগুলোর গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করতে হয় এবং তাহলেই প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন এবং সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এমনটা না হলেও অন্তত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের যে ব্যবস্থাটি অটুট ছিল। যদিও এক্ষেত্রে বড় বাধাটি এসেছে ২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে অর্থাৎ এক কথায় বেসামরিক মোড়কে সামরিক শাসনের মধ্যদিয়ে। এই সরকারটির আগমন হয়েছিল রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতার কারণে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনীতির দুই পক্ষের একটি পক্ষের সম্মতির জোরেই এ কথাও সত্য। সেনা সরকারটি ‘রাজনীতি মেরামত করতে এসেছেন’ এই শ্লোগান দিলেও তারা রাজনীতির চরম সর্বনাশটি করে দিয়ে গেছে। এ কথাটি সব সময় সত্য যে, রাজনৈতিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানই হয়, অন্যথা নয়। অগণতান্ত্রিক পন্থায় গণতন্ত্র সঠিক পথে আনা যায় না এ কথাও সত্য।

যাই হোক, এরপরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। ২০০৮এ বিপুল ভোটাধিক্যে বিজয়ী হয়ে ২০০৯এ আওয়ামী লীগ এবং তার জোট ক্ষমতাসীন হয়। ক্ষমতাসীন হওয়ার প্রথম দিন থেকেই আওয়ামী লীগ নির্বাচনের সময়ে যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা সব দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে স্বরূপে আবির্ভূত হতে থাকে। স্বল্পকালেই তাদের পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশ পায়। এ সবের ভুক্তভোগী এদেশের মানুষ। কাজেই তাদের কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই। এরপরেও সময়কালটি বোঝার জন্য কিছু বিষয় যেমন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, তেলগ্যাস বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়ানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ছাত্রলীগযুবলীগসহ ক্ষমতাসীন দলের সীমাহীন নির্যাতন, নিপীড়ন, দখল, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজী, যৌন সন্ত্রাস, পুলিশর‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, গুম, খুন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাের ঘটনা ঘটতে থাকে এবং এ সবকিছুই এখনো ঘটছে। আর্থিক খাতে নৈরাজ্য, লুটপাট, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, ডেসটিনিসহ ব্যাংক খাতের লুটপাট, কুইক রেন্টালের নামে লাখ কোটি টাকা লোপাট এখনো চলছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের নামে ট্রানজিটের কথা বলে সড়ক, নৌ, রেল, বিদ্যুৎ, টেলিকরিডোর, সমুদ্রবন্দর, বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারসহ নানা ঘটনা ঘটতে থাকে এবং ঘটছে। বিরোধী দল, মত, পথ, ব্যক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যাবতীয় প্রচেষ্টা এখনো অব্যাহত আছে। এছাড়াও আগের জাতীয় সংসদকে ক্ষমতাসীন দল চরমভাবে অকার্যকর করার যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে।

আওয়ামী লীগ আগের মতোই চেয়েছে দেশ এক মত, এক পথসহ একা এবং একক এমন একটি অবস্থার মধ্যদিয়ে চলবে। এ লক্ষ্যে অন্যান্য বিষয়ের সাথে ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পাস হয় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী। আর এর মাধ্যমে অনেক দিনের এক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিকে বাতিল করে সংবিধানের ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। আর এসবই করা হয় একটি লক্ষ্য সামনে রেখেই এক ও এককের চিন্তা। একদলীয় শাসন কায়েমের লক্ষ্যে দেশ ক্রমাগত এগিয়ে যেতে থাকে দেশীবিদেশী নানা উদ্যোগ, নানা পরামর্শ, নানা দেনদরবার ও উদ্যোগ সত্ত্বেও। কোন দেশী উদ্যোগ বা পরামর্শ তো গ্রহণযোগ্য হয়ইনি, ব্যর্থ হয়েছে সব বিদেশী উদ্যোগও।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি অনুষ্ঠান নিয়েও নানা টালবাহানা করা হয়। বলা হয় এটা সংবিধান রক্ষার স্বার্থে। এরপরে সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করার কথাও অঙ্গীকার করা হয়েছিল।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি অনুষ্ঠানের পরে সব কিছুই আবার স্বভাব অনুযায়ী যথারীতি পাল্টে যায়। বলা হয়, ঐতিহাসিক বিজয় অর্জিত হয়েছে। জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছে। যে নির্বাচনে কোনো দলই অংশ নেয়নি, শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ ও তার ‘খুদকুড়া’ খাওয়া কিছু দল যাকে তারা জোট বলে থাকেন এবং এদের মধ্যেই একটি দলকে বলা হয় বিরোধী দল হওয়ার জন্য। এ এমন এক বিরোধী দল সৃষ্টি করা হয়েছে যারা সরকারেও আছে এবং বিরোধী দল হিসেবেই কাজ করছে। গণতান্ত্রিক বা নির্বাচনের ইতিহাসে এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি। অবস্থাটি দাড়িয়েছে এমন এটি ছেলেও নয়, মেয়েও নয়।

ওই নির্বাচনটি এমনই ছিল যে, ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতাসীনরা নির্বাচিত হয়েছে। আর যেসব আসনে ভোট হয়েছে তাতে সর্বোচ্চ হলেও শতকরা ৫ ভাগ ভোটও পড়েনি। দেশেবিদেশে এর কোনো বৈধতাই মেলেনি। কিন্তু সরকার প্রধান এবং ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদী করার প্রত্যয়ে ২০১৯এর আগে কোনো নির্বাচন নয় বলে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বানকে যেমন প্রত্যাখ্যান করছে, তেমনি সংলাপ অনুষ্ঠানকেও সরাসরি না বলে দেয়া হয়েছে। যদিও সরকারটি বৈধতা জন্য এখনো দেশে দেশে ঘুরছে।

এমনই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন এবং অপনজির সৃষ্টিকারী ওই নির্বাচনের দিনকে ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ হিসেবে পালন করবে বলে কর্মসূচি দিয়েছে। মানবাধিকার, নানাবিধ জনআকাক্সক্ষা এবং সর্বোপরি গণতন্ত্র আজ নির্বাসনে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে সামান্য সুযোগটুকু দেশবাসীর ছিল তাকেও যে দিনটিতে বিদায় জানানো হয়েছে সে দিনেই পালিত হবে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস। তাহলে প্রশ্ন জাগাটিই স্বাভাবিক গণতন্ত্রের বিদায় দিবস কোনটি?