Home » বিশেষ নিবন্ধ » মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের ভূমিকা :: চিরুলিয়া-বিষ্ণুপুর অঞ্চল

মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের ভূমিকা :: চিরুলিয়া-বিষ্ণুপুর অঞ্চল

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

last 3৭১এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর সরকারের কর্তৃত্বের বাইরে দেশের অভ্যন্তরে বেশ কিছু অঞ্চলে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। গেরিলা বাহিনী গঠন ও ঘাঁটি স্থাপন করে তাঁরা ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। মতাদর্শগত পার্থক্য থাকায় মুজিবনগর সরকারের সাথে এসব বাহিনীর কোন সম্পর্ক ছিল না। এসব বাহিনীর সকলেই বিশ্বাস করতেন, তাঁরা একটি দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছেন এবং জনগনের সমর্থন ও সক্রিয় অংশগ্রহনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ করা সম্ভর হবে। বামপ্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারার এ সকল নেতা ও কর্মীরা বিশ্বাস করতেন, সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সংগঠিত এই দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংগ্রামে কেবলমাত্র জনগনই তাদের বন্ধু হতে পারেন।

রাষ্ট্রযন্ত্র বা বাইরের কোন সহায়তা ছাড়া দেশের ভেতরে থেকে এরকম গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সুকঠিন একটি কাজ হলেও দেশের কয়েকটি অঞ্চলে তাঁরা এই যুদ্ধ শেষ অবধি চালিয়ে যান। দক্ষিনপশ্চিমাঞ্চলে তৎকালীন মহকুমা সদর বাগেরহাটের চিরুলিয়াবিষ্ণুপুরে গড়ে ওঠা গেরিলা ঘাঁটি এবং নয় মাসব্যাপী সশস্ত্র যুদ্ধ এরকম একটি উদাহরন। মুজিবনগর সরকার তো দুরে থাক, কোন কোন ক্ষেত্রে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বিরোধিতা উপেক্ষা করে কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের পূর্ববাংলা সমন্বয় কমিটির আঞ্চলিক প্রধান রফিকুল ইসলাম খোকনের নেতৃত্বে বিশালবিস্তীর্ন অঞ্চলে কয়েকটি দুর্ভেদ্য গেরিলা ঘাঁটি গড়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাসই দুর্ধর্ষ এই গেরিলা বাহিনী গোটা এলাকায় শত্রুমুক্ত রাখতে সক্ষম হন। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ক্ষমতাসীন প্রতিটি সরকারই মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় এই অধ্যায় উপেক্ষা করেছেন।

চিরুলিয়াবিষ্ণুপুরে সংঘটিত সশস্ত্র যুদ্ধগুলি গেরিলা যুদ্ধের একেকটি অনন্যসাধারন উদাহরন। বিষ্ণুপুরে গেরিলারা একটি শক্তিশালী অবস্থান অঞ্চল (Lodgement Area)গড়ে তোলেন এবং কয়েকটি গেরিলা ঘাঁটির প্রতিরক্ষা ব্যুহ নির্মান করেন। বাগেরহাট শহরের বুক চিরে প্রবাহিত ভৈরবদড়াটানা নদীর উত্তর তীরে বিষ্ণুপুরের খালিশপুর গ্রামে ছিল এই বিপ্লবী যোদ্ধাদের সদর দপ্তর। অন্য দুটি ঘাঁটি ছিল সন্তোষপুর প্রাইমারী স্কুল ও চিতলমারীর ইউনিয়নের সুড়িগাতী গ্রামে। মুজিবনগর সরকারের কোন রকম নিয়ন্ত্রন ছাড়াই তারা মুক্তিযুদ্ধকালে প্রায় ১৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা শত্রুমুক্ত রাখতে সক্ষম হন।

বামপন্থীদের ভাঙ্গন ও প্রস্তুতি পর্ব

বাগেরহাট ও সংলগ্ন অঞ্চলে স্বাধীনতা যুদ্ধপূর্বকালীন রাজনৈতিক দলের অবস্থান ও তৎপরতা অনুসন্ধান করে জানা গেছে, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী) ছিল অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী অবস্থানে। আওয়ামী লীগেরও তৎপরতা ও জনপ্রিয়তা ছিল। অন্যান্য দলের মধ্যে ন্যাশনাল আওয়ামী পাটি (মোজাফ্ফর), কমিউনিষ্ট পার্টি (মনি সিং), জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান, কনভেনশন মুসলিম লীগ, মুসলিম লীগ (কাইয়ুম) ইত্যাদি দল ছাড়াও কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটি সক্রিয় ছিল। এখানে ষাট দশকের মধ্যভাগে চৈনিক ধারার বামপন্থীদের মধ্যকার ভাঙ্গনের বিষয়টি এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন।

১৯৬৬ সালে সুখেন্দু দস্তিদারহকতোয়াহা পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিষ্ট পার্টি (মার্কসবাদীলেনিনবাদী) গঠন করেন। ১৯৬৭৬৮তে পার্টি ভেঙ্গে যায় এবং কয়েকটি উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১. আমজাদ হোসেনমাহবুব উল্লাহ, .দেবেন শিকদারআবুল বাসার ৩.মতিনআলাউদ্দিন ৪.জাফরমেননরনো ৫.সিরাজ শিকদার। জাফরমেননরনোর নেতৃত্বাধীন উপদলটি কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের পূর্ববাংলা সমন্বয় কমিটি নামে শ্রেনী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পার্টি গড়ে তোলার বক্তব্য হাজির করেন।

বাগেরহাটের রঘুনাথপুরবিষ্ণুপুর ও বাহিরদিয়া, পিরোজপুরের মাটিভাঙ্গা, চেচরিরামপুর অঞ্চলের কৃষক অধ্যুষিত এলাকায় তাদের যথেষ্ট রাজনৈতিক তৎপরতা ছিল। এসময় পার্টির শ্লোগান ছিল ‘কৃষক শ্রমিক অস্ত্র ধরপূর্ববাংলা স্বাধীন করো’। স্বাধীন জনগনতান্ত্রিক পূর্ববাংলা কায়েমের লক্ষ্যে তারা সংগঠিত হচ্ছিল। বাগেরহাটে রফিকুল ইসলাম খোকন, পিরোজপুরে ফজলুখালেদ রবি, বাহিরদিয়ার মানস ঘোষ ও গিয়াসের নেতৃত্বে এরা সংগঠিত হতে থাকে। ৬৯এর গনঅভ্যুত্থানে সৃষ্ট গনবিস্ফোরনের মধ্যে বাগেরহাটের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁরা কৃষকদের সংগঠিত করে ‘কৃষক অঞ্চল’ গঠন অব্যাহত রেখেছিলেন।

গণ হত্যাযজ্ঞ :: প্রাক ও পরবর্তী পরিস্থিতি

৭০’র নির্বাচন পরবর্তীকালে অসহযোগ আন্দোলনের ফলে পরিস্থিতি র‌্যাডিক্যালাইজড হয়। পাকিস্তানী বর্বর শাসক চক্রের উস্কানি ও প্ররোচনার বিপরীতে শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে বাগেরহাটেও সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে শেখ আমজাদ আলী (ভাসানী ন্যাপ), এ্যাডভোকেট এস এম এ সবুর (মোজাফ্ফর ন্যাপ), প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা এ্যাডভোকেট শেখ আব্দুর রহমান, একই দলের সৈয়দ অজিয়র রহমানের নেতৃত্বে এই কমিটি গঠিত হয়। বাগেরহাট শহরতলীর একটি বাড়িতে এই কমিটি নিয়মিত বৈঠকে বসতো। ক্যাপ্টেন আব্দুর রহমানের নেতৃত্বে এখানে একটি ক্যাম্প গড়ে ওঠে। ষ্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আরেকটি ক্যাম্প স্থাপিত হয় বাগেরহাট হাইস্কুলের ভবনে।

সংগ্রাম কমিটি একটি বৈঠকে আলোচনা করে ৩টি বাহিনী নিযুক্ত করে। আনসার কমান্ডার হাবিবুর রহমানকে চিতলমারী এলাকা, কচুয়ার গোয়ালমাঠ ও মোরেলগঞ্জের তেলিগাতী এলাকার দায়িত্ব প্রদান করা হয় সোহরাব হোসেনকে। মেজর জলিল সে সময় একবার এ অঞ্চল পরিদর্শনে আসেন। মেজর মেহেদী আল ইমামের নেতৃত্বে একটি দল খানজাহান (রঃ) দরগাহ ও ষাট গুম্বজ মসজিদের মাঝামাঝি এলাকায় কয়েকদিন অবস্থান করেন। এখান থেকে মুক্তিযোদ্ধারা বাগেরহাট সদর আসনের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য শেখ আব্দুর রহমান এবং কামরুজ্জামান টুকুর (পরবর্তীতে জাসদ, বর্তমানে আওয়ামী লীগ লীগ নেতা ও বাগেরহাট জেলা পরিষদ প্রশাসক) সহায়তায় খুলনার গল্লামারী এলাকায় বেতার কেন্দ্র আক্রমনের প্রস্তুতি গ্রহন করেছিলেন। ৭ জুলাই তারা এ অঞ্চল ছেড়ে চলে যান।

বাগেরহাটের মুক্তিযুদ্ধ :: কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি

অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ

রফিকুল ইসলাম খোকনের নেতৃত্বে আগে থেকেই একটি গ্রুপ সংগঠিত হচ্ছিল। তারা সংগ্রাম কমিটির সাথে যোগাযোগ করে প্রশিক্ষণ গ্রহনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ১৯ এপ্রিল রফিকুল ইসলাম খোকন, জুবায়ের নোমা, শংকর বিশ্বাস, খসরুসহ মোট ১১ জন রঘুনাথপুরে কেষ্ট ডাক্তারের বাড়ি হয়ে বিষ্ণুপুর হাইস্কুলে অবস্থান গ্রহন করেন। এখান থেকে শুরু হয় তাদের অস্ত্র সংগ্রহ অভিযান। পার্টির কর্মী আসাদ একটি রিভলবার সংগ্রহ করেন। এটি ছিল বাহিনীর প্রথম অস্ত্র।

২৭ এপ্রিল রফিকের নেতৃত্বে গোলাম মোস্তফা হিল্লোল, শংকর বিশ্বাস, নিশু, কুটি অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে দড়াটানা পার হয়ে মুনিগঞ্জে আসেন। খেয়া ঘাটে এসে তারা একটি আরোহীবিহীন জিপ দেখতে পান। হিল্লোল স্টার্ট দিতে সক্ষম হলে সকলে মিলে জিপে চড়ে বসেন। তাদের সাথে অস্ত্র ছিল ৩টি ৩০৩ রাইফেল ও ১টি রিভলভার। শহরের কেন্দ্রস্থলে ফাইন আর্ট প্রেসের সামনে তারা অবস্থান নেন। বিকাল ৫টার দিকে ৪ জন টহলরত পুলিসসহ একজন আনসারের দেখা পেলে রফিক ও তার বাহিনী অস্ত্রের মুখে তাদের আত্মসমর্পন করান এবং সাথে থাকা ৫ টি ৩০৩ রাইফেল ছিনিয়ে নেন। জিপ পুনরায় স্টার্ট নিতে ব্যর্থ হলে তারা রেল লাইন ধরে হাঁটা শুরু করে শহরে ঢুকে গলিঘুঁপচি দিয়ে দড়াটানা পার হয়ে যান। চলার পথে একজন আনসারের কাছ থেকে তারা আরো একটি রাইফেল সংগ্রহ করে নিরাপদে বিষ্ণুপুর ঘাঁটিতে ফিরে আসেন।

বাহিরদিয়ায় মানস ঘোষ আগে থেকেই প্রতিরোধ সংগঠিত করছিলেন। পিরোজপুরে কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের পূর্ববাংলা সমন্বয় কমিটি নেতা ফজলুল হকের (ফজলু) নেতৃত্বে ট্রেজারির অস্ত্রাগার লুট করা হয়। সেখান থেকে তিনি ১৯ টি .৩০৩ রাইফেল বিষ্ণুপুরের জন্য পাঠিয়ে দেন। বাগেরহাট সদরের ডেমা থেকে সংগৃহীত হয় আরো ৬ টি .৩০৩ রাইফেল এবং বারুইপাড়ার মোশারেফ মিয়ার বাড়ি থেকে ১টি ব্যাটাগান ও কার্তুজ সংগ্রহ করা হয়।

২৫ এপ্রিল পথে অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মংলা থেকে গানবোট যোগে চৌমহলার কাছ থেকে কাড়াপাড়া সড়ক ধরে বাগেরহাটে প্রবেশ করে। আসার সময়ে পথিমধ্যে তাদের হাতে অসংখ্য মানুষ নিহত হন। কাড়াপাড়া বাজার তারা পুড়িয়ে দেয় এবং এখানে গনহত্যা চালায়। শহরের স্থানীয় নাগের বাড়িতে মুক্তিবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাস্প ছিল। শুরুতেই ক্যাম্প আক্রান্ত হয় এবং মুক্তিযোদ্ধারা পশ্চাদাপসরন করেন। এ সময় ৪/৫ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। বাগেরহাট শহরের মুক্তিযোদ্ধারা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ চিতলমারীতে ষ্টুয়ার্ড মুজিব ও অন্যান্যরা গোয়ালমাঠ ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। শহরে কিছু পাঞ্জাবী মিলিশিয়া ও পুলিশ রেখে পাক বাহিনী ঐ দিনই বাগেরহাট ত্যাগ করে।

প্রতিরোধ পর্ব

এপ্রিলের শেষের দিকে রফিকুল ইসলাম খোকনের নেতৃত্বাধীন বাহিনী, যা পরে রফিক বাহিনী নামে খ্যাতি লাভ করে, স্থানীয় তরুনযুবা ও পার্টির বিভিন্ন অঞ্চলের কর্মীরা যোগ দিতে শুরু করেন। স্থানীয় রাজনৈতিক দন্দ্বের ফলশ্রুতিতে চিতলমারীর দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার কমান্ডার হাবিব ২৭ এপ্রিল রাতে হালিশহর গ্রামের নৃপেনের বাড়িতে আসে এবং চরম হুমকি প্রদান করে। খবর বিষ্ণুপুর ঘাঁটিতে পৌঁছলে পরের দিন হিল্লোল, ইসমাইল হোসেন (মেজো), মান্নান চৌধুরী, শংকরসহ একটি দল হাবিবের হুমকির জবাব দিতে গেলে প্রতিপক্ষের আক্রমনে সকাল ১১ টায় গুলিবিদ্ধ হন হিল্লোল। বিকাল ৪ টার দিকে তিনি মারা যান। জগন্নাথ কলেজের ছাত্র গোলাম মোস্তফা হিল্লোল (বর্তমান বিমান মন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদখান মেননের শ্যালক) মুক্তিযুদ্ধে বিষ্ণুপুর রনাঙ্গনের প্রথম শহীদ।

কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের অন্য দুটি শাখা ফকিরহাটের বাহিরদিয়া ও পিরোজপুরে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহন করছিলো। অস্ত্রাগার লুটের পরে পিরোজপুরের সমন্বয় কমিটির নেতা ফজলুল হক স্বরূপকাঠির জলাবাড়ি ক্যাম্পে যান। ৫ মে ফজলু, পূর্নেন্দু বাচ্চু, প্রবীর বাচ্চু, জাহাঙ্গীর, দেবু ও কেষ্টকে দেশীয় দালালদের সহযোগিতায় পাক সেনারা বন্দী করে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরবর্তীকালে পার্টির অন্যতম কর্মী বিধান চন্দ্র মন্টুও পাক হানাদারদের হাতে নিহত হন। পিরোজপুরে পার্টির অন্যান্য কর্মীদের মধ্যে নুরদিদা খালেদ রবি, ওবায়দুল কবীর বাদল, শহীদুল হক চান, সামসুদ্দোহা মিলন, শহীদুল হক মন্টু, সমীর কুমার বাচ্চু, তোফাজ্জেল হোসেন মঞ্জুসহ আরো কয়েকজন বিষ্ণুপুর ক্যাম্পে যোগ দেন।

বাগেরহাট সদর থানা আক্রমণ

ইতিমধ্যে বিষ্ণুপুর ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহনকারী মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক সৈয়দ অজিয়র রহমান শহরে ফিরে পাকিস্তান বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন এবং তাকে বাগেরহাট থানা হাজতে রাখা হয়। দলমত নির্বিশেষে জনপ্রিয় এই নেতাকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় রফিক বাহিনী। কামরুজ্জামান টুকু তাঁর বাহিনী নিয়ে এই হামলায় অংশগ্রহণ করেন। ৩০ এপ্রিল রাতে তারা থানা আক্রমনের উদ্দেশ্যে তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। তাদের জানা ছিল না ঐ দিন সন্ধ্যায়ই অজিয়র রহমানকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। ৩০ এপ্রিল রাত ১২ টার পরে ১ মে’র প্রথম প্রহরে রফিক বাহিনী ও টুকু বাহিনী একযোগে আক্রমন চালান। আক্রমনে ২ পুলিশ নিহত ও কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়। টুকু বাহিনীর ২ জন মুক্তিযোদ্ধাও শহীদ হন। অজিয়র রহমানকে তারা উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন এবং পরবর্তীকালে পাক বাহিনী তাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। এই আক্রমনে রফিক, জুবায়ের, খসরু, আসাদ, আনিস, গোবিন্দ, মধু, মজবুলসহ ২০ থেকে ২২ জন মুক্তিযোদ্ধা অংশ নেন।

দালালরাজাকার নিধন কর্মসূচি

বিষ্ণুপুরের মুক্তিযোদ্ধারা এলাকার শত্রুমুক্ত করার প্রয়োজনে পাক বাহিনীর দেশীয় দালালরাজাকার নিধন কর্মসূচী গ্রহন করেন। বাগেরহাট শহরের দালালদের তৎপরতা ও অত্যাচার বৃদ্ধি পেলে প্রধান প্রধান দালালদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়। শহরে পাক বাহিনীর প্রধান সহযোগী দালাল প্রধান রজব আলীকে তারা প্রথম টার্গেট হিসেবে বেছে নেন। ১৪ মে মাঝ রাতে রফিক, জুবায়ের, সমীর বাচ্চু, বাদল, মান্নান চৌধুরী বাগেরহাট খান জাহান (রঃ) এর দরগাহ সড়কের পাশে সুশীল দামের পোড়োবাড়িতে অবস্থান নেন। ১৫ মে পাক বাহিনী দ্বিতীয় দফায় বাগেরহাট শহরে আসে। এখানে প্রায় তিন দিন অবস্থানের পরে ১৭ মে মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুর দেখা পান বটে। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। ঐদিন সকালে কয়েক ট্রাক পাকিস্তানি হানাদার পরিবেষ্টিত রজব আলী সড়ক অতিক্রম করে। ফলে মুক্তিযোদ্ধারা পরিকল্পনা মুলতবী করে ফিরে আসেন।

১৭মে হানাদার বাহিনী দেশীয় দালাল রাজাকারদের নিয়ে গোটাপাড়া ও বিষ্ণুপুর এলাকায় ব্যাপক অগ্নিসংযোগ, হত্যাধর্ষন চালিয়ে শহরে ফিরে যায়। ক্যাম্পে ফিরে মুক্তিযোদ্ধারা দালাল রাজাকারদের লুটপাটে বাধা দেয়ার সময় মজিবর নামে একজন রাজাকার নিহত হয়। তার লাশ শহরে নিয়ে আসার পরে পাক হানাদাররা দ্বিতীয় দফায় গানবোটে করে বাবুরহাট বাজার থেকে আক্রমন চালায়। মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে জঙ্গলবাড়ি রঘুনাথপুরে আশ্রয় নেয়।

২২মে গেরিলারা পুনরায় এলাকা শত্রমুক্ত করার জন্য সত্তার লস্কর নামে এক দালালকে হত্যা করে। ২৬ মে কামারগাতি গ্রামে আওয়ামী লীগ সমর্থিত হাবিব কমান্ডারের নেতৃত্বাধীন বাহিনী অতর্কিতে আক্রমন করে রফিক বাহিনীর কয়েক জনকে। রফিকের সাথে ছিলেন খসরু ও রতন মাষ্টার। এ হামলায় তারা কোনরকম বেঁচে যান। ৬ জুন হাবিব বাহিনীর হাতে রফিক বাহিনীর মজবুল শহীদ হন। অন্যদিকে এসময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রুটিন করে প্রতিদিন গোটাপাড়া, বিষ্ণুপুর এলাকায় আক্রমন চালাতে থাকে। তবে হানাদাররা গেরিলাদের ভয়ে এই এলাকায় ঘাঁটি গেড়ে অবস্থান নিতে সাহস পায়নি।

এদিকে দালাল প্রধান রজব আলীকে হত্যা করার জন্য দ্বিতীয় দফায় কেষ্ট ঘোষ ও ইসমাইল হোসেন (মেজো) শহরে অবস্থান নিয়ে একাধিকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ৯ জুন ইসমাইল হোসেন মেজো (ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন) রফিক বাহিনী গেরিলাদের নিয়মিত প্রশিক্ষন দেয়া শুরু করেন। ১৬ জুন তাজুল ইসলাম (বিমান বাহিনীর প্রাক্তন সদস্য ও আগরতলা যড়যন্ত্র মামলার আসামী) বিষ্ণুপুরে রফিক বাহিনীর সাথে যোগ দেন। এ সময়ে পাক বাহিনীর আক্রমন দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ২০ জুন তারা কান্দাপাড়ায় গনহত্যা চালিয়ে ২৩ জনকে হত্যা করে এবং বাজার পুড়িয়ে দেয়।

২১ জুন পাক বাহিনী চিতলমারিতে মুক্তিযোদ্ধাদের (সংগ্রাম কমিটির অনুসারী) আরেকটি ক্যাম্পে কম্বিং অপারেশন চালায়। হানাদাররা কালিগঞ্জ, চিতলমারি, খড়মখালি, দুর্গাপুর, খলিশাখালি এলাকায় গনহত্যা ও অগ্নিসংযোগ করে। জুন মাসের মাঝামাঝি এখানে দুএকটি প্রতিরোধ যুদ্ধ সংঘটিত হলেও ভয়াবহ এই হামলার পরে জুলাইয়ের প্রথমে এই বাহিনীর অধিকাংশ ভারতে চলে যান।

দালাল প্রধান নিধনে সুইসাইড স্কোয়াড

অন্যদিকে বিষ্ণুপুরের রফিক বাহিনীর গেরিলারা তাদের যুদ্ধ প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ, ছোটখাটো আক্রমন ও দালাল নিধন কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন। ১১ জুন যাত্রাপুরের আফসার বেগের বাড়ি থেকে একটি বন্দুক ও একটি রিভলবার সংগ্রহ করে। ৭ জুলাই বাহিনীর বিশেষ বৈঠকে রজব আলীকে হত্যার উদ্দেশ্যে জুবায়ের ও কেষ্ট ঘোষ সমন্বয়ে স্যুইসাইডাল স্কোয়াড গঠিত হয়।

দ’জনের বাহিনী ৯ জুন শহরে প্রবেশ করে মুক্তিযোদ্ধা সিরাজদের বাড়িতে অবস্থান নেন। রাতেই রজব আলী সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের কাজে নামেন সিরাজ ও খোকন। ১০ জুলাই গেরিলারা চুড়ান্ত আক্রমনের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রজব আলীর অপেক্ষা করতে থাকেন। সংবাদ বাহক খবর দেয় রজব আলী শহরের আমলাপাড়ায় ওয়াপদা রেষ্ট হাউসে অবস্থান নিয়েছে। দুই গেরিলা সেখানে অবস্থান নেন। সংকেত নির্ধারন করা হয়, রজব আলী বেরিয়ে এলে সিরাজ জামার বোতামগুলি খুলে সোজা হেটে যাবে।

সংকেত পেয়ে জুবায়ের ও কেষ্ট এগুতে শুরু করেন। কেষ্ট’র হাতে ছিলো রিভলভার ও জুবায়েরের কাছে ছিলো একটি ব্রিটিশ ষ্টেনগান। ম্যাগাজিনে ছিল ১১ টি গুলি। ওয়াপদা রেষ্টহাউসের প্রধান ফটক ছিল জনাকীর্ন। খোলা ষ্টেন ও রিভলভার হাতে দুই গেরিলা মুখোমুখি হলে রজব আলী নিশ্চল হয়ে যায়। জুবায়ের ষ্টেন দিয়ে ব্রাশ ফায়ার শুরু করতেই দেহরক্ষীকে সামনে টেনে নিয়ে আসে রজব। হতভাগা লোকটি সাথে সাথেই নিহত হয়। পিঠে ও বুকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পালাতে গেলে কেষ্ট পুনরায় গুলি করে রজব আলীকে। গুলি ফুরিয়ে যাওয়ায় আহত রজব আলীকে তারা ষ্টেন ও রিভলবারের বাঁট দিয়ে পিটিয়ে হত্যার চেষ্টা চালান। এ সময় ওয়াপদা’র জনৈক কর্মকর্তার ছেলের ছোঁড়া বন্দুকের গুলিতে কেষ্ট আহত হন। এ অবস্থায় দ্রুত তাঁরা মুনিগঞ্জ খেয়া পেরিয়ে বিষ্ণুপুরে ফিরে আসেন। খবর পেয়ে উল্লসিত জনতা ঘাড়ে তুলে গেরিলাদের ঘাঁটিতে নিয়ে যায়। পাক সেনাদের দ্রুত তৎপরতায় যশোর ক্যান্টনমেন্টে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে রজব আলী সে যাত্রা রক্ষা পায়। ১৬ ডিসেম্বর দেশ মুক্ত হলে রজব আলী আত্মহত্যা করে।

কচুয়া থানা আক্রমণ ও মাধবকাঠির যুদ্ধ

জুলাই মাসের প্রথম দিকে রাশেদ খান মেনন (মতান্তরে, হায়দার আকবর খান রনো) বিষ্ণুপুর ক্যাম্পে গেরিলাদের সাথে মিলিত হন। দিনব্যাপী এক আলোচনায় পাক সামরিক জান্তাকে এক নম্বর শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে জনযুদ্ধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২২ জুলাই হাবিব কমান্ডারের সাথে রফিক বাহিনীর সাথে একটি আপোষ আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত হয় পরস্পরের প্রতি আর কেউ আক্রমন চালাবে না। ২৪ জুলাই রাজাকারদের বহনকারী রূপসা থেকে বাগেরহাটগামী একটি বিশেষ ট্রেনে বাহিরদিয়ার মানস ঘোষের বাহিনী ও রফিক বাহিনী সম্মিলিত আক্রমন চালায়। অনেক রাজাকার হতাহত হয় এবং বিপুল পরিমান অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। ইতিমধ্যেই রফিক বাহিনী বাগেরহাটের কচুয়া থানায় আক্রমন চালিয়ে ৮ টি .৩০৩ রাইফেল, ২ টি ষ্টেনগান ও ১ টি রিভলভার সংগ্রহ করেন। এই হামলায় অংশ নেন তাজুল ইসলাম, জুবায়ের, কেষ্ট, কান্ত, আবু, মনসুর, কুদ্দুস, হাবিব, নিরোদ, মজিবর,বাচ্চু, বাদল, নবীরুদ্দিন, শংকর, সিরাজ, তৈয়ব খাঁ, মালেক ও খসরু।

১ আগষ্ট পাক হানাদাররা বিষ্ণুপুর আক্রমন করে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করে এবং মুক্তিযোদ্ধা কান্তর দুই ভাই নিরোদ ও কালিপদকে হত্যা করে শহরে প্রত্যাবর্তন করে। বিষ্ণুপুরের গেরিলারা এ সময় এলাকায় জনগনকে সংগঠিত করতে প্রচারপত্র ও যুদ্ধের নির্দেশিকা ছড়িয়ে দেন। ৬ আগষ্ট মাধবকাঠি মাদ্রাসায় অবস্থান নেয়ার জন্য পাক হানাদার ও রাজাকারদের একটি দল আসে। ৭ আগষ্ট কমান্ডার হাবিরের দল তাদেরকে ঘিরে রাখে। অপরদিক থেকে একই দিনে বিষ্ণুপুরের গেরিলারা মাধবকাঠি মাদ্রাসায় পাক বাহিনীর অবস্থান ঘিরে ফেলে। রাত ১২ টায় জিরো আওয়ারে সম্মিলিত আক্রমন শুরু হয়। পরের দিন দুপুর ২ টা পর্যন্ত এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়। এ সময় মাদ্রাসার দক্ষিন দিক থেকে গেরিলাদের একটি অগ্রবর্তী দল ঢুকে পড়লে হানাদার ও রাজাকাররা পালিয়ে নদীর ঘাটে থাকা লঞ্চে ওঠার চেষ্টা চালায়। এই যুদ্ধে ৩ জন পাক সেনাসহ ১৬ জন রাজাকার নিহত হয় এবং আহতের সংখ্যা ছিল অগনিত।

দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি’ তত্ত্ব

১১ আগষ্ট কমিউনিষ্ট পার্টি (এম এল) হক তোয়াহা গ্রুপের প্রতিনিধি হিসেবে জীবন মুখার্জী, ললিত মোহন বিশ্বাস মুক্তিযুদ্ধকে ‘দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি’ তত্ত্ব হাজির করে পাক সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ভারতীয় সম্প্রসারনবাদ মোকাবেলার প্রস্তাব দিলে রফিক বাহিনী ঘৃনাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং দুজনকেই ক্যাম্প ত্যাগ করে চলে যেতে বলা হয়।

মধ্য আগষ্ট থেকে পাক বাহিনীর প্রতিদিনের আক্রমনের তীব্রতার মুখে রফিক বাহিনী কিছুটা হলেও বিপন্ন ও অসহায় হয়ে পড়ে। অস্ত্রের অভাব প্রকট আকার ধারন করে। ২৪ আগষ্ট মানস ঘোষের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়ে রফিক, কালিপদ ব্যানার্জী, রতন মাষ্টার ও বিনয় অস্ত্র সংগ্রহে রওয়ানা হন। ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি কোন এক স্থান থেকে অস্ত্র সংগ্রহের পরিকল্পনা থাকলেও পথিমধ্যে পাক হানাদারদের আক্রমনের মুখে পড়ে যান তাঁরা। পশ্চাদাপসরন করতে যেয়ে রফিক আহত হন। ঐ দিনেই দেবী বাজারের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাক বাহিনীর এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এখানে ৩ জন পাক সেনা ও ৫ জন রাজাকার নিহত হয়।

পানিঘাটএর যুদ্ধ :: গেরিলা যুদ্ধের মডেল

২৫,২৬,২৭ ও ২৯ আগষ্ট পাক বাহিনীর পুন: পুন: আক্রমনে বিষ্ণুপুরের গেরিলারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হন। পাক বাহিনী সন্তোষপুর ক্যাম্প পুড়িয়ে দেয়। এ সময় বাহিনী ছেড়ে তাজুল ইসলাম ভারতে চলে যান। ৩০ আগষ্ট আহত রফিক বিষ্ণুপুর ক্যাম্পে ফিরে আসেন এবং মুক্তিযোদ্ধারা সামর্থ্য অনুযায়ী পুনরায় সংগঠিত হয়ে শক্তি সংহত করার চেষ্টা চালান।

সেপ্টেম্বরের গোড়ার দিকে চিরুলিয়াবিষ্ণুপুরের গেরিলা ঘাঁটিগুলি নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য পাক বাহিনী সর্বাত্মক আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেয়। ৯ সেপ্টেম্বর বাগেরহাট সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের পানিঘাট এলাকায় পাকিস্তানি সৈন্যরা জড়ো হতে থাকে। বিষ্ণুপুরের গেরিলাদের জন্য অসম্ভব গুরুত্বপূর্ন এ লড়াই ছিল তাদের অস্তিত্ব রক্ষার। এটি বিখ্যাত পানিঘাটএর যুদ্ধ নামে পরবর্তীতে খ্যাতি লাভ করে। গেরিলা যুদ্ধের ইতিহাসে এটি একটি অনন্য সাধারণ লড়াই। অন্যান্যদের সাথে এখনকার খ্যাতনামা সাহিত্যিক সুশান্ত মজুমদার এই যুদ্ধে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন।

লড়াইয়ের প্রস্ততি হিসেবে ভৈরব নদীর তীর ধরে গেরিলারা ২’শ গজ দুরত্বের মধ্যে ডিফেন্স লাইন নির্মান করেন। নদীর বাঁকের দু’দিকেই বাংকার খুঁড়ে প্রতিটিতে ২ জন করে গেরিলা অবস্থান নেন। বৃষ্টির মত গুলি বর্ষন করতে করতে লঞ্চ নিয়ে পাক হানাদাররা মুক্তিযোদ্ধাদের ডিফেন্স লাইন ভেদ করার চেষ্টা চালায়। গেরিলাদের পাল্টা গুলিতে সারেং গুলিবিদ্ধ হলে একাধিক জায়গায় ফুটো হয়ে যাওয়া লঞ্চ নদীতে ঘুরপাক খেতে থাকে। এই যুদ্ধে গেরিলারা ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে অংশ নেয়। এ সময় সড়ক পথে আগুয়ান হানাদারদের একটি দল গেরিলাদের গুলির মুখে পালিয়ে যায়। পানিঘাটের এই যুদ্ধে ১৬ জন পাক সেনাসহ অগনিত রাজাকার নিহত হয়। বাগেরহাট শহরে সান্ধ্য আইন জারী করে নিহতদের লাশ অপসারন করা হয়।

কয়েকটি যুদ্ধে গেরিলাদের সাফল্য

১৩ সেপ্টেম্বর দেপাড়া ব্রীজের কাছে পুনরায় গেরিলারা পাক বাহিনীর মুখোমুখি হন। সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত স্থায়ী এই যুদ্ধে বিজয় পাল শহীদ হন। ৩ জন পাক সেনা ও ৫ জন রাজাকার নিহত হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর জীবন মুখার্জী ও ললিত মোহন পুনরায় বিষ্ণুপুর এসে আগের প্রস্তাব উত্থাপন করলে বাহিনী প্রধান রফিক সাফ জানিয়ে দেন, তাঁরা যদি তৃতীয়বার এই প্রস্তাব নিয়ে আসেন তাহলে জীবন নিয়ে ফিরে যেতে পারবে না। বাহিরদিয়ার মানস ঘোষ ও তার বাহিনী এই প্রস্তাব গ্রহন করে পাক বাহিনীকে সহায়তা দিয়ে ভারতীয় সম্প্রসারনবাদ মোকাবেলার লাইন গ্রহন করেন।

মধ্য অক্টোবরে গেরিলাদের জন্য কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। ভারত প্রত্যাগত পাক বিমান বাহিনীর কর্পোরেল আমজাদুল হকের বাহিনী বিষ্ণুপুরের গেরিলাদের সাথে যোগ দেন। সংগ্রাম কমিটি সমর্থিত মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার ও আবুল হোসেনের নেতৃত্বে আরো ৭/৮ জন এই বাহিনীতে যোগ দেয়। ইতিমধ্যে তাজুল ইসলাম ভারত থেকে ফিরে আলাদা বাহনী গঠন করে যুদ্ধে অংশ নেন। তাজুল ইসলাম ২১ অক্টোবর পিসি কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেনকে সাথে নিয়ে ভারত থেকে ফিরে আসেন। ২৭ অক্টোবর রাতে অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন নিহত হন। তার হত্যাকান্ডের ঘটনাটি এখনও রহস্যাবৃত। শহীদ এই বুদ্ধিজীবির পরিবার এখনও জানেন না, কেন, কারা, ছাত্রপ্রিয় জাঁদরেল এই অধ্যাপককে হত্যা করেছিল? এ বিষয়ে সন্দেহের তীর্যক আঙ্গুল রফিক বাহিনীর দিকে বিদ্ধ করেন কেউ কেউ। বাহিনী প্রধান রফিক শ্রদ্ধেয় এই অধ্যাপকের হত্যার ঘটনায় তার বাহিনীর কেউ জড়িত নয় বলে একাধিকবার জানিয়েছেন।

১৫ অক্টোবর ভাটছালা ব্রিজের কাছে পাক বাহিনীর সাথে গেরিলাদের একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে কোন পক্ষেরই তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ৩০ অক্টোবর গোটাপাড়া ইউনিয়নের বাবুরহাট বাজারে পাক বাহিনী ও রাজাকারদের সম্মিলিত বাহিনী সর্বশক্তি নিয়ে রফিক বাহিনীর মুখোমুখি হয়। চিরুলিয়াবিষ্ণুপুরের মুক্তিযুদ্ধে এটি ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী লড়াই। ঐ দিন সকালেই পাক বাহিনী ভৈরব নদী পেরিয়ে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে বাবুরহাটে গেরিলাদের শক্ত অবস্থানের ওপর হামলা চালায়। সুরক্ষিত অবস্থান থেকে পাল্টা আক্রমনে পাক বাহিনীর অগ্রবর্তী অংশ দিগি¦দিক পালিয়ে যায়।

পাক হানাদারদের অন্য অংশটি বাবুরহাটের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বাজারের কাছাকাছি বাংকারে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকারদের ইউনিফর্ম পরে অপেক্ষা করছিল। এর ফলে পাক বাহিনী বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। আকবর নামের কিশোরের মাথায় কার্তুজের বাক্স তুলে দিয়ে পাক বাহিনী এগুতে থাকে। ব্রিজের কাছাকাছি যেতেই কিশোরটি খালে লাফিয়ে পড়ে। পাক বাহিনী গেরিলাদের গুলিবৃষ্টির মধ্যে পড়ে। অতর্কিত এই আক্রমনে একজন ক্যাপ্টেনসহ ৪ হানাদার সেনা ও ৩ রাজাকার নিহত হয়।

৯ নভেম্বর গেরিলাদের সাথে পাক বাহিনীর আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ঐ দিন ভৈরব নদী অতিক্রম করে ৩ মাইল দুর থেকে মর্টার শেলিং করতে করতে পাক বাহিনী এগুতে থাকে। বাবুরহাটে পৌছলে গেরিলারা তিনদিক থেকে হানাদারদের ঘিরে ফেলে। পাক বাহিনী মরিয়া হয়ে গুলি বর্ষন করতে থাকে। চারদিক থেকে গেরিলারা সাঁড়াশি আক্রমন রচনা করে। মাত্র দেড় থেকে দুই ঘন্টা স্থায়ী এই যুদ্ধে ৫ জন পাক সেনাসহ অগনিত রাজাকার নিহত হয় এবং আল শামস’র একজন সদস্যকে জীবন্ত ধরে ফেলা হয়। একজন পাক সেনাকে ধাওয়া করে ইসমাইল হোসেন (মেজো) হাতাহাতি যুদ্ধে একটি হেভি মেশিনগান (এমএমজি) ছিনিয়ে নেন। বিষ্ণুপুর এলাকার যুদ্ধে এটি ছিল একেবারেই সনাতনী মুখোমুখি যুদ্ধ। এদিন পালাতে গিয়ে পাক বাহিনীর কয়েকজন গ্রামবাসীর গনপিটুনীতে নিহত হয়।

মুজিববাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সাথে লড়াই

৩ ডিসেম্বর পাকভারত যুদ্ধ শুরু হলে পাক বাহিনীকে বাগেরহাট থেকে সরিয়ে নিয়ে খুলনায় নিয়োগ দেয়া হয়। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় বাহিনী ও মুজিব বাহিনীর সদস্যদের একটি যৌথ দল নিয়মিত টহল দানকালে বিষ্ণুপুর গেরিলাদের সহযোগী মজিবরের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করলে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। মজিবর ও ইসমাইল হোসেন (মেজো) বাগেরহাটপিরোজপুর সড়কে এ্যামবুশ করে একটি ট্রাকে হামলা চালিয়ে দু’জন ভারতীয় সৈন্যকে হত্যা করে।

১৬ ডিসেম্বর দেশ মুক্ত হলে বিভিন্ন দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে বাগেরহাট শহরে প্রবেশ করতে থাকে। কামরুজ্জামান টুকুর নেতৃত্বে মুজিব বাহিনী শহরে অবস্থান নেয় এবং মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আসেন মেজর জয়নুল আবেদীন, পরে আসেন ক্যাপ্টেন নোমান উল্লাহ। ১৭ ডিসেম্বর বিষ্ণুপুরের গেরিলারা পিসি কলেজে ক্যাম্প করে। কয়েকজন গেরিলাকে মুজিব বাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে রেষ্ট হাউসে বন্দী করে রাখে। এ ঘটনার পরে রফিকের নেতৃত্বে গেরিলারা পুনরায় বিষ্ণুপুরে ফিরে যায় এবং পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মুজিব বাহিনীর ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পানিঘাটের কাছে রেকি করতে আসা মুজিব বাহিনীর অশোক ও জাহাঙ্গীরকেও তারা আটক করে।

নতুন লড়াই শুরু হয়েছে

রফিক বাহিনী এ সময় ঘোষনা করে জনগনতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা কায়েমের লড়াই শেষ হয়নি। পাকিস্তানীদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে দেশ ভারতীয় সম্প্রসারনবাদের কবলে পড়েছে। নতুন লড়াই শুরু হয়েছে। ডিসেম্বরের শেষে পানিঘাট এলাকায় ভৈরব নদীতে গানবোটে অবস্থান নেয়া ভারতীয় সেনা বাহিনীর সাথে গেরিলাদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। গেরিলাদের আক্রমনের তীব্রতার মুখে ভারতীয় বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধে উভয় পক্ষে তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি না হলেও এর সুদুরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। উত্তরকালে এসব ঘটনা ভারত বিরোধিতার ক্ষেত্রে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে অন্যতম উপাদান হিসেবে কাজ করেছে।

জানুয়ারীর প্রথম সপ্তায় আহত পায়ে গ্যাংগ্রিন হয়েছেএ আশংকায় বাহিনী প্রধান রফিকুল ইসলাম খোকন চিকিৎসার জন্য ঢাকায় চলে যান। ৩১ জানুয়ারী রাশেদ খান মেননের উপস্থিতিতে ‘টোকেন’ হিসেবে মহকুমা প্রশাসকের কাছে বিষ্ণুপুরের গেরিলারা কিছু অস্ত্র জমা দেন। পরবর্তীকালে ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে রক্ষী বাহিনীর তৎপরতা ও পার্টির সিদ্ধান্তে বাগেরহাট টেনিস গ্রাউন্ডে সংরক্ষিত অস্ত্রের ভান্ডার আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও যশোরের তৎকালীন জিওসি ব্রিগেডিয়ার আবুল মঞ্জুর বীরোত্তমএর (পরবর্তীকালে মেজর জেনারেল এবং ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সংঘটিত সেনা অভ্যূত্থানে নিহত) উপস্থিতিতে জমা দেয়া হয়।

চিরুলিয়াবিষ্ণুপুরের মুক্তিযুদ্ধ :: কয়েকটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য

ষাট দশকের প্রগতিশীল বাম ধারার ছাত্র নেতৃবৃন্দ মূলত: চিরুলিয়াবিষ্ণুপুর অঞ্চলের গেরিলা যুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। তাঁরা তখন মাওসেতুং ও ভিয়েতনাম গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশল পাঠ করতেন। বলা যায়, প্রচন্ড প্রভাবিত ছিলেন। রফিক বাহিনীর যোদ্ধাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যুদ্ধ কৌশল, আক্রমনধারা রচনা ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী এবং প্রথা বহির্ভুত। সনাতনী যুদ্ধের কলাকৌশল তারা প্রায় অনুসরনই করেননি। যদিও প্রথম দিকে চোরাগোপ্তা হামলার পাশাপাশি আগষ্ট মাস থেকে পাক হানাদারদের সাথে তারা কয়েকটি মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন।

যে কোন যুদ্ধ জয়ের জন্য তাদের কৌশলের মধ্যে যে সব অত্যাবশ্যকীয় শর্ত ছিল, তা হচ্ছে

. জনগনের ব্যাপক সমর্থন;

. গেরিলাদের অনেকগুলি আশ্রয়স্থল;

. অস্ত্রসহ বিভিন্ন উপকরনের নিয়মিত সরবরাহ;*

. বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত তাত্ত্বিক আলোচনা ও ক্লাস চালু রাখা;

. শত্রুপক্ষের গোপন খবর সংগ্রহের জন্য একটি ছোটখাটো ইউনিট;

. বাহিনীর শৃঙ্খলা কঠোর নিয়ন্ত্রনে রাখা;

*তৃতীয় শর্তটি ছিল দুর্লভ। মনে রাখতে হবে, বাহিনীর গেরিলারা দেশের অভ্যন্তরে থেকেই অস্ত্র ও উপকরন সংগ্রহ করেছেন।

মূলত: জনগনের ব্যাপক সমর্থন নিয়ে এবং জনগনকে সম্পৃক্ত করেই এই বাহিনী গেরিলারা প্রতিরোধ যুদ্ধ সংগঠিত করেছিলেন। এভাবেই তারা একাধিক যুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদারদের পরাজিত করেন এবং এলাকা শত্রুমুক্ত রাখতে সক্ষম হন। পার্টির যুদ্ধ সংঘটনের নীতি ও প্রস্তুতি সম্পর্কে ১৯৮৯ সালে অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক বিচিত্রা’র সাথে এবং ব্যাক্তিগত সাক্ষাতকারে রফিকুল ইসলাম খোকন বলেছিলেন, ‘সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই আমাদের প্রস্তুতি ছিল। জনগনের শক্তি ছিল আমাদের মূল রাজনৈতিক শক্তি। শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষনের মধ্য দিয়ে সবকিছুই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঐ ভাষণ ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সংকেত। এছাড়া পার্টির নির্দেশ তো ছিলই। শত্রুর অস্ত্র দখলের মাধ্যমেই আমরা শত্রুদের খতম করেছি। জনগনের মাঝে আমরা সব সময় অবস্থান করেছি, তারা এবং আমরা ছিলাম পরস্পরের পরিপূরক, কখনোই তাদের পরিত্যাগ করিনি এবং পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে আশ্রয় নেইনি। শ্রেনী দ্বন্দ্ব মীমাংসার জন্যই যুদ্ধ করেছিলাম এবং বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে গনযুদ্ধের আবহ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলাম”।।

 

তথ্যসূত্র:

. সাপ্তাহিক দক্ষিন বাংলার কয়েকটি সংখ্যা

. এই নিবন্ধকার’র আজকের কাগজএ প্রকাশিত নিবন্ধ ‘চিরুলিয়বিষ্ণুপুরের মুক্তিযুদ্ধ’

. সাপ্তাহিক বিচিত্রা’য় প্রকাশিত একটি নিবন্ধ

. মুক্তিযোদ্ধা জুবায়ের নোমা’র ডায়েরির কয়েকটি পাতা

. বিষ্ণুপুরের কয়েকজন গেরিলা যোদ্ধার সাথে আলাপচারিতা