Home » শিল্প-সংস্কৃতি » স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব :: কয়েকটি ভালো ছবির গল্প

স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব :: কয়েকটি ভালো ছবির গল্প

ফ্লোরা সরকার

last 6আমাদের সব থেকে বড় যে সমস্য তা হলো, আমরা কোনো কাজ শুরু করতে পারি সমাপ্তি টানতে পারিনা। শেষ করতে পারলেও তড়িঘড়ি করে তা করা হয়। এবারের চলচ্চিত্র উৎসবেও ঠিক তাই হতে দেখা গেলো। উৎসবের প্রথম দিনগুলোতে সিডিউল মেনে ছবি দেখানো হলেও, শেষের দুদিন তা আর দেখা গেলোনা। গত ১১ ডিসেম্বর উৎসবের সমাপ্তি ঘটেছে। এমনকি ফেসবুকের নিয়মিত সংবাদ বুলেটিনও পাওয়া যায়নি শেষের দিকে। সিডিউল বিপর্যয়ের কারণে বেশ ভালো ভালো ছবি থেকে দর্শক বঞ্চিত হয়েছেন। আশাকরি ভবিষ্যতে উৎসব কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে সচেষ্ট থাকবেন। গত পর্বের আলোচনায় আমরা ইরানের ছবি ‘মোর দ্যান টু আওয়ারস’ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলাম। আমাদের এই পর্বে এই ছবি সহ আরো অন্যান্য ছবি নিয়ে আলোচনা করা হবে।

একটা সমাজব্যবস্থায় যখন নাগরিক সুবিধাঅসুবিধাকে বিবেচনার বাইরে রেখে, অনড় কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়, তখন নাগরিকেরা কী নিদারুণ সমস্যার মুখোমুখি হয়, তারই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে আলি আজগার পরিচালিত ‘মোর দ্যান টু আওয়ারস’ ছবিতে। ছবির শুরুতেই আমরা দেখি বিবাহবর্হিভূত এক দম্পতি গভীর রাতে, গাড়িতে হাসপাতালের দিকে যাচ্ছে। নারীটি অসুস্থ, অপারেশান প্রয়োজন। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের বিয়ের সার্টিফিকেট ছাড়া অথবা দম্পতির বাবামা’র অনুমতি ছাড়া অপারেশান করতে নারাজ, কারু রাষ্ট্রীয় আইনে তা নেই। যে হাসপাতালেই তারা যায় সেখানেই তাদের এ কথাই জানানো হয়। যেহেতু বিয়ের বৈধ কোনো কাগজপত্র তাদের সাথে নেই এবং তাদের বাবামাও বিষয়টি জানেনা আর অত রাতে জানানোও সম্ভব না, ফলে তারা কি করবে ভেবে না পেয়ে দিকহারা হয়ে গাড়িতে ঘুরতে থাকে। মেয়েটি ক্রমেই অসুস্থ হতে থাকে। সে তার স্বামীকে জানায়, বিষয়টা মেয়েটির মাকে জানানো উচিত, নাহলে তার বেঁচে থাকাই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। স্বামী রাজি হয়না, কেননা জানাজানি হলে তা আরো জটিল আকার ধারু করবে। ছবির শেষে দেখি, একটা জায়গায় গাড়ি থামে (মেয়েটিই থামতে বলে), মেয়েটি গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলে, ‘সে তার মা’কে মোবাইলে জানাবে’। ছেলেটি অসহায়ের মতো গাড়িতে বসে থাকে। বেশ কিছুক্ষন পর, ছেলেটি লক্ষ করে মেয়েটি তখনও গাড়িতে ফিরছেনা। সে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে মেয়েটির খোঁজ করে, কিন্তু তাকে আর পাওয়া যায়না। ছবি শেষ হয়। আমরা বুঝে যাই, আইনের কঠর বেড়াজালে নাগরিকেরা এভাবেই হারিয়ে যায় একসময়, সব দেশে, সবকালে।

দারিয়া রাজুমনিকোভা পরিচালিত রাশিয়ার ছবি ‘নট এ ওয়ার্ড অ্যাবাউট ইওর মাদার’ মা আর মেয়ের সম্পর্কের এক দুর্দান্ত ছবি। মা আর মেয়ের মাঝে, যে অলিখিত এক নিবিড় বন্ধন থাকে, যে বন্ধনের ছেদ কখনো হয়না, তা ছবিতে অসাধারু দক্ষতায় পরিচালক তুলে ধরেন। মেয়েটির একজন ছেলেসঙ্গী আছে, কিছুদিনের মধ্যেই তাদের বিয়ে হবার কথা, তবে তখনও মেয়েটি তার মা’য়ের সঙ্গে আছে। মেয়ে তার বয়স্কা মা’কে ছেড়ে থাকার কথা ভাবতে পারেনা। অন্যদিকে, ছেলেটিকেও সে প্রচন্ড ভালোবাসে। দুই ভালোবাসার দ্বন্দ্ব কথার চেয়ে না বলা কথা দিয়ে পরিচালক চমৎকার করে উপস্থাপন করেন। যেখানেই মা দাঁড়িয়ে থাকেন বা বসেন, মেয়েটির ছায়া যেন সেখানেই দেখা যায়। এমনকি ছেলেটির সঙ্গে ভালোবাসার চরম মুহূর্ত্তেও তার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। ছবির শেষে আমরা দেখতে পাই, মেয়েটি ছেলেটির কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় জানায়, হয়তো কোনোদিন তাদের বিয়ে হবে এবং এখানেই দুই প্রেমিকপ্রেমিকার গল্পটা যেন ইচ্ছকৃত ভাবেই পরিচালক অসমাপ্ত রেখে দেন। পরের শটে দেখি, সমুদ্রের ধারে বৃদ্ধা মা বসে আছেন, মেয়েটি চমৎকার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের সঙ্গে ছোটবেলার মতো মায়ের চারপাশে নেচে বেড়ায়যে মেয়েটি বড় হবার পরেও যেন আর বড় হতে পারেনা। মেয়েটি যেন সার্বজনীন এক মেয়ে হয়ে ওঠে, যারা মায়ের কাছে সন্তান হিসেবেই থেকে যায়।

টমাস জানাসেক এর চেকস্লোভিয়ার ‘লিটল ব্লক ড্রেস’ সবাক যুগের নয় মিনিটের যেন এক নির্বাক ছবি। কোনো কথা ছাড়া, সাদাকালোয় নির্মিত ছবিটি আমাদের বেশ অবাক করে। গল্প বুঝতেও বেগ পেতে হয়না। পুরুষ যখন কোনো নারীকে তার অধিকারে নিয়ে আসে, ঠিক তখন থেকে শুরু হয় সেই নারীর প্রতি তার উদাসীনতা বা নিষ্পৃহতা ঠিক এই বিষয়টিকেই কেন্দ্র করে ছবিটি নির্মিত। তবে ছবির গল্প আমাদের আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে দেখায়, কোনো সচেনতন নারী পুরুষের এই নিষ্পৃহতাকে খুব সহজে ছেড়ে দেয়না এবং পুরুষকে তার প্রাপ্ত প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে ছাড়ে। মাত্র নয় মিনিটে বিশাল এই বিষয়টিকে ধারু করা প্রশংসনীয় কাজ বটে।

ডেনমার্ক ও আইসল্যান্ডের ‘ওয়েল ভ্যালি’ ছবিটি এবারের উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। ছবিটি ভালো হলেও, ঠিক শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে পুরস্কৃত হবার মতো কিনা সন্দেহ থেকে যায়। কেননা, ছবিটি দুই নিঃসঙ্গ ভাইয়ের সাধারু এক গল্প নিয়ে নির্মিত। দুজন তাদের বাবামা’য়ের সঙ্গে খোলাখুলি কোনো কথা বা আলোচনা করতে পারেনা। নিঃসঙ্গতার শুরু হয় এখান থেকে। ছবির শেষে দুজনেই উপলব্ধি করে, স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তার কথা, কেননা, অস্বচ্ছতা তাদের দুজনের জীবনেই অকল্যাণ ডেকে নিয়ে এসেছিলো।

এবারের উৎসবে, বেশকিছু প্রামাণ্য ছবি দেখানো হলেও, ক্রিস্টিনা লিন্ডস্ট্রম ও মউদ নিকানসার পরিচালিত ‘পা’মে’ ছবিটি ছিলো বেশ ব্যতিক্রম। শুধু সুইডেনের ছবি বলেই নয়, ছবিটি, সুইডেন এবং বর্হিবিশ্বের অত্যন্ত জনপ্রিয়, দুবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ওলফ পা’মে পা’মের (৩০ জানুয়ারি, ১৯২৭ ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৬) হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে নির্মিত এবং যে হত্যাকান্ডের হত্যাকারীকে আজও উদঘাটন করা যায়নি। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ না করলেই না, বিষয়টি হলো ছবিটি জাতীয় যাদুঘরের বিশাল হলে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হলেও, দর্শকের সমাগম ছিলো খুবই স্বল্প। সারা হলে, খুব বেশি হলে আট থেকে দশজনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ ছবি দেখা থেকেও আমাদের দর্শক (বিশেষত শিক্ষিত দর্শক, যারা এসব উৎসবে আগ্রহের সঙ্গে উপস্থিত হন) কেনো বিরত থাকলেন তা বোধগম্য হয়নি। এবার ছবির বিষয়ে যাওয়া যাক। ছবিটি ওলফ পা’মেকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও, পরিচালকদ্বয় সেই সময়ের সুইডেন এবং পারিপার্শ্বিক বিশ্ব রাজনৈতিক ঘটনাসমূহ বিশদ ভাবে উপস্থাপন করেছেন। পা’মের জীবন এবং তার হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে, বিশ্ব রাজনৈতিক, মতাদর্শিক ভেদাভেদ, ঈর্ষা, ক্ষমতার আগ্রাসী রূপ ইত্যাদি ছবিতে স্বচ্ছভাবে ফুটে উঠতে দেখা যায়। ছবির শুরুতে পা’মের ছোটবেলা থেকে অভিজাত পরিবারের বেড়ে ওঠার একটা সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আমরা দেখতে পাই। ১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত সুইডেনের সব থেকে প্রচীন রাজনৈতিক দল সোশাল ডেমোক্রেটের সদস্য ছিলেন পা’মে। ১৯৫৭ সালে এম.পি হিসেবে নির্বাচিত হন, ১৯৬৭ তে হন শিক্ষামন্ত্রী, ১৯৬৯ সালে প্রথম এবং ১৯৭৬ এ দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। পা’মে শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে সুইডেনকে যেন এক স্বর্ণযুগ প্রদান করেন। একদিকে যেমন শিক্ষার হারের বৃদ্ধি ঘটে, অন্যদিকে বেকারত্বের হার নেমে যেয়ে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে এবং গৃহায়ন সমস্যার সফল সমাধান করেন। আমরা যদি পা’মের সময়টা লক্ষ্য করি তাহলে বুঝতে অসুবিধা হয়না যে, এটা সেই সময় যখন পৃথিবীতে তৃতীয় যুদ্ধ নামে খ্যাত ঠান্ডা লড়াইয়ের উত্তপ্ত সময় অতিক্রান্ত হচ্ছে। তবে পা’মে, ঠান্ডা লড়াইয়ের কোনো পক্ষ, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন বা যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষের সমর্থন করেন নাই, বরং দুই পক্ষের কড়া সমালোচক ছিলেন তিনি। তার এসব স্পষ্ট ভাষণই হয়তো তার জীবনের কাল হয়েছিলো। শুধু তাই নয়, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের গভীর সমর্থক ছিলেন। ছিলেন ভিয়েতনাম যুদ্ধের কড়া বিরোধী। পশ্চিমের তিনি প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি ফিদেল ক্যাস্ট্রোর কিউবায় গমন করেন। পিনোচে আমলের কড়া সমালোচক ছিলেন। কেনিয়ার বিখ্যাত সাহিত্যিক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো সা¤্রাজ্যবাদের সব থেকে বড় অস্ত্রের নাম দিয়েছেন ‘সাংস্কৃতিক বোমা’। যে বোমা, নিজেদের ভাষা, পরিচয়, ঐক্য, সংগ্রামের ঐতিহ্য, নিজেদের ক্ষমতা এবং সর্বপোরি খোদ নিজেদের ওপর থেকেই বিশ্বাস নষ্ট করে দেয়। এই বোমা, নিজেদের অতীতকে অর্জনহীন এক পোড়োভূমি বলে পরিচয় করাতে সচেষ্ট এবং মানুষকে তার নিজ ভূমি থেকে বিচ্ছিন্নতা লাভের উৎসাহ যোগায়। পা’মে ছিলেন এসব বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক একজন মানুষ। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রসমূহ, উপনিবেশ মুক্ত দেশসমূহ এবং তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোর সমর্থন যুগিয়ে গেছেন মৃত্যুর আগে পর্যন্ত। সব থেকে বড় যে বিস্ময় ছবিতে দেখা যায়, তা হলো অত্যন্ত সাধারু ভাবে তার হত্যার ঘটনা। সিনেমা হল থেকে স্বস্ত্রীক বের হবার পথে, পথেই গুলিবিদ্ধ হন। একজন প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্তেও কোনো ধরণের নিরাপত্তা রক্ষী রাখার প্রয়োজন বোধ করেননি। সারা ছবিতে যত সাক্ষাতকার তার দেখা যায়, বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ দেখা যায়, তার সাধারু চলাফেরা কথাবার্তা তাকে একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাবাতে দর্শকের বেশ বেগ পেতে হয়। পৃথিবীর মহান মানুষেরা বোধহয় এমনই সাধারু হয়ে থাকেন। ছবি শেষ হয়, তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশের গরিব রাজনৈতিক সংকটপূর্ণ দেশের মতো আমাদের দেশের দর্শকরা, নিজেদের প্রধানমন্ত্রীদের কথা ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফেরেন। দুই মেরুর দুই প্রধানমন্ত্রীদের মাঝে মোটা দাগের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে এবারের উৎসবের ছবিগুলো ভালো ছিলো এবং ভবিষ্যতেও তা থাকবে বলে আশা করা যায়।।