Home » আন্তর্জাতিক » তালেবান প্রশ্নে পাকিস্তানের সব দল ও সেনাবাহিনী কি পারবে ঐক্যবদ্ধ হতে?

তালেবান প্রশ্নে পাকিস্তানের সব দল ও সেনাবাহিনী কি পারবে ঐক্যবদ্ধ হতে?

আসিফ হাসান

last 3মাত্র এক সপ্তাহ আগে ‘জিহাদি’ তৈরির কারখানা লাল মসজিদ (রেড মস্ক) ছিল পাকিস্তানের চরমপন্থীদের জন্য প্রায় অভয়ারোণ্য এবং সাধারণের জন্য অস্পৃশ দুর্গ। কঠোর পাহারায় থাকা মসজিদটির দিকে তাকাতেও ভয় পেত অনেকে। কিন্তু শুক্রবার সন্ধ্যায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। শত শত ক্রুদ্ধ বিক্ষোভকারী মসজিদটির ফটকে প্রধান মাওলানা আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে, যাকে ২০০৭ সালে তালেবান হামলা শুরুর পর থেকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি, ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকে।

তালেবান বন্দুকধারীদের হাতে ১৬ ডিসেম্বর অন্তত ১৩২ জন স্কুলশিশুসহ বিপুলসংখ্যক লোক খুন হওয়ার ফলে এই পরিবর্তন ঘটেছে। পুরো দেশ শোকে বিহ্বল হয়ে পড়ে। কেবল লাহোরে নয়, পাকিস্তানের অন্যান্য স্থানেও ক্ষোভ, ক্রোধ দেখা যায়। বিষয়টা এত বেশি ছিল যে, কেউ সাফাই গাইবার ন্যূনতম চেষ্টাও করেনি, এমনকি তালেবান পক্ষ থেকেও বিবৃতি দিয়ে এই ঘটনায় তাদের ‘হৃদয় ভেঙে’ যাওয়ার কথাও ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরাও এক মঞ্চে সমবেত হয়েছেন। এই ঘটনার কয়েক মাস আগে থেকে পাকিস্তানের নেতারা রাজনৈতিক যুদ্ধ খেলায় মেতেছিলেন। সম্ভবত সেই খেলায় তারা বিরতি টেনেছেন। কিন্তু পেশোয়ার স্কুলের ঘটনায় শোক, ক্রোধ সৃষ্টি হওয়ায় উগ্র চরমপন্থীদের ব্যাপারে পাকিস্তানের সব স্তরের মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়ে যায়। বিক্ষোভগুলো খুব বড় হয়েছে, এমন নয়। কিন্তু মানুষ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। বিক্ষোভের নেতারা মনে করছেন, জনগণ তাদের সমর্থন দেবে।

তবে বিশ্লেষকেরা এখনো সন্দিহান, এই ঘটনা সত্যিকার অর্থেই পাকিস্তানকে বদলাবে কি না তা নিয়ে। সহিংস বিভাজন, সাংস্কৃতিক যুদ্ধ এবং সামরিক বাহিনীর বিশেষ অধিকার থাকায় দেশটির বদলানো সহজ নয়। আগেও অনেকবার প্রায় কাছাকাছি মাত্রার শোকে মুহ্যমান হয়েছিল দেশটি। বিশেষ করে ২০০৭ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো নিহত হওয়ার সময় কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনো পক্ষ থেকে ‘দানবীয়’ শক্তিকে প্রতিরোধ করার প্রয়াসে বাধা এসেছিল।

পাকিস্তানে তালেবানদের উত্থানের পেছনে শুধু বর্তমান বা অদূরের অতীত দায়ী তাই নয়, এটি দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। আর এ সমস্যাটি শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রপাকিস্তান বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধের মধ্যদিয়ে। এরপরে দীর্ঘ ইতিহাস। এরপরের ইতিহাস আরও ভয়াবহ। পাকিস্তানে রাজনৈতিক দলগুলোর আশ্রয়প্রশ্রয় এবং সামরিক বাহিনী ও ভয়াবহ ক্ষমতাশালী আইএসআই নানা সময়ে তাদের ব্যবহার করেছে, লালন করেছে। আর এ পথেই বেড়ে উঠেছে ওই বিষবৃক্ষ। অতীতে তালেবানদের নানা সহিংস এবং রক্তাক্ত ঘটনা সত্ত্বেও পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো যেমন এক হতে পারেনি, তেমনি সামরিক বাহিনীও এক হতে পারেনি তালেবানদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই শুরু করতে। কিন্তু পেশোয়ারের মর্মান্তিক ঘটনার কারণেই প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ তার চরম শত্রু ইমরান খানসহ অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকতে পেরেছেন ওই পেশোয়ারেই। আর সেনাবাহিনীও জানিয়ে দিয়েছে, এনাফ ইজ এনাফ অর্থাৎ যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। এরপরেও প্রশ্ন থেকে যায় পাকিস্তান কি পারবে ঐক্যবদ্ধ হতে ওই মাসুম বাচ্চাদের মৃত্যুর মধ্যদিয়েও?

চলতি বছরের প্রায় পুরোটাই রাজনৈতিক বিরোধীদের আন্দোলনে স্থবির হয়ে থাকা প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ অবশ্য বলেছেন, এবার পরিস্থিতি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। গোলাগুলি বন্ধ হওয়ার আগেই তিনি পেশোয়ারে ছুটে গেছেন। তিনি ‘ভালো’ ও ‘মন্দ’ সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যকার পার্থক্য বাদ দিয়ে সবার বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এটা একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। কারণ পাকিস্তান সেনাবাহিনী দীর্ঘ দিন ধরে উগ্রপন্থী গ্রুপগুলোর মধ্যে কাউকে কাউকে ‘ভালো’ তকমা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে বিরত ছিল। পাকিস্তানে সেনাবাহিনী এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই দুটি বিশেষ বিভাগ। অনেকে মনে করেন, দেশটির নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে এই দুটি বিভাগের বিশেষ ভূমিকা থাকে। তাদের কারণেই অনেক কার্যক্রম মাঝপথেই ঠেকে গেছে।

এবার সাধারণ মানুষের সহানুভূতিও সেনাবাহিনীর পক্ষেই রয়েছে। কারণ পেশোয়ারের আর্মি পাবলিক স্কুলটির ছাত্ররা প্রধানত সামরিক বাহিনীর পরিবার থেকে আসা। তারাও এবার শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছে বলে মনে হচ্ছে।

পাকিস্তানে কেন এই শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি? এমনকি এবারও এমন নিষ্ঠুরতার পরও রাজপথে উপচে পড়া স্রোত দেখা যায়নি। রাজপথে তালেবানবিরোধী হামলার চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে ফেসবুক আর টুইটারে। এর অন্যতম কারণ পাকিস্তানের সিভিল সোসাইটি এখনো দুর্বল ও অসংগঠিত। তারা তালেবান এবং নিরাপত্তা বাহিনীর চরদের ভয়ে ভীত।

যাই হোক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের নেতৃত্বে একটি বহু দলীয় রাজনৈতিক কমিটি গঠিত হয়েছে। তারা এক সপ্তাহের মধ্যে সম্ভাব্য করণীয় ঠিক করবে। এটা একটা শুভ উদ্যোগ। দলাদলি থেকে মুক্ত হয়ে অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ পাকিস্তানের ইতিহাসে এই উদ্যোগটি একটি মাইলফলক।

এদিকে পাকিস্তান সরকার ইতোমধ্যে দণ্ডপ্রাপ্তদের ফাঁসি কার্যকর শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু ফাঁসি দিয়ে সমস্যাটির সমাধান হবে না বলেই মনে হচ্ছে। সকালে স্কুলে গিয়ে বিকেলে কফিনে করে বাসায় ফেরার সমস্যার সমাধান ফাঁসিতে হবে না। পাকিস্তান সরকার এবং জনগণকে সাহসী হতে হবে। নিজেদের এবং দেশকে বাঁচানোর জন্য তাদের অভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে হবে। কিছু কিছু ব্যাপারে তাদের একমত হতে হবে। সেটা করতে পারলে বাইরের শক্তি তাদের ওপর আছর করতে পারবে না।।