Home » শিল্প-সংস্কৃতি » মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিকৃত বয়ান (প্রথম পর্ব)

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিকৃত বয়ান (প্রথম পর্ব)

ফ্লোরা সরকার

last 6যুদ্ধভিত্তিক যেকোনো চলচ্চিত্র নির্মাণের অর্থ তার ঐতিহাসিক অনিবার্যতাকে সঙ্গে রাখা। যে কোনো যুদ্ধেরই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থাকে। তেমনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নির্মিত চলচ্চিত্র যখন দেখি তখন তার সঠিক ইতিহাসের প্রতিও আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে। আমাদের দেশ ছাড়াও ভারতেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ছবি নির্মিত হয়েছে। এই ধরণের ছবি নির্মাণের জন্যে আমরা অবশ্যই আনন্দিত। স্বাগত জানাই। কিন্তু একই সঙ্গে যখন এসব ছবির কাহিনীতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস খুঁজে না পাই তখন স্বাভাবিক ভাবেই এসব ছবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠে। সাম্প্রতিক সময়ে এই রকম দুটি ছবি আমরা দেখতে পাই। যেখানে সঠিক ভাবে বাংলাদেশ বা তার মুক্তিযুদ্ধকে পাওয়া যায় না। ভিন্ন এক বাংলাদেশ, ভিন্ন এক মুক্তিযুদ্ধ দেখা যায়। যখন কোনো ছবি এভাবে নির্মিত হয় তখন বাংলাদেশের চোখ দিয়ে নয়, ভারতের চোখ দিয়েই সেসব ছবি নির্মিত হতে দেখি। আমাদের এবারের চলচ্চিত্র বিষয়ক আলোচনায়, এমন দুটি ছবি নিয়ে দুই পর্বে আলোচনা করা হবে। প্রথম পর্বে “ চিলড্রেন অফ ওয়ার” এবং দ্বিতীয় পর্বে “ গুন্ডে ” ছবি নিয়ে আলোচনা করবো।

চিলড্রেন অফ ওয়ার’ শুরু থেকে যে শব্দটির জন্যে বিতর্কিত হয়েছিলো সেটা হলো ‘বাস্টার্ড’ শব্দটি নিয়ে। ছবিটি মুক্তি পাবার আগে যখন ‘চিলড্রেন অফ ওয়ার’ এর সঙ্গে ‘দা বাস্টার্ড চাইল্ড’ যুক্ত করা হয় তখন ইন্ডিয়ান মোশান পিকচার্স প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ক্রমাগত বাঁধা আসতে থাকে ‘বাস্টার্ড’ শব্দটি তুলে ফেলার জন্যে। ফলে মুক্তি পাবার আগেই ছবিটিকে নিয়ে বেশ বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয় ছবির চিত্রনাট্যকার এবং পরিচালক মৃত্যুঞ্জয় দেবব্রতকে। গত ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৩, দা নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় তিনি বেশ স্পষ্ট করে দেন বিষয়টি। তার মতে বাস্টার্ড শব্দের আভিধানিক অর্থ বিবাহবহির্ভূত সন্তান, যে সন্তানকে সমাজ অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। মৃত্যুঞ্জয় অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলেন – ‘সমাজের প্রচলিত অশ্লীল অর্থে বাস্টার্ড শব্দটি ব্যবহার করতে চাইনি ছবিতে। আমি মনে করি অন্তত তিনজন দর্শক যদি ছবিটি দেখে শব্দটির অপব্যবহার রোধে সোচ্চার হয় তাহলে এর সার্থকতা পেয়ে যাবো। অনেকটা এই মনোভাব নিয়ে আমি বাস্টার্ড শব্দটা ব্যবহার করেছি।’ যেকোনো যুদ্ধের সময় সাধারণত নারীরা যুদ্ধের অন্যতম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ধর্ষণ যার মধ্যে তার অন্যতম একটি। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে পরিচালক মৃত্যুঞ্জয় দেবব্রতের ‘চিলড্রেন অফ ওয়ার’ নির্মিত। হিন্দী ভাষায় নির্মিত ছবিটি এই বছরের ১৬ মে ভারতে মুক্তি পায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর ভিত্তি করে নির্মিত হলেও ছবিটি দেখার পর প্রশ্ন জাগে যে বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ছবিটি নির্মিত এবং প্রেক্ষাপটের যে স্থান নির্বাচন করা হয়েছে, সেই ‘বাংলাদেশ’কে আমরা কতটুকু পাই?

ছবির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে একজন সাংবাদিক আমীর ও তার স্ত্রী ফিদা, যাকে পাক বাহিনী নিয়ে যায় এবং তাদের ক্যাম্পে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করে, দুই অনাথ ভাইবোন এবং আরো কিছু মানুষের দুর্দশাকে কেন্দ্র করে। কাহিনীর সূত্রপাত ২৬ মার্চ গভীর রাতে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্যে দিয়ে। অর্থাৎ ২৫ মার্চ শেষ হয়ে ২৬ মার্চের প্রারম্ভ লগ্নে। অথচ সেই ভয়াল রাতের কোনো আঁচ বা ছায়া আমীরের বাড়িতে স্পর্শ করেনা। সে শুধু সেই ঘোষণা পত্রটি টাইপ রাইটারে টাইপ করে একটি বালকের হাতে দেয় নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেয়ার জন্যে। স্ত্রী ফিদা এসব বিষয়ে কিছুই জানেন না। একজন সাংবাদিকের বাড়ি হওয়া সত্ত্বেও বাড়ির পরিবেশ যেনো অন্যান্য আটদশটা সাধারণ নির্বিঘ্ন রাতের মতো। বাড়ির বাইরে এবং ভেতরে সব ঠিকঠাক মতো চলছে।

অথচ ২৫ মার্চ রাত এগারটায় যখন পাক বাহিনী নির্বিচার আক্রমণ শুরু করে তার এক ঘন্টার মধ্যে অর্থাৎ রাত বারটার মধ্যে বাংলার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত খবরটা দাবানলের মতো ছুটে যায়। স্বাধীনতা ঘোষণার ঐ পত্রটি ছাড়া আর কোনো প্রেক্ষাপট বা আবহ আমরা ছবির শুরু থেকে পাইনা। তারপর হঠাৎ মাঝরাতে ক্যাপ্টেন মালিক এসে হাজির হন, যমদূতের মতো। স্বামীকে আটকে তার সামনেই ফিদাকে ধর্ষণ করে ক্যাপ্টেন মালিক এবং ধর্ষণের চিত্রায়ন যতটুকু না ধর্ষণ বিরোধী, তার থেকে আরো অনেক বেশী বানিজ্যিক উদ্দেশ্য প্রণোদীত। ফিদাকে তারা ক্যাম্পে নিয়ে যায় এবং আমীর পাকিস্তান বিরোধী জানা সত্ত্বেও ক্যাপ্টেন তাকে রাখে অক্ষত, কেননা কাহিনীর শেষে নায়কনায়িকার মিলন প্রয়োজন। এরপর আমরা ইন্দিরা গান্ধীর কিছু নিউজ রিল দেখতে পাই, যেখানে তিনি বিবিসিতে সাক্ষাৎকার দেন। যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় ইতিমধ্যে কিন্তু কোনো মুক্তিবাহিনীর নিশানা নেই। যুদ্ধের কোনো ফুটেজ তো নয়ই। শুধু একটা পুরোনো দালানের সামনে এক যুবক কিছু বক্তৃতাবিবৃতি দিয়ে যায়। সামনে দাঁড়ানো মানুষজন সেই সময়ের নয় এই সময়ের পোশাকে দাঁড়িয়ে সেই বক্তৃতা শোনে। ছবিতে বেশ কয়েকবার দৃশ্যটি দেখানো হয়। মনে হয় সেখানে দাঁড়িয়েই তারা কেবল যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যুদ্ধ যখন মধ্য গগনে তখনও। নায়ক আমীর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেও যুদ্ধ করতে তাকে আমরা দেখিনা।

দুই অনাথ তরুণ ভাইবোন দিশাহারা হয়ে ঘুরে বেড়ায় শুধু। তাদের গন্তব্য কিছু বোঝা যায়না। মাঝে তাদের সঙ্গে আরেক পরিবারের সঙ্গে দেখা হয়, যারা কিছু পরে পাক বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ছবির অনেক পরে ভাইবোন ভারতীয় বর্ডারের কাছে এলেও ভাইটি পাকবাহিনীর হাতে মারা পরে। যুদ্ধের বিষয়ে পরিচালকের নিস্পৃহতা থাকলেও রাজাকার নিধনে বেশ সম্পৃক্ততা দেখা যায়। ছবিতে পাক বাহিনী নিধনের চাইতেও রাজাকার নিধন অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হতে দেখি। একের পর এক রাজাকারদের তালিকা দেখা যায় এবং সশরীরের নিধন নয় শুধু কলমের দাগে নিধন চলে পর্দায়। কোথাও যুদ্ধের চিহ্ন দেখা না গেলেও আক্ষরিক অর্থেই পর্দায় রক্তের বন্যা দেখা যায়। স্লো মোশানে, নান্দনিক ঢঙ্গে বেশ অনেকক্ষণ দৃশ্যটি চিত্রায়িত হতে দেখি। ছবির বেশ কিছু পরে আমরা একজন মুক্তিবাহিনীর নেতাকে পাই, যিনি তার বাড়িতেই অবস্থান করেন। মুক্তিবাহিনীর সেই প্রবীণ নেতা হিসেবে মজিদ চরিত্রে ফারুখ শেখকে দেখে দর্শক শুধু হতাশ নয়, এইরকম একটি অনুল্লেখ্য পার্শ্ব চরিত্রে তাকে কেনো অন্তর্ভুক্ত করা হলো তার কারণ খুঁজে পাওয়া যায়না। ছবিতে শুধু একজন রাজাকার আর ক্যাপ্টেন মালিক (পরে যখন ধরা পড়ে তাদের কাছে) – এই দুই ব্যক্তিকে শুধু কিছু চড় দেয়ার মাঝে মজিদ চরিত্রটিকে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়।

এবারে ছবির মূল বিষয়টির দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। যে ধর্ষণকে কেন্দ্র করে ছবির কাহিনী আবর্তিত সেই ধর্ষণের বিষয়টিকে এতো টেনে টেনে দীর্ঘায়িত করা হয় যে, ধর্ষণের ভয়াবহতার কোনো উপলব্ধি আর দর্শকের মাঝে থাকেনা। নারীদের কনসেনট্রেশান ক্যাম্পটি দেখে মনে হয় ক্যাপ্টেন মালিক সেখানে একাই একশ এবং পুরো যুদ্ধের সময়টা সে ধর্ষণ ছাড়া আর কোনো কাজ করেনি। পাকিস্তান সরকার তাকে শুধু ধর্ষণ করার লক্ষ্যে এখানে নিয়োজিত করেছে। তার কাছে যুদ্ধের কোনো খবর আসেনা, সেও কোনো খবর নেয়না। সব থেকে বড় কথা সারা নয় মাসের যুদ্ধে একমাত্র ক্যাপ্টেন মালিকের দ্বারাই নারীরা ধর্ষিত হয়, আর কোনো ক্যাপ্টেন বা মেজর দ্বারা নয়। ফলে ছবির মূল বক্তব্যের বিষয়টি অত্যন্ত একঘেয়েমিতে এসে ঠেকে। যেসব নারীরা ধর্ষিতা হচ্ছেন, তারা সেই সময়ের নয়, ভ্রু প্লাক করা, চুলের বর্তমান হেয়ার স্টাইলে এখনকার নারী।

বাংলায় ডাব করা যে প্রদর্শনী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শীত হয়েছে, সেই বাংলা যেন হিন্দী উচ্চারণে বাংলায় সংলাপ বলা। যেকোনো নৃগোষ্ঠীর আচরণ, আবেগঅনুভূতির প্রকাশ, কথা বলা,চলাফেরাবসা সবকিছুর নিজস্ব একটা বৈশিষ্ট থাকে। যে বৈশিষ্ট দেখে সেই বিশেষ নৃগোষ্ঠীকে চেনা যায়। বাংলাদেশের কাহিনী তাও মুক্তিযুদ্ধের মতো এমন বিশাল ক্যানভাসের একটি ছবি হয়েও আমরা সেখানে বাংলাদেশের কোনো বাঙালিকে দেখতে পাইনা, পাই মুম্বাই চলচ্চিত্রের কিছু এলিট চরিত্র।

যেকোনো ঐতিহাসিক কাহিনী বা চলচ্চিত্র একটি বিশেষ সময়ের বিশেষ সেই কালের সাক্ষ্য বহন করে। কালের সেই চিহ্নের কোনো লেশমাত্র ছবিতে নেই। ছাড়া ছাড়া কিছু কোলাজ দিয়ে কাহিনী সাজানো যায়, যা এই ছবিতে করা হয়েছে, কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তাকে গোছানো যায় না। ছবির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বলতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, ইন্দিরা গান্ধীর নিউজরিল ছাড়াও আমরা শুধু দেখি সেই সময়ের বাংলাদেশের পতাকা, শেখ মুজিবুর রহমান ও জয়বাংলা স্লোগান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, শুধু একটি যুদ্ধের ইতিহাসই নয়, যুদ্ধ জয়েরও ইতিহাস। যে ধর্ষণকে কেন্দ্র করে ছবির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে পরিচালক সেই ধর্ষিতা নারীদের সংগ্রামের একটা ইতিবাচক দিক তুলে ধরলে ছবিটি সামান্য কিছু অর্থপূর্ণতা পেতো। ক্রমাগত হেরে যাওয়ার অর্থাৎ শুধুই ধর্ষিত হওয়ার মধ্য দিয়ে কোনো গৌরবগাথা গাঁথা যায়না। ছবির পরিচালক যে দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে যুদ্ধ শিশু বা বাস্টার্ডদের উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, ছবিতে সেই শিশুদের ভবিষ্যত বাংলাদেশ গড়ার সামান্য ইতিবাচক ভূমিকা যদি রাখতেন, তাহলে ছবিটি একটি ভিন্ন মাত্রা পেতো। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, দেশকাল ও চরিত্র চিত্রনের অভাবের কারণে ছবিটি তাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী হয়েও ভারতীয় মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।।

(চলবে…)