Home » অর্থনীতি » সুন্দরবন ধ্বংসের সমন্বিত উদ্যোগ কার স্বার্থে?

সুন্দরবন ধ্বংসের সমন্বিত উদ্যোগ কার স্বার্থে?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

last 1জলে কুমীরসহ জলজ সকল প্রাণী আর ডাঙ্গার মানুষকেউই এখন আর নিরাপদ নয়। দক্ষিণ, দক্ষিণপশ্চিমের রক্ষাকবজ সুন্দরবনের ওপর ভর করা পরিবেশপ্রতিবেশ এবং প্রাণীকূলকে ধ্বংস করে ফেলার আয়োজন চলছে। দামামা বাজছে যেন, জলজ, বনজ, ডাঙ্গার কোন প্রাণী নিরাপদ থাকবে না। সুন্দরবন সন্নিহিত উপকূলবাসীর এখন প্রশ্ন একটাই সুন্দরবনকে ধ্বংস করার মত ঝুঁকি সরকার নিচ্ছে কেন? বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে একটি বিশ্ব ঐতিহ্য ও পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ কেন এভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মান শুরু করার পরে পাথরঘাটায় জাহাজভাঙ্গা শিল্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন ধ্বংসের কফিনে একটির পরে একটি পেরেক ঠুকে দিচ্ছে। এই কফিনের শেষ পেরেকটি হচ্ছে, বনের শ্যালা নদীতে তেলবাহী জাহাজ দুর্ঘটনার পরে সাড়ে তিন লাখ লিটার ফার্নেস ওয়েল ছড়িয়ে পড়ছে বনের বিস্তীর্ন অঞ্চলে। এর সূদুরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া নিয়ে তাবৎ মানুষ আতঙ্কিত হলেও সরকারের প্রধানমন্ত্রী, নৌ পরিবহনমন্ত্রী ও বন পরিবেশ মন্ত্রীর তেমন কোন উদ্বেগ লক্ষ্য করা যায়নি। সুন্দরবন পরিদর্শন শেষে খুলনায় সাংবাদিকদের অনেক ঘটনঅঘটন পটিয়সী নৌ পরিবহনমন্ত্রী সুন্দরবনের বিপক্ষে অবস্থান নিলেন এভাবে, ‘জংলার চেয়ে মংলা ভাল’। বন পরিবেশমন্ত্রী মোটামুটি নিশ্চিত যে, ‘ক্ষতির পরিমান যৎসামান্য, একবছরের মধ্যে কাটিয়ে ওঠা যাবে’। আর প্রধানমন্ত্রী দুর্ঘটনার পাঁচদিন পরে খুলনাঞ্চলের প্রশাসনের সাথে ভিডিও কনফারেন্সে বলেন, ‘সুন্দরবনে একটি ট্যাংকার দুর্ঘটনায় তেল ছড়িয়ে পড়েছে। এটা ঠিক, সেখানে স্থানীয় লোকজন তেল সংগ্রহ করছে, এটা বেশ কার্যকর পদ্ধতি, সেখানে লোকজন উৎসাহ নিয়ে কাজ করছে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরো সতর্ক থাকতে হবে’।

বনের প্রাণীকূলের পাশাপাশি খাদ্যচক্রের ওপরও ফার্নেস অয়েল প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। আশংকা করা হচ্ছে, এই প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে যাচ্ছে। আর এদিকে পরিবেশ ও বন মন্ত্রনালয় বলছে,‘সুন্দরবনের প্রাণী ও উদ্ভিদ আশংকামুক্ত’। এভাবে এই মন্ত্রণালয়ও অবস্থান গ্রহন করেছে সুন্দরবনের বিপক্ষে। সুন্দরবন গবেষকরা মন্ত্রণালয়ের এই দাবিকে অবৈজ্ঞানিক ও প্রতারণামূলক আখ্যা দিয়ে বলেছেন, সুন্দরবনের ক্ষতি মেনে নিয়ে এর স্থায়ী সমাধান খোজা উচিত। অন্যদিকে গত ১১ ডিসেম্বর নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় জারিকৃত নির্দেশ উপেক্ষা করে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌযান চলাচল অব্যাহত রয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর দিনগত রাতে ২টার পরে এক এক করে ১৭ টি কার্গোজাহাজ সারিবদ্ধভাবে শ্যালা নদী ধরে এগিয়েছে জয়মনিরগোলের দিকে।

সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের এ ধরনের কথাবার্তা এবং আচরন জনমনে একটি পারসেপশন তৈরী করে দিচ্ছে, তা হচ্ছে সুন্দরবন ধ্বংসের একটি টার্গেট নিয়ে সরকার এগোচ্ছে। কেন, সেটি এখনও জনগন বুঝতে পারছে না। সরকার যদি সৎ এবং আন্তরিক হন, তাহলে সে বিষয়টি জনগনের সামনে তুলে ধরাই উচিত। বর্তমান এবং ভবিষৎত মিলিয়ে সুন্দরবন এখনই যেসব ক্ষতির মুখে পড়েছেবনের ভেতরে বিভিন্ন শ্বাসমূলীয় উদ্ভিদ ধ্বংস হয়ে যাবে। জীববৈচিত্র্য বিলীন হবার আশংকা রয়েছে। শ্যালা, পশুর, বলেশ্বর নদীর পানি দুষিত হয়ে পড়েছে। ফলে জলজ প্রাণী বিশেষ করে বিরল প্রজাতির ডলফিনগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সবচেয়ে বিভীষিকাময় হয়ে উঠবে বনসংলগ্ন জনগোষ্ঠির জীবনযাপন। সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়া তেল উদ্ধার কাজে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়িয়ে পড়ায় বনের নির্জনতা বিপন্ন হচ্ছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বন্য প্রাণীর জীবন হুমকির মুখে পড়ছে। সব মিলিয়ে অপ্রাকৃতিক সাময়িক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে যাচ্ছে সুন্দরবন।

অভিযোগ উঠেছে, কাকে তুষ্ট করতে ধুন্ধুমার উন্নয়নের কথা বলে সুন্দরবনকে ধ্বংসের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দেয়া হচ্ছে? রামপালে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র, পাথরঘাটায় জাহাজ নির্মান শিল্প এবং সম্প্রতি নৌ দুর্ঘনায় ফার্নেস তেল ছড়িয়ে পড়া প্রশ্ন উঠেছে এসবই কি পরিকল্পিত? সরকারের আচরন, বক্তব্য, বিবৃতি শুনে মনে হতে পারে, এই ম্যানগ্রোভ নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যাথা নাই। এ কথাতো মানতেই হবে, যে ভারতকে খুশি করতে উন্নয়নের মাজেযায় রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরী হচ্ছে, অথচ সেই ভারতই তো সুন্দরবন বা কোন সংরক্ষিত বননদীর কাছে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান করেনি। শুধু তাই নয়, সুন্দরবন সুরক্ষায় ভারত সরকার কি করছে এবং তার স্যাটেলাইট ছবি তলব করেছে ওই দেশের জাতীয় পরিবেশ আদালত। আদালত স্বতঃপ্রণোদিত আদেশে বলেছে, “সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ নষ্ট হতে বসেছে। এই পরিস্থিতিতে ম্যানগ্রোভের বর্তমান চেহারা কেমন, নদী বা খাঁড়িতে দুষিত ডিজেল ব্যাবহার হয় কিনা, সেখানে বেআইনী ইটভাটা চলছে কিনা, বন এলাকায় অবৈধ হোটেল রেস্তোরা বন্ধ করা হয়েছে কিনা, ইত্যাদি বিষয়ে রাজ্যের অবস্থান জানানো হোক। একই সাথে আদালত সরকারের বক্তব্যের সমর্থনে অবশ্যই স্যাটেলাইট ছবি থাকতে হবে”।

এর বিপরীতে বাংলাদেশে বন সুরক্ষায় কোন পদক্ষেপ তো নাই, উপরন্তু একের পর এক অভিযোগের জন্ম দেয়া হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় অভিযোগটি হচ্ছে বনসংলগ্ন জনসাধারনের। সুন্দরবনকে কি খুব পরিকল্পিত টার্গেটে পরিনত করেছে সরকার? এই অভিযোগের কারণ হচ্ছে, জনমনে সন্দেহ বনকে কেন্দ্র করে সরকার বিশাল সব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। বনসংলগ্ন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ফুলবাড়ি কয়লাখনি সরকারের মূল লক্ষ্য। এ জন্যই বনের ভেতর দিয়ে নৌরুট চালু রেখে প্রকল্পগুলি বাস্তবায়নে বিশেষ সুবিধা দিতে চায় সরকার। এ সব দৃশ্যমান প্রকল্পের নেপথ্যে রয়েছে এশিয়া এনার্জি প্রস্তাবিত ফুলবাড়ি কয়লা প্রকল্পের উন্মুক্ত খনন। ফুলবাড়ি থেকে আহরিত কয়লা সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে দ্রুত পরিবহন করার জন্য এই নৌরুট অত্যন্ত কার্যকর। মংলা বন্দরকে সচল ও সক্রিয় রাখতে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে কয়লাসহ অন্যান্য উন্নয়ন উপকরন পরিবহনের জন্য সরকার জাতিসংঘ, ইউনেস্কো, জনদাবি এমনকি বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সকল পরামর্শ, নিবেদন, নিষেধাজ্ঞাসবকিছু অমান্য করছে।

সরকারের ভেতরে গড়ে ওঠা নানান জাতের পরামর্শকরা বাজার অর্থনীতির সমর্থক এবং বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ কর্পোরেট স্বার্থের ধারক এবং বাহক। যে কোন মূল্যে উন্নয়ন এবং উন্নয়ন এটি হলো তাদের মূল দর্শন। উন্নয়নের জোয়ারে মানুষ, প্রকৃতিপরিবেশ ধ্বংস তাদের কাছে বিবেচ্য নয়। বড় বড় ফ্লাইওভার, সেতু, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প তাদের কাছে উন্নয়ন মানেই বিলিয়ন ডলারের এইসব প্রকল্প। এর ফলে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষ সহজেই ভুলে যাবে পরিবেশ ধ্বংসের মত দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি। আর একেবারেই ভেতরেই বিষয়টি সম্ভবত: এই যে, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশটি বিনষ্ট হয়ে গেলে ভারতীয় সুন্দরবন টিকে থাকবে। এটি কি কোন সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ, যার আভাস বুঝি বা একটু একটু করে ফুটে উঠতে শুরু করেছে।।