Home » অর্থনীতি » গেলো বছরটিতে কেমন ছিলেন নারীরা?

গেলো বছরটিতে কেমন ছিলেন নারীরা?

খুজিস্তা নূর ই নাহরীন মুন্নি

dis 5বাংলাদেশে বাড়ছে যৌন সন্ত্রাস,বাড়ছে ধর্ষণ সেই সাথে বাড়ছে নারীর ক্ষমতায়ন। তাহলে নারীর ক্ষমতায়ন কি করে সম্ভব? তার অর্থ, যৌন সন্ত্রাস আর ধর্ষণ যে ভাবে বাড়ছে নারীর ক্ষমতায়ন সে ভাবে হচ্ছে না বা বাড়ছে না। কারণ নারীরা ক্ষমতায়িত হওয়ার সাথে সাথে যৌন সন্ত্রাস আর ধর্ষণের বিলুপ্ত হওয়ার কথা ছিল, নিদেন পক্ষে কমার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবচিত্র ভিন্ন যদিও আমাদের দেশের প্রধান মন্ত্রী, সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী এবং সংসদের বাইরে থাকা অপর এক বড় দলের নেত্রী তিন জনই নারী। কিন্তু বর্তমানে তিন জন গুরুত্বপূর্ণ নারী নেত্রীই ক্ষমতায় এসেছেন পুরুষতান্ত্রিকতার ধারাবাহিকতায় পরিবারতন্ত্রের হাত ধরে। দেশের শীর্ষপদে নারী থাকা মানেই নারীর অধিকার সমাজে নিশ্চিত হচ্ছে এমনটি ভাবার কোন অবকাশ নেই। কারণ আমাদের সাধারণ ঘরের নারীদের ন্যায্য অধিকার যতদিন নিশ্চিত না হবে ততোদিন সামগ্রিক নারী অধিকারও নিশ্চিত হবে না। যখন একেবারে সাধারণ পরিবারের নারী নিজ যোগ্যতায় শীর্ষ স্থানে পৌঁছাবে তখনই নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী অধিকার নারী স্বাধীনতানারীর ক্ষমতায়ন একটি অপরটির সাথে সম্পর্কিত বিষয়। যেখানে নারীর নিশ্চয়তাই নেই সেখানে অধিকার, স্বাধীনতা, ক্ষমতায়ণের কথা ভাবা বাতুলতা ছাড়া কিছু নয়। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কয়েকজনকে বাদ দিলে নারীর ক্ষমতায়ন আর্ন্তজাতিক মাপকাঠিতে এখনো তলানির সারিতেই রয়ে গেছে। নারীরা প্রতিনিয়ত ধর্ষিত হচ্ছে যৌন সন্ত্রাসের স্বীকার হচ্ছে, যৌতুকের জন্য নিপীড়ণের স্বীকার হয়ে অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের বিচারের দাবী, হাহাকার নিভৃতে কেঁদে কেঁদে ফিরছে। মাঝে মাঝে দ্বিধাগ্রস্থ অবস্থায় এই প্রশ্ন উত্থাপন জরুরি যে, আমরা কি কোন সভ্য সমাজে বসবাস করছি নাকি এখনও বর্বর যুগেই রয়ে গেছি। এদেশে নারীদের নিশ্চয়তা নেই। পাষন্ড মানষিক বিকার গ্রস্থদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোমল মতি শিশুরাও। প্রতিদিন লোমহর্ষক ঘটনার শিকার হচ্ছে অসংখ্য নারী ও শিশু। তার কিছু অংশ আমাদের কানে আসছে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে রক্তচক্ষুর ভয়ে, সমাজে ধর্মীয় গোড়ামি এবং ফতোয়াবাজদের দৌরাত্বে লোক চক্ষুর অন্তরালেই রয়ে যাচ্ছে। কারণ বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে গ্রাম্য শালিস এবং ফতোয়াবাজরা নারীর বিপক্ষে অবস্থান গ্রহন করে সমস্ত দোষের দায়ভার নিরীহ নারীর উপর চাড়িয়ে দিচ্ছে। তাছাড়া আজও অজপাড়া গাঁয়ে নারীর সমাজিক অবস্থান অশিক্ষা, দারিদ্র তথা আত্মসচেতনতার অভাবে খুবই দূর্বল এবং ভঙ্গুর। যে কোন দায়ভার প্রতাপশালীরা নিজেদের গ্রহনযোগ্যতার স্বার্থে অসহায় নারীর উপর চাপিয়ে দিতে বিন্দু মাত্র কুন্ঠিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে নারী নির্যাতন সংঘটিত হওয়ায় নির্যাতনের বিষয়গুলো ধামাচাপা পড়ে যায়। এছাড়া, নারীর পরিবারও লোকলজ্জা ও সামাজিক সম্মাহানির ভয়ে এসব নিয়ে থানা পুলিশও করতে চায় না। ক্রমবর্ধমান সভ্যতার ধারায় মুঠোফোন এবং ইন্টারনেটের ব্যবহার যেমন পুরো পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে তেমনিই কিছু কিছু বিকৃত মানসিকতা সম্পন্ন মানুষের নৈতিক অবক্ষয়ে পুরো সমাজ হুমকির সম্মুক্ষীন হয়ে পড়েছে। তারা নিস্পাপ কিশোরী, যুবতী মেয়েদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে, প্রেমের মায়াজালে ফেলে তাদের সাথে অনৈতিক নিষিদ্ধ সম্পর্কে মত্ত হচ্ছে আবার গোপন ক্যামেরায় ধারনকৃত ছবি দিয়ে তাদেরকে সামাজিক হুমকির সম্মুক্ষীন করছে। অসহায় মেয়েরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজেদের অসহায়ত্বে বিকৃতকাম মানুষের লালসার স্বীকার হতে বাধ্য হচ্ছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধী চক্র। বিশেষ করে মেয়ে শিশুটি যখন যৌন সন্ত্রাসের শিকার হয় প্রাথমিক অবস্থায় যে বুঝে উঠতে পারে না, কিন্তু প্রতিক্রিয়া স্বরূপ মনে এক প্রকার বিরূপভাব জন্ম নেয় যার স্থায়িত্ব থাকে চিরকাল। পরবর্তীতে মানসিক সমস্যা, হীনমন্যতা, ব্যক্তিত্বহীনতা সহ আরো অনেক রকমের শারীরিক মানসিক ক্ষতির শিকার হতে হয় তাকে। পরবর্তীতে কেউ কেউ নারীর চিরায়ত বাসনা মা হওয়ার উপযোগিতাটুকু হারিয়ে ফেলে। প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হওয়ার ঝুঁকি মেয়ে শিশুদের মনে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিচ্ছে। শিশুর বাধাহীন মানসিক বিকাশ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

কিন্তু বর্তমানে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ধর্ষন এবং ধর্ষনের পর অপরাধটিকে ধামাচাপা দেবার জন্য খুন। ২০১৪ সালে দেখা গেছে, নারীর ওপর নির্যাতনের ক্ষেত্রে ধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে অনেক বেশী। বাদ যায়নি শিশু ও বয়স্করাও। বিকৃতকাম চরিতার্থ করা ছাড়াও নারীকে রাজনৈতিক,সমাজিক,অর্থনৈতিক ভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার মোক্ষম হাতিয়ার হচ্ছে ধর্ষন। পারিবারিক সংহিসতাও কম ছিল না এ বছর। নির্যাতন করে খুন করার পর আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যেন নিত্তনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ান ষ্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী এ বছর বিভিন্ন ঘটনায় ৬১০ জন নারী নির্যাতন ও ৩০ জন ধর্ষনের স্বীকার হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালের প্রথম ৬ মাসেই যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ১১৪ জন নারী। যাদের মধ্যে ৭৭ জন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনেক অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। দক্ষিন এশিয়ায় নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। এই অসহনীয় অবস্থা কখনই আমাদের কাম্য হতে পারে না। থানা গুলোতে ধর্ষনকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগকে শুধুমাত্র জিডি হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে যৌন সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নির্যাতিতা নারী আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা, গতিময়তা হারিয়ে নিষ্ঠুরতম আত্মহত্যার পথকেই আলীঙ্গন করছে। কিন্তু নির্যাতকের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি হচ্ছে না। সমাজে বিদ্যমান প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গী,সামাজিক ও পরিবারিক কুসংস্কার, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার ফলে উদ্ভুত পরিস্থিতি ধর্ষিতা নারীকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ,আধুনিক শিক্ষা প্রগতিশীলতা বাস্তবিক ভাবেই যৌন সন্ত্রাসের মতো ঘৃন্য অপরাধকে প্রতিরোধ করতে পারে। উন্নত বিশ্ব আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠিত এবং শিক্ষার আলোয় আলোকিত। প্রতিদিনে প্রত্রিকার পাতা খুললেই যৌন সন্ত্রাস, ধর্ষন, হত্যা নয়তো আত্মহত্যা। আমাদের বিবেক কি তবু জাগ্রত হয় না। আর কবে হবে? তা না হলে আমরা যতই নারীর ক্ষমতায়ন বলে চিৎকার করি কোন লাভ হবে না। নারীর ক্ষমতায়ন হলো নারীর স্বনির্ভরতা অর্জন এবং পরিবার সমাজ এবং রাষ্ট্রিয় পর্যায়ে সিন্ধান্ত গ্রহনের অধিকার। নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়টিকে এখন সামাজিক উন্নয়নের সূচক হিসেবে ধরা হচ্ছে। কেবল আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেই নয় বাংলাদেশের স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে যে কোন নীতিনির্ধারনী আলোচনায় নারীর ক্ষমতাকে গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ,ধর্মীয় আবেগ অনুভুতি এবং সর্বোপরি অভ্যস্ত নারী উন্নয়নকে বাঁধাগ্রস্থ করছে। নারী বান্ধব আইনগুলোও সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না কোন কোন ক্ষেত্রে। তবে নারী কি চিরকাল ধর্ষিত হবে? যৌন সন্ত্রাসের শিকার হবে? নির্যাতিত হবে? নাকি রুখে দাঁড়াতে শিখবে? যৌন সন্ত্রাস থেকে নারীর ক্ষমতায়ন আর কত কাল, কত দূরে?