Home » অর্থনীতি » চীনকে সার্কের পূর্ণ সদস্য পদ দেয়া প্রশ্নে ভারতের বাধা

চীনকে সার্কের পূর্ণ সদস্য পদ দেয়া প্রশ্নে ভারতের বাধা

last 5নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কের শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলনে চীনকে সার্কের পূর্ণ সদস্য পদ দেয়া প্রশ্নে মতবিরোধ দেখা দেয় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে। ভারত চাইছে চীন যেন কোনোক্রমেই সার্কের পূর্ণ সদস্য হতে না পারে। জেনস ডিফেন্স উইকলির সংবাদদাতা রাহুল বেদি তারই বিস্তারিত এবং নেপথ্য কাহিনী তুলে ধরেছেন। জেনস ডিফেন্স উইকলির প্রতিবেদনের অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ

আট জাতির দক্ষিণ এশিয়ান আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থায় (সার্ক) ভারত প্রাধান্য বিস্তার করে চললেও এই গ্রুপটিতে চীনকে আরো বড় ভূমিকা পালন করা থেকে বিরত রাখতে দেশটি যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল, তা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে বড় ধরনের প্রতিরোধের মুখে পড়েছে।

কাঠমান্ডুতে সার্কের তিন দিনব্যাপী দ্বিবার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিন ২০০৫ সাল থেকে পর্যবেক্ষকের মর্যাদা পেয়ে আসা চীনকে পূর্ণ সদস্যপদ প্রদান করার প্রতি বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা সমর্থন ব্যক্ত করে। সমর্থনকারী চার দেশের সবাই ব্যাপকভাবে চীনা অর্থনৈতিক, সামরিক ও অবকাঠামোগত সহায়তা পেয়ে আসছে। আর সার্কের অন্য তিন দেশ আফনিস্তান, ভুটান ও নেপালেরও চীনের সঙ্গে তুলনামূলক ভালো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রয়েছে।

সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ২৯ বছরের পুরনো এই সংগঠনটিতে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার প্রস্তাব করার মাধ্যমে ভারতের বিরুদ্ধে কামান দাগা শুরু করেন। তিনি বললেন, ‘আমি সার্ক পর্যবেক্ষকদের ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ করার ওপর জোর দিতে চাই। তাদের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে সার্ক উপকৃত হতে পারে।’

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মহিন্দা রাজপাক্ষে এরপর বিষয়টিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে ঘোষণা করেন, সার্ক দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব ‘সামর্থ্যবিকাশ’ করার জন্য সার্ক জাতিপুঞ্জে চীনের মতো পর্যবেক্ষকদের সাথে অবশ্যই সম্পৃক্ত হতে হবে। তার কথার প্রতিধ্বনি করেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন গাইয়ুম ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংস্থায় সদস্য বাড়ানোর প্রস্তাবে দৃঢ় বিরোধিতা করেন এই ভয়ে যে, এতে করে সার্কে দিল্লির প্রাধান্যপূর্ণ ভূমিকাকে ম্লান করে দিতে পারে এবং চীনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত শক্তি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে একে ব্যবহারের আশাটিকে নিরাশায় পরিণত করতে পারে। এ প্রসঙ্গে এ কথাও উল্লেখ করা যায়, এই ভয় থেকেই গত মে মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদি সরকারি সফরে ভুটান ও নেপাল গিয়ে উভয় দেশের ঋণ সীমা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

কাঠমান্ডুতে এক ভারতীয় মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের দিগন্ত সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণের আগে দরকার সার্কের দেশগুলোর মধ্যে আমাদের সহযোগিতা আরো গভীর করা। পর্যবেক্ষক বিষয়টি একটি প্রান্তিক বিষয়, এটা নিয়ে আমরা পরবর্তী পর্যায়ে কাজ করব।’

চীনা বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার (অব.) অরুন সাহগল বলেন, এই অচলাবস্থা দেশ দুটির মধ্যকার ‘ব্যাপকতর অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার’ সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, অধিকন্তু, সার্ক এমন একটি ফোরাম যেখানে ভারত পুরোপুরি প্রাধান্য বিস্তার করে আছে এবং সে তার এই অবস্থানটি তার চেয়ে বেশি শক্তিধর চীনের কাছে ছেড়ে দিতে নারাজ।

চীনের সাম্প্রতিক ৪০ বিলিয়ন ডলারের সামুদ্রিক সিল্ক রুট নির্মাণ উদ্যোগ এবং বন্দরের নেটওয়ার্ক এবং সেইসাথে অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বেইজিংয়ের প্রভাব বাড়ানোর বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করতে সার্ককে ব্যবহারের কথাও ভাবছে ভারত।

কাঠমান্ডু সার্ক সম্মেলনে চীনের প্রতিনিধি উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী লিউ ঝেনমিন বলেন, ‘চীন সার্কে তার সম্পর্ক বাড়াতে প্রস্তুত। তিনি আরো বলেন, ‘সার্কের আটটি দেশের মধ্যে পাঁচটির সাথে চীনের সীমান্ত রয়েছে এবং আমাদের ভবিষ্যত গন্তব্যও পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। আমাদের উচিত অভিন্ন কল্যাণের জন্য কাজ করা’।

লিউ ঝেনমিন জ্বালানি সঙ্কটে থাকা সার্ক দেশগুলোর জন্য এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছেন, যার কাছাকাছি যাওয়াও ভারতের পক্ষে সম্ভবত সম্ভব নয়। সেটা হলো আগামী পাঁচ বছরে এই অঞ্চলে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা। তিনি আরো বলেন, একই সময়ে চীন সার্কের সাথে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৯০ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৫০ বিলিয়ন ডলার করার পরিকল্পনাও করেছে। তিনি দক্ষিণ এশিয়ান ছাত্রদের জন্য বছরে ১০ হাজার চীনা স্কলারশিপ এবং দক্ষতা বিকাশ কর্মসূচিতে পাঁচ হাজার জনকে গ্রহণের প্রস্তাব দেন।

চীনা সাহায্য ও অর্থনৈতিক প্যাকেজ একেবারে নিঃশর্ত, এর সাথে কোনো ধরনের গণতান্ত্রিক সংস্কার, মানবাধিকার বা স্বচ্ছতার শর্ত যোগ করা হয়নি। চীন এই প্রস্তাবের মাধ্যমে ভারতকে ম্লান করার সুযোগ এবং ভারতের বড়ভাইসুলভ মনোভাব এবং ঘন ঘন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ নিয়ে সার্ক দেশগুলোর ধারণার বিপরীত চিত্র উপহার দেওয়া হয়েছে।

শ্রীলঙ্কার এক কূটনীতিক বলেন, ‘ভারতের অর্থনৈতিক বা সামরিক সাহায্য বা সহায়তা এবং অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর সবই প্রায় সব সময়ই একই ধরনের হতাশ বয়ে আনে। তবে আমরা যখন হতাশায় চীনের কাছে ছুটতে চাই, তখন ভারত দ্রুত সাড়া দিয়ে প্রতিশ্রুতি পূরণ করে দেয়।’

এদিকে সার্কে বেইজিংয়ে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে ভারতকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সদস্য পাইয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিল্লিতে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ভারতীয় কর্মকর্তারা এ ধরনের কোনো সমঝোতার কথা অস্বীকার করেছেন।

এসসিও’র পাঁচ পর্যবেক্ষকের একটি ভারত। এটি ২০০১ সালে সাংহাইয়ে প্রতিষ্ঠিত চীন, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, রাশিয়া, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তানের সমন্বয়ে এটি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক জোট।।