Home » বিশেষ নিবন্ধ » বিএনপি :: অব্যাহতভাবে পিছু হাটা ও পিছু হটার বছর

বিএনপি :: অব্যাহতভাবে পিছু হাটা ও পিছু হটার বছর

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

dis 3ভোটের রাজনীতিতে সফল ও প্রায় ৪০ শতাংশ জনসমর্থনপুষ্ট বিএনপি এই ডিসেম্বরের শেষে এসে আবার সেই সনাতনী ধারার হরতালের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করেছে। অথবা বলা উচিত, সরকার ও ক্ষমতাসীনরা আবার তাদেরকে গনবিচ্ছিন্ন হরতাল বা সহিংস আন্দোলনের পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে। এর মধ্য দিয়ে তাদের ঘরমুখো নেতৃত্ব রণে ভঙ্গ দিয়েছে এবং ঘরে বসেই হরতাল কর্মসূচিতে তাদের প্রকট দুর্দশা দেখতে থাকবে, মিডিয়ায় সাক্ষাৎকারে কিংবা ‘টকশো’তে বুলি কপচিয়ে যাবে। রাজনৈতিক গবেষকদের কাছে আগামীতে এটি একটি আকর্ষণীয় গবেষণার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে যে, অনেকগুলো ফ্যাক্টর এবং বিপুল জনসমর্থন পক্ষে থাকা সত্বেও একটি প্রধান রাজনৈতিক দল ময়দানে কেন মাজা সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না? গাজীপুরে জনসভাস্থলে সরকারের ১৪৪ ধারা জারি করা বিএনপির জন্য আন্দোলন শুরু করার যে অনুকূল সুযোগ তৈরী করে দিয়েছিল সেটিকে তারা মামুলী একটি হরতাল ডেকে নষ্ট করে দিলেন। হতাশায় ডোবালেন আন্দোলনমুখী বিশাল কর্মীবাহিনীকে। বিএনপির তথাকথিত অহিংস নেতৃত্ব এ প্রসঙ্গে জানাচ্ছেন, ‘পুলিশ ও ছাত্রলীগের মত উগ্রতা না দেখিয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তারা সমাবেশ করা থেকে পিছু হটেছেন’। অথচ মাত্র কয়েকদিন আগে দলের মহাসচিবসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ মিডিয়ায় তর্জনগর্জন করে বলেছেন, যে কোন মূল্যে তারা গাজীপুরে জনসভা করবেন। এই তর্জনগর্জন অথবা ডন কুইক্সোটের মত হাওয়ায় তরবারী ঘুরিয়ে সরকারের অগণতান্ত্রিকভাবে জারি করা ১৪৪ ধারা, বিএনপি সুবোধ বালকের মত মেনে নিয়েছেন নির্বিবাদে। তারা গত ৬ বছরের মধ্যে এ নিয়ে তারা কতবার আন্দোলনের ময়দান থেকে পিছু হটলেন তার পরিসংখ্যান দেবার প্রয়োজন নাই। তবে ৫ জানুয়ারি তাদের কথিত গণতন্ত্র হত্যা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূুচি বাস্তবায়ন এখন বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। গত ২৯ ডিসেম্বর তারা বছরের সবশেষ হরতালটি সম্ভবত ডেকে ফেললেন বলে মনে হচ্ছে। সন্দেহ নেই, আগামীতেও তারা একই পখে হাঁটবেন। এ কর্মসূচিতেও ঘরমুখো নেতৃত্ব কোথাওই অংশগ্রহন করেছে, এমনটি জানা যায়নি। বরাবরের মত যুগ্ম মহাসচিব রুহল কবীর রিজভী অনেকটা এতিমের মত কিছু কর্মী নিয়ে কেন্দ্রীয় অফিসের গেটের ভেতর বসে মিডিয়ায় সাক্ষাতকার দিয়েছেন। ক্ষমতাসীনদের ইতিমধ্যে জানা হয়ে গেছে, বিপুল সম্পদ ও সুযোগসুবিধার মধ্যে বসবাসকারী বিএনপির প্রায় সকল নেতার মধ্যে হামলামামলাগ্রেফতার ফোবিয়া রয়েছে। আর সে কারনেই সর্বাত্মক দমননীতির কৌশল অবলম্বন করে ক্ষমতাসীনরা বিএনপির যে কোন কর্মসূচি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে অবরুদ্ধ করে ফেলছে। এর বিপরীতে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কোন কোন নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তারা আওয়ামী লীগের সাথে যোগাযোগ ও সমঝোতার নীতি অবলম্বন করে ভাল থাকার চেষ্টা করছেন।

বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, বিপুল সম্পদের অধিকারী সুবিধাবাদী নেতৃত্ব এবং পকেট রাজনীতি। বিএনপি ২০০১২০০৬ মেয়াদে যখন ক্ষমতাসীন ছিল তখনও দুটি ভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্র, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও তদীয় পুত্রের কার্যালয় হাওয়া ভবনের মধ্যে ছিল সমন্বয়হীনতা। সে সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্যারালাল কেন্দ্র হয়ে দাড়ায় হাওয়া ভবন এবং এই ভবনের নির্দেশেই দেশ পরিচালিত হয়েছে। মানুষের স্মৃতি থেকে হাওয়া ভবনের প্রচন্ড দাপট, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠন, জঙ্গীবাদকে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ গত ৬ বছরে বিএনপি মুছে দিতে সক্ষম হয়নি। বিএনপি নেতৃত্ব এখনো জনগনকে পরিষ্কার করতে পারেনি যে, ক্ষমতায় গেলে এই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। কিন্তু বিএনপির নেতৃত্বর একটি অংশ হাওয়া ভবনের সেই রাজনীতির অনুসারী হিসেবে তারেক রহমানকে ঘিরে অন্তত: দলের মধ্যে সেই পরিস্থিতি অব্যাহত রাখছেন। আর সেই সুযোগটি বারবার নিচ্ছে আওয়ামী লীগ।

২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের নির্দেশে গ্রেফতার তারেক রহমান চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রায় পঙ্গু হয়ে গিয়েছিলেন। সে সময়ে সরকারের সাথে একটি সমঝোতা ও তারেক ভবিষ্যতে রাজনীতি করবেন না মর্মে মুচলেকা দিয়ে তাকে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তারপর গড়িয়ে গেছে ৬ বছর। লন্ডন থেকে তারেকের আর ফেরা হয়নি। তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে, তিনি সেরে উঠেছেন, কিন্তু তার মানসিক ক্ষত নিরাময় হয়নি বলে কথাবার্তায়, বক্তব্যবিবৃতিতে তা প্রতিভাত হচ্ছে। সে জন্যই প্রশ্ন উঠেছে, তারেক দলের জন্য ‘এ্যাসেট না লায়াবিলিটি’? অথচ বিএনপির তরুণ নেতৃত্ব ভরসা করে আছে তার ওপর। দলের মহাসংকটের সময় তাঁর কাছ থেকে সংগঠিত হওয়ার, আন্দোলনের দিক নির্দেশনা চান সিংহভাগ নেতাকর্মী। কিন্তু লন্ডনে বসে তারেক যা করছেন তাতে ধরে নিতে হবে হাওয়া ভবনের ঘোর তার কাটেনি। উল্টো আমাদের মীমাংসিত মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধিকার আন্দোলন প্রসঙ্গে এমন সব মন্তব্য করছেন যা মোটেই তার রাজনৈতিক পরিপক্কতার পরিচয় বহন করে না। দলের অনেক নেতাকর্মীর এ বিষয়ে অসন্তোষ থাকলেও প্রকাশ্যে কেউ প্রতিবাদ করছেন না, কারন তারেকের চক্ষুশূল হয়ে অন্তত বিএনপির রাজনীতি করা যাবে না।

বিএনপির জন্মলগ্নের পর থেকে গত এক বছর ধরেই রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় বৈরী পরিস্থিতি, সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি। এরকম পরিস্থিতি এবং সংকট অনেক সময় বড় ধরনের সুযোগ তৈরী করে। তার প্রমান হচ্ছে, ১৯৮২’র পরে ধ্বংসস্তুপ থেকে বিএনপিকে দেশের রাজনীতিতে একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। এক অর্থে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল বিএনপি। তাদেরকে বুঝতে হবে, আসন্ন ঝড়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে উট পাখির মত বালুতে মাথা গুঁজে মিডিয়ায় গর্জন করে জনগনকে ডাকলে কেউই মাঠে নামবে না। বিএনপির প্রথম সারির নেতানেত্রীদের মাঠে নেমে প্রমান করতে হবে দলের স্বার্থে তারা যে কোন ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন সম্পর্কে তাদের একটি বড় মূল্যায়ন থাকতে হবে যে, আন্দোলনের কৌশল হিসেবে তারা নির্বাচনে অংশ না নিয়ে কত বড় ভুল করেছে। তাদের নির্বাচন প্রতিহত করার আন্দোলন ও প্রতিরোধের মধ্যে কার্যকারিতা কতটুকু ছিল এটিও মূল্যায়নের সময় এসেছে। শুধুমাত্র সহিংসতা সৃষ্টি করে, জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে, তারা নির্বাচন প্রতিরোধ করতে চেয়েছে। প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের মত জনগনের ওপর আস্থাবিশ্বাস না থাকায় তারা বেছে নিয়েছিল ধ্বংসাত্মক রাজনীতি, যা পরিনামে তাদের আজকের পরিনতির দিকে নিয়ে এসেছে। তিন পকেটে বিভক্ত একটি দলের নেতা খালেদা জিয়া বর্তমান সরকারকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে দিয়ে একটি নতুন নির্বাচন দিতে বাধ্য করতে নতুন আন্দোলনের কথা বলছেন এটি এখনও পর্যন্ত নিছক মিডিয়ার আওয়াজ হিসেবেই সীমাবদ্ধ।

এহেন চতুর্মুখী সংকটে এক সময়ের আপোষহীন নেত্রী ও বর্তমান সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকা বিএনপি নেত্রীর আশেপাশে কোন ক্রাইসিস ম্যানেজার নেই। এককেন্দ্রিক বা উত্তরাধিকারের নেতৃত্বে সেটি আশাও করা যায় না। ফলে জনগনকে সংগঠিত করে সরকারের দমননীতি উপেক্ষা করে আন্দোলন গড়ে তুলবে বিএনপি বারবার সেটি মিডিয়ায় হুংকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। আন্দোলনের অনুকূল পরিস্থিতি বিদ্যমান, জনমনে রয়েছে তীব্র অসন্তোষ, আওয়ামী লীগ আস্থাভাজন নয় জনগনের, সবক্ষেত্রেই তাদের আত্মম্ভরিতা, জনউপেক্ষা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্যকোনকিছুই বিএনপি কাজে লাগাতে পারেনি। বর্তমান নেতৃত্বও এ যাবত জনগনকে কোন ইতিবাচক মেসেজ দিতে সক্ষম হয়নি। সম্ভবত: সে কারনে বিএনপি মাঠে সফল কোন আন্দোলন গড়তে সক্ষম হয়নি এবং সেটি না পারলে বলা বাহুল্য, রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের পরিনতি দেখার অপেক্ষা করতে হবে।।