Home » বিশেষ নিবন্ধ » সংস্কৃতি :: বিদেশি আগ্রাসন আর নির্ভরশীলতার বছর

সংস্কৃতি :: বিদেশি আগ্রাসন আর নির্ভরশীলতার বছর

ফ্লোরা সরকার

last 6ক্ষমতা, আধিপত্য এবং কর্তৃত্ব বজায় রাখার অপর নাম বিশ্বায়ন। যে বিশ্বায়ন বা উন্নত পুঁজির হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। নব্বইয়ের দশকে ‘আকাশ সংস্কৃতি’ নামে নতুন যে সংস্কৃতির সাথে আমাদের পরিচিতি ঘটে, তা প্রকৃতপক্ষে ছিলো পণ্যায়ন তথা সাংস্কৃতিক পণ্যায়নের এক বিস্ফোরণ। যে বিস্ফোরণ আনবিক বা পরামানবিক বিস্ফোরণের চাইতেও শক্তিশালী। কেননা, সাংস্কৃতিক পণ্যায়নের এই বোমার কোনো বাহ্যিক আকৃতি নেই। খালি চোখে তা দেখা যায় না, তার গতিবিধি চলে নিরবে, নিভৃতে। মুনাফা অর্জন এবং দেশীয় সংস্কৃতিকে আত্মসাৎ করাই এর মূল লক্ষ্য। ভারতের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এবং শিক্ষক কে.এন. পানিক্কর তাই যথার্থই বলেছেন ‘তৃতীয় বিশ্বের মানুষকে তার সাংস্কৃতিক ভিত্তিভূমি থেকে ছিন্নমূল করাটাই উন্নত পুঁজির বিশ্বজনীন চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ’। ছিন্নমূল করার এই প্রক্রিয়া যে নতুন, তা বলা যাবেনা। কিন্তু অতীতের সাংস্কৃতিক পণ্যায়নের গতি বর্তমানের চেয়ে ছিলো কিছুটা স্লথ এবং তুলনামূলকভাবে কম প্রভাববিস্তারী। আকাশ সংস্কৃতির আগেও, আমাদের এখানে বিদেশি ছবি, গান, টিভি সিরিয়াল ইত্যাদির আগমন যে ছিলোনা তা নয়। কিন্তু বর্তমানের মতো এমন প্রবল আর তীব্র ছিলোনা। ভিন্ন সাংস্কৃতির প্রভাব ছিলো, কিন্তু নিজেরদের শিল্প ও সংস্কৃতি আত্মসাতের মতো ঘটনার উন্মেষ ঘটেনি। তবে এসব প্রভাবের শিকার শুধুমাত্র আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশেই সীমাবদ্ধ, প্রথম বিশ্ব তথা পশ্চিমা বিশ্ব এর আঁচ থেকে একেবারেই মুক্ত।

মুক্ত থাকার এই প্রক্রিয়াটি মূলত নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের পণ্যায়নের নিয়ন্ত্রণের ওপর। যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের বৈচিত্রময় শিল্প ও সাহিত্যের নিয়ন্ত্রণ বা অবাধে চলাচল ঘটে, সে প্রক্রিয়াটি কিন্তু খুব মসৃণ নয়। জার্মানির আইনজীবী এবং নগর পরিকল্পনাকারী পিটার মারকিউজ যেমন বলেছেন, ‘যদি এরকম দেখা যায় যে কোনো রাষ্ট্র, পুঁজি বা পণ্যের চলাচলকে নিয়ন্ত্রণ করছে না, তাহলে মনে রাখতে হবে যে, সে এটা করতে সক্ষম নয় তা কিন্তু নয়, বরং সে এটা করতে আগ্রহী নয়। এই ধরণের ঘটনা ক্ষমতা ত্যাগের উদাহরণ, ক্ষমতা না থাকার উদারহণ নয়।’ কাজেই আমরা যদি কোনো পণ্যের অবাধ সুযোগ করে দেই তাহলে, তাহলে পণ্যের এই সমাগমের জন্যে কিছুতেই সংশ্লিষ্ট দেশকে দোষারোপ করা যাবেনা। পুঁজির একমাত্র লক্ষ্য বাজার দখল করা। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, শিল্পসাহিত্য যেহেতু আর দশটা পণ্যের মতো নয়, এই পণ্যের গতিবিধি যত বেশি অবাধ হবে, তত বেশি সংশ্লিষ্ট দেশ শিল্পসাহিত্যসংস্কৃতিতে উন্নততর হবে। কথাটা অবশ্যই যথার্থ। কিন্তু পাশাপাশি এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, শিল্পসাহিত্য আর দশটা পণ্যের মতো না হলেও, পণ্যও বটে। যে কোনো পণ্য মানেই তার আছে নির্ধারিত দাম, মুনাফা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারজাতকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ ইত্যাদি। এই ধরণের পণ্যে অবশ্যই এক তরফা আমদানি বা রফতানির কোনো সম্ভাবনা থাকার কথা নয়। এখন আমরা যদি আমাদের দেশীয় শিল্পসাহিত্যের পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টিপাত করি, তাহলে কি দেখতে পাবো?

আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বিগত দশ পনর বছর ধরে আমাদের দেশীয় টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান বর্জনের যেন এক মহোৎসব শুরু হয়েছে। প্রথমে প্রধান বিনোদন নাটক দেখা থেকে দর্শক বিমুখ হয়েছেন। ধীরে ধীরে অন্যান্য অনুষ্ঠান বর্জন করে বিদেশী অনুষ্ঠানের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে গেছেন। দর্শকের এই নির্ভরশীলতাকে দোষ দেয়া যায় না। কেননা, উন্নত অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে দর্শক চাহিদা পূরণ না হলে, খুব স্বাভাবিক ভাবেই তারা অধিক উন্নতর অনুষ্ঠানের দিকে মনোনিবেশ করবেন। যেখানে দেশীয় বাজারের চাহিদা এসব টিভি চ্যানেল পূরণ করতে পারছে না সেখানে বিদেশী বাজারে প্রবেশধিকারের আশা করা নিতান্তই গৌণ। এমনকি, দেশীয় এসব অনুষ্ঠান বিদেশী অনুষ্ঠানের অনুকরণ করেও শেষ রক্ষা হচ্ছেনা। এবার বিষয়টার আরেকটু গভীরে যেয়ে দেখা যাক, এসব চ্যানেলের বাজার হারানো এবং অনুষ্ঠানের মান বজায় না থাকার পেছনে কি কি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, মিডিয়ার ভূমিকা নির্ভর করে মিডিয়ায় কারা বিনিয়োগ করে বা কাদের দ্বারা পরিচালিত হয় তার ওপর। এসব লগ্নীকারীদের নীতি নির্ধারণীর ওপর নির্ভর করে অনুষ্ঠানের মান। দ্বিতীয়ত, চ্যানেলগুলোর আপাত স্বাতন্ত্র বা ইংরেজিতে যাকে বলা হয়ে থাকে ‘ রিলেটিভ অটোনমি’ বজায় আছে কতটুকু তার ওপর। প্রতিটি আধুনিক রাষ্ট্রেই তত্ত্বগত ভাবে মানুষের বাক স্বাধীনতার পাশাপাশি মিডিয়ার স্বাধীনতাকে অর্থাৎ ফোর্থ এস্টেট ভূমিকা হিসেবে মেনে নিয়েছে। কাজেই এসব চ্যানেলগুলো যে তাদের আপাত স্বাতন্ত্র এবং একই সঙ্গে স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারবে বা পারা উচিত সেটা ধরে নেয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে আমাদের চ্যানেলগুলোর ক্ষেত্রে আমরা কি দেখতে পাই? এসব চ্যানেলের অধিকাংশই মূলত রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোশকতায় গড়ে ওঠা। কাজেই এখানে যে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দৃঢ় ভাবে বজায় থাকবে স্বাভাবিক ভাবে তা অনুমেয়। কৌতুক করে অনেকে আজকাল বলেন, ‘সব চ্যানেলই বিটিভি অর্থাৎ সরকারি মদদপুষ্ট’। একটু পেছনে তাকালেই আমরা দেখতে পাবো, বিএনপি সরকারের সময় ১১টি টিভি চ্যানেলের যদি লাইসেন্স দেয়া হয়, আওয়ামী সমর্থিত সরকারের সময়ে দেয়া হয়েছে ১৬টিরও অধিক টিভি। কাজেই এসব চ্যানেলগুলো যে মারকিউজ কথিত ক্ষমতা ত্যাগের উদারহণ, ক্ষমতা না থাকার উদাহরণ নয় তা নির্দ্ধিধায় বলা যায়। অর্থাৎ এসব চ্যানেলের উন্নততর বা মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষমতা আছে কিন্তু তারা তাদের সেই ক্ষমতা কাজে লাগাতে আগ্রহী নয় বরং সেই ক্ষমতা ত্যাগ করে, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের কাছে জিম্মি রাখতে আগ্রহী। বাকস্বাধীনতার মতো শিল্পকর্ম তার স্বাধীন অস্তিত্ব হারিয়ে ফেললে তার মৃত্যু অনিবার্য। কেননা, শিল্পকর্ম কোনো চাপিয়ে দেয়ার বিষয় নয়। যা চাপিয়ে দেয়া হয় তাই পরাধীন।

চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও একই দৃশ্যের অবতারণা ঘটতে দেখা যায়। সেন্সর বোর্ডের রাজনৈতিক ক্ষমতার ছত্রছায়ায় পছন্দের ছবি নির্মিত এবং প্রদর্শিত হলে তা থেকে মানসম্পন্ন ছবির আশা করা যায়না। আর সরকারি অনুদানে নির্মিত ছবির ক্ষেত্রে তো কথাই নেই। যদিও, এসব অনুদানের দানের অংকের পরিমাণ খুব বেশি না, তবু যেটুকুই আছে সেগুলোও দেয়া হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে অন্য আর যেসব ছবি নির্মিত ও প্রদর্শিত হয়, তার অধিকাংশই বিষয়বস্তুহীন আঙ্গিক সর্বস্ব ছবি। সত্যজিৎ রায়ের ভাষায়, ‘এসব ছবির আস্ফালনের ভঙ্গিই প্রবল, চমক লাগানোর প্রয়াসটা স্পষ্ট’ (চলচিত্রের ভাষা : সেকাল ও একাল)। এসব ছবির নির্মাতারা ছবিকে শিল্প নয় বরং বাজারি কারবার বলে মনে করে।

মঞ্চনাটকের অধিকাংশই অনুদিত বা অভিযোজিত নাটক। এই ক্ষেত্রে বেশ কৌতূহলদ্দীপক একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়। মঞ্চনাটক আকাশ সংস্কৃতি থেকে কিছুটা মুক্ত হলেও, মৌলিক নাটকের চেয়ে উদ্যোক্তরা অনুদিত বা অভিযোজিত নাটকেই বেশি আগ্রহী। অর্থাৎ, যেভাবেই হোক না কেনো, আমরা আমাদের মৌলিকত্ব বজায় রাখতে কোনো ভাবেই আগ্রহী নই। ব্যান্ড সঙ্গীতের কল্যাণে, দেশীয় গান শুধু বিলুপ্তির পথেই নয়, কর্পোরেটায়ন করে মূল গানের আদল একেবারে বদল করে ফেলা হচ্ছে। নতুন যেসব গান, দুই একটা ছাড়া খুব বেশি শ্রোতা ধরে রাখতে পারছেনা। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই শ্রোতারা ভিন্ন গানের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।

এভাবে বিশ্বায়ন বা উন্নত পুঁজির হাত ধরে আমরা নিজেরাই নিজেদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ঘটাচ্ছি। দু হাত বাড়িয়ে শুধু অন্যের সংস্কৃতি গ্রহণই করছিনা, পাশাপাশি নিজেদের যা কিছু অবশিষ্ট ছিলো তারও বিলুপ্তি ঘটাচ্ছি। আমাদের বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস.এম.সুলতানকে শিল্পকলা একাডেমি যখন মুক্তিযুদ্ধের ছবি আঁকতে বলেছিলো, তিনি কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে স্টেনগান, রাইফেল দিয়ে আঁকেননি, এঁকেছেন লাঠি, সরকি আর বল্লম দিয়ে। তার যুক্তি ছিলো, স্টেনগান, রাইফেল আমাদের অর্জন নয়। যা নিজেদের অর্জিত নয় তা নিজেরও নয় এবং আধুনিক তো নয়ই। আমরা তার যুক্তির আরেক ধাপ এগিয়ে যেয়ে বলতে পারি, অন্যের ধার করা বিষয়বস্তু নিয়ে শুধু আধুনিকায়ন নয়, নিজের পায়ের ওপরই দাঁড়ানো যায়না। সাংস্কৃতিক লেনদেন কোনো একচেটিয়া কারবারি প্রতিষ্ঠান নয়। ‘বিশ্বায়ন’ এর অর্থ নিজের দরজা খোলা রেখে অন্যের দরজায় নিজেদের প্রবেশ নিষেধ নয়। আমরা অবশ্যই অন্যের শিল্পসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হবো, শ্রদ্ধা করবো কিন্তু নিজেরটা নিঃশেষ করে দিয়ে নয়। এভাবে আমরা নিজেরাই যদি নিজেদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ঘটাতে থাকি, তাহলে আমাদের অবস্থা দাঁড়াবে কেনিয়ার লেখক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর ‘উইজার্ড অফ দ্যা ক্রো’ উপন্যাসের সেসব কালো বর্ণের ক্রীতদাসদের মতো, যেসব ক্রীতদাস তাদের বর্ণ শ্বেতকায় করার উন্মত্ত বাসনার জন্যে প্রথমে হারিয়ে ফেলেছিলো তাদের নাম, পরে মুখের ভাষা। যেসব ক্রীতদাসেরা উপন্যাসের শেষে চিৎকার করে বলছিলো – ‘উই ওয়ান্ট আওয়ার ভয়েজ ব্যাক’ বা ‘আমরা আমাদের ভাষা ফিরে পেতে চাই’। এবং আমাদের স্মরণ রাখা প্রয়োজন, হারিয়ে যাওয়া বা বিলুপ্তি যতটা সহজ ফিরে পাওয়া কিন্তু তত সহজ কাজ নয়। কাজেই নতুন বছরের এই শুভ লগ্নে আমরা আশা করবো অতীতের ভুলক্রটি পার করে নুতনভাবে আমাদের শিল্পাঙ্গনকে সাজিয়ে এবং বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করা হবে।।