Home » অর্থনীতি » ২০১৪ :: অর্থনীতিতে মন্দা আর স্থবিরতা

২০১৪ :: অর্থনীতিতে মন্দা আর স্থবিরতা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

last 2এক বছর আগে মোটা চাল কেজিপ্রতি বিক্রি হয়েছে ৪০ টাকা, এখন সেটি বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা। ৩৬৫ দিনের ব্যবধানে চালের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা। সুতরাং দেশের অর্থনীতি কিভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তা সহজেই বোঝা যায়। অন্যদিকে সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, স্বাভাবিকভাবেই প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। তবে প্রশ্ন হলো এ এক বছরে দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থার কি কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে? এক কথায় বলা যায়, না হয়নি। ২০১৪ সালে বছর জুড়ে ছিল নিত্যপণ্যের দামের উঠানামা। ভোজ্য তেলের দাম স্থির থাকলেও বেড়েছে প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে খাদ্যপণ্যের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। চার মাসে খাবারের দাম বিশ্ববাজারে গড়ে ৬ শতাংশ হারে কমেছে। তবে বাংলাদেশে উল্টো, বাড়ছে খাদ্যপণ্যের দাম। কখনও হরতালঅবরোধ, কখনও প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ, আবার কখনও মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ার কথা বলে চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে নতুন চাল বাজারে এলেই চালের দাম কমে আসবে বলে আশার বাণী শুনিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। তবে বাজারে আমনের নতুন চাল এলেও পণ্যটির দাম কমেনি, উল্টো সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে চালের দাম। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বলেছে, এক বছরে চালের দাম ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এক বছর আগে প্রতি কেজি ভালো মানের নাজিরশাইল চালের দাম ছিল ৪৬ থেকে ৫০ টাকা। একই মানের চাল বর্তমানে ৪৮ থেকে ৫৭ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে বলে দাবি করেছে টিসিবি। অবশ্য বাজারে বর্তমানে ৫২ টাকা কেজির নিচে ভালো মানের কোনো চাল পাওয়া যাচ্ছে না। ৪৮ টাকায় মোটা চাল কিনে খেতে হচ্ছে গ্রাহকদের।

শুধু মূল্যস্ফীতি নয়, বিনিয়োগ হ্রাস, ব্যাংক ও শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির বিচার না করা, লুটপাট ছিল বছর জুড়ে আলোচিত ঘটনা। কর্মসংস্থান বাড়াতে না পারায় বেকারত্বেও বেড়েছে এ সময়ে। যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি ফিরে পাওয়ার কথা থাকলেও সেটি মেলেনি। তৈরি পোশাক খাত এখনো রয়েছে শঙ্কায়। বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লেও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ধস নেমেছে, বেড়েছে দুর্নীতি। বিদেশে জনশক্তি রফতানি গেল দুই বছর অনেক কমে গেছে। তারপরও সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক আপাতদৃষ্টিতে ভালো থাকলেও, তার সুফল জনগণ পাচ্ছে না। শ্রমজীবী মানুষই চালিয়ে রেখেছে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা। সরকার বড় প্রকল্প একটিও শেষ করতে পারেনি এ সময়ে। ঢাকাময়মনসিংহ ও ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়ক চারলেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের অবস্থা তথৈবচ। অর্থ পাচারের প্রবণতাও বেড়েছে। গেল কয়েক বছরে এর পরিমাণ দ্বিগুণ এমনকি তিনগুণ হয়েছে বলে খবর মিলছে। দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের জন্যও খুব খারাপ সময় ছিল ২০১৩। রানা প্লাজা ধস, যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি সুবিধা স্থগিত হওয়া, স্মার্ট ও স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টসে আগুন লাগা এবং এ খাতে ন্যূনতম মজুরি নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য। এসব কারণের সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় পোশাক শিল্পের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা ২০১৪ সালেও ফিরিয়ে আনা যায়নি। গার্মেন্টস খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত আড়াই দশকে এ খাতের অর্জন এবং যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল তাতে ২০২২ সালে এ খাত থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় আসার কথা। কিন্তু গত বছরের এসব বিপদের কারণে এ খাতের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছির তা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। এমনকি ৪০ শতাংশ গার্মেন্টেসে এখনো ন্যূনতম মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন করা হয়নি। সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

২০১৪ সালের খতিয়ান দেখলে দেখা যাবে, বছরজুড়ে পুঁজিবাজারের দরপতন, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান কমে যাওয়া, রেমিট্যান্স প্রভাবে ভাটা, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে হতাশার পাল্লাই ছিল ভারী। এছাড়া ২০১৪ সালে ব্যাংকিং ব্যবসাসহ সবধরনের ব্যবসায়ে মন্দা, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না হওয়া, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে প্রবৃদ্ধি না হওয়ার বেদনাও ছিল। একইসঙ্গে কাঙ্খিত রাজস্ব আদায় না হওয়া ছিল গেল বছরের নেতিবাচক দিক। ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বছরের শুরু থেকেই যথেষ্ট পরিমাণে গ্যাসবিদ্যুতের সরবরাহ করছিল সরকার। সেসময়ে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে মনোযোগী হচ্ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হওয়ায় নতুন বিনিয়োগ থমকে দাঁড়ায়। দেশিবিদেশি কোনো উদ্যোক্তাই আর নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী নয়। যা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

২০১৪ সালে নতুন করে বিনিয়োগ করতে পারেনি ব্যাংকগুলো। আর ব্যবসাবাণিজ্যে স্থবিরতায় বিনিয়োগ করা অর্থও ফেরত পায়নি ব্যাংক। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের অনুরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের খেলাপিদের ছাড় দিয়েছে। কমিয়ে দেওয়া হয়েছে রফতানি উন্নয়ন তহবিলের সুদহার। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদেরকেও সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব কারণে ব্যাংকের আয় তেমন বাড়েনি। ফলে একদিকে ব্যাংকের আয় কমেছে, বেড়েছে খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আমদানি কম হওয়া, ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দার পাশাপাশি ঋণ খেলাপি, পুনঃতফসীলিকরণ ও প্রভিশনিং বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সার্কুলারের কারণে ব্যাংকিং ব্যবসা বিপাকে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। ২০১৪ সাল রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সুখকর ছিল না। এ সময়ে রাজস্ব আদায় আগের অর্থবছরের তুলনায় বেশি হলেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশ খানিকটা পিছিয়ে ছিল।

২০১৪ সালের জুনে বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদনে (ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট২০১৪) বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে মোট বিদেশি বিনিয়োগ আগের বছরের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেড়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে মোট বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ২০১২ সালে বাংলাদেশে মোট বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ১২৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার। ২০১৩ সালে সম্পূর্ণ নতুন বিনিয়োগ এসেছে ৫৪ কোটি ১০ লাখ ডলারের যা আগের বছরের তুলনায় ৯ শতাংশেরও বেশি। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘২০১৪ সালটি রাজনৈতিকভাবে শান্তিপূর্ণই ছিল। তাই সবার ধারণা ছিল এবার বিনিয়োগ বাড়বে। কিন্তু বছর শেষে যা দেখা যাচ্ছে, বিনিয়োগ সেভাবে বাড়েনি। ২০১৩ সালে বৃদ্ধির হার যা ছিল ২০১৪ সালেও একই পরিস্থিতি। আসলে সরকারের তরফ থেকে অর্থনৈতিক সংস্কারমূলক কোনো কার্যক্রম নেয়া হয়নি। ফলে যেটা হচ্ছে, রফতানি প্রবৃদ্ধি প্রথম ৫ মাসে দেখা গেল ১ শতাংশের মতো যা আগের বছর ছিল ১২ থেকে ১৩ শতাংশ। কিন্তু বছর শেষে রফতানি প্রবৃদ্ধি ১২ থেকে ১৩ শতাংশে নিয়ে যাওয়া কঠিন। কারণ গার্মেন্টস সেক্টরের অনেক ক্রেতা অন্য দেশে চলে গেছেন। আমাদের যে সব উদ্যোগ আছে তা তারা হয়তো আবার ফিরে আসবেন। ততোদিনে কিন্তু আমাদের রফতানি প্রবৃদ্ধি গত বছরগুলোর তুলনায় অনেক কমে যেতে পারে।

এক হিসেবে দেখা গেছে, প্রতি বছর ১৮ থেকে ২০ লাখ শিক্ষিত মানুষ চাকরির বাজারে আসছে। এ সব শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের চাকরির ব্যবস্থা না করা গেলে শিক্ষিত বেকারত্ব দিন দিন বেড়েই যাবে। আবার বিদেশে জনশক্তি রফতানি অনেক কমে গেছে। এ বছর ৪ লাখের বেশি মানুষ বিদেশে পাঠানো যায়নি। আগের বছরও সংখ্যা একই ছিল। কিন্তু ২০১২ সালে বা তার আগে বিদেশে জনশক্তি গেছে ৬ থেকে ৮ লাখের মতো। ফলে দেশের চাকরির বাজারে এই মানুষগুলো ভিড় করছেন। গত ২৬ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে প্রবাসী ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশ ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করছে। গত এক দশকে দারিদ্র্যের হার ৫৭ থেকে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, মাথাপিছু আয় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে, ডাবল ডিজিট থেকে মুদ্রাস্ফীতি আবার ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হয়েছে প্রায় এক কোটি। তিনি বলেন, এ সময়ে রফতানি আয় তিন গুণ বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন থেকে ৩০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের কোটা ছুয়ে এখন ২২ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রবৃদ্ধি ভালো হলে সরকারের রাজস্ব আহরণের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। তার ফলে সরকার বাজেট ঘাটতি সীমার মধ্যে রেখেও দারিদ্র্যবিমোচন সংক্রান্ত যেসব সরকারি কর্মকাপরিচালনা করা উচিত, সেক্ষেত্রেও উদ্যোগ নিতে পারে না। ভারতের প্রবৃদ্ধি বেশি হওয়া সত্ত্বেও কিছু কিছু সূচকে তারা আমাদের চেয়ে পিছিয়ে আছে। তবুও প্রবৃদ্ধি, একটা পূর্বশর্ত হচ্ছে সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতি এবং সামাজিক উন্নয়ন। এক্ষেত্রে আমাদের যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে সেই চ্যালেঞ্জগুলো অ্যাড্রেস করার জন্য নীতিনির্ধারণকে খুব বেশি মাত্রায় গুরুত্ব দেয়া উচিত।’

এদিকে বিবিএস এর জরিপ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে শ্রমশক্তির পরিমাণ পাঁচ কোটি ৬৭ লাখ। এর মধ্যে পাঁচ কোটি ৪১ লাখ মানুষের কাজ আছে। এর অর্থ মাত্র ২৬ লাখ মানুষ বেকার। তবে জরিপেই বলা আছে, পরিবারের মধ্যে কাজ করে কিন্তু কোনো মজুরি পান না, এমন মানুষের সংখ্যা এক কোটি ১১ লাখ। এ ছাড়া আছে আরও এক কোটি ছয় লাখ দিনমজুর, যাদের কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিশ্বব্যাংক মনে করে, সরকার কম দেখালেও প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। এর ওপর এখন প্রতিবছর নতুন করে ১৩ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। সুতরাং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির চাপ রয়েছে অর্থনীতির ওপর।।