Home » রাজনীতি » ক্ষিপ্ততার সীমা এবং ক্ষমতার অহঙ্কার

ক্ষিপ্ততার সীমা এবং ক্ষমতার অহঙ্কার

আবীর হাসান

dis 3মানুষের তৈরি জিনিসপত্রের দৈর্ঘপ্রস্থবৈধ কিংবা কর্তৃত্ব এমন মাত্রায় বাড়ে না যা অসীম পর্যায়ে চলে যেতে পারে। ক্ষমতা যেমন অসীম হতে পারে না এবং অদম্য গতিতে সময়কে অতিক্রম করে যেতে পারে না, তেমনি অধীনতা ও বঞ্চনাও অনন্তকাল ধরে চলতে পারে না। অন্তত এখন পর্যন্ত এমন ঘটনা ঘটেনি। ২০১৫ সালের শুরু থেকেই এমন একটা আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, আগের মতো আর কিছুই চলবে না। বিশ্ব ব্যবস্থাতেও যেমন পরিবর্তন আসন্ন তেমনি দেশের পরিস্থিতিও পরিবর্তিত হবে। গত বছরের মতো একইভাবে কাটবে না ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহটা। সময় দাড়িয়ে থাকবে না যেমন আগেও থাকেনি, তেমনি ঘটনাগুলোকেও কোনো ব্যক্তির ইচ্ছার খাচার বন্দী করে রাখা যাবে না।

অবশ্য চেষ্টা হচ্ছে ও রকমই ক্ষমতাসীনরা চাচ্ছেন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী অবস্থাটা বজায় রাখতে এবং সেটাকে দীর্ঘায়িত করতে, নিদেনপক্ষে ২০১৪ সালের শেষের দিকের পাচটা মাস যেভাবে তারা কাটিয়েছেন সেভাবে ২০১৫ থেকে ২০১৯ও কাটাতে। অবশ্য আরও আগে বাড়তে চান তারা, ২০২১কে টার্গেট করার কথা ইতোমধ্যে জানিয়েও দিয়েছেন।

এই টার্গেটেরও একটা সীমা মানুষ হিসেবে থাকা উচিত। কেননা জীবন এবং কর্মক্ষমতাও সসীম। এসব বিষয়ের অবতারণা না করে এটা বলাই সঙ্গত যে, দেশকে রাজনীতিহীন করার চেষ্টা হোচট খাচ্ছে এবং সেটা খুব একটা সাবলীল গতিতে এগুবে না অবধারিত।

কারণ রাজনীতিহীনতা যখন জীবন সংশয়ের ঝুকি নিয়ে হাজির হয় তখন মানুষ রাজনীতিকেই বেছে নেয়। মানব সভ্যতার অর্জন ডায়ানোএথিক এবং নৈতিকতা যা রাজনীতির অকৃত্রিম সত্ত্বা। এ দুটোকেই মানুষ আকড়ে ধরে শেষ অবলম্বন হিসেবে। আর বিধাতার কাছে প্রার্থনা করে স্বৈরশাসকের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। বাংলাদেশের ইতিহাসেই এটা ক্রমাগত হয়ে এসেছে। দুঃখ প্রকাশের ব্যাপারে নয়, আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক দল ১৯৭২ সাল থেকেই দেশের মানুষকে রাজনীতিহীন করার চেষ্টা করেছে। পরবর্তী শাসকরাও সেই একই কাজ করেছেন নিজের নিজের স্টাইলে। কিন্তু চাওয়া ছিল ওই একটাই, মানুষ যেন রাজনীতি না করে, কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ না করে, সুশাসন না চায় এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যুক্তি ও নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এই দফার আওয়ামী লীগের আগের তিন মেয়াদের চেয়ে এই মেয়াদে এই চাওয়াটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ভয়াবহ এই কারণে যে, রাজনৈতিক ন্যায়কে বিসর্জন দিয়ে এমন একটা ন্যায় প্রতিষ্ঠার আবদার তারা করছেন যা দাসের ওপর প্রভূর কর্তৃত্বের মতো। কোন কোন সময় তাকে সন্তানের ওপর পিতার কর্তৃত্বের মতো করে তোলার চেষ্টাও হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কোন রাষ্ট্রে এ ধরনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। কারণ গণতান্ত্রিক এবং রাজনৈতিক মূল্যবোধ ভয়াবহভাবে স্বজনবিরোধী। ন্যায়ের আনুগত্য এবং আদর্শিক অর্জন এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। প্রাচীনকালে চীনা শাসকরা তিনি ঈশ্বরের প্রতিভূ তাদের পিতার মতো। কিন্তু এ কথা বলে সন্তানকে কষ্টে রাখা, তার অধিকার হরণ করা, সম্পদ তছরূপ করা এবং জীবনকে তুচ্ছ করে ফেলতে দ্বিধাবোধ করতেন না। সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশেই রাজনৈতিক ন্যায়ের বদলে ঈশ্বর, পিতা বা পিতৃমাতৃ অধিকার বলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু তা কর্তৃত্বকারী গোষ্ঠী, দল বা ব্যক্তির জন্য খুব একটা উপভোগ্য হয়নি শেষ পর্যন্ত। ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা, ফিলিপিন্স, সিঙ্গাপুর, আর্জেন্টিনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রগুলো এর উৎকৃষ্ঠ উদাহরণ। সময় যতো এগোয় ততোই এ ধরনের মেয়াদকালহীন ক্ষমতা দুর্বল হতে থাকে। এ কারণেই তথাকথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত পুলিশী ব্যবস্থায় পর্যবসতি হয়। আর এই ব্যবস্থাটা খুব বেশিদিন টেকসই হয় না। এটা পুলিশী ব্যবস্থার অক্ষমতা না শাসকের কর্তৃত্বের দুর্বলতা নাকি সময়ের টোল আদায়ের জন্য হয়তো কে জানে।

তবে স্বৈরাচারী এরশাদ গত ১ জানুয়ারি বড় খেদ নিয়ে একটা কথা বলেছেন, ‘ইতিহাস আমাকেও ক্ষমা করেনি’। এরশাদও চেয়েছিলেন ১৯৮৫৮৬’র মতো সারা জীবন সুলভে ক্ষমতা ধরে রাখতে। তার আমলের ওই দুটো বছর ছিল তার জন্য অতীব সুখের। কিন্তু তারপর থেকেই ঘটনা প্রবাহ অন্যদিকে মোড় নিতে থাকে। আর ১৯৯০তে গিয়ে একেবারেই তা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়।

ওই নিরিখে ২০১৪ সালটি ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য একটা সুখের বছর। একটা গোলমেলে নির্বাচনের মাধ্যমে পাওয়া ক্ষমতা ভাওতা দিয়ে টিকিয়ে রাখার জন্য পুলিশী শক্তিকে সঠিকভাবে অপব্যবহার করতে পেরেছেন তারা। তবে বছরটা বিগত হয়েছে হারিয়ে গেছে কালের অতলে। ২০১৫ সালে এসে সেই অবস্থাটা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা যে তারা করছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তাতে রাজনীতির কোন বৈশিষ্টই থাকছে না। ইতোমধ্যেই তা অপসৃত হয়েছে বা উধাও করে দেয়া হয়েছে। ফলে এই ক্ষমতাটার মধ্যে গণতন্ত্র তো নেইই রাজনীতিও নেই। আছে কেবল রূঢ় স্বেচ্ছাচার এবং অশ্লীল বাক্য বিনিময়ের প্রতিযোগিতা। নিজেরা ইচ্ছা করে রাজনীতি পরিত্যাগ করেছেন বলেই কেবল জেলঅহংকার আর প্রভূসুলভ বক্তব্যে প্রতিদিন দেশের মানুষের কান ভরে দিচ্ছেন তারা। অতিকথনের নিম্নতম পর্যায়ও অতিক্রম করেছেন তারা।

কিন্তু মানুষের কান ভরার একটা সীমা আছে এবং কোনও একক মানুষ বা গোষ্ঠীর অহংকারেরও সীমা আছে। সে সীমাটা ইতোমধ্যেই অতিক্রান্ত হয়েছে। তবে যতোটা সম্ভব তারা করে যাচ্ছেন। এ বিষয়টাতে তারা যে নিরলস তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এক্ষেত্রে সদাচারকে যেহেতু বিসর্জন দিয়েছেন তারা সেহেতু ফলাফলের বিষয়টা নিয়ে খুব একটা আশাবাদী হওয়ার অবকাশ আর তাদের নেই। এ কারণেই বছরের প্রথমদিন থেকেই ভিন্নমাত্রিক ক্ষিপ্ততা দেখা যাচ্ছে সরকারের মন্ত্রীদের। বেশ বোঝা যাচ্ছে, এই ক্ষিপ্ততাও অচিরেই পৌছে যাবে চরম সীমায়। নিজেদের তৈরি নিয়মই তারা মানতে পারছেন না। রাষ্ট্রের সব কিছুকে দলীয় সঙ্কীর্ণতার কানা গলির মধ্যে ঢুকিয়ে স্বস্তি পেতে চাচ্ছেন তারা। কিন্তু তাতে আরও শঙ্কা বাড়ছে।