Home » রাজনীতি » গণতন্ত্রের এমন বিজয়োৎসব কখনো দেখেনি কেউ

গণতন্ত্রের এমন বিজয়োৎসব কখনো দেখেনি কেউ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

dis 2৫ জানুয়ারি বিএনপি ঘোষিত ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ প্রমান ও সফল করতেই সরকার ও ক্ষমতাসীন দল কি কার্যত সারাদেশকে অবরুদ্ধ করে ফেলছে? ভয়েরআতংকের বাত্যাবরন তৈরী করে অন্ধকারের চাদরে কেন মুড়ে ফেলা হচ্ছে গোটা দেশ? এই প্রশ্ন এখন বাংলাদেশের প্রতিজন সাধারন মানুষের। গেল বছর ২০১৪ সালের ডিসেম্বরজানুয়ারির ধ্বংসযজ্ঞের দগদেগ তাজা স্মৃতি প্রায় অবিকলঅবিকৃতভাবে ফিরিয়ে আনা হলো ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে। রক্তাক্ত,অগ্নিদগ্ধ, আতংকিত, হিংস্র, অবরুদ্ধ দেশ আবার ফিরে এসেছে। কারণ একটিই, ক্ষমতায় টিকে থাকা। ২০১৪ সালের জানুয়ারির জন্য যদি দায়ি করা হয় ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন উৎসব এবং এর প্রতিক্রিয়ায় বিএনপিজামায়াতকে, তাহলে এবারের জানুয়ারির জন্য এককভাবে সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে। কেন সরকার এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করল? সরকার কি যে কোন আন্দোলন অথবা কর্মসূচিকে ভয় পায়? ক্ষমতা হারানোর ভয়ে সরকার কি অহর্নিশি আতংকিত? তারা কি বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়? বিরোধী মতপথকে কোন অবস্থাতেই সহ্য করতে চায় না? শঠতা, প্রতারণা, মিথ্যের ফুলঝুড়ি আর উন্নয়নের মিথ তৈরী করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে চায়? একের পর এক উন্নয়নের মিথ তৈরী করে, অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা বলে সরকারবিরোধী রাজনীতির ওপর দীর্ঘকালে খাঁড়া নামিয়ে আনা হচ্ছিল এবং যার সূচনা কি ঘটলো চলতি বছরের প্রথম সপ্তাহেই?

সহিংসতা, প্রাণসংহার আর জনগনের বৃহৎ অংশের অনুপস্থিতিতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একটি একক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। জনসম্পৃক্ততা ছাড়াই রক্তাক্ত পথে বিএনপিজামায়াত জোট এ নির্বাচন প্রতিরোধে সপূর্ণ ব্যর্থ হয়। গেল বছর ০১ জানুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঐ জোট ঘোষিত অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়া হয় ১৩ জানুয়ারি। এ সম্পর্কে বিএনপির সাম্প্রতিক দলীয় মূল্যায়ন হচ্ছে, সে সময় আন্দোলন অব্যাহত রাখতে পারলে ক্ষমতাসীনদের আলোচনায় বসতে বাধ্য করা যেত এবং একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ এভাবে ক্ষমতায় জেঁকে বসতে পারতো না। তাদের মতে, কোন দিক নির্দেশনা ছাড়া আকস্মিভাবে আন্দোলন থেকে সরে আসায় হামলামামলায় পর্যুদস্ত নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ে। অন্যদিকে, বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতার অপ্রকাশ্য মূল্যায়ন হচ্ছে, নির্বাচনে অংশ না নেয়াটা ভুল ছিল। কিন্তু দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া ও তদীয় পুত্র তারেক জিয়া দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ব্যাপারে অনড় থাকায় কারো পক্ষে এ বিষয়ে টুঁ শব্দ করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে বিএনপির সাধারন সমার্থকগোষ্ঠির মূল্যায়ন হচ্ছে, আন্দোলনের কৌশল হিসেবে সে সময়ে বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহনের ঘোষণা সবচেয়ে বেকায়দায় ফেলতে পারতো আওয়ামী লীগকে। কারণ, তারা কখনই চায়নি বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিক এবং ঐ নির্বাচনে বিএনপির জয় ছিল অবধারিত। ক্ষমতাসীনরা যেকোন উপায়ে নির্বাচন ভন্ডুল করে দিত এবং আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারতো বিএনপি। তাদের মতে, এসব তো কিছু হয়ইনি বরং সরকারের পাতানো ফাঁদ ও পথে বিএনপি হেটেছে যা সাধারন জনগন মোটেই পছন্দ করেনি। ফলে তারা না সামিল হতে পেরেছে নির্বাচন প্রতিরোধের আন্দোলনে না ভোট দেবার ক্ষেত্রে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয় হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিএনপির দুর্বলতা প্রকট হয়ে ওঠে এবং জামায়াতশিবির নির্ভরতা দৃশ্যমান হয়ে পড়ে।

নির্বাচনের একমাস পর গত বছর ৪ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া জানিয়েছিলেন, আগে দল গোছাবেন, তারপরে আন্দোলন শুরু করবেন। বছর ধরে দল গোছাতে গিয়ে বিএনপির ভেতরের দেউলিয়াত্বপনা ও ভেতরের দ্বন্দ্ববিবাদ প্রকাশ্য হয়ে পড়ে। এমনকি দলের একজন স্থায়ী মহাসচিব নিয়োগ দিতে সমর্থ হয়নি বিএনপি। নতুনভাবে ঢাকা মহানগর কমিটি গঠিত হলেও দ্বন্দ্ববিবাদ থেকে যায়। উপরন্তু ছাত্রদলের কোন্দলহানাহানি দলকে বিব্রতকর পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যায়। লন্ডন প্রবাসী দলের সিনিয়র ভাইস চেযারম্যান তারেক বাস্তবতা বিবর্জিত বক্তব্য দলকে বারবার বেকায়দায় ফেলেছে। এর ফলে গত একবছর ধরেই বিএনপির দল গোছানো ও আন্দোলনের আওয়াজ মিডিয়ায় সীমাবদ্ধ থেকে যায়। কার্যত: তারা এ সময়ে দেশের কয়েকটি বিভাগীয় ও জেলা শহরে সমাবেশ, জনসভা ছাড়া কোন কর্মসূচি দিতে সক্ষম হয়নি। ডিসেম্বরের শেষে এসে তারা গাজীপুরে ছাত্রলীগ ও সরকারের যৌথ প্রতিরোধের মুখে জনসভা করতে না পেরে হরতাল দিয়ে মুখরক্ষার চেষ্টা করে।

সবশেষে তারা ৫ জানুয়ারিকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস অভিহিত করে এই দিনটিকে ঘিরে সমাবেশ ও জনসভার মত নিরীহ কর্মসূচি দিয়েও পার পায়নি। এই কর্মসূচি নিয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্যণীয়। সরকার ও ক্ষমতাসীন দল এর বিপরীতে চলে যায় হার্ড লাইনে। ৩ জানুয়ারি থেকে সারাদেশকে এক কথায় অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়। ঐ দিন রাতেই বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয় পুলিশ। রাস্তায় আড়াআড়িভাবে ট্রাক ও ভ্যান দিয়ে পথ বন্ধ করে দেয়া হয়। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দিয়ে যুগ্ম মহাসচিব রুহল কবীর রিজভীকে পুলিশ হেফাজতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সরকারী ইঙ্গিতে বেসরকারী পরিবহন ও লঞ্চ মালিকরা বাস, লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে ঢাকাকে সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ৪ জানুয়ারি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সকল সভাসমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। শুরু হয় বিএনপি নেতাদের গ্রেফতার ও বাসায় বাসায় তল্লাশি অভিযান। খালেদা জিয়া তার কার্যালয়ে বন্দী হয়ে পড়েন। এ নিয়ে বছরের শুরুর শ্রেষ্ঠ কৌতুকটি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তার জন্য চিঠি দেয়ায় তাকে (খালেদা জিয়া) বাড়তি নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে। তিনি বন্দী নন। ইচ্ছে করলে বাসায় চলে যেতে পারেন’। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীও বলেছেন, খালেদা জিয়ার বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কি অমানবিক কৌতুক! দেশের একজন প্রধান নেত্রীর অফিস অবরুদ্ধ করে দিয়ে, রাস্তায় আড়াআড়ি ইটবালুর ট্রাক রেখে বলা হচ্ছে, তার বাড়তি নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। মন্ত্রী মেফাজ্জেল হোসেন চৌধুরী মায়া লুঙ্গি পড়ে দলীয় কার্যালয়ে এসেছিলেন এই চ্যালেঞ্জ নিয়ে যে, বিএনপি ঢাকায় সমাবেশ করতে পারলে তিনি গামছা পড়ে ঘুরে বেড়াবেন। মন্তব্য করার কিছু নাই, তবে একটি বাক্য বলে রাখা ভাল যে, জনগনের তাড়া খেয়ে বহু মহারথী ইতিপূর্বে গামছা পড়ারও সময় পায়নি।

এভাবেই একটি তামাশার নির্বাচনে নির্বাচিত সরকার একটি দলের নিরীহ কর্মসূচিতে নাশকতার দোহাই দিয়ে গোটা দেশকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। নিজেরা সমাবেশ মিছিল করেছে। আমোদ করেছে বিএনপি নেত্রীর সাথে কেউ নেই, তার অসহায়ত্ব উপভোগ করেছে। আবার বেরোতে গেলে বেরোতে দেয়নি, মেরেপিটিয়ে, পিপার ¯েপ্র করে কার্যালয়ের মধ্যে ঠেলে পাঠিয়ে দিয়েছে। বেসরকারী চ্যানেল একুশ টিভি অনানুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং গ্রেফতার করা হয়েছে এর চেয়ারম্যানকে। আহা, গণতন্ত্রের এমন বিজয়োৎসব কে, কবে, কোথায় দেখেছে! এর মধ্য দিয়ে কি প্রকারান্তরে তারা বিএনপির অভিযোগ ও দাবির যৌক্তিকতা প্রমান করছে যে, গত ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনের একবছর পরে যে, ঐ দিন দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবশিষ্টাংশ নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙ্গে দিয়ে একদলীয় শাসনব্যাবস্থা কায়েম করা হয়েছিল?

দলদাস বুদ্ধিজীবি ও সাংবাদিকরা সরকারের এই আচরনের প্রতিবাদনিন্দা করা তো দুরের কথা, বরং দেশ জুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির এই সরকারী পদক্ষেপ জায়েজ করার জন্য যে সব কথাবার্তা বলছেন, তা কেবল তাদের দৈন্যতা ও দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করে দিয়েছে। গত জানুয়ারিতে সংঘটিত নাশকতার উদাহরণ টেনে তারা বলার চেষ্টা করছিলেন, গোয়েন্দাদের কাছে নাকি খবর ছিল সমাবেশের অনুমতি দিলে বিএনপি নাশকতা করবে! তারা তো আসলে বিএনপি চেয়ারপারসনকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করেনি, নিরাপত্তা বাড়িয়েছে মাত্র! গত কয়েক বছর ধরে সংঘটিত নাশকতা ও ধংসযজ্ঞের জন্য বিএনপিজামায়াতকে সরকার দায়ী করলেও এখন পর্য়ন্ত একটি ঘটনায় কাউকে বিচারের মুখোমুখি না করায় এ নিয়েও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করতে বলা হচ্ছে বিএনপিকে। অথচ শোনা যায়, জামায়াতের সাথে ক্ষমতাসীনদের একটি গোপন সম্পর্ক গড়ে উঠছে। শান্তিপূর্ন আন্দোলনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বিএনপিকে। ২০১৪ সাল জুড়ে বিএনপির সমাবেশজনসভা শান্তিপূর্ণই ছিল। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশে কখনোই বিরোধীদলকে শান্তিপূর্ন আন্দোলন করতে দেয়া হয়নি। আর এই আমলেও তো প্রশ্নই উঠছে না। এর নমুনা পাওয়া যাচ্ছিল গাজীপুর থেকে এবং শেষ হল জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ জুড়ে সরকার ও ক্ষমতাসীনদের অবরোধের মধ্য দিয়ে। সেখান থেকেই শুরু হল বিএনপির অবরোধ কর্মসূচি। এর শেষ কোথায় আমরা জানি না!

একটি একক ও প্রায় ভোটারবিহীন দশম সংসদ নির্বাচনের পর একাধিক লেখায় যে কথাটি বলার চেষ্টা করা হয়েছিল সেটি এখন দৃশ্যমান বাস্তব। ঐ নির্বাচনের পরে বলা হয়েছিল, নির্বাচিত এই সরকারটি নৈতিকভাবে দুর্বল সরকার। তাকে ব্যস্ত থাকতে হবে এই নির্বাচনটিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতার তকমা পরাতে। কারণ, ক্ষমতাসীনরা জানে ঐ নির্বাচনে অধিকাংশ ভোটারই ভোট দেয়নি। নির্বাচিত ১৫৩ জন প্রার্থী ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন। বাকি ১৪৭ টি আসনে ভোটার উপস্থিতি ছিল নগন্য। এজন্য শুরু থেকে আশংকা করা হয়েছিল নৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ার কারনে এই সরকার অনেক বেশি হিংস্র ও ক্ষিপ্রতাসম্পন্ন হবে। বিরোধীদের দমনপীড়নে হয়ে উঠবে চরম আগ্রাসী। নিয়োগ করা হবে সর্বশক্তি। মাত্র এক বছর পরে বর্তমান বাস্তবতায় জনগন এর প্রতিটি বাক্যের সত্যতা উপলব্দি করতে পারছেন। ভীতবিপর্যস্ত সরকার বেছে নিয়েছে নিপীড়নের আইনীবেআইনী সকল কৌশল। এখন এর ফলে একটি বড় আশংকা জন্ম নিচ্ছে। সরকার যে ভয় ও অন্ধকারের মধ্যে দেশ ও জনগনকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে জনগনের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে উঠবে অন্ধকারের প্রানীরা। সক্রিয় হয়ে উঠবে জঙ্গী, মৌলবাদী ও চরমপন্থী সন্ত্রাসীরা। তাদের সাথে যুক্ত হবে রাজপথে নামতে না পারা দলগুলোর তরুন শক্তি। ন্যায়ত ও কার্যত: যদি সকল মতপথকে অবরুদ্ধ করে দেয়া হয় তাহলে বিপরীতে অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে অন্ধকারের শক্তির উত্থান। তথাকথিত ইসলামী মিলিট্যান্সি হয়ে উঠতে পারে অপ্রতিরোধ্য। এর অনিবার্যতা হচ্ছে, বাংলাদেশ বিবেচিত হবে বিশ্বে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।।