Home » প্রচ্ছদ কথা » ফিরে আসুন ওই সর্বনাশা পথ থেকে

ফিরে আসুন ওই সর্বনাশা পথ থেকে

আমীর খসরু

coverতলানিতে গণতন্ত্রের যে অবশেষটুকুও বাকি ছিল তাও নানা চেষ্টাতদবির, ফন্দিফিকির করে বিদায় দেয়া হয়েছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। ওই সময়ও সরকারি উদ্যোগে রাজধানীকে পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার লক্ষ্যে সরকারি অবরোধও হয়েছিল। তাদের উদ্যোগেই সংঘাতসহিংসতাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বালুইট ভর্তি ট্রাক সংস্কৃতির সৃষ্টিও ওই সময়ে। ওই সব নজিরবিহীন ঘটনা এদেশের রাজনীতি ইতিহাসে নেতিবাচক এবং কালো অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে আছে এবং থাকবে। কিন্তু এক বছর পরেও ওই নজিরবিহীন অবস্থাকে আরও নাজুক করে দিয়ে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস হিসেবে পালন করার নামে রাজনীতির অধিকতর অধঃপতনের ঘটনা ইতিহাসে সংযোজিত হলো। নিজেদের গণতন্ত্র বিজয় দিবসকে বিসর্জন দিয়ে বিরোধী দল, মত, পক্ষকে সমূলে উৎপাটনের যে শপথ তারা আগেই নিয়েছিল তার বাস্তবায়ন হয়েছে আরও হিং¯্রতা, ক্ষিপ্রতা, ভয়াবহতা এবং সহিংস পন্থার মাধ্যমে। এ কথাটি বলতেই হবে, গণতন্ত্রের বিজয় দিবসে আসলে ক্ষমতাসীনরা নৈতিক এবং মানসিকভাবে পরাজিতই হয়েছে। আর তারই সব স্বাক্ষ্য মিলেছে এবারের ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে। বাস্তবে সরকার ও ক্ষমতাসীনরা যে সীমাহীন ভীতি ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে তা পুরোটা প্রমাণের জন্য এই ঘটনাগুলোই যথেষ্ট। এ কারণে গত বছরের দুটো বালুইট ভর্তি ট্রাকের বদলে এবারে এসেছে কমপক্ষে ১০ থেকে ১২টি ট্রাক, জলকামান, রায়টকারের সংখ্যা বেড়েছে, নিরাপত্তা স্তর ও বলয়ের সংখ্যা তিন গুণ হয়েছে এবং যুক্ত হয়েছে পিপার স্প্রে ছড়ানোর মতো ঘটনাও। এসবই প্রমাণ করে সীমাহীন ভীতির পারদ উপরে উঠতে উঠতে এক বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌছেছে। এ কথা আমাদের সবারই জানা যে, শাসক যখন দ্বিগিদ্বিক শূন্য হয়ে পরে তখন বাস্তবকে তারা দেখতে বা বুঝতে পারে না। তারা মনে করে, সবাই তাদের কথা বিশ্বাস করছে এবং তাদের কথাই শেষ কথা। এরই প্রমাণ দিলেন সরকার প্রধান নিজেই। যখন বিএনপি চেয়ারপার্সনকে দলীয় কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে তখন ৪ জানুয়ারি তিনি বললেন, ‘কয়েকদিন আগে উনি চিঠি দিয়েছেন ওনার নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য। যে নিরাপত্তা জোরদার করতে গেলাম এখন বলে বন্দী করে রাখা হয়েছে। মানুষ যাবে কোথায়?….. পুলিশ যখন নিরাপত্তা দিল তখন আবার বলে বন্দী করে রাখা হয়েছে। উনি তো বন্দী নন ইচ্ছা করলে উনি ওনার বাসায় এখনই যেতে পারেন’। যখন খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে তালা মেরে দেয়া হয়েছে তখনো (৬ জানুয়ারি) স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবার বললেন, ‘খালেদা জিয়া ইচ্ছা করলে বাসায় যেতে পারেন’। ৫ জানুয়ারি মন্ত্রী মায়া বললেন, ‘ইট ও বালুর ট্রাক খালেদা জিয়া তার বাড়ি সংস্কারের জন্য এনে রেখেছেন’।

এসব কথামালার মধ্যদিয়েই বোঝা যাচ্ছে আসলে তাদের মানসিক অবস্থা এবং মনোজগতের পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে রয়েছে। এটা যদি কোনো একজন সাধারণ মানুষ তার নিজ বলয়ের মধ্যে করতেন তাহলেও তা হতো তার আশেপাশে যারা থাকেন তাদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। আর এটা যখন রাষ্ট্র পরিচালকদের ঘটনা হয় তখন পরিস্থিতি কি দাড়ায় তা সহজেই অনুমান করা যায়।

এ কথা পুনর্বার বলার প্রয়োজন নেই যে, বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই তারা বিরোধী দল, মত, পক্ষকে সমূলে বিনাশ করতে চায়। একই সাথে তারা জনগণের গণতান্ত্রিক আশাআকাঙ্খাকেও করে দিতে চায় বিলুপ্ত। এ বিনাশ ও বিলোপের ধারায়ই সব কিছু ঘটছে বিষয়গুলো সে নিরিখেই বিবেচনা করতে হবে।

এ কথা বহুবার বলা হয়েছে যে, নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ। একটি রাষ্ট্রে পুরো মাত্রায় গণতন্ত্র বিদ্যমান থাকতে হলে তার প্রথম ও উল্লেখযোগ্য ধাপটিই হচ্ছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য এবং প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচন। আর এটি যদি সম্পন্ন হয় তাহলে গণতন্ত্র তার যাত্রাটি শুরু করতে পারে। তবে গণতন্ত্র তখনই পূর্ণতা পায় যখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মৌলিক অধিকারসহ জনগণের সব অধিকারগুলো নিশ্চিত করাসহ প্রথাপ্রতিষ্ঠান অর্থাৎ পুরো রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যেই গণতন্ত্র বিদ্যমান থাকে। গণতন্ত্র কোনো খন্ডিত বিষয় নয়, একটি অবিরাম প্রচেষ্টা ও চর্চ্চার নাম। কিন্তু বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশটিতে কখনই গণতন্ত্র চর্চ্চা তো দূরে থাক, ন্যূনতম যতোটুকু প্রচেষ্টা প্রয়োজন, তার বিপরীতটাই ঘটেছে। আর এর শুরু স্বাধীনতার ঠিক পর পরই। এরপরে চলেছে সেনা শাসন এবং ’৯০এর পরে বেসামরিক শাসনে গণতন্ত্র চর্চ্চার যে সামান্য সুযোগটুকুও তৈরি হয়েছিল বর্তমান সরকার এসে তাতে শেষ পেরেকটা ঠুকে দিয়েছে। আগে নির্বাচনের যে সামান্য ব্যবস্থাটি ছিল সব দলের অংশগ্রহণে তাও বিদায় করা হয়েছে। আর এ বিপজ্জনক যাত্রার এক ভয়ঙ্কর সংযোজন ৫ জানুয়ারি নির্বাচন। ওই পরিস্থিতির আরও ভয়াবহ রূপ হচ্ছে বর্তমানে যা ঘটছে তাই।

একটি প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় বিরোধী দল কেন প্রয়োজন এবং অপরিহার্য তাও সবারই জানা। নির্বাচন যেমন গণতন্ত্র যাত্রার একটি প্রাথমিক পন্থা, তেমনি ওই নির্বাচনটি হতে হবে সব দল, মত ও পক্ষের অংশগ্রহণে। বর্তমান সরকার কথায় কথায় উন্নয়নের কথা বলছে। এমনও অনেক সরকারপন্থী কথাজীবি আছে যারা বলে থাকে গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নয়ন বেশি জরুরি। ওই সব মৃত বিবেকধারী ব্যক্তিদের এটা জানা নেই যে, উন্নয়নের পূর্ব শর্ত হচ্ছে গণতন্ত্র। অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষের অংশীদারিত্ব ও প্রতিনিধিত্ব। তারা এক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক দেশ এবং জনকল্যাণধর্মী একনায়কদের (বেনুভোলেন্ট ডিক্টেটর) কথা বলে থাকে। কিন্তু এটাও তাদের জানা নেই যে, ওই ব্যবস্থাগুলোর প্রতি প্রবল জনসমর্থন রয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান জনসমর্থনহীন সরকারের পক্ষে উন্নয়নের নামে জনগণের অর্থ বিনাশ বা ভাগবাটোয়ারা হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র অপরিহার্য। তবে প্রকৃত গণতন্ত্র কোনো সমাজে থাকলে উন্নয়ন সাধিত হয় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়েই। এ জন্য গণতন্ত্রকে বাদ দিয়ে উন্নয়নের নামে অস্বাভাবিক পথ গ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই। যারা ওই পথ গ্রহণ করে তারা আসলে মনেপ্রাণে স্বৈরাচারী এবং এ কারণেই তারা ওই পথটি গ্রহণ করছে। এ কথাও মনে রাখতে হবে, জনসমর্থনহীন সরকারের অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশ শাসন।

বর্তমান সরকার গণতন্ত্রের বিজয় দিবসের কথা বলছে অগণতান্ত্রিক পন্থায়, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকে বিদায় দিয়ে। এর বিপজ্জনক দিকটি হচ্ছে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি না থাকলে বা ওই পরিস্থিতি বিদ্যমান না রাখা হলে যে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তাতে অস্বাভাবিক পন্থারই উত্থান ঘটে। শূন্যতার সুযোগ গ্রহণের চেষ্টা চালায় ধূর্ত সুযোগ সন্ধানীরা। রাজনীতির স্বাভাবিক এবং অবাধ পথ বন্ধ হলে যারা সংক্ষুব্ধ তারাও যে স্বাভাবিক পথে এগিয়ে যাবে তা নয়। এ কথা মনে রাখতে হবে, স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বই যে রাজনীতির মাঠের একমাত্র খেলোয়াড় বা পক্ষ থাকে তা নয়। সেখানে নানা অ্যাক্টর ও ফ্যাক্টর অর্থাৎ অরাজনৈতিক নানা পক্ষ ও মতপথের ছায়াকায়াহীন সুযোগ সন্ধানীদের উত্থানের সুযোগ ঘটে। স্বাভাবিক পথে সুযোগ না পেলে অনিবার্যভাবে অস্বাভাবিক পথ কেউ কেউ গ্রহণ করতে পারে যার উদাহরণ রয়েছে দেশে দেশে, অতীতে এবং বর্তমানে। বর্তমান সরকার জঙ্গীবাদসন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কথা বলছে। কিন্তু সুষ্ঠু স্বাভাবিক রাজনীতি না থাকলে ওই বিপদের ঝুকিই শুধু থাকে না, ওই পন্থার পাশাপাশি চরম পথের অনুসারীরা সক্রিয় হতে পারে, নানা ভাবে এবং নানা পথে। এটা দেশ এবং জাতির ভবিষ্যতের জন্য এক অশনিসঙ্কেত হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু সেই বিপজ্জনক পথেই সরকার হাটছে। এখনো সময় আছে ফিরে আসুন ওই সর্বনাশা পথ থেকে।