Home » শিল্প-সংস্কৃতি » মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিকৃত বয়ান (শেষ পর্ব)

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিকৃত বয়ান (শেষ পর্ব)

ফ্লোরা সরকার

last 7সাধারণত যার মাথা তারই ব্যাথা হবার কথা, কিন্তু বলিউডের ইয়াশ রাজ ফিল্মস এর ব্যানারে নির্মিত ও আলী আব্বাস জাফরের চিত্রনাট্য ও পরিচালিত ছবি ‘গুন্ডে’র ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটতে দেখা গেলো। ছবিটি নির্মিত হলো ভারতে আর তার প্রতিক্রিয়া ঘটলো বাংলাদেশে। ইতিহাস যখন শুধুমাত্র মিথ্যে দিয়ে নয়, বিকৃত করে চিত্রিত বা রচিত হয় তখনই এমন ঘটনা ঘটে থাকে। ভারতের নির্মিত এই ছবি তাই বাংলাদেশের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব থেকে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো ছবির যেভাবে সমাপ্তি টানা হয়েছে তা শুরুর থেকেও যেনো আরো প্রশ্নবোধকে রূপান্তরিত হয়েছে। সেখানে যাবার আগে আমরা ছবির শুরু থেকেই আলোচনায় যেতে পারি।

ছবিটি শুরু হয় ভয়েসওভার বা ধারাভাষ্যের মাধ্যমে, ছবির পর্দায় ভেসে ওঠে – ’১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১’, ধারাভাষ্যের পাশাপাশি আমরা কাহিনী দেখতে থাকি। ধারাভাষ্যের প্রথম অংশটুকু দেখলেই যেকোনো ইতিহাস সচেতন মানুষ চমকে উঠবেন, কেননা এই ইতিহাস কোনো প্রগৈতিহাসিক যুগের নয়, সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া জলজ্যান্ত সত্য ইতিহাস, প্রত্যক্ষদর্শীদের মাঝে যাদের অনেকেই এখনো বেঁচে আছেন। এখন দেখা যাক, সেই ধারাভাষ্যে আমরা কি শুনতে পাই – ‘‘১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। পাকিস্তান এবং হিন্দুস্তানের মধ্যে তৃতীয় যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছে। নব্বই হাজার পাকিস্তানি সেনা, হিন্দুস্তানী সেনার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে (পর্দায় আমরা জেনারেল নিয়াজি এবং অরোরার আত্মসমর্পণের দৃশ্যসহ অন্যান্য দৃশ্য দেখি)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বলা হয়ে থাকে, এটাই এযাবৎকালের সব থেকে বৃহত্তম আত্মসমর্পণ। জন্ম নিলো এক নতুন দেশ বাংলাদেশ’’। যখন হিন্দুস্তান সেনারা ঢাকা ছেড়ে চলে যায়, (পর্দায় আমরা দেখি জেনেভা ক্যাম্পে নিয়ে যাবার জন্য অপেক্ষারত দুটি শিশু অন্যান্য অনেক মানুষের সঙ্গে কাঁটাতারের অপর পারে দাঁড়িয়ে গাড়ি বহরে চলে যাওয়া বিদায়ী ভারতীয় সেনাদের দেখছে) তখন দুটি হিন্দু অনাথ শিশু বিক্রম এবং বালা দুজনের মনে এই প্রশ্ন ছিলো যে, তাদের সাথে যা হলো তা কি ভালো না মন্দ হলো নতুন দেশ কি তাদের নতুন জীবন দেবে? দুজনের চোখে সেদিন এই প্রশ্নই ছিলো। প্রথম বাক্যটিই একটু নিবিড় ভাবে পড়লে যা দৃষ্টিআকর্ষণ করে তা হলো দুটো শব্দ . হিন্দুস্তান ২. তৃতীয় যুদ্ধ। বোঝা গেলো ভারতীয়রা এখনো নিজেদের ‘হিন্দুস্তান’ বলতে খুবই স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। কেননা, ‘ভারত’ শব্দের চাইতে ‘হিন্দুস্তান’ শব্দটি দিয়ে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের অধিকৃত এবং অধিকারভুক্ত ভূখন্ড বিশেষভাবে প্রতীয়মান করা যায়। দ্বিতীয় শব্দটি আরো ভয়াবহ, কেননা, এই শব্দের সঙ্গে ভারত শুধু একাই জড়িত নয়, সেই সঙ্গে আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র, ‘বাংলাদেশ’ নামের এই দেশটির অস্তিত্বের প্রশ্নও জড়িত। ছবিতে বলা হয় হিন্দুস্তান এবং পাকিস্তানের মাঝে ১৯৭১ সালে ঘটেছে ‘তৃতীয় যুদ্ধ’, দর্শক মনে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠবে, ’৭১ এর যুদ্ধ কি তাহলে ভারত আর পাকিস্তানের মাঝে সংগঠিত কোনো যুদ্ধ ছিলো এবং এই যুদ্ধ যদি উল্লেখিত দুই দেশের তৃতীয় যুদ্ধ হয়, তাহলে প্রথম দুটি যুদ্ধ কখন, কেনো, কীভাবে সংঘঠিত হয়।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়ার রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট শর্মিলা বোস, (যার ‘ডেড রেকনিং’ বইটি বেশ সাড়া জাগিয়েছে) তার প্রবন্ধ Anatomy of Violence : Analysis of violence in East Pakistan 1971- এ ইকবাল নামের একজন প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধার একটি উক্তি তুলে ধরেন – ‘বাংলাদেশই হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে তার স্বাধীনতা সংগ্রামকে দুটি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখা হয়।’ এই ক্ষোভের কারণ আর কিছুনা, উইকিপিডিয়া সহ সাম্প্রতিক সব ইতিহাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা সংগ্রামকে কেবলমাত্র ভারতপাকিস্তানের যুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার এক অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। উইকিপিডিয়ায় ভারতপাকিস্তানের মধ্যে সংঘঠিত চারটি যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে . ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে সংঘঠিত প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধ। ২. ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে সংঘঠিত সতর দিনের দ্বিতীয় কাশ্মীর যুদ্ধ। ৩. ১৯৭১ এর ভারতপাকিস্তান যুদ্ধ (?) এবং ৪. ১৯৯৯ সালের প্রথম দিকে, যা কারগিল যুদ্ধ নামে পরিচিত। উইকিপিডিয়ায় ১৯৭১ এর আমাদের মুক্তি সংগ্রামের কিছুটা আলোচনা থাকলেও মোটা দাগে তা ইন্দোপাকিস্তান যুদ্ধ বলেই উল্লেখ করা হয়েছে। কাজেই পরিচালক জাফর তার ‘গুন্ডে’ ছবিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ভারতপাকিস্তানের তৃতীয় অন্যতম যুদ্ধ বলে যে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটাবেন এ আর এমনকি ঘটনা?

যাই হোক ছবির সেই বিক্রম আর বালা ঢাকা থেকে পালিয়ে চলে যায় কলকাতায়, শুরু হয় তাদের অবৈধ উপার্জনে বেড়ে ওঠার কাহিনী আর আমরা দেখি গতানুগতিক তৃতীয় শ্রেণীর হিন্দি ছবির মারদাঙ্গা কাহিনী। যদিও হিন্দুস্তান টাইমস (১৪.০২.২০১৪) ছবিটির ওপর প্রশংসাসূচক আলোচনা করেছে। তাদের মতে ছবিটি সত্তরের দশকের সেসব ছবির মতো যেসব ছবিতে নায়ক, নায়কোচিত অপরাধ করে থাকে, নায়ক অপরাধী হলেও সম্মানিত, যেমন সোলে, কালা পাত্থার, কাভি কাভি ইত্যাদি, যেসব ছবির একচ্ছত্র নায়ক ছিলেন অমিতাভ বাচ্চন। গুন্ডে ছবির বালা এবং রাহুল কলকাতার সেরা কয়লা মাফিয়া চক্রে রূপান্তরিত হয়। একের পর এক অপরাধ করেও তারা পার পেয়ে যায়। এমনকি নন্দিনী নামের মেয়েটির ভালোবাসাকে তুচ্ছ করে তাদের বন্ধুত্ব অটুট থাকে। ছবির শেষে তাই দেখতে পাই পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে তারা পালিয়ে যাচ্ছে, ধারাভাষ্যে আমরা শুনি – ‘তারা গুন্ডা ছিলো, আছে এবং থেকে যাবে।’ ছবির এইরকম সমাপ্তি তাই আরো বড় একটা প্রশ্নের মুখোমুখী করে আমাদের।

বিজেপি, আরএসএস, শিবসেনা ভারতীয় নির্বাচনের সময় যে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিয়েছিল এবং বর্তমানেও হিন্দু রাষ্ট্র কায়েমের যেসব বক্তব্য শোনা যাচ্ছে সে কথাই বার বার মনে হয়। আগে এবং এখনো বলা হচ্ছে, ভারতে কেবল হিন্দুদেরই ঠাঁই হবে। অন্য ধর্মের হলে গলা ধাক্কা। গুন্ডে ছবির শেষ দৃশ্যের সঙ্গে উক্তির কি অসাধারণ সাদৃশ্য আমরা দেখতে পাই। বালা এবং রাহুল দুজন বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে চলে যায় এবং সেখানে বিভিন্ন অপরাধ কর্মে নিয়োজিত হলেও, থাকে আইনের উর্ধ্বে এবং এসব অপরাধ তারা করে যেতে থাকে, সবাই তাদের ক্ষমা করে কারণ তারা ‘গুন্ডে’র নায়কোচিত অপরাধী আর আরএসএস, শিবসেনা, বিজেপি’র সংখ্যালঘু। কিন্তু এই সংখ্যালঘু নায়কেরা কি কখনো ভারতীয় সমাজের মূল ধারার সঙ্গে মিশে যেতে পেরেছে না পারবে কোনোদিন? তারা কি সারাজীবন অপরাধের কালিমা বয়ে বেড়াবে? কেবলমাত্র বাংলাদেশ থেকেই ভারতে গুন্ডের আমদানি ঘটে থাকে? অর্থাৎ বাংলাদেশ একটি অপরাধী তৈরির একটি বৃহৎ কারখানা মাত্র? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর বা সমাধান, না ছবিতে না তাদের উক্তিতে পাওয়া যাবে।

কিন্তু বাংলাদেশে এই দফায় ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানীর বিশাল উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে একটি শ্রেণীর মধ্যে থেকে। তারা যুক্তি দেখান, আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে। প্রতিযোগিতার এই সময়ে প্রতিযোগিতা ছাড়া কিছু টিকে থাকতে পারেনা। খুব ভালো কথা। দুঃখের বিষয় ‘প্রতিযোগিতা’ শব্দ আমরা যত সহজে উচ্চারণরণ করি বুঝি তার খুব কম। প্রশ্ন হলো প্রতিযোগিতা কখন, কার সঙ্গে হয়? নিশ্চয়ই দুটো উপযুক্ত পণ্যের সঙ্গে। চলচ্চিত্র যদি পণ্য হয়ে থাকে, আমাদের প্রথমে ভাবতে হবে, আমাদের চলচ্চিত্রের অবস্থান কোন্ পর্যায়ে আছে? একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হবার সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে করে তার অবস্থান বোঝার জন্যে কোনো গবেষণার বা মিডিয়া বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন পরবে না। সামান্য একটা ফিল্ম ইন্সটিটিউট (পুনে ইন্সটিটিউটের মতো ইন্সটিটিউট অনেক দূরের কথা) আমরা এখনো গড়ে তুলতে যেখানে পারিনি, দেশের ভেতরেই যেখানে প্রতিযোগিতাহীন একের পর নিম্ন মানের চলচ্চিত্র নির্মিত হয়ে চলেছে, সেখানে বাইরের ছবির সঙ্গে কীভাবে প্রতিযোগিতা হতে পারে তা বোধগম্য নয়। হয়তো তারা বলবেন, বাইরের ছবি (বাইরের ছবি বলতে তারা বিশেষ ভাবে ভারতীয় ছবিই মনে করেন) না এলে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি হবেনা। ভালো কথা। ‘গুন্ডে’ র মতো ইতিহাস বিকৃতির ছবি আমাদের কোন প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব গড়ে তুলবে? স্বাধীন দেশে বসবাস করে পরাধীনতার ঐতিহাসিক মনোভাব নয়কি? ছবিটি ওই দেশে এবং দেশের বাইরে অসংখ্যবার স্ক্রিনিং হয়ে গেছে। যতবার ছবিটির স্ক্রিনিং চলেছে, আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর ততবার কালিমা লিপ্ত হয়েছে। এভাবে যদি ভারতীয় ছবি আমদানি হয় তাহলে এর মাধ্যমে আমরা শুধু আমাদের দেশীয় ছবির বাজার হারাবো না, একই সঙ্গে হারিয়ে ফেলবো আমাদের সত্য ইতিহাস। যে ইতিহাস কেবলমাত্র এককভাবে কোন দল বা পক্ষ দ্বারা রচিত হয়নি, রচিত হয়েছে এ দেশের সাধারণ মানুষের রক্তের রেখা দিয়ে। আমরা আশা করবো ভারতীয় ছবির আমদানি যেকোনো মূল্যে শুধু বন্ধ নয় একই সঙ্গে ভারতীয় বিকৃত ইতিহাসের সব ছবির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে।।