Home » মতামত » রাজনৈতিক সঙ্কট :: মূল কারণ অন্যত্র

রাজনৈতিক সঙ্কট :: মূল কারণ অন্যত্র

বিদ্যমান সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণ বিশ্লেষণ করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক আফসান চৌধুরী।

. আকবর আলি খান

bisleson 1বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের পর্যালোচনা করতে হলে বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে হবে। এ দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা শুরু হয়েছে স্বাধীনতার পর থেকেই। এরপরে বঙ্গবন্ধু, মরহুম জিয়াউর রহমান এসব বড় বড় হত্যাকান্ড ঘটেছে এবং এই ঘটনাগুলো ঘটার ফলে দুই দলের মধ্যকার বিভক্তি প্রকট আকার ধারণ করেছে। রাজনীতির বিভক্তির প্রেক্ষাপটে দু’দলই ক্ষমতায় আসতে চায়। এই যে ক্ষমতার লড়াই এবং তিক্ততা মিলেই দ্বান্দ্বিক রাজনীতির সৃষ্টি হয়েছে।

১৯৯০ থেকে যে ধারা আমরা পেয়েছিলাম তাতে আবারও ব্যতিক্রম হয়েছে। আবার ’৯০এর আগের যে পরিস্থিতি সেখানেই আমরা ফিরে গেছি, অর্থাৎ যেখানে যেনতেন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মনে রাখতে হবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচনই যথেষ্ট নয়। কারণ বাংলাদেশে দেখা গেছে, একবার একদলকে পরিবর্তন করে আরেক দল ক্ষমতায় আসে। কিন্তু দেশের শাসন ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন হয় না, সুশাসনের অবনতি ঘটছে। এ জন্য বাংলাদেশের সংবিধানের কতোগুলো পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো যদি না আনা হয় বা আনা না যায় তাহলে একদল আসবে এবং আরেক দল যাবে। নির্বাচন হতে পারে কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য যে পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে তা হচ্ছে নির্বাচন ব্যবস্থার পরিবর্তন, প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা হ্রাস, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণ। এছাড়া গণভোটের ব্যবস্থা করতে হবে অর্থাৎ কোনো ব্যবস্থায় যদি জনগণ সংক্ষুব্ধ হন তার প্রতিকারের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ। সাংবিধানিক পথগুলোকে নিরপেক্ষকরণ যার মাধ্যমে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ সব পরিবর্তন অনেক বড় এবং এগুলো কোনো জোটের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আন্দোলন হতে পারে, সরকারও পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না।

যতোই নির্বাচনের কথা বলা হয়, আসলে ৫ বছরে একবারই জনগণ প্রজাতন্ত্রের মালিক হন। যারা নির্বাচিত হন তারা মনে করেন, তাদেরকে দেশের মৌঢ়শীপাট্টা দিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তারা ৫ বছর যা ইচ্ছা করতে পারেন। তবে আগের সাথে এখনকার তফাৎটা হচ্ছে আগে ৫ বছরে একদিন জনগণ ক্ষমতা পেতেন, এখন ওই একদিনের যে ক্ষমতাও আর নেই।

একথা বলতেই হবে যে, গণতন্ত্র সংরক্ষণের জন্য নির্বাচনের প্রয়োজন রয়েছে এটা ঠিক কিন্তু নির্বাচন দিলেও গণতন্ত্রের সব সমস্যার সমাধান হবে না এবং সমস্যাগুলো সম্পর্কে সবাই ওয়াকিবহাল। কিন্তু এসব সঙ্কট ও সমস্যা সমাধানের জন্য বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো উদ্যোগ নেই। কারণ ওই সব সংস্কার যদি না হয়, তাহলে তারাই উপকৃত হন।

বিদ্যমান সঙ্কট সমাধানের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বলতে চাই, কোনো ধরনের যদি একটি নির্বাচন করা যায় তবে চলমান সঙ্কট হ্রাস পাবে বটে, কিন্তু সামগ্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন করাই যথেষ্ট নয়। দেশের রাজনীতিকে ঢেলে সাজানো, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন, শাসনতান্ত্রিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। আর এগুলো করার জন্য যা প্রয়োজন তাহলো এই রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর থেকেই এ ধরনের উদ্যোগ আসতে হবে। সে ধরনের কোনো উদ্যোগ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু এ জন্য যে তা কোনোদিন হবে না, তাও চিন্তা করা ঠিক নয়। তবে সম্ভাবনার যে পথটি রয়েছে সে পথটি দিয়ে আমরা হাটছি না।

আফসান চৌধুরী

bisleson 2দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এদেশের রাজনীতির কোনো ইতিহাস তৈরি হয়নি, সৃষ্টি হয়নি কোনো ঐতিহ্যের। যেটা তৈরি হয়েছে তাহলো রাজনৈতিক দলের ঐতিহ্য। এর ফলে রাজনীতি করতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক এবং রাজনৈতিক দল দুটোরই উন্নতির প্রয়োজন হয়, পরিপক্কতার দরকার হয়। কিন্তু আমরা দেখতে পাই, যেহেতু বাংলাদেশের সাংবিধানিক এবং এর চর্চার দিক অর্থাৎ কোনোটিই সবল হয়নি বা সে সুযোগও পায়নি, সে কারণে আমরা জানিই না কিভাবে রাজনীতি করতে হয়। আমরা বর্তমানে যা করছি তাকেই রাজনীতি বলে মনে করি। আর যেহেতু আমরা পাকিস্তানের গর্ভ থেকে বের হয়ে এসেছি, পাকিস্তানেও ওই ঐতিহ্যটির সৃষ্টি হয়নি। যার কারণে এক ভয়াবহ অবস্থায় এখন পাকিস্তান।

আমরা সাধারণত রাজনৈতিক দল বলতে যা বুঝতে চাই অর্থাৎ দুটো দল পারস্পরিক কথা বলবে, তাদের বক্তব্য দেবে, নির্বাচন করবে সে ঐতিহ্য বাংলাদেশে নেই।

বাংলাদেশে ১৯৭২ থেকে ’৭৫এর মধ্যে বাকশাল হয়েছে, ’৭৫৭৬ থেকে ’৯০ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসন হয়েছে, তারপরেও হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো কিভাবে রাজনীতি করতে হয় তা কখনোই শেখেনি। এখন নতুন একটি পর্যায় দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু নতুন এই পর্যায়টিকে যদি বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দেখা হয় বা বিবেচনা করা হয় তাহলেই হবে ভ্রান্তি। মূলত ’৭২এর ঐতিহ্য থেকে এগুলো প্রায় অবধারিত ছিল। অর্থাৎ যদি রাজনীতি পরিপক্কতা না পায়, প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্কতা না আসে তবে সে দেশের রাজনীতি এ রকমই হয়। আসল কথা হচ্ছে এখন তো রাজনীতি হচ্ছে না, হচ্ছে রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষ, বিবাদ এক বিষয়, আর রাজনীতি অন্য বিষয় আর এ কারণেই আমাদের এ সঙ্কট।

এখানে আরেকটি বিষয় বলতে চাই ১৯৯০এর পরে যে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছিল, তার জন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দায়ী নয়। আসলে ওই আশাবাদেরই কোনো ভিত্তি ছিল না। রাজনীতি ’৯০এর আগেও যেমন ছিল, ’৯০এর পরেও তেমন রয়েছে। মূল বিষয় হচ্ছে আমাদের কল্পনায়, ভাবনায় তিনটি মহত্তম সময় হচ্ছে ১৯৬৯, ১৯৭১ এবং ১৯৯০। কিন্তু এগুলো সব কিছুই রাজপথের আন্দোলন, মাঠের আন্দোলন। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্কতার আন্দোলন তো কখনই হয়নি। এর কারণ হচ্ছে যার ভিত্তিতে ওই আন্দোলন হতে পারে তা তৈরি হয়নি। ১৯৯০এর কথাই যদি বিবেচনা করি তাহলে দেখা যাবে, রাস্তা বা মাঠ পর্যায়ের আন্দোলন হয়েছে। রাস্তা বা মাঠের আন্দোলন একটু অনুসঙ্গ হিসেবে থাকতে পারে, তবে যখন একটি দেশের ইতিহাসে রাস্তার আন্দোলনই প্রধান হয়, তখন আমরা কিছুতেই বলতে পারি না যে, সে রাজনীতি পরিপক্ক। বাংলাদেশের নির্মল সাংবিধানিক রাজনীতির কোনো অভিজ্ঞতা নেই। পাকিস্তানেরও ওই একই অবস্থা।

আসলে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, রাজনৈতিক দলগুলো জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন। নির্বাচন নিয়ে তারা যে ঝগড়াঝাটি করছে তা তাদের নিজেদের ক্ষমতায় যাবার ব্যাপারে, এর সাথে জনগণের সম্পৃক্ততা নেই। কারণ আমাদের দেশে যে সব নির্বাচিত সরকার তারা কখনোই জনগণের উন্নয়ন করতে পেরেছে এমন কোনো উদাহরণ নেই। ২০০৬ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নির্বাচন জনগণের অবস্থার উন্নয়ন করেছে এমনটা তারা বিশ্বাস করেন না।