Home » অর্থনীতি » শঙ্কা-উৎকণ্ঠায় ব্যবসায়ীরা

শঙ্কা-উৎকণ্ঠায় ব্যবসায়ীরা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

dis 4রাজনৈতিক অস্থিরতায় আবারও আতঙ্কে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা। একদিকে বিরোধী দলীয় জোটের দেয়া কঠোর আন্দোলনের শঙ্কা, অন্যদিকে সরকারের অনমনীয় মনোভাব। সরকার ও বিরোধী দলের কর্মসূচি রাজনৈতিক মাঠ যখন উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা,তখন সে আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে। ব্যবসায়ীদের মতে, সরকারের অনমনীয় মনোভাবে বিরোধী দলের ডাকা কঠোর থেকে কঠোর আন্দোলনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসাবাণিজ্যে। বাধাগ্রস্ত হবে আমদানিরফতানি, ব্যবসাবাণিজ্য ও শিল্প কারখানার উৎপাদনসহ ব্যাংকিং লেনদেনও। ক্ষতিগ্রস্থ হবে ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাসহ সব নাগরিক।

২০১৩ সালে হরতালসহ সরকার ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক কর্মকান্ডে স্থরিব হয়ে পড়েছিল দেশের অর্থনীতি। বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছিল ব্যবসাবাণিজ্যসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির। ফলে চরম হতাশায় পড়েছিল ব্যবসায়ীরা। মাত্র এক বছর আগের সে ক্ষতি পুষিয়ে না উঠতেই নতুন করে বিরোধী জোটের আবারও সরকার পতন আন্দোলনের ঘোষণা এবং সরকারের অনড় অবস্থান ব্যবসায়ীদের আবারও হতাশায় ফেলেছে। এমনি উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, অতিমাত্রায় রাজনৈতিক কর্মসূচির আড়ালে ধ্বংসাত্মক হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচিতে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত ২০১৩ এর রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন ব্যবসায়ী ও হকার ও শ্রমিক শ্রেণীর সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হয়েছে। যা থেকে বাদ পড়েনি সাধারণ ভোক্তারাও। নতুন করে বিরোধী দলের আন্দোলনের ঘোষণায় ব্যবসায়ী সমাজে আবারও ভীতি দেখা দিয়েছে

নির্বাচনী বছরে ক্ষতি

বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯০ সালের পর থেকে প্রতি নির্বাচনী বছরে দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। যেমন, ১৯৯৫৯৬ অর্থবছরটি ছিল নির্বাচনী বছর। ওই সময়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধি আগের অর্থবছরের ৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে হয় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। একইভাবে ২০০১০২ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ, আর এর আগের বছর ছিল ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। একইভাবে ২০০৭০৮ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২ শতাংশ হলেও পরের অর্থবছরটি ছিল নির্বাচনী বছর। সে সময় প্রবৃদ্ধি কমে হয় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। এর নেপথ্য কারণ ছিল হরতালসহ ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মকান্ড।

গবেষণায় রাজনৈতিক অস্থিরতা

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ১৯৭৫ থেকে ২০১৩ এর ১১ এপ্রিল পর্যন্ত হরতালের কারণ বিশ্লেষণ করে বলেছে, এ পর্যন্ত যত হরতাল হয়েছে, তার প্রায় ৯৫ শতাংশই ডাকা হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। মাত্র ৫ শতাংশ হরতাল হয়েছে অর্থনৈতিক কারণ কিংবা জনস্বার্থে। হরতাল ও রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে অর্থনীতির ক্ষতি নিয়ে ২২ বছর ধরেই নানা ধরনের গবেষণা করছে বিভিন্ন দেশিআন্তর্জাতিক সংস্থা। ব্যবসায়ীরাও নানাভাবে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে নানা ধরনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোনো উদ্যোগই সফল হয়নি। বরং রাজনৈতিক সহিংসতা ও হরতাল বেড়েই চলেছে। রাজনৈতিক যে দলটি ক্ষমতায় থাকে, তারাও হরতালের কারণে অর্থনীতির ক্ষতি নিয়ে সোচ্চার থাকে। আবার তারাই বিরোধী দলে গিয়ে হরতাল করে। এর ফলে সমস্যার কোনো সমাধান কখনও হচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক গবেষণায় রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষতি

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর হরতালের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা বাংলাদেশের জিডিপির ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশের সমান। বাংলাদেশের হরতাল নিয়ে ২০০৫ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) গবেষণায় বলা হয়, ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর হরতালের কারণে দেশের জিডিপির ৩ থেকে ৪ শতাংশের সমান আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল গত ৩ আগস্ট ২০১৩ এক প্রতিবেদনে বলেছে, হরতাল বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট সমস্যা। এ নিয়ে অনেক দিন ধরেই ধুঁকছে বাংলাদেশ। হরতালের কারণে ২০১৩ সালে প্রায় ৫৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকার (৭০০ কোটি ডলার) ক্ষতি হয়েছে। প্রতিদিনের ক্ষতি প্রায় এক হাজার ৫৪০ কোটি টাকা (২০ কোটি ডলার)

অভ্যন্তরীন গবেষণায় অস্থিরতায় ক্ষতি

হরতালে ক্ষতির একটি হিসাব করেছে ঢাকা চেম্বার। সংগঠনটি হরতালের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানায়, এক দিনের হরতালে অর্থনীতির ক্ষতি ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। আর বছরে গড়ে ৪০ দিনের হরতাল হিসাবে ক্ষতি ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া মোট দেশজ উত্পাদন বা জিডিপিতে দৈনিক ক্ষতির হার ৬০ শতাংশ এবং বছরে জিডিপিতে ক্ষতির অংশ ৬.৫ শতাংশ। সংগঠনটির গবেষণায় বলা হয়, এক দিনের হরতালে পোশাক খাতে ক্ষতি ৩৬০ কোটি, রাজস্ব আদায়ে ২৫০ কোটি, খুচরা বিক্রিতে ৬০০ কোটি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা খাতে ৬৫ কোটি, শিক্ষা খাতে ৫০ কোটি, পরিবহন খাতে ৬০ কোটি, পর্যটন খাতে ৫০ কোটি, উৎপাদন খাতে ১০০ কোটি ও অন্যান্য খাতে ৬৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এভাবে এক দিনে মোট ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এ ক্ষতি শুধু জিডিপির। এর বাইরেও বহুমাত্রিক ক্ষতি রয়েছে, যা পরিমাপ করা যায়নি বলে উল্লেখ করে সংগঠনটি। হরতালের ক্ষতি নিয়ে পরিসংখ্যান দিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। সংগঠনটির হিসাবে, এক দিনের হরতালে দেশের জিডিপির দশমিক ১২ শতাংশ ক্ষতি হয়। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের (আইসিসিবি) হিসাবে, এক দিনের হরতালে এক হাজার ৫৪০ কোটি টাকার (২০ কোটি ডলার) ক্ষতি হয়।

তৈরি পোশাক খাত

তৈরি পোশাক শিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএ গত এপ্রিলে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিল, এক দিনের হরতালে পোশাক খাতের ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। যদিও ঢাকা চেম্বারের দেয়া তথ্যে দেখা গেছে, এ খাতে একদিনে ক্ষতির পরিমাণ ৩৬০ কোটি টাকা। বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, হরতালে ব্যবসায়ীদের যেমন ক্ষতি হয়, তেমনি সারা বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। জিএসপি, রানা প্লাজা ধস ও তাজরিন ফ্যাশনের অগ্নিকান্ডের ক্ষতি এখনও পুষিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। নতুন করে আবারও হরতাল অবরোধের মতো রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু হলে আমাদের অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।

রাজস্ব ক্ষতি

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একদিনের হরতালে ৪০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়। হরতালে স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ থাকলে রাজস্ব আদায়ে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়, তা জানতে এ প্রতিবেদন তৈরি করে এনবিআর। রাজস্ব আদায়ের দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বড় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে প্রতিদিন প্রায় চার হাজার পণ্যের চালান খালাস হয়। হরতালের কারণে চালানগুলো সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। এ ছাড়া সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোলে আটকে থাকে ৪০০টি, ঢাকা কাস্টম হাউসে ৬০০ থেকে ৭০০ ও কমলাপুর আইসিডিতে ৫০৬০টি চালান। হরতালজনিত কারণে মালপত্র খালাস না হওয়ায় সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটে। এতে ব্যবসাবাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দেয়।

পরিবহনের ক্ষতি

ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির হিসাবে, হরতালের দিন সারাদেশে গড়ে কমপক্ষে সাড়ে তিন লাখ বাসমিনিবাস ও ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকে। এ কারণে ওই সব দিন অন্তত ২৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। গত বছর ৫২টি হরতালে ভাঙচুর করা ও পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে কয়েকশ’ যানবাহন। এ ক্ষতির পরিমাণও প্রায় দশ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞ মতামত

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, হরতাল অবরোধে প্রথম প্রভাব পড়ে নিত্যপণ্যের বাজারে। সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না থাকায় পণ্যমূল্য বেড়ে যায়। এতে স্বল্প আয়ের মানুষ পড়েন নানা ভোগান্তিতে। গত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা কম থাকলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি খুব একটা ভালো হয়নি। এ অবস্থায় রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হলে বাজেটের যে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না বলেও জানান তিনি।

বিশ্ব ব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দীর্ঘ সময় থেকে বিনিয়োগের স্থবিরতা গত এক বছরেও স্বাভাবিক হয়নি। মূলত রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণেই এমনটি হয়েছে। আবারও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতায়। ফলে এ বছরও অর্থনৈতিক কর্মকাব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হবে।

পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. জাইদি সাত্তার বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ফের যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে তার নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতেই পড়বে। ২০১৫ সালের শুরু থেকেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল বিএনপি নানা কর্মসূচি ঘোষণা করছে। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও। এর ফলে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ নষ্ট হবে, যা হবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি। তিনি আরো বলেন, যেকোনো দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগ পরিবেশে প্রভাব ফেলে। রাজনীতিকদের উচিত এসব বিষয়ে নজর রাখা। দেশের বড় রফতানি খাত পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিতকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি মোঃ শহীদুল্লাহ আজীম বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা রফতানি খাতে বড় ধরনের সঙ্কটের সৃষ্টি করবে। গত এক বছর আমরা অপেক্ষাকৃত শান্তিতেই ছিলাম। ২০১৩ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমরা যে ক্ষতির শিকার হয়েছিলাম, তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলাম। ক্রেতারা আবার ফিরতে শুরু করছিলো। কিন্তু আবার রাজনৈতিক অঙ্গনে যেসব বিশৃঙ্খলা ঘটলো, তা আমাদের চলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তার মতে, দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর বড় ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও তারা দায়িত্বশীল আচরণ করছেন না। বিজিএমইএ’র হিসাব মতে দেশের হরতাল বা এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গড়ে প্রতিদিন পোশাক শিল্পেই প্রায় ৩শ’ কোটি টাকার ক্ষতি হয়।