Home » শিল্প-সংস্কৃতি » আমাদের জাতীয় চরিত্র এবং ১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন

আমাদের জাতীয় চরিত্র এবং ১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন

ফ্লোরা সরকার

last 6১৯৬৬ সালে নির্মিত ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’ অনেকদিনের পুরনো হলেও, আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নানা দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চলচ্চিত্র। ছবিটি শুধু পুরনো ঢাকার একটি আইকন হয়ে থাকার জন্যে নয়, এদেশের একমাত্র কমেডি ছবি এবং আমাদের জাতীয় চরিত্র তুলে ধরার জন্যেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বানিজ্যিক ছবিগুলোর মধ্যে এমন বাস্তব ধারার ছবি আমরা খুব কম পেয়েছি। আমাদের বানিজ্যিক ধারার ছবিগুলি বিশেষ করে আশির দশকের পর থেকে প্রধানত নায়কনায়িকা নির্ভর ছবি হয়ে উঠছিলো। ফলে সেখানে কৃত্রিম প্রেম আর যৌনতার খামোখা কিছু সুরসুরি ছাড়া আমরা বিশেষ কিছু দেখতে পাইনা। এটা ভাবার কোনো যৌক্তিকতা নেই যে, দর্শক এসব পছন্দ করেন বলেই নির্মাতার এই ধরণের সিনেমা নির্মাণ করতে বাধ্য হন। কেননা এখনও যেমন দর্শক আছেন সেই সময়েও এই দর্শকই ছিলেন। ১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন সেসব দর্শকের ধার না ধরে সাহসের সঙ্গে সেদিন যে ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন, সেই কারণে, শুধু পুরনো ঢাকাই নয়, আমাদের জাতীয় চরিত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি আমরা আজ উদঘাটন করতে পারি। বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রেখ্যাপটে ছবিটির উপর আলোচনা করা তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জেমস টেলর ১৮৪০ সালে, কোলকাতা থেকে ‘টপোগ্রাফী অফ ঢাকা’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামন, বাংলা অ্যাকাডেমি থেকে জেমস টেলরের বইটি অনুবাদ করে ‘কোম্পানি আমলে ঢাকা’ নামে প্রকাশ করেন। জেমস টেলার তার বইটিতে ঢাকা শব্দের উৎপত্তি নিয়ে আলোচনাকালে, বেশ কিছু তথ্য দেন। তার মধ্যে একটি হলো ঢাকা শহরকে ‘৫২বাজার এবং ৫৩ গলি’ নামে অভিহিত করা।

১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’ এর শুরুতেই আমরা সেসব গলির দেখা পাই। টপ লং শটে ক্যামেরা প্যান করে পুরনো ঢাকার অনেকটা জায়গা জুড়ে দেখানো হয়। সরু রাস্তা বা গলির ভেতর দুই এক জন মানুষের চলাচল ছাড়া কোনো যানবাহন দেখা যায়না। দালানগুলো তখনও তালগাছ, নারকেল গাছকে ছাপিয়ে যায়নি। অধিকাংশ বাড়িঘর একতলা, খুব বেশি হলে তিন বা চারতলা পর্যন্ত দেখা যায়। বাড়ির ভেতরে এবং বাইরে আদি পুরনো ঢাকার একটা আমেজ ছড়িয়ে থাকে। মোটা মোটা ভিমের ওপর দালানগুলো নির্মিত, জানালায় শুধু মোটা শিক দেখা যায়, দোতলা বা তিনতলার খোলা বারান্দার কারুকাজও আমাদের ছোখে পড়ে। ভাবতে অবাক লাগে সেই সময়ের অভিনয়শিল্পীরাও কতটা প্রতিভাবান ছিলেন। এই ছবির কাহিনী এবং সংলাপ সেই সময়ের বিখ্যাত কৌতূকাভিনেতা খান জয়নুলের হাত দিয়ে রচিত হয়েছে। ছবিটি নিয়ে আমরা যত আলোচনা করবো ততই কাহিনীর শক্তিশালী দিকগুলি উদঘাঠিত হবে।

চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন, চার্লি চ্যাপলিন সম্পর্কে একবার বলেছিলেন – ‘মানুষ হাসে। হাসে আর ভাবে। ভাবে আর তাদের মনের বয়স বাড়ে’। এই ছবি সম্পর্কেও আমরা একই কথা বলতে পারি। ছবিটিতে আমরা সামগ্রিক ভাবে শুধু কলহপ্রিয় এক ঢাকা শহরকেই পাইনা, সেই সঙ্গে সারাদেশের কলহপ্রিয় এক জনসমষ্টিকে পাই। ছবির কাহিনী দুটো পরিবারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটিয়া দম্পতি। এই দুই দম্পতির মাঝে বিবাদ দিয়ে গল্পের শুরু এবং বিবাদের সমাপ্তির মধ্যে দিয়ে ছবি শেষ হয়। ছবির চিত্রনাট্য এবং সংলাপ এমন নিপুণ বুননে বোনা হয়েছে যে, চত্রিরা অত্যন্ত ভাবগম্ভীর হয়ে সংলাপ বলে বা ঝগড়া করে যায়, দর্শক হেসে গড়িয়ে পড়ে। কোনো ধরণের সামান্য অতি অভিনয় বা ভাঁড়ামো নেই। দর্শক যত হাসে, ততই পর্দায় নিজেদের চরিত্র প্রতিফলিত হতে দেখে আর ভাবে। ভাবে আর নিত্য বর্তমানকে তারা খুঁজে পায়। ছবির শুরুতেই আমরা দেখি, ভাড়াটিয়ার কাজের ছেলে (খান জয়নুল) মাটির কলসিতে পানি নিয়ে বাড়িওয়ালার বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে থাকলে, বাড়িওয়ালি (সুমিতা দেবী) তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে বলেন – ‘এ্যাই তুই আমাকে ভেঙচি কাটলি কেনো?’ অর্থাৎ গায়ে পড়ে ঝগড়া করার এক অদ্ভূত অভ্যাস আমাদের ভেতরে বিদ্যমান। বাড়িওয়ালা তার শালাকে (বেবি জামান) নিয়ে আসেন ভাড়াটিয়া পরিবারের সাথে বিশেষ করে ভাড়াটিয়ার শালীর (সুজাতা) সঙ্গে ঝগড়া করার জন্যে। বাড়িওয়ালা তার শালাকে বলেন – ‘এখানে খাবে, দাবে আর ওদের সাথে ঝগড়া করবে’। অর্থাৎ এই শ্যালকের ঝগড়া করা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। যখন দুই পরিবারের মধ্যে তুমুল ঝগড়া শুরু হয় তখন তারা পরস্পরকে গালাগাল দেয়া শুরু করে। যদিও, গালাগালের ভাষার ব্যবহার বর্তমানের মতো এতোটা নিচে নেমে যায়নি, তবু কিছু গালি আমরা শুনি। আবার এখানে আরো একটা বিষয় উঠে আসে, তা হলো বাংলায় গালিগালাজের সঞ্চিত শব্দ শেষ হয়ে গেলে যখন ইংরেজিতে শুরু হয় তখন দেখা যায়, ইংরেজিতে গালি দেয়াটা বেশ সম্মানজনক বলে মনে করে দুই পরিবারই। ইংরেজ দ্বারা শাসিত হলেও ইংরেজির ব্যবহারকে সম্মান করতে কোনো দ্বিধাবোধ করেনা। কিন্তু ঝগড়ার সূত্রপাত দারুণ কৌতূহলোদ্দীপক।

চাষী নজরুল একজন সফল চিত্র পরিচালকের প্রয়াণ

এদেশে বানিজ্যিক ধারার ছবিগুলির মধ্যে যে কয়জন সফল চিত্রপরিচালক আছেন তার মধ্যে চাষী নজরুল ছিলেন অন্যতম একজন। গত ১১ জানুয়ারি, ২০১৫, ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটে, তিনি আমাদের ছেড়ে চিরতরে যান। ১৯৪১ সালের ২৩ অক্টোবর শ্রীনগর থানার সমসপুর গ্রামে মোসলেহ উদ্দীন ও শায়েস্তা খানমের ঘরে জন্ম হয় চাষী নজরুলের। চার ভাই ও তিন বোনের মাঝে তিনি ছিলেন সবার বড়। ১৯৫৭ সালে বাবার মৃত্যুর পর এজি অফিসে চাকরিতে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে চাকরি ছেড়ে দিলেও তার আগে থেকেই তিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। খ্যাতিমান অভিনেতা এবং পরিচালক ফাতেহ লোহানী নির্মিত “ আছিয়া (১৯৬০)” ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্রে তার প্রথম পদার্পণ। ১৯৬৪ সালে সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা ওবায়দুল হক নির্মিত “দুই দিগন্ত” ছবিতেও তিনি সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পর ১৯৭২ সালে একক পরিচালনায় নির্মাণ করেন তার প্রথম ছবি “ ওরা এগারজন”। চাষী নজরুল এদেশের অন্যতম একজন পরিচালক যিনি সামাজিক ছবির পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এবং সাহিত্যভিত্তিক ছবি অধিক সংখ্যায় নির্মাণ করেন। যেকারণে আমরা একদিকে যেমন পাই ওরা ১১জন, সংগ্রাম, ধ্রুবতারার মতো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি, অন্যদিকে পাই চন্দ্রনাথ,শুভ দা, দেবদাস, শাস্তি, হাঙর নদী গ্রেনেডের মতো সাহিত্যভিত্তিক ছবি। এছাড়াও তার “ হাছন রাজা” এদেশের ঐতিহাসিক ছবি হিসেবেও মনে রাখার মতো। পৌরাণিক ছবি “বেহুলা লখিন্দর” তার অন্যতম এক সৃষ্টি। সারাজীবন তিনি কেবল ছবির জন্যেই নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন। জাতীয় পুরস্কার সহ অন্যান্য অনেক পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছেন। এমন একজন মহান পরিচালকের মৃত্যুতে আমরা শোকাহত।

ভাড়াটিয়া ভাড়া দিতে চায়না। কারু, বাড়িওয়ালা তার বউয়ের সঙ্গে দিনরাত ঝগড়া করে। তাদের মাঝে সন্ধি হয়, বাড়িওয়ালা তার বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া বন্ধ করলে ভাড়াটিয়া ভাড়া দেবে এবং ঝগড়া করলে ভাড়া দেবেনা। ভাড়াটিয়াদের নিয়েও একই সন্ধি হয়। কিন্তু বিবাদ আর থামেনা। বিবাদও একেবারে চতুর্মুখী চলতে থাকে। নিজেদের মাঝে, অপরের মাঝে ইত্যাদি। কিন্তু এসব বিবাদ ছাপিয়েও ভালোবাসার মতো সম্পর্ক হয়। সেই শালা আর শালী অর্থাৎ ছবির নায়কনায়িকার মাঝে ভালোবাসাবাসি ঘটে যায়। বিবাদের বাইরেও আরেকটা বিষয় আমাদের চোখে পড়ে। বিয়ের আয়োজনের সময় দুই পরিবারের অর্থব্যয়ের প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে আমাদের লোক দেখানো চরিত্র। শুধু তাই না, অর্থ ব্যয়ের কথা বাড়িয়ে বলাটাও যেন আমাদের একটা অভ্যাস। তবে বাড়ির মালিকদের সাথে কাজের লোকের সম্পর্কের যে চিত্র আমরা পাই, তা বেশ চিত্তাকর্ষক। দুই বাড়ির কাজের লোকের সাথে যার যার বাড়ির মানুষদের সুন্দর একটা মেলবন্ধন দেখা যায়। তাদেরকে কাজের লোক মনে না হয়ে বাড়ির একজন সদস্য বলেই মনে হয়।

আইজেনস্টাইন তার ছবি সম্পর্কে বলতেন – ‘জনতাই নায়ক’। ১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগারের শেষ দৃশ্যে এসে আমরা দেখতে পাই, ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে বিবাদ কেউ মেটাতে পারেনি, দুই বিয়েতে (ভাড়াটিয়া এবং বাড়িওয়ালার বাড়ির দুটো বিয়ে একই জায়গায়, একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়) আসা নিমন্ত্রিত অতিথিরা এসে তা মিটিয়ে দেন। যারা ছবিটি দেখেছেন, তারা জানেন কিভাবে এই বিবাদের অবসান হয়। এখানে তার বিশদ বিবরণের কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করিনা। ছবির শেষ দৃশ্য আমাদের এই বার্তাই দেয়, একটা দেশে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা অর্থনৈতিক যে কোনো ক্ষেত্রে যত বিবাদই চলুক না কেনো, সব সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ জনপথ অর্থাৎ জনগণ। ছবিটি আমাদের কাছে তাই আরো মহান এক আদর্শ ছবি হয়ে ওঠে।