Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ১)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ১)

আনু মুহাম্মদ

last -1জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্র চীন, পুরো নাম ইংরেজিতে ‘পিপলস রিপাবলিক অব চায়না’ বাংলায় ‘গণপ্রজাতন্ত্রী চীন’। এখন এই দেশের জনসংখ্যা ১৩৫ কোটি। এর আয়তন ৯৬ লাখ বর্গ কিলোমিটার। ভূমির আয়তনের দিক থেকে এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম, সমগ্র অঞ্চল ধরলে তা পরিমাপের পার্থক্য অনুযায়ী তৃতীয় বা চতুর্থ হবে। ২২টি প্রদেশ, ৫টি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, ৪টি কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত পৌরসভা (বেইজিং, তিয়ানজিন, সাংহাই, চংকিং) এবং ২টি বিশেষ মর্যাদায় ভিন্নভাবে পরিচালিত অঞ্চল (হংকং, ম্যাকাও) নিয়ে বর্তমান চীন। তাইওয়ান, বা এখনও যে রাষ্ট্র চীন হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেয়, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন তার দাবীদার প্রথম থেকেই। ১৯৪৯ সালে বিপ্লবের পর চীন থেকে পালিয়ে চিয়াং কাই শেক এই রাষ্ট্র গঠন করেছিলেন, যার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

ভূপ্রকৃতির দিক থেকে চীন বৈচিত্রপূর্ণ। সমতল, পাহাড়, বনভূমি, মরুভূমি সবই আছে এই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। তবে মোট আয়তনের খুব কম অংশই আবাদযোগ্য। হিমালয়, কারাকোরাম, পামির এবং তিয়ান শান পর্বতমালায় এটি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া থেকে ভিন্ন করে রেখেছে। তিব্বত থেকে বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘতম নদী ইয়াংসী এবং ষষ্ঠ দীর্ঘতম নদী হলুদ নদী চীনের মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের উপকূলীয় দৈর্ঘ্য ১৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বা ৯ হাজার মাইল দীর্ঘ। চীনের সাথে অনেকগুলো দেশের সীমান্ত। এই দেশগুলো হলো: ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, ভূটান, মায়ানমার, মঙ্গোলিয়া, কাজাখস্তান, কিরঘিস্তান, তাজিকিস্তান, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, রাশিয়া। ভারতের সাথে চীনের সীমান্ত বিরোধ কয়েক দশকের। এনিয়ে ১৯৬২ সালে দুইদেশের মধ্যে যুদ্ধও সংঘটিত হয়।

ইরান, ভারত এবং ‘আমেরিকা’র ইনকা মায়ার মতো কিংবা তার চাইতেও প্রাচীন চীনের সভ্যতা। অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতার অঞ্চলের মতো চীনকে ঘিরে, প্রাচীন রাজ্য, শাসন ও ক্ষমতা নিয়ে অনেক মিথ আছে। লিখিত ইতিহাস অবশ্য অনেক পরের। সেই সময় থেকেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিবেচনায় চীন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি। অষ্টাদশ শতক থেকে ইউরোপে যে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়, তার ধারাবাহিকতায় উনিশ শতকে সারাবিশ্বে সাম্রাজ্যিক আধিপত্যে ইউরোপ হয়ে দাঁড়ায় প্রধান ঔপনিবেশিক শক্তি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায় চীন সেসময় পিছিয়ে যায় এবং ইউরোপের পূর্ণ উপনিবেশে পরিণত না হলেও তার প্রভাব বলয়ে পতিত হয়। এইসময়ে জাপানও সাম্রাজ্যিক ক্ষমতায় ইউরোপের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। চীনের বিরাট অংশ জাপানের ঔপনিবেশিক নিষ্ঠুর শাসনের অধীনস্ত হয়।

ইউরোপ ও জাপানের সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য, বিভিন্ন অঞ্চলে সামন্ত প্রভুদের শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে জনগণের লড়াইকে সংগঠিত ও সমন্বিত করেই চীন কমিউনিস্ট পার্টি দীর্ঘ জনযুদ্ধ পরিচালনা করে। ১৯৪৯ সালের বিপ্লব চীনকে আবারও বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে হাজির করে। এই বিপ্লবের পরও অনেক উঠানামা গেছে। বর্তমান চীন অনেকরকম সংস্কারের মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হয়েছে।

এই চীন কি সমাজতান্ত্রিক না পুঁজিবাদী না নতুন এক ব্যবস্থা? এই প্রশ্ন বিশ্বব্যাপী বিদ্যায়তন, রাজনীতি ও অর্থনীতি আলোচনায় অব্যাহত বিতর্কের বিষয়। তবে এব্যাপারে সবাই একমত যে, বর্তমান বিশ্বে চীন এক পরাশক্তি। প্রচলিত জিডিপি বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের পরই দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। আর ক্রয়ক্ষমতার সমতার নিরিখে বিচার করে আইএমএফ এর হিসাব অনুযায়ী চীন এখন বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি। পুঁজিবাদী বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের প্রভাব ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। এর পাশাপাশি চীন সাম্রাজ্যবাদী বিশেষণেও অভিহিত হচ্ছে বিশেষত আফ্রিকায় তার ভূমিকার কারণে।

চীনের এই দ্রুত বিস্ময়কর অর্থনৈতিক গতির রহস্য কী? দেশের ভেতর বৈষম্য, দুর্নীতি বৃদ্ধির খবর নিয়মিত। বিশাল ধনিক একটি গোষ্ঠী প্রবল প্রতাপে নিয়ন্ত্রণ করছে অর্থনীতির কিছু তৎপরতা। এসবের সাথে কমিউনিস্ট পার্টির একক শাসন কীভাবে সঙ্গতিপূর্ণ? চীন সরকারের দাবি অনুযায়ী, তারা বাজার সমাজতন্ত্রের পথে চলছে। এর আসলে স্বরূপ কেমন?

এসব প্রশ্ন অনুসন্ধান করতেই এই লেখার পরিকল্পনা। তবে যথাযথভাবে চীনের শক্তি ও দুর্বলতা, সাফল্য ও ব্যর্থতা, পরিবর্তন ও ধারাবাহিকতা বুঝতে গেলে একদিকে ঐতিহাসিক অন্যদিকে বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিত আনতে হবে। বিপ্লব পূর্ব চীন, বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং ৭০ দশক থেকে তার সংস্কারের ভেতর বাহির পরীক্ষা করতে হবে।।

(চলবে…)