Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩)

উনিশ শতকের চীন আফিম যুদ্ধ

আনু মুহাম্মদ

last 3অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে ১৭৭৬ সালে লন্ডনে প্রকাশিত হয় এডাম স্মীথের গ্রন্থ ‘এন ইনকোয়ারি ইনটু দ্য নেচার এন্ড কজেস অব দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’। এইসময় ইংল্যান্ডসহ ইউরোপে শুরু হয়েছে শিল্পবিপ্লব, ক্রমেই তা শক্ত ভিত্তি তৈরি করে বিস্তৃত হচ্ছে। এই শিল্পবিপ্লব সম্পর্কিত ছিলো বিশ্বজুড়ে উপনিবেশগুলোতে ইউরোপীয় দেশগুলোর দখল শাসন ও সম্পদ সঞ্চয়নের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। গ্রন্থটি বস্তুত পুঁজিবাদের সূচনাকালের ঘোষণা ও তার জটিল জগত অনুসন্ধান। সেকারণে গ্রন্থে ইউরোপের ভেতর ও বাইরের অনেক বিষয় দেখার চেষ্টা আছে। মার্কসের পুঁজিতে এই গ্রন্থসহ সেসময়ের বুুদ্ধিবৃত্তিক জগতের গভীর পর্যালোচনা আছে।

যখন ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের যাত্রা জোরদার হচ্ছে তখনও চীন প্রবল অর্থনৈতিক শক্তি। সমাজবিজ্ঞানী, জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক, জিওভানি আরিঘি তাঁর এ্যাডাম স্মীথ ইন বেইজিং গ্রন্থে চীনের এইসময়কাল পর্যালোচনা করে বলছেন, প্রকৃতপক্ষে স্মীথ যখন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ লিখছেন তখনও পূর্ব এশিয়ার পতন শুরু হয়নি। বরঞ্চ অষ্টাদশ শতকে চীনে যে শান্তিস্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি এবং জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি শক্তি তৈরি হয়েছিলো তা ইউরোপের আলোকময়তা বা এনলাইটেনমেন্ট এর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ যেমন লেইবনিজ, ভলতেয়ার, এবং কুইসনি বা কেনেসহ অনেকের অনুপ্রেরণার উৎস ছিলো। চীনের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন, নৈতিক নির্দেশনা, মেধা ও শক্তির সমন্বয়, কৃষিপ্রধান জাতীয় অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ে তাঁরা অধ্যয়ন করে বস্তুত ইউরোপের জন্য পথ অনুসন্ধান করেছেন। অনুসন্ধানী চোখে চীন সাম্রাজ্যের আকার, জনসংখ্যা এবং ঐক্য ছিলো বিশেষ আগ্রহের বিষয়। চীনের আভ্যন্তরীণ বাজারের আকারকে স্মীথ বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন, যা তাঁর ভাষায়, ‘ইউরোপের সবগুলো দেশ একত্র করলেও তার তুলনায় খারাপ হবে না’। ১

উনিশ শতকেই এই প্রবল শক্তির মধ্যে ভাঙন ধরে। ভেতরের দ্বন্দ্ব সংঘাত ও বাইরের আগ্রাসন চীনকে দীর্ঘ স্থিতিশীল সমৃদ্ধির অবস্থান থেকে সরিয়ে দেয়। এই শতকে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, আফিম যুদ্ধ, দেশের ভেতরে বিদ্রোহ, দুর্ভিক্ষ, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশে বড় আকারে অভিবাসনসহ অনেকগুলো ভবিষ্যৎ নির্ধারক ঘটনাবলী অতিক্রম করে চীন।

চীনে কিং সাম্রাজ্য শুরু হয়েছিলো ১৬৪৪ সালে, এটি চীনের শেষ সাম্রাজ্যিক শাসন। এর সমাপ্তি ঘটে ১৯১২ সালে। উনিশ শতকে এই সাম্রাজ্যের চীনকেই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের চাপানো দুইদফা আফিম যুদ্ধের শিকার হতে হয়। আফিম যুদ্ধের মূল বিষয় ছিলো ব্যাপকভাবে আফিম বিতরণে বৃটিশসহ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবসায়ীদের কাছে চীনকে উন্মুক্ত করা নিয়ে বিরোধ। চীন এতে সম্মত ছিলো না। অন্যদিকে এব্যাপারে চাপ প্রয়োগ করতেই বৃটিশরা চীনের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা শুরু করে। ফ্রান্সেরও ভূমিকা ছিলো এতে। বৃটেনের সাথে প্রথম চীনের আফিম যুদ্ধ চলে ১৮৩৯ সাল থেকে ১৮৪২ সাল পর্যন্ত, এরপরের যুদ্ধ ১৮৫৬ সালে শুরু হয়ে শেষ হয় ১৮৬০ সালে। প্রথম যুদ্ধে পরাজয়ের পরই চীনকে অপমানজনক শর্তে চুক্তি করতে হয়। ১৮৪২ সালে স্বাক্ষরিত নানকিং চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটিশদের হাতে ছেড়ে দিতে হয় হংকং। ১৮৯৪৯৫ সালে প্রথম চীন জাপান যুদ্ধেও চীনের পরাজয় হয়। এর ফলে তাইওয়ান চলে যায় জাপানের হাতে, কোরিয়ার ওপরও চীন তার নিয়ন্ত্রণ হারায়।

এই সময়কালের নৌবাণিজ্য কেন্দ্র করে অমিতাভ ঘোষ ত্রয়ী উপন্যাস লিখেছেন। এগুলো বিস্তর গবেষণা ও পর্যালোচনার বিশাল কাজ। এই সিরিজের প্রথম উপন্যাস ‘সি অব পপিজ’। এতে আছে কীভাবে বৃটিশ বণিকেরা চীনের বাজার লক্ষ করে ভারতে আফিম উৎপাদন সম্প্রসারণ করছে। এর ফলে ভারতের বহু অঞ্চল বদলে যাচ্ছে। খাদ্য উৎপাদনের জমি চলে যাচ্ছে এসব অর্থকরী ফসল উৎপাদনে। চীন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এই বণিকদের সমালোচনা তাদের বিভিন্ন আলোচনা বিতর্কে উঠে এসেছে। এসবের সারকথা হলো, চীনারা আফিম বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখে মুক্ত বাজার অর্থনীতি, ব্যক্তি স্বাধীনতার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। এই বাধা দূর করতে হলে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করতেই হবে।২

ব্রিটিশরা চীনে আফিম বিক্রি শুরু করে ১৭৮১ সালে। এক্ষেত্রে একক আধিপত্য ছিলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। ১৮২১ থেকে ১৮৩৭ সালের মধ্যে আফিম বিক্রি চারগুণ বৃদ্ধি পায়। এই ব্যবসা সরল বা আইনসম্মত ছিলো না। কোম্পানি আফিমভরা জাহাজ নিয়ে হাজির হতো মূল ভূখন্ডের কাছাকাছি কোনো দ্বীপে। সেখান থেকে চীনা বণিকরা রূপার বিনিময়ে নিষিদ্ধ এই নেশাদ্রব্য সংগ্রহ করে তা মূল ভূখন্ডে সরবরাহ করতো। এই ব্যবসায় যুক্ত থেকে চীনের ভেতরেও প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী তখন বিপুল অর্থ উপার্জন করেছে।

ইংল্যান্ডের মুক্ত বাণিজ্যের প্রবক্তাদের একাংশের চাপে ১৮৩৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের অবসান ঘটে এবং আরও অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এতে যোগ দেয়। একপর্যায়ে মার্কিন ব্যবসায়ীরাও আফিম ব্যবসায়ে যুক্ত হয়। মার্কিনীরা এর যোগান বাড়াতে থাকে তুরস্ক থেকে। ব্রিটিশ ও মার্কিন ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতায় আফিমের দাম কমে যায় এবং তার বিক্রি বাড়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। তাদের তখন প্রয়োজন এই বাণিজ্যের ওপর বিদ্যমান সব বিধিনিষেধ, নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার। এই বিষয়ে চাপ থেকেই ক্রমে যুদ্ধ শুরু। আর এতে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে চীনের শাসনব্যবস্থাতেও একের পর এক ফাটল আসতে থাকে। পরে আমরা দেখি এই পশ্চিমা বিশ্বেই চীনাদের পরিচয় হয় আফিমখোর হিসেবে!

যাইহোক, উনিশ শতকে চীনের ভেতরেও কিং সাম্রাজ্যের শাসকদের ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহ মোকাবিলা করতে হয়। পরের পর্বে সেই আলোচনা।।

তথ্য সূত্র : Giovanni Arrighi: Adam Smith in Beijing, Lineages of the Twenty-First Century, Verso, 2007 2Amitav Ghosh: Sea of Poppies, 2008.