Home » অর্থনীতি » জ্বালানির দাম কমেছে ॥ কিন্তু বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বর্গী উৎপাত

জ্বালানির দাম কমেছে ॥ কিন্তু বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বর্গী উৎপাত

বি.ডি. রহমতউল্লাহ্

dis 5বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতকে ক্ষমতাসীনদের নিবিড় সহযোগিতায় সংঘবদ্ধ চক্রের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এ খাতটিকে পুরো পকেটে ঢুকিয়ে হাতপালেজ ইচ্ছেমতো কেটেকুটে বিনাশ করে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। রেন্টাল এবং তথাকথিত কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের যে ‘অনৈতিক’ দর নির্ধারণ করা হয়েছে শুধু এই একটি কারনেই বাংলাদেশের অর্থনীতি যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়েছে তা স্পষ্ট। জানা মতে মোট ২৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রেন্টাল এবং কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বসানো হলেও সিষ্টেমে বর্তমানে ১ হাজার মেগাওয়াট চালু আছে। যার অধিকাংশই তরল জ্বালানী ভিত্তিক। রেন্টালকুইক রেন্টালের ট্যারিফ কত হওয়া দরকার তা নির্ধারণ করার পূর্বে পাঠকদের সুবিধার্থে কতগুলো তথ্যের দিকে দৃষ্টি দিতে অনুরোধ করছি।

. প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৮০% বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রই পুরোনো ‘ছুড়ে ফেলে দেয়া’ যন্ত্রপাতি দ্বারা নির্মিত, , বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের মালিকদের নিদারুন অনভিজ্ঞতা, , টেন্ডার ব্যতিরেকেই নিজেদের ‘পছন্দ’ করা লোকদের কার্য্যাদেশ দেয়া, , বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের স্পেসিফিকেশান নির্মানে ঠিকাদারদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, , জ্বালানী সরবরাহের দ্বায়িত্ব সরকারের হাতে রাখা, , স্পন্সরদের কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও ক্যাপাসিটি পেমেন্টে’র নামে সম্পূর্ণ ‘অনৈতিক’ও ‘অচিন্তনীয় মাসিক বিল দেয়া’, , বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বসাবার স্থান সরকার বা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউ বোর্ড) কর্তৃক ক্রয় করে সরবরাহ করা ৮, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র লোড সেন্টারে না বসানো

দর নির্ধারনের বিশ্লেষণ: ডিজেল ভিত্তিক রেন্টাল কেন্দ্রের, পুরান বিবেচনায় এবং ডিজেলের মূল্য ৬৮ টাকা লিটার ধরে প্রতি ইউনিটের প্রচলিত হারে লাভসহ বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় ১৩ টাকায়, যেখানে ট্যারিফ ধরা হয়েছিলো ১৬ টাকা ৮০ পয়সা। এবং ফার্নেস ভিত্তিক রেন্টাল কেন্দ্রের, পুরান বিবেচনায় একই নীতিতে ট্যারিফ দাঁড়ায় ৬ টাকা ৬০ পয়সা যেখানে ট্যারিফ ধরা হয়েছিলো ৮ টাকা ৮০ পয়সা অর্থাৎ ডিজেলের ক্ষেত্রে আমাদের সরাসরি প্রতারণা করা হচ্ছিল (১৬.৮০ ১৩.০০) – ৩ টাকা ৮০ পয়সা। আর ফানের্সের ক্ষেত্রে আমাদের প্রতারণা করা হচ্ছিল (.৮০.৬০) – ২ টাকা ২০ পয়সা। এক্ষেত্রে হিসেবের সুবিধের জন্য দর নির্ধারনে প্রতারণার পরিমানের গড় (ওয়েট ফ্যাকটর অনুযায়ী)৭ টাকা হিসেবে ন্যুনতম ১ হাজার মেঃওয়াট এবং ৬০ শতাংশ প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর ধরে নিজেদের অবৈধ অর্থ লুন্ঠনের জন্য শুধু ঠিকাদারকে বিল হিসেবে অতিরিক্ত টাকা দেয়া হচ্ছে বার্ষিক প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।

রেন্টাল/কুইক রেন্টালের ট্যারিফ কত হওয়ার দরকার তা বুঝতে ট্যারিফ নির্ধারনের পদ্ধতি আলোচনা করছি। বিদ্যুৎ হার (ট্যারিফ) নির্ধারনে নিম্নের দুটি উপাত্ত ধরা হয়।

ট্যারিফ: উন্নয়নের অংশ (স্থির মূল্য) .সমস্ত যন্ত্রপাতির ক্রয়মূল্য, .ভূমি ক্রয় ও উন্নয়ন বাবদ প্রদত্তমূল্য, . যন্ত্রপাতিমালামাল ক্রয় করা স্থান থেকে বসানোর স্থানে পরিবহন বাবদ প্রদত্ত ব্যয়, .বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র পরীক্ষন ব্যয়, .জ্বালানী সরবরাহের জন্য ভৌত অবকাঠামো নির্মান বাবদ প্রদত্ত ব্যয়। ৫.পুরোনো এবং প্রায় একেবারেই অচল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের স্থাপনা ব্যয় যার জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে ব্যয় পড়ে সর্বাধিক ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা।

জ্বালানী বাবদ ব্যয়, পরিচালন জনবলের বেতন ভাতাদি বাবদ ব্যয়, অফিস পরিচালনা ব্যয়। অর্থাৎ প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে ডিজেল লাগে দশমিক ২১ লিটার যার মূল্য দাঁড়ায় ১৪ টাকা ৫০ পয়সা এবং দশমিক ১৪ লিটার পরিমান ফার্নেসের মূল্য দাঁড়ায় ৮ টাকা ৪০ পয়সা। ট্যারিফ নির্ধারণে মূলধনী ব্যয় ধরা হয়েছে যথাক্রমে ২ টাকা ১০ পয়সা ও ৫০ পয়সা যা অত্যন্ত বেশী।

যেহেতু আমাদের দেশে ডিজেলফার্নেস ওয়েল ভিত্তিক রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বসানো হয়েছে, এক্ষেত্রে শুধুমাত্র এ দুটির’ই হিসেব নীচে দেয়া হলো। যেহেতু অভিযোগ আছে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রেই পুরোনো যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছে নীচে পাঠকদের সুবিধার জন্য নতুন যন্ত্র ও পুরনো যন্ত্রের তুলনামূলক দর (ট্যারিফ)-এর একটি নমুনা দেয়া হলো।

আমরা জানি ১টি ১০০ মেগা ওয়াট নোতুন ডিজেল এবং ফার্নেস ওয়েল ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের সর্বমোট মূল্য দাঁড়ায় ৫শ কোটি টাকা এবং যেখানে একটি পুরনো ১০০ মেঃ ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের সর্বাধিক দাম পড়তে পারে ১শ কোটি টাকা। আর এই টাকার মধ্যে যা যা পাওয়া যাবে তাহলো ঃ সমস্ত যন্ত্রপাতির ক্রয়মূল্য, ভূমি ক্রয় ও উন্নয়ন বাবদ প্রদত্তমূল্য, যন্ত্রপাতি ক্রয় করা স্থান থেকে বসানোর স্থানে পরিবহনবাবদ প্রদত্ত ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র পরীক্ষন ব্যয়, জ্বালানী সরবরাহের জন্য ভৌত অবকাঠামো নির্মান বাবদ প্রদত্ত ব্যয়। একে বলে স্থির অংশ। এর সাথে পরিচালন ব্যয় অর্থাৎ জ্বালানী ব্যয় ও বেতন ভাতাদি যুক্ত হয়ে মোট ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়।

এখানে উল্লেখ্য যে রেন্টালের ক্ষেত্রে চুক্তি অনুযায়ী অনেক কিছুই স্পন্সরকে দিতে হয়নি, যেমন ভূমি ক্রয় ও উন্নয়ন বাবদ প্রদত্তমূল্য, জ্বালানী সরবরাহের জন্য ভৌত অবকাঠামো নির্মান বাবদ প্রদত্ত ব্যয় ইত্যাদি। এগুলো দিয়েছে সরকার। তাতে পুরনো প্ল্যান্ট বাবদ ট্যারিফ প্রায় ২০ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার কথা।

এখানে রেন্টাল এর ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে। যেহেতু এটি ৩ বা ৫ কিংবা ৭ বছরের চুক্তি বিধায় জরুরী বিবেচনায় অল্প সময়ে টাকা উঠানোর জন্য ট্যারিফ ন্যুনতম ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা যৌক্তিক। অর্থাৎ একই উপকেন্দ্র যদি ১৫ বছরের জন্য বসানো হয় তার লাভের সমান লাভ করতে যে দর দেবে, ৭ বছরের জন্য বসানো উপকেন্দ্র থেকে সমান লাভ করতে হলে তার দর স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশী হবে। তবে কতো বেশী হবে তা বিচার বিশ্লেষণহিসাব করতে হবে।

সার্বিক দিকগুলোকে বিবেচনায় এনে নীচের বিষয়গুলো দেয়া হলো

পুরনো ও নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে জ্বালানী ব্য্রবহারের তুলনামূলক হিসাবকৃত অপচয় এক্ষেত্রে হিসেবের সুবিধের জন্য নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র না বসিয়ে পুরনো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ বসাবার ফলে যে অতিরিক্ত জ্বালানী ব্যবহার করতে হচ্ছে তাতে গড় অনুযায়ী ৭ টাকা হিসেবে ন্যুনতম ১ হাজার মেঃওয়াট এবং ৬০ শতাংশ প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর ধরে আবারো বার্ষিক ক্ষতির পরিমান দাঁড়ায় ৪ হাজার কোটি টাকা।

যে ভর্তুকির কথা সবাই বলছে: জ্বালানী ভর্তুকির কথা সবাই বলাবলি করছে। কিন্তু বিষয়টিকে এভাবে একপেশে বিবেচনা করলে হবে না। তাহলে জ্বালানীতে কতো ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে? ডিজেল ও ফার্নেস ওয়েলে একটি ইউনিট উৎপাদন করতে প্রতি লিটার যথাক্রমে ১১ ও ৯ টাকা ভর্তুকির গড় ১০ টাকা ধরলে রেন্টাল ও তথাকথিত কুইক রেন্টাল ষ্টেশনের উৎপাদন যদি ঃ ১ হাজার মেঃওয়াট হয় তাহলে বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪,০০০ কোটি টাকা, আর সরকার ঘোষিত ৩ হাজার মেঃ ওয়াট হয় তাহলে বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ হাজার কোটি টাকা।

ভর্তুকির প্রকৃত বিভাজন: তাহলে স্পষ্টতই ভর্তুকির আমরা ৩টি ভাগ পেলাম ঃ ১. টেন্ডার না করে ইচ্ছেমতো অবৈধ ভাবে দরবৃদ্ধির ফলে ভর্তুকির পরিমান দাঁড়াচ্ছে ৪ হাজার কোটি টাকা। এর ফলে বিউবোর্ড প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১৬.৮০ টাকা দরে ক্রয় করে বিক্রয় করছে গড়ে ৫.৮০ টাকা। এতে বিউবোর্ডএ ক্ষতি দাঁড়াচ্ছে বার্ষিক ৪ হাজার কোটি টাকা। ২. টেন্ডার না করে ইচ্ছেমতো অবৈধ অর্থ আয়ের লোভে পুরোনো কেন্দ্র বসানোর ফলে ভর্তুকির পরিমান দাঁড়াচ্ছে ৪ হাজার কোটি টাকা। যেহেতু জ্বালানী সরবরাহ করছে সরকার এবং এর ফলে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ অপচয় হচ্ছে বার্ষিক ৪ হাজার কোটি টাকা। ৩. সরকার ডিজেল লিটার প্রতি ৭৩ টাকা দরে এবং ফার্ণেস অয়েল ৬৯ টাকা দরে ক্রয় করে রেন্টাল ও তথাকথিত কুইক রেন্টালের কাছে যথাক্রমে লিটার প্রতি ৬১ ও ৬০ টাকা দরে বিক্রি করার ফলে শুধুমাত্র জ্বালানীর মূল্যবাবদ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ৬ হাজার কোটি টাকা। ৪. বর্তমানে ক্রুড অয়েলের দাম বিশ^ব্যাপী বর্তমানে গড়ে ইউএস ৪৮ ডলারে নেমে আসাতে বাংলাদেশে ডিজেলের আমদানি মূল্য লিটার প্রতি দাঁড়িয়েছে ৩৫ টাকার মতো আর ফার্নেসের মূল্য লিটার প্রতি ২৮ টাকা।

আর উল্টো হিসেবে আমরা যদি অন্ততঃ ন্যায্যমতো টেন্ডার করে যথাযথ দর ও পূরণের পরিবর্তে নতুন কেন্দ্র বসাতে পারতাম তাহলে কম জ্বালানীর ব্যবহার হতো বিধায় ভর্তুকির সর্বাধিক পরিমাণ কিছুতেই ৪ হাজার কোটি টাকার বেশী দাঁড়াতো না।

কিন্তু এখানেই লুন্ঠন শেষ নয়। আমরা জানি এ কেন্দ্রগুলো শুধু পুরনোই নয়, অনেক ক্ষেত্রে উন্নত দেশসমূহে থেকে আনা হয়েছে যা ছিলো পরিত্যক্ত, বর্জ্জ্য হিসেবে ফেলে দেয়া ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। বাংলাদেশ থেকে যখন সরকারের নির্বাচিত পছন্দসই ঠিকাদাররা এসব উপকেন্দ্র আনতে যান, গল্প প্রচলিত আছে যে, এক বিক্রেতা নাকি শুনে যেমন চমৎকৃত হয়েছেন, তেমন অবাকও হয়েছেন। এবং খুশী হয়ে তাদের কেউ কেউ নাকি এমনও বলেছেন, তোমরা যদি এগুলো নিয়ে যাও, বাপু আমরা দারুন বেঁচে যাই। এ জন্যে তোমাদের কোন পয়সা লাগবে না বরং নেবার ভাড়াটুকুও দিয়ে দেবো।

একটি বর্গীদের সিন্ডিকেট জিইয়ে রেখে, আমাদের জিম্মি করে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা যদি প্রথমেই তাদের প্রতিহত করে সঠিক পথে গ্যাস ও জ্বালানী সংকট দূর করার পদক্ষেপ নিতাম তাহলে প্রথম বছরেই গ্যাসের যে দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট চাহিদার ঘাটতি তাও যেমোন থাকতো না এবং বিদ্যুতেরও কোন লোড শেডিং হতো না।বিদ্যুতের মূল্য বাড়াবার জন্য সরকার এভাবে আমাদেও প্রতারণাও করতে পারতো না।।