Home » শিল্প-সংস্কৃতি » রুচিহীন ভারতীয় সিনেমা আমদানীতে এতো আগ্রহ কেন

রুচিহীন ভারতীয় সিনেমা আমদানীতে এতো আগ্রহ কেন

ফ্লোরা সরকার

last 6২০১৪ সালের একাডেমিক অ্যাওয়ার্ডের তালিকায় যেসব ছবি ছিলো, যেমন আমেরিকান হাসল, ফিলোমেনা, গ্র্যাভেটি, হার, নেবারাস্কা, টুয়েলভ ইয়ার্স এ স্লেভ, দ্য উলফ অফ দ্য ওয়ালস্ট্রিট ইত্যাদি, এসব ছবির মধ্যে সব থেকে আলোচিত হয়েছিলো টুয়েলভ ইয়ার্স এ স্লেভ (ছবিটি অস্কার জিতে নেয়), গ্র্যাভেটি, হার, নেবারাস্কা, ফিলোমেনা ইত্যাদি। সবচেয়ে কম আলোচিত ছিলো, দ্য উলফ অফ দা ওয়ালস্ট্রিট। আলোচনা কম হবার কারণ, ছবিটি পুঁজিবাদের নিন্দা করতে গিয়ে নিজেই নিন্দিত হয়ে ওঠে। ছবির অনেক অংশ কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া অত্যন্ত আপত্তিকর ভাবে দৃশ্যায়ন করা হয়। যা সাধারণ যেকোনো রুচিশীল দর্শকের কাছে অবশম্ভাবী ভাবে দৃষ্টিকটু। অথচ ঐ একই বছর, আমাদের প্রেক্ষাগৃহে বিশেষ করে স্টার সিনে কম্পেক্সে ছবিটি শুধু প্রদর্শিতই হয়নি, বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে অবস্থান করে। ভাবতে অবাক লাগে, টুয়েলভ ইয়ার্সএর মতো এমন ভালো একটি চলচ্চিত্র থাকতে কেনো এই দেশে দা উলফ অফ দ্য ওয়ালস্টিটের মতো আপত্তিকর ছবির আমদানি করা হয়। আমদানি যখন করাই হবে, ব্যয় যখন হবেই তখন ভালো ছবি কেনো না? আমাদের দেশে দেশীয় ছবি নির্মাণের ক্ষেত্রে যেমন অবহেলা করা হয় তেমনি ছবি আমদানির ক্ষেত্রেও সমপরিমাণ অবহেলা করতে দেখা যায়। 

আমাদের সেন্সর বোর্ড কোনো রাজনৈতিক আপত্তিকর দৃশ্যের বেলায় যতটা সচেতন, ঠিক ততটাই অসচেতন অন্যান্য অশৈল্পিক, রুচিহীন ছবি আমদানির বেলায়। এসব অসচেতনার সুযোগে যে ভারতীয় হিন্দী ছবির আমদানি ঘটবে তা সহজেই বোধগম্য। গত ২৩ জানুয়ারী থেকে ইনউইন এন্টারপ্রাইজের উদ্যোগে এখানকার প্রেক্ষাগৃহে চলছে ভারতীয় হিন্দী ছবি ‘ওয়ানটেড’। এ ছাড়াও একে একে ‘ডন২’,‘ থ্রি ইডিয়াটস’ এবং‘ তারে জামিন পার’ এই তিনটি ছবিও সেন্সরবোর্ড কর্তৃক ছাড় পেয়েছে এবং পরবর্তিতে প্রদর্শিত হবে। গত ২০ জানুয়ারি, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিষয়ক বেশ কয়েকটি সংগঠনের নেতারা এফডিসিতে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এসব ছবির প্রদর্শন ও আমদানির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ সহ আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান।

সিডি, ডিভিডি ইত্যাদি পাইরেসির বদৌলতে ইতিমধ্যে ভারতীয় সিনেমা আমাদের এখানে সিডি, ডিভিডির বাজার দখল করেছে বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই। আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো এখন আর আমাদের দখলে নেই। প্রায় সব বাড়িতেই ভারতীয় টিভি চ্যানেল ছাড়া দেশীয় চ্যানেল দর্শকরা দেখেন না বললেই চলে। অথচ প্রতি বছর এসব চ্যালেনের পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি চিত্রনায়ক শাকিব খান বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা জানান। তিনি বলেন,‘ আইনের ফাঁকফোঁকড় গলে দেশের শত্রুরা সেন্সর বোর্ডের বর্তমান ভাইস চেয়াম্যানের সঙ্গে আঁতাত করে ভারতীয় হিন্দী সিনেমা সেন্সর করিয়ে নিচ্ছেন। এই কুচক্রী মহল বিভিন্ন হলে ডিজিটাল মেশিন ভাড়ার টাকা দিতে চান না, অথচ কোটি কোটি টাকা খরচ করে তারা হিন্দী সিনেমা আমদানি করতে পারেন। তখন তাদের টাকার অভাব হয়না।’ ঐক্যজোট নেতা ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সমিতির বর্তমান কমিটির সহসভাপতি চিত্রপরিচালক সোহানুর রহমান সোহান বলেন,‘হিন্দী ছবি আমদানির বিষয়টি এখনো উচ্চ আদালতে প্রক্রিয়াধীন। ভারতীয় বা উপমহাদেশীয় যেকোনো সিনেমা আমদানির বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত রায় আসেনি। কিন্তু তারা আদালতের রায়ের অপেক্ষা না করেই, আইন,বিচার ও সংসদ মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের মাধ্যমে অনুমতি এনে তথ্য মন্ত্রণালয় ও তথ্য সেন্সরবোর্ড থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে।’ ২০১৪ সালের ১২ নভেম্বর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধিশাখার পক্ষ থেকে উপসচিব স্বাক্ষরিত এই চিঠিতে বলা হয়েছে – ‘চারটি ভারতীয় হিন্দী চলচ্চিত্র সেন্সর করার ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বাঁধা নেই, সেহেতু চারটি চলচ্চিত্র বিধি মোতাবেক সেন্সর করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’ মন্ত্রণালয়ের সেই নির্দেশ অনুযায়ী ইনউইন এন্টারপ্রাইজ এই চারটি ছবি আমদানি ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। প্রশ্ন হলো আদালতের রায় বড় নাকি তথ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা বড়? আদালতের রায় প্রকাশের আগেই কীভাবে এসব ছবির আমদানি এবং প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হলো?

বাংলাদেশে প্রায় ৮০০ মতো সিনেমা হল ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়া, সিনেমা শিল্পের ধ্বসেরই ইঙ্গিত বহন করে। তর্কের খাতিরে আমরা যদি ধরেও নেই, পরবর্তী যেকোনো সময়ে আদালত ভারতীয় ছবি আমদানির ক্ষেত্রে ইতিবাচক রায় দিয়ে দেবে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় দেশীয় শিল্পের এমন করুণ অবস্থার সময় ভারতীয় ছবির আমদানি কতটা যুক্তিযুক্ত হবে? অর্থনীতির নিয়মে কোনো পণ্যের অসম প্রতিযোগিতা সম্ভব নয়। অসম প্রতিযোগিতামূলক বাজারের অর্থই হলো একচেটিয়া বাজারের উত্থান হওয়া। দুটি পণ্যের অসম প্রতিযোগিতামূলক বাজারে, যেকোনো একটি পণ্য তার বাজার হারাতে বাধ্য হয়। ভারত তার সিনেমার বাজার সমগ্র ইউরোপ, এশিয়া পর্যন্ত বিস্তার লাভ করাতে সক্ষম হয়েছে। লন্ডনে প্রতি সপ্তাহে একটি করে ভারতীয় হিন্দী ছবি প্রদর্শিত হয়। জার্মানিতেও নিয়মিতভাবে ভারতীয় ছবি দেখানো হয়। আর এশিয়ায় শুধু ভারতীয় ছবিই নয়, টিভি চ্যানেলের বাজার পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে ফেলেছে। কাজেই বাংলাদশের মতো জায়গায় ভারত তার ছবি রপ্তানি না করলেও তার সিনেমার বাজার সঙ্কুচিত হবেনা। আসলে, আমারে দেশে কিছু অতি উৎসাহী ব্যবসায়ী আছেন, যারা উৎপাদনের চাইতে তৈরি পণ্যে অধিকতর বিশ্বাসী। তারা তাদের প্রযোজনীয় অর্থ চলচ্চিত্র শিল্পে নিয়োজিত করা দূরে থাক, আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের রুগ্ন দশাকে আরোগ্য লাভ করানো দূরে থাক, বরং ভারতীয় তৈরি ছবি আমদানির মধ্যে দিয়ে আমাদের ভঙ্গুর চলচ্চিত্র শিল্পের উপর শেষ পেরেকটা ঠুকে দিচ্ছেন যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

তবে মন্দ খবরের মাঝেও কিছু ভালো খবর অলক্ষে থেকে যায়। ভারতীয় ছবি আমদানির প্রচেষ্টা ২০১০ সাল থেকেই একরকম শুরু হয়েছিলো। এদেশের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক শাকিব খান জানান, সংখ্যাবিচারে নয়, মান বিচারে এখন থেকে তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয় করবেন। দশটা ফ্লপ ছবির চেয়ে একটি হিট ছবিতে অভিনয় করলে শুধু তার অভিনয়ের ক্যারিয়ারের জন্যেই নয়, পুরো চলচ্চিত্রশিল্পের জন্যে তা আর্থিকভাবে লাভের মুখ দেখবে। এই মান বিচার করে চলচ্চিত্র বাছাইয়ের বিষয়টির জন্যে আমরা তাকে সাধুবাদ জানাই। যেকোনো পণ্যের বেলায় এই ‘মান বজায়’ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পণ্যের মানের উপর পণ্যের আর্থিক লাভক্ষতি নির্ভর করে। আর চলচ্চিত্রের মতো এমন বিনোদন ও নান্দনিক একটি বিষয় সংশ্লিষ্ট শিল্পের জন্যে এই মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, চলচ্চিত্রের ভাষা, সাহিত্যের ভাষার মতে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকেনা। তার ভাষা আন্তর্জাতিক। ভারতীয় ছবির আমদানি এখন আমাদের এই মান বজায় এর বিষয়টিকে অধিকতর সচেতন করে দিয়েছে। কেননা, ভালো ছবি নির্মিত না হলে, খুব স্বাভাবিক ভাবেই অন্য ছবির বাজার এখানে দখল করে নেবে। কারণ, ‘বাজার কখনো শূন্য পড়ে থাকে না’ সেখানে ক্রেতাবিক্রেতার সমাগম ঘটবেই। আর খোলা বাজার অর্থনীতি বা উন্মুক্ত বাজারের দুনিয়ায় ক্রেতাবিক্রেতা উভয়ই বাজারের অবশম্ভাবী অংশ। বাজার যেদিকে পরিচালিত হয় অর্থনীতির চাকাও সেদিকে ঘোরে। বাজারের সাফল্য মানেই আর্থিক উন্নয়ন। উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে হলে ভালো ছবির এখন আর কোনো বিকল্প নেই। কাজেই চলচ্চিত্র শিল্পের বাজারে টিকে থাকতে হলে, শুধু ভালো ছবি নির্মাণ করলেই হবে না, ভারতীয় ছবিসহ উলফ অফ দ্য ওয়ালস্ট্রিটের মতো রুচিহীন ছবিগুলির আমদানি নিষিদ্ধের প্রতিও উদ্যোগী হতে হবে। সব থেকে বড় কথা, আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প যতদিন না পর্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক বাজারে প্রবেশের যোগ্য হয়ে উঠছে, ততদিন পর্যন্ত বিদেশী ছবি আমদানির মধ্যে দিয়ে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের ধ্বংস করা উচিত হবে না। যেদিন আমাদের চলচ্চিত্র বিশ্বের অন্যান্য দেশের চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে, সেদিন আমরা ভারতীয় ছবি আমদানির কথা ভাবতে পারি। কেননা, তখন ভারতসহ অন্যান্য দেশও আমাদের ছবি আমদানি করতে উৎসাহ বোধ করবে। আর এই ধরনের সমপ্রতিযোগিতা বিশেষত ভারত ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের শুধু সমআর্থিক উন্নয়নই ঘটাবে না, সাংস্কৃতিক উন্নয়নও ঘটাবে।।