Home » অর্থনীতি » ভাগ্যবান ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণের বিশেষ সুবিধা :: ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক খাত

ভাগ্যবান ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণের বিশেষ সুবিধা :: ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক খাত

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

dis 4২০১৩১৪ সালে ব্যবসাবাণিজ্যের অবস্থা ভালো ছিল না। এর প্রভাব পড়ে ব্যাংক খাতে। এমন পরিস্থিতিতে ২০১৪ সালের শুরুর দিকে ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়াতে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের বিশেষ সুযোগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ব্যবস্থায় পুনঃতফসিল হয়েছে ২৩ হাজার কোটি টাকা। তার পরও খেলাপি ঋণ কমেনি। সর্বশেষ হিসাবে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এর মূল কারণ, বিতরণ হওয়া ঋণে ব্যাপক অনিয়ম। গত বছরজুড়েই ব্যাংক খাতের আলোচিত বিষয় ছিল অনিয়ম আর খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল। বিদায়ী বছর বিপুল পরিমাণের খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের পরও গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে ১৬ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা বেড়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৭ হাজার ২৯১ কোটি টাকা, যা বিতরণ হওয়া মোট ঋণের ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণের কারণে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বেড়ে যাওয়ায় নিয়ম মেনে মূলধন সংরক্ষণ করতে পারেনি আটটি ব্যাংক। গত সেপ্টেম্বরে এসব ব্যাংকের ১২ হাজার ৬০৭ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই প্রভাবে সামগ্রিক ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতি এক হাজার ৯৬ কোটি টাকা। ২০১৩ সাল শেষে ব্যাংক খাতে তিন হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত ছিল।

ব্যাংক খাতে অনিয়মের বিষয়টি পুরনো হলেও বিদায়ী বছরে এর ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। অনিয়মের বেশির ভাগই হয়েছে বেসরকারি ব্যাংকে। অনিয়মের কারণে ন্যাশনাল ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংকে ঋণ অনিয়মের তথ্য উদ্ঘাটনের পর নাটকীয়ভাবে পদত্যাগ করেন এমডি। এর পর অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। এক মাস না পেরোতেই নভেম্বরের শুরুর দিকে পর্যবেক্ষক বসানো হয় মার্কেন্টাইল ব্যাংকে। চট্টগ্রামের মিজানুর রহমান শাহীন ও মজিবুর রহমান মিলন নামের দুই ভাই নয়টি ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে উধাও হয়। দুই ভাইকে সর্বোচ্চ প্রায় তিনশকোটি টাকা ঋণ দেয় মার্কেন্টাইল ব্যাংক। এ ঘটনাসহ ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যানের সিএসআরের দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ, পরিচালকদের মধ্যে দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক বসানো হয়।

বিদায়ী বছরের পুরো সময় বারবার আলোচনায় এসেছে বেসিক ব্যাংক। যদিও ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও অপসারিত এমডিসহ বিভিন্ন পক্ষের যোগসাজশে ব্যাংক থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ অনিয়মের তথ্য উদ্ঘাটন শুরু হয় বেশ আগে। তবে এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ২০১৪ সালে। ঋণ অনিয়মের কারণে ব্যাংকটিতে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়ে ছয় হাজার ১৪৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। মূলধন ঘাটতি হয়েছে দুই হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। একইভাবে পুরনো হলেও আলোচনায় এসেছে হলমার্কের ঋণ কেলেঙ্কারি। বিশেষ করে সোনালী ব্যাংকের স্বীকৃতির বিপরীতে ২৬টি ব্যাংকের পাওনা এক হাজার ৩১৬ কোটি টাকা পরিশোধ না করায় একাধিক ব্যাংকার্স সভায় এ নিয়ে আলোচনা হয়।

দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পুন:তফসিলসহ আরও বেশ কিছু ব্যাংকিং সুবিধা পেয়েছে ওয়ানইলেভেনের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যবসায়ীরা। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি সোনালী ও জনতা ব্যাংকের এমন সুবিধা পেয়েছে দেশের অন্যতম শিল্প উদ্যোক্তা বেক্সিমকো গ্রুপ। এই প্রতিষ্ঠানটিকে যথাক্রমে ২০২৫ ও ২০২৬ সাল পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সময় দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি দেশের বেশ কিছু বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের আর্থিক চিত্র তুলে ধরে ঋণ পুন:তফসিসহ সুদ কমানোর দাবি জানিয়ে চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে। রাজনৈতিক বা যৌক্তিক কারণে এ সব প্রতিষ্ঠানের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তাতে ইতিবাচক সাড়া দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পুন:তফসিলসহ কিছু সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছে।

অতীতে রাজনৈতিক কারণে যে সব ব্যবসায়ী ও তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের সহায়তা করতে ব্যাংক ও গ্রাহকের লেনদেন সম্পর্কের ভিত্তিতে সুবিধা দিতে চায় সরকার। এক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে গেল বছরের ৫ আগষ্ট ঋণ পুন:গঠন ও সুদের হার কমানোর এক প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর ড. আতিউর রহমানকে দেন বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমান। তিনি বেক্সিমকোর টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস বিভাগের ঋণের পাওনা ৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধে ১২ বছর সময় ও সুদের হার ১০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দেন।

বেক্সিমকো গ্রুপের এই প্রস্তাব পেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৯ আগস্ট সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মতামত চায়। প্রস্তাবের সঙ্গে একটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতামত ও সংশ্লিষ্ট নথি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিয়েছে বেক্সিমকো। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গত ৩০ জুন পর্যন্ত বেক্সিমকোর টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস ডিভিশনের ঋণের স্থিতি একীভূত করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পরিশোধের জন্য পুনঃতফসিলীকরণ, কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আড়াই বছরের জন্য স্থগিত এবং সুদের হার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব দিয়েছে।

বেক্সিমকো গ্রুপের এই প্রস্তাব প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর ড. আতিউর রহমান সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, রাজনৈতিক বা যৌক্তিক কোনো কারণে কিছু প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খারাপ হতেই পারে। আমাদের সবার জানা আছে, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অনেক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সে ক্ষেত্রে ব্যাংক ভালো করে যাচাই করে ব্যাংক কোম্পানি আইনের মধ্যেই যা করার তা করবে। আইনের বাইরে কাউকে কোনো ছাড় দিলে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান বিপদে পড়লে অবশ্যই ব্যাংক তাকে উদ্ধার করবে।

বেক্সিমকো গ্রুপের ওই প্রস্তাব সংক্রান্ত চিঠিতে সালমান এফ রহমান বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ গ্রহণে বাধা দেওয়াসহ ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল (প্রথমে বিএনপিজামায়াতের চার দলীয় জোট ও পরে মঈনউদ্দিনফখরুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল) পর্যন্ত নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। এতে প্রায়ই বেক্সিমকো গ্রুপকে চলতি মূলধন সংকটে পড়তে হচ্ছে। আর ২০০৯ সাল থেকে বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানির ঋণ শোধ করা হয়েছে। মূলত এটা আমরা করেছি ঋণ খেলাপি হওয়া এড়ানোর জন্য। এটা অস্থায়ী একটা সমাধান ছিল। গত ১০ বছরে বেক্সিমকো গ্রুপ দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে বলে চিঠিতে দাবি করেন সালমান এফ রহমান।

এরআগে এরকম ঋণ পরিশোধের সুযোগ পেয়েছিল দেশের আরেকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ইসলাম গ্রুপ। চলতি মূলধন সংকটে পড়া কোম্পানিকে বিদেশেও এ ধরনের সুযোগ দেয়া হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন একাধিক ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার। এছাড়াও মুন্নু গ্রুপকেও সোনালী ব্যাংক একশত কোটি টাকা মওকুফ করেছে বলে জানা গেছে।

এদিকে বেক্সিমকোর প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগের আলোকে মতামত দিয়েছে জনতা ব্যাংক লিমিটেড। রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটিও বেক্সিমকো গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা পরিশোধে ১১ বছর মেয়াদি সুবিধা দিয়েছে। গত ৮ ডিসেম্বর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের বোর্ড সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলে আগামী ২০২৫ সাল পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সময় পেয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ। এরআগে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে সোনালী ব্যাংক লিমিটেডও। রাষ্ট্রায়ত্ব এই ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ সভায় গত ৩ নভেম্বর বেক্সিমকো গ্রুপকে তাদের ঋণ পরিশোধে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠানো সোনালী ব্যাংকের এক চিঠিতে বলা হয়েছে, বেক্সিমকো গ্রুপের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় এনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতিসাপেক্ষে এবং কোম্পানির অর্থপ্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে বৃহদায়ক ঋণ বিশ্রেণীকরণ করে পরিশোধের সুযোগ দেয়ার জন্য পুনঃতফসিল করা যেতে পারে। এজন্য সুদের হার হবে ১০ শতাংশ। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেক্সিমকো গ্রুপের টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট বিভাগের ৫ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনের জন্য আবেদন করেছেন সালমান এফ রহমান।

রূপালী ব্যাংকের শীর্ষ গ্রহীতাদের একটি মাদার টেক্সটাইল মিলস। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র উঠে এলেও সম্প্রতি ঋণ পুনর্গঠনে অভিনব সুবিধা পেয়েছে মাদার টেক্সটাইল। ২০৩০ সাল পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সুযোগসহ প্রতিষ্ঠানটির ৬৩৪ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠন করেছে রূপালী ব্যাংক। জানা গেছে, পুনর্গঠিত ঋণের মধ্যে ১২৪ কোটি টাকা সুদবিহীন মান ধরে ২০৩০ সাল পর্যন্ত পরিশোধের সুযোগ দেয়া হয়েছে। বাকি ঋণের সুদের হার কমিয়ে করা হয়েছে ১১ শতাংশ। তবে অভিযোগ উঠেছে, বিশেষ চাপ অথবা সুবিধা নিয়েই রূপালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটিকে এ সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। বড় অঙ্কের ঋণ পুনর্গঠনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিমালা জারি করে সম্প্রতি। কিন্তু তার আগেই এ প্রতিষ্ঠানকে ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা দিয়েছে রূপালী ব্যাংক।

২০১৪ সালের ৩ নভেম্বর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের জন্য মাদার টেক্সটাইল নতুন ঋণ অনুমোদন ও পুনর্বিন্যাসের আবেদন করে রূপালী ব্যাংকে। গত ৪ ডিসেম্বর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তিসাপেক্ষ এ সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়, যা ১৭ ডিসেম্বরের পর্ষদ সভায় নিশ্চিত করা হয়। পর্ষদ সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়, ‘স্থানীয় শাখার গ্রাহক মেসার্স মাদার টেক্সটাইল মিলসকে কয়েকটি বিভাজন ও শর্তে ঋণের পুনর্বিন্যাস/পুনঃতফসিলীকরণ সুবিধা অনুমোদন করা হলো।’ জানা গেছে, মাদার টেক্সটাইলকে ঋণের ৬৩৪ কোটি টাকার ৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট হিসেবে মোট ৩২ কোটি টাকা সমান ত্রৈমাসিক কিস্তিতে ২০১৫ ও ২০১৬ সালের মধ্যে পরিশোধের সুযোগ দেয়া হয়েছে। পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সব ফোর্সড ঋণ ১ জানুয়ারি থেকে দুই বছর গ্রেস পিরিয়ড বিবেচনা করে ত্রৈমাসিক কিস্তিতে ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পরিশোধের সুযোগ দেয়া হয়েছে। সুদের হার ধরা হয়েছে ১১ শতাংশ। এ সুবিধার আওতায় প্রতিষ্ঠানটির দায় ৪৮১ কোটি টাকা। এছাড়া মেয়াদি ঋণ ১৭৪ কোটি, ব্লকড ঋণ ৫৫ কোটি ও সিসি ব্লকড ঋণ ৪০ কোটি টাকা একীভূত করে ২০৩০ সালের মধ্যে পরিশোধের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ২০২২ সাল পর্যন্ত অর্থ পরিশোধ স্থগিত রাখা হয়। এতেও সুদের হার ধরা হয়েছে ১১ শতাংশ। এছাড়া সুদবিহীন ব্লকড ১২৪ কোটি টাকা ২০২২ সাল পর্যন্ত স্থগিত রেখে ২০২৩২০৩০ সালের মধ্যে পরিশোধের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এ সময়েও সুদবিহীন মান ধরে রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে মাদার টেক্সটাইলকে।

রূপালী ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, মাদার টেক্সটাইলের কাছে ব্যাংকটির পাওনা দাঁড়িয়েছে ৬৮৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তির পর গ্রাহককে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানিয়ে দেয়া হয়েছে বলেও জানান রূপালী ব্যাংকের স্থানীয় শাখার মহাব্যবস্থাপক। ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, রূপালী ব্যাংকে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ ছিল ৪৭৮ কোটি টাকা। ২০১১ সাল শেষে যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯২ কোটি টাকায়। ২০১২ সাল শেষে তা ৬৫৮ কোটি এবং সর্বশেষ হিসাবে এ ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬৮৪ কোটি টাকা।

২০১২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে বেরিয়ে আসে রূপালী ব্যাংকের স্থানীয় শাখার নানা জালিয়াতির চিত্র। শাখাটির গ্রাহক মেসার্স মাদার টেক্সটাইল মিলসের ৫২ কোটি টাকা মূল্যের ডেফার্ড বিলের মূল্য পরিশোধের শেষ সময় ছিল ২০১২ সালের ১৬ এপ্রিল। সময় শেষ হওয়ার পর ব্যাংক বিলটি শ্রেণীকরণ করেনি। এর আগেও ফোর্সড ঋণ সৃষ্টি করে গ্রাহককে ডেফার্ড দায় শোধ করার সুযোগ দেয়া হয়। ২০০৯ সালের নভেম্বরের পর কোনো টাকা জমা না দেয়ার পরও ঋণটি শ্রেণীকরণ করা হয়নি। উল্টো বিধি লঙ্ঘন করে হিসাবটিতে ২৫ কোটি টাকা সুদ আরোপ করে শাখার মুনাফা বাড়ানো হয়েছে। একই শাখায় মাদার টেক্সটাইলের ২১৭ কোটি টাকার চারটি ব্লকড ঋণ রয়েছে। এ হিসাব পুনঃতফসিলের জন্য ৩৪ কোটি টাকা ডাউন পেমেন্ট বা এককালীন পরিশোধ ধরা হয়েছে, যা নীতিমালার লঙ্ঘন। এ গ্রাহককে লিম ঋণ (লোন এগেইনস্ট ইমপোর্ট অ্যান্ড মার্চেন্ডাইজ) সীমা না থাকলেও শাখা ব্যবস্থাপক সীমা বহির্ভূতভাবে লিম সুবিধা দিয়েছেন। ফলে শাখাটি এ অর্থ আদায় করতে পারছে না। এ রকম নানা অনিয়মের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে স্থানীয় শাখার তৎকালীন ব্যবস্থাপক ও ব্যাংকটির মহাব্যবস্থাপকসহ ছয় কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়।

ঋণ পুনঃতফসিলি ও পুনর্গঠনের কারণে নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ব্যাংকগুলোও নিজেদের অর্থ রয়েছে দেখিয়ে উচ্চ মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে। মন্দ ঋণ হলে বাংলাদেশ ব্যাংকে এর বিপরীতে অর্থ জমা রাখতে হতো ব্যাংকগুলোর। এতে কমে আসত ব্যাংকের মুনাফার পরিমাণ। বলতে গেলে ঋণ পুনঃতফসিলি ও ঋণ পুনর্গঠনের মাধ্যমে ব্যাংকের মুনাফা নিশ্চিত করা হলেও প্রকৃত অর্থে ব্যাংকিং খাতের অবস্থা করুন হোক সেটি রাজনৈতিক অস্থিরতা বা লুটপাটের কারণে সৃষ্ট। এতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। পুনঃতফসিলি করিয়েও ঋণখেলাপি কমানো যাচ্ছে না। এ অবস্থায় স্বল্পমেয়াদে ব্যাংকগুলো আয় বাড়ানোর সুযোগ পেলেও দীর্ঘমেয়াদে সঙ্কট থেকেই যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃতফসিলিকরণ নীতিমালা অনুসারে, শ্রেণিকৃত মেয়াদি ঋণ প্রথমবারে সর্বোচ্চ ৩৬ মাস এবং তৃতীয়বারের ক্ষেত্রে ১২ মাস পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর জারি করা পুনঃতফসিলিকরণ নীতিমালার শিথিলে ব্যাপক অপব্যবহার করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে ২০২৩২০২৪ সাল পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের মেয়াদকাল দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিপত্রে ঋণ নবায়নে সময়কাল নির্ধারণ ও ডাউনপেমেন্ট গ্রহণে ব্যাংকারগ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিবেচনার কথা বলা হয়। তবে অধিকাংশ পুনঃতফসিলিকরণে কোনো ধরনের ডাউনপেমেন্ট গ্রহণ করেনি ব্যাংকগুলো। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনাপত্তিপত্রে ৫ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট গ্রহণের শর্ত দেওয়া হয়েছিল। ব্যাংকের স্বাভাবিক নিয়মেই খেলাপি হয়ে গেছেন, এমন ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক অস্থিরতার অজুহাতে ঋণ পুনঃতফসিল করিয়ে নিয়েছেন। দেশে ২০১৪ সালের অধিকাংশ সময় কোনো ধরনের সংঘাতসহিংসতা না থাকলেও অস্থিরতার অনুরূপ কারণ দেখিয়ে এখনও পুনঃতফসিলিকরণের আবেদন করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ব্যাংকগুলোর পাঠানো আবেদনে অনাপত্তি দিচ্ছে। এমনকি জালজালিয়াতির মাধ্যমে যেসব অর্থ ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পেয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাও নিয়মিত করা হয়েছে। যদিও এসব প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সমস্যায় পড়েনি। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাংকিং খাত ও আমানতকারীরা।।