Home » বিশেষ নিবন্ধ » মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় বিদেশীদের উদ্বেগ

মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় বিদেশীদের উদ্বেগ

এম. জাকির হোসেন খান

dis 2বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের অবস্থান জানাতে গিয়ে এর মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক ২২ জানুয়ারি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এর আগে মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার অফিস থেকে সবাইকে শান্ত থাকার আহবান জানানো হয়েছে। আমরাও ওই উদ্বেগের সঙ্গে একইভাবে উদ্বিগ্ন। সরকারের এটা নিশ্চিত করা উচিত যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ খেয়ালখুশি মতো বিরোধীদলীয় কোন শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার বা আটক করতে পারবে না। একই সঙ্গে আইনশৃংখলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে। এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে যেসব মানদন্ড আছে তা মেনে চলতে হবে। আপনি জানেন, অবশ্যই, আমরা দেখেছি এবং দেখছি যে, পরিস্থিতি আরও বেশি হতাশ হওয়ার মতো।’ অথচ জাতিসংঘের এ সতর্কবাণী তোয়াক্কা না করে আটকসহ নানা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আর এ থেকে কেউই বাদ যাচ্ছেন না। ৩০ জানুয়ারি মন্ত্রী শাজাহান খান হুমকি দিয়ে বলেন, ‘হরতাল অবরোধ তুলে না নেওয়া হলে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয় পোড়া গাড়ি দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হবে। শুধু তাই নয়, ওই কার্যালয়ের পানি ও বিদ্যুতের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হবে। তাঁর বাড়িতে খাবারও ঢুকতে দেওয়া হবে না, অবস্থা এমন হবে যে খালেদা জিয়া না খেয়ে মারা পড়বেন’।

ঠিক ওই দিনই দিবাগত রাতে বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয়ের বিদ্যুৎ, এবং পরের দিন ডিশ, মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এমনকি পানির ড্রাম প্রবেশেও বাধা দেয়া হয় বলেও সংবাদ মাধ্যম খবর দিয়েছিল। এ নিয়ে বিভিন্ন মহল তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। ৩১ জানুয়ারি রাতে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হলেও এখন পর্যন্ত অন্যান্য সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এর আগে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের সামনে ইটবালু ভর্তি ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড দিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। যদিও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা তাকে ‘অবরুদ্ধ’ করা হয়নি বলে প্রচারণা চালায়। চলমান হত্যা, নির্যাতন, গুম এবং গণতন্ত্র হরণের ফলাফল বাংলাদেশের জন্য যে শুভকর হবেনা তা জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক ২২ জানুয়ারির প্রশ্নোত্তর পর্বে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার কাছে প্রশ্ন ছিলো, ‘এ প্রেক্ষিতেএখন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ অংশ নেয়া এক নম্বর দেশ এবং যেসব মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে তার অনেকগুলোর জন্য দায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শান্তিরক্ষী বাহিনী নেয়ার ক্ষেত্রে যে পর্যালোচনা করা হয় তাতে এ বিষয়টি কিভাবে দেখা হবে’? এর উত্তরে তিনি জানান, ‘আমি মনে করি, এক্ষেত্রে মানবাধিকারের মানদন্ড যাচাইয়ের যে নীতি রয়েছে তা অব্যাহতভাবে প্রয়োগ করা হবে’। ২৮ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী পুলিশ বাহিনীকে নাশকতা দমনে যা কিছু করণীয় তা করার নির্দেশ দেন এবং তিনি এর দায়দায়িত্ব নেয়ার কথাও উল্লেখ করেন।

অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল ২৯ জানুয়ারি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘পুলিশের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ ভয়াবহ পেট্রোল বোমা হামলার জবাব নয়। প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের মন্তব্য পুলিশকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয় এবং মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের উন্মুক্ত আমন্ত্রণ হিসেবে দেখার উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করেছে যা নিকট অতীতে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায়ই এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে। পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযানে সম্প্রতি এক ডজনের বেশি লোক মারা গেছেন। ১২ থেকে ২৮ জানুয়ারির মধ্যে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ১০ জন মারা গেছেন। এসব মৃত্যুর কিছু কিছু বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, যার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করা দরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তারা আইনের ঊর্ধ্বে এবং এই অজুহাতে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করতে পারে’। যদিও হরতালঅবরোধের মধ্যে কথিত ক্রসফায়ারসহ বিচার বহির্ভূত হত্যাকাের কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।

২৯ জানুয়ারি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০১৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়,

৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসমূহ কর্তৃক হত্যাযজ্ঞ, গুম এবং নির্বিচারে গ্রেফতারের মতো আইন লঙ্ঘনের বিচারে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বিশেষকরে তা করা হচ্ছে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের টার্গেট করে। সরকারি সংস্থাগুলো ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে ও পরে মানবাধিকার লংঘন করেছে। অপরদিকে বিরোধী দলগুলোর সদস্যরাও অবরোধ ও ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে সংঘাতসহিংসতার ঘটনা ঘটিয়েছে। উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাসমূহের দায়ে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার ক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি’। প্রতিবেদনে সংস্থাটির এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত সরকারের স্বার্থরক্ষা হয় ততক্ষণ পর্যন্ত সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ‘অবাধ স্বাধীনতা’ দিয়ে থাকে। আর বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন এমনটা অনেক দিনের ধারাবাহিকতা। মে মাসের ঘটনায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) এর কয়েকজন সদস্য গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনা ইতিবাচক হলেও সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, কোনো পক্ষের কারো ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার যেন বিঘ্নিত না হয়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘সমালোচকদের দমন করার লক্ষ্যে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। গণমাধ্যম বিষয়ক নতুন নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। এতে মুক্ত মতামত প্রকাশ ও বক্তব্যের ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য সীমারেখা আরোপ করা হয়েছে। ২০১৩ সালে সরকার বেশ কয়েকটি টেলিভিশন ও সংবাদ মাধ্যম সমালোচনামুলক প্রতিবেদন প্রকাশ করায় বন্ধ করে দেয়।’ এসব বিবৃতির মধ্যদিয়ে এটা স্পষ্ট যে, দেশের ভাবমূর্তি বহিঃবিশ্বে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

সংকট উত্তরণে দেশিবিদেশি সবাই সংলাপ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সঙ্কট নিরসনের পরামর্শ দিলেও তার বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। বরং মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতারা কোনো সংলাপ নয় বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের কয়েকজন এমপি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বিপন্ন করা হয়েছে। এই নির্বাচনে জনগণের আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটেনি। সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হওয়ায় বৃটেনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর কাছে তা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তাই সংকট নিরসনে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিকল্প নেই। র‌্যাব, পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলাবাহিনী সাধারণ জনগণের উপর অন্যায়ভাবে নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত হওয়ায় বৃটেন তাদেরকে আর্থিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণ বন্ধ করে দিয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ রাখা, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এবং রাজনৈতিক নেতাদেও জেল, নির্যাতন, হত্যা, গুমসহ সরকারের বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ড রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে অন্তরায়’।

বর্তমান এ অসহনীয় অবস্থায় মাহাথির মোহাম্মদের ‘এশিয়া প্রত্যাশা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক বইটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। ওই বইয়ে তিনি লিখেছেন, (পৃ.৬১) ‘নাগরিকরা সম্ভবত: জানে কখন তারা খারাপ সরকার ও দুর্বৃত্ত শাসক পায়। একটি ভালো সরকার প্রতিশ্রুতির ওপর কথা বলে এবং দুর্ব্যবহার না করে জনগণের উন্নতির চেষ্টা করে। যদি একটি সরকার দুর্নীতিবাজ, সংকীর্ণ এবং অত্যাচারী হয় তখন অনেকেই জানে যে, তারা একটি খারাপ কর্তৃত্বের রুপ দিচ্ছে এবং অধিকাংশ সাহসী লোকজন বিদ্রোহ করে। কেউ এ ধরনের কর্তৃত্বের কাছে নিস্বার্থ আনুগত্য স্বীকার করতে পারে না। প্রতিটি কর্তৃত্বের কিছু গুণাগুণ থাকতে হবে যা জনগণের আনুগত্য নয় বরং গ্রহণ করার আগ্রহ সৃষ্টি করবে। অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব অযৌক্তিক অত্যাচারী কর্তৃত্বের প্রতি জনতার অবাধ্যতার বলে সামাজিক বিপ্লব পরিচালনা করেছেন’।।