Home » অর্থনীতি » সাধারণ মানুষকেই খেসারত দিতে হয়

সাধারণ মানুষকেই খেসারত দিতে হয়

ফারুক আহমেদ

dis 3জনগণের জীবনে ঘটে যাওয়া করুণ এবং নির্মম সব ঘটনাবলী নিয়ে রাজনৈতিক ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে এখনকার সবচেয়ে বড় সত্য। দায়ীত্ব নেওয়ার কেউ নেই। জনজীবনের সর্বপ্রকার দুর্ভোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতায় টিকে থাকার সবচেয়ে বড় পুঁজি। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মানুষের অভিজ্ঞতা হলো, জনজীবনের দুর্ভোগ দুর করার কোন ব্যবস্থা এবং উদ্যোগ শাসক দলগুলোর নেই। বরং দুর্ভোগ ঘটানোর পারস্পরিক অভিযোগই হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন তাদের একমাত্র রাজনৈতিক কর্মসূচী,শাসক দলগুলোর কাছে রাজনৈতিক বিজয়। এই বিজয় বিজয় খেলায় জনজীবনে যত দুর্ভোগই ঘটুক, যত নির্মমতাই নেমে আসুক তাতে এদের কিছুই যায় আসে না। সরকারের শীর্ষস্থানীয়রা কতটা দায়ীত্বহীন এবং খামখেয়ালি তা তাঁদের প্রতিদিনের কথাবার্তা থেকেই জনগণ এর সাথে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অচলাবস্থায় সারা দেশ অচল। সারা দেশ অচল হলেও শাসক দলগুলোর এবং সরকারের দায়ীত্বপ্রাপ্তরা সবদিক দিয়ে সচল। তাঁদের কথায় চরম দায়ীত্বহীনতা এবং খামখেয়ালিপনারই পরিচয় পাওয়া যায়।

দীর্ঘদিনের অবরোধ হরতালে যখন সব্জিচাষী প্রান্তিক কৃষক, কুলি, পরিবহন শ্রমিকসহ লক্ষ লক্ষ মানুষ পথে বসার শামিল তখন অর্থমন্ত্রী বলে বসলেনএক টাকা এবং দুই টাকার মুদ্রা উঠিয়ে দিয়ে সর্বনিম্ন মুদ্রা করা হবে পাঁচ টাকা! যখন সব্জিচাষী অসহায় কৃষক তাঁর দীর্ঘশ্রমে উৎপাদিত একটি ফুলকপি যার শ্রম মূল্যই হয় পাঁচ টাকার উপরে, সেই ফুলকপি এক টাকায় বিক্রি করার জন্য কেঁদে ফিরছেন, তখন অর্থমন্ত্রী বলছেন এক টাকার মুদ্রাই উঠিয়ে দেওয়ার কথা ! একদিনের মধ্যে অর্র্থমন্ত্রীর এ ঘোষনা তুলে নেওয়া বা বাতিল করা অর্থনীতিবিদ বা শিক্ষিত জনদের কাছে তামাশা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এমন কথা অসহায় কৃষকের কাছে তামাশা মনে হয় না, তাঁর কাছে এমন কথা বড় নির্মম মনে হয়।

দেশের সব্জিচাষী প্রান্তিক কৃষকের সারা বছরের রোজগারের একটা বড় অংশ হলো শীতের এই সময়ের সব্জি চাষ। পুঁজির জোর এদের নেই। শরীর নিংড়ানো শক্তিই এদের প্রধান পুঁজি। শরীর নিংড়ানো শক্তির বাইরে সব্জিচাষে যে অর্থের প্রয়োজন হয় তা তাঁদেরকে জোগাড় করতে হয় নানা নামের মহাজনী কারবারীর কাছ থেকে চড়া সুদে। সেই ফসল যখন তাঁর চোখের সামনে শাসক দলগুলোর তান্ডবনির্মমতায় পচে যায়, তখন তার কাছে এর চেয়ে কষ্টের এবং নিষ্ঠুর ব্যাপার আর কি হতে পারে? কষ্টের এবং নিষ্ঠুরতার এখানেই শেষ নয়। এমন একজন কৃষক যখন তাঁর দশ টাকার ফসল এক টাকায়ও বিক্রি করতে পারছেন না, তখন চাল কিনতে গিয়ে তাঁকে বাড়তি পাঁচ টাকা গুনতে হচ্ছে। শুধু চালই নয় ডাল, তেল সবকিছুতেই বাড়তি দাম।

ওদিকে সব্জি চাষিদের সব্জি পচে যাচ্ছে আর এদিকে শহরাঞ্চলে বিশেষ করে ঢাকা শহরে এই সময়ে সব্জির দাম যা থাকার কথা তার চেয়ে দ্বিগুন তিনগুন দামে কিনতে হচ্ছে। শুধু সব্জিই নয় চাল, ডাল, তেল সহ প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। প্রতি কেজি চালের দাম অবরোধের আগে যা ছিল তা থেকে পাঁচ থেকে সাত টাকা বেড়েছে। ডালের দাম কেজি প্রতি দশ থেকে পনেরো টাকা বেড়েছে। আটা, তেল সব কিছুর দাম বেড়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের আয় কমেছে। অনেকের আয় রোজগার বলে কিছুই নেই। একদিকে আয় রোজগার নেই অপরদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিসের দাম বেশি। এ অবস্থায় মানুষের বাঁচার উপায় কি?

মানুষের জীবনের নিরাপত্তা,আয়রোজগার,উৎপাদিত ফসল, ¤পদ কোনকিছুরই নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। মানুষ এসবের নিরাপত্তা কার কাছে দাবি করবে ? দাবি করার কোন উপায় নেই। সকল প্রতিবাদ এবং দাবি প্রতিরোধ করার সংষ্কৃতির মধ্যদিয়ে ক্ষমতাসীন দল এবং সরকার জনমনে নিজেই এই ধারণা তৈরী করেছে যে, জনগণের প্রতি সরকারের দায়ীত্ব বলে কিছুই নেই। ক্ষমতাসীন দল এবং প্রতিদ্বন্দ্বি উভয়ের রাজনীতি হলো জনগণকে জিম্মি করার রাজনীতি। কিন্তু সরকার জনগণের জানমালজীবিকা কোন কিছুরই নিরাপত্তার দায় নিচ্ছে না। কিন্তু নিরাপত্তার দায় দিয়ে যে সব পদক্ষেপ নিচ্ছেন তাতে জনমনে আতংক আরো বেড়ে যাচ্ছে। জনমনের এ আতংক হলো বর্তমানে সর্বক্ষেত্রে আরো বেশি নিরাপত্তাহীনতা এবং এই যন্ত্রনাদুর্ভোগ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশংকা। ক্ষমতাসীন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিদের আচরণে এবং পরিস্থিতিতে জনমনে এই আশংকা তৈরী হয়েছে যে,জনগণই হলো এদের প্রধান প্রতিপক্ষ। জনমনের এ আশংকা সচেতনতায় পৌঁছালে শাসক দলগুলোর জন্য কি বিপদ তা তারা কেউ ক্ষমতার মসনদে বসে এবং কেউ ক্ষমতা ধরার মোহে আছে। বাংলাদেশের জনগণের খেসারত দেওয়ার যেমন ইতিহাস আছে, ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ারও ইতিহাস আছে।।