Home » অর্থনীতি » অর্ডার যাচ্ছে ভিনদেশে ॥ ক্রেতারা ঢাকায় আসতে নারাজ

অর্ডার যাচ্ছে ভিনদেশে ॥ ক্রেতারা ঢাকায় আসতে নারাজ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

dis 4রানা প্লাজা ধসের পর থেকে ক্ষতি যেন পিছু ছাড়ছে না বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের। পশ্চিমা ক্রেতা জোট এ্যাকর্ডএ্যালায়েন্সের রিপোর্টে একদিকে যেমন বন্ধ হচ্ছে পোশাক কারখানা, অন্যদিকে হরতালঅবরোধ ও চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় বাতিল হচ্ছে ক্রেতাদের পোশাকের অর্ডার। ফলে এ খাতে দিন দিন বাড়ছে ক্ষতির পরিমাণ। দেশের তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, হরতালঅবরোধে পোশাক সাপ্লাই চেইন ধসে পড়েছে। ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়াসহ বিশ্ববাজারে এ শিল্পের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। বিদেশী ক্রেতারা বাংলাদেশে তাঁদের অর্ডার পে#সমেন্ট ও নেগোসিয়েশনের বিষয়ে কোনো মিটিং করতে পারছেন না। ফলে স্বাভাবিক অর্ডার অর্ধেকে নেমে এসেছে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বিদেশী ক্রেতারা বাংলাদেশে ব্যবসার পরিধি কমিয়ে আনছেন। ভারত, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশের প্রতি নজর দিচ্ছেন তাঁরা। ফলে পোশাক খাত হুমকির মুখে পড়ছে।

বিজিএমইএর তথ্যানুযায়ী, এক দিন হরতাল বা অবরোধে তৈরি পোশাক শিল্পে অন্তত ২শ’ ১৫ কোটি টাকার উৎপাদন ব্যাহত হয়। সে হিসাবে গত ৩২ দিনে এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৮শ’ ৮০ কোটি টাকা। প্রতিদিন টেক্সটাইল সুতা, বোতাম, জিপার, সুতার কার্টন, এমব্রয়ডারি, ওয়াশিং, ডায়িংসহ বিভিন্ন খাতে যোগানের পরিমাণ প্রায় ২শ’ ৮০ কোটি টাকা, যা এই অস্থিরতার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ জানাতে পারেনি সংগঠনটি। নানা কারণে পোশাক মালিকরা তাঁদের কারখানার সঠিক ক্ষতির পরিমাণ জানাতে চাচ্ছেন না। তবে বিজিএমইএ সূত্র বলছে, ২৩টি কারখানার মোট ক্ষতির পরিমাণ ১৯ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ১শ’ ৪৮ কোটি টাকা। ওই ২৩ কারখানায় অর্ডার বাতিল হয়েছে ৯২ লাখ ৯২ হাজার ২শ’ ৩৬ ডলার পণ্যের। আর ডিসকাউন্টে ক্ষতি হয়েছে পাঁচ লাখ ১৫ হাজার ৭শ’ ৩৩ ডলার, এয়ারফ্রেইড বাবদ ক্ষতি সাত লাখ ৮২ হাজার ৯শ’ ৬৫ ডলার, বিলম্বিত জাহাজীকরণে ক্ষতি ৪৪ লাখ ৯২ হাজার ২শ’ ২১ ডলার এবং নাশকতার আগুনে ক্ষতি হয়েছে ৩৯ লাখ ৩৬ হাজার ১শ’ ৪৩ ডলার। পোশাক মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে চলমান অস্থিতিশীল রাজনীতির কারণে কারখানা মালিকরা তাঁদের পণ্য পরিবহনসহ নানা সমস্যার মধ্যে পড়ছেন। তৈরি পোশাক সময়মতো ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে অনেক কারখানায় শ্রমিকদের জানুয়ারি মাসের মজুরি পরিশোধে সংশয় তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক। মোট রপ্তানির আয়ের ৮০ ভাগ আসে এই খাত থেকে। যার পরিমাণ এখন গড়ে বছরে ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু এই খাতে বাংলাদেশ তীব্র প্রতিযোগিতার মুখেও রয়েছে। বিশেষ করে ভারত এবং চীন বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। গত ডিসেম্বর থেকে যে রাজনৈতিক সংকট শুরু হয়েছে, তা আরো তীব্র হয়েছে ফেব্রুয়ারিমার্চে। হরতাল, অবরোধ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে ক্রেতাদের সময়মতো পোশাক সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বেড়ে যাচ্ছে পরিবহণ খরচ।

ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ক্রেতা পূর্ব নির্ধারিত বাংলাদেশ সফর স্থগিত করেছেন। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক প্রথম সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান জানান, ঠিক সময়ে সরবরাহ করতে না পারায় বেশ কিছু ক্রেতা তাদের অর্ডার বাতিল করেছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছেন পোশাক শিল্প মালিকরা। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি সুবিধাজনক না হলে এ সব ক্রেতা অন্য দেশে চলে যাবেন। শুধু রফতানি বাণিজ্য নয়, বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের বড় একটি খাত হল এই পোশাক শিল্প। এই খাতে কমবেশি ৩০ লাখ কর্মী কাজ করেন। যার মধ্যে ৯০ ভাগ নারী।

পোশাক শিল্পের উদ্যাক্তারা মনে করছেন, টানা অবরোধের কারণে এ শিল্পের সব চেয়ে বড় দিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সংকটে পড়েছে পুরো পোশাক শিল্প। এই অবস্থা আরো প্রলম্বিত হলে পোশাক শিল্পের অপুরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। তখন পোশাক শিল্প পাট শিল্পে অবয়ব ধারণ করবে। উদ্যোক্তারা জানান, কোনভাবে জোড়াতালি দিয়ে উৎপাদন করার পরও সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের কারণে ঠিকমত রপ্তানি করা যাচ্ছে না। এতে রপ্তানিমূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। তাছাড়া এই শিল্পের ৬০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি নির্ভর হওয়ার কারণে শিল্প সময়মত মত ইনপুট পাচ্ছে না। এ ছাড়া ছোট্ট ছোট্ট সরবারহ স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করতে হয়। এ সব কাঁচামাল ও সেবা স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করার সময় প্রায়ই পিকেটিং এর শিকার হচ্ছে। এতে উৎপাদনে প্রভাব পড়ছে। এছাড়া পোশাক শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে ক্রেতাদের পোশাক শিল্প কারখানা পরিদর্শন, উৎপাদিত পণ্যের মান যাচাই করা এবং কার্যাদেশ দেয়া। টানা সহিংস অবরোধে ক্রেতারা দেশে আসতে পারছে না। এ জন্য যেনতেনোভাবে কারখানাগুলো চালিয়ে নেয়া বা পুলিশের সহায়তায় রপ্তানি করলেও দীর্ঘ মেয়াদি সমস্যার মুখে পড়ছে পোশাক শিল্প। আবারো ক্রেতারা বাইরে কোন দেশে চলে গেলে বাংলাদেশে ফেরানো কঠিন হবে। এ অবস্থা পোশাক শিল্পে বড় ধরনের ক্ষতের সৃষ্টি করবে। আর এ প্রভাব গিয়ে পড়বে দেশের অর্থনীতির উপর।

বাংলাদেশের শিল্প মালিক এবং বণিকদের সংগঠন এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ জানান, সরকারি এবং বেসরকারি খাত মিলে দেশে বছরে এখন প্রায় ২০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়। বেসরকারি খাত মুখ থুবড়ে পড়লে কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে, বেকারত্ব বাড়বে। তিনি বলেন, শুধু রফতানি নয় আমদানি বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জানুয়ারিফেব্রুয়ারি মাসের হিসেবে আমদানি কমেছে শতকরা ১০ ভাগ। এর মধ্যে শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি অন্যতম। যা প্রমাণ করে শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ব্যবসায়ীরা এখন বাংলাদেশের পরিবর্তে অন্য দেশকে বেছে নিচ্ছেন। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিকে ঝুঁকছেন গার্মেন্টস শিল্পের অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী। সম্প্রতি ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদন থেকে এ কথা জানা গেছে।

বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, শিল্পকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া এখনো সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান চালুর প্রস্তুতি নিয়েও চালু করা সম্ভব হয়নি। তার ওপর রাজনৈতিক অস্থিরতা সব সেক্টরকে আরো মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারা বলেন, সাম্প্রতিকালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশিবিদেশি বিনিয়োগ আশঙ্কাজনক হারে কমে আসছে। বিগত বছরগুলোতে গার্মেন্টস খাতে বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এ অবস্থান হারাতে বসেছে। জানা যায়, বাংলাদেশের ওপর বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরো নষ্ট হয়ে গেলে দেশটি বিরাট সুযোগ হারাবে। কারণ এ শিল্প খাতটি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠার পর থেকে এ খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান হয়েছে। এছাড়াও বিগত বছরগুলোতে বস্ত্র খাতে বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ ২০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। জানা যায়, দেশে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় এ সুযোগ নিচ্ছে ভারত। তাই বাংলাদেশ থেকে অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী ভারতে চলে যাচ্ছেন। দেশের প্রায় ৫ হাজার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মধ্যে বিশ্বমন্দা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে দেড় হাজার কারখানা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারখানা ভারতীয়রা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্রয় করে নিয়েছে। তার ওপর যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এসব কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বাজার চলে যাচ্ছে ভারতের হাতে।

দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় পোশাক শিল্পে ৩০ শতাংশ অর্ডার কমে গেছে বলে জানিয়েছেন তৈরি পোশাক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। বড়দিনের শেষে ও বছরের শুরুতে নতুন রফতানির অর্ডারের সময় হলেও ক্রেতারা অর্ডার দিতে আসছে না। অবরোধহরতালে ইতোমধ্যে পোশাক শিল্পে ৩০ শতাংশ অর্ডার কমে গেছে। পোশাক শিল্পের সমগ্র সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ছে। এর ফলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যবসা হারানোর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে, নিট পোশাক রফতানির অবস্থাও সঙ্গীন। জানুয়ারি মাসে যেখানে নতুন অর্ডার আসার কথা ছিলো সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতায় নতুন অর্ডার তো আশানুরূপ আসেনি বরং পুরানো অর্ডারের মধ্যে ৩৮ লাখ ডলার মূল্যের অর্ডার বাতিল হয়েছে এমবি নিট ফ্যাশনের। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, ক্যাশিও ও কেইলার নামক দুটি ক্রেতা রাজনৈতিক অস্থিরতায় অর্ডার সাপ্লাই দিতে পারবো কিনা সন্দেহে প্রায় ৩৮ লাখ ডলার মূল্যের অর্ডার বাতিল করেছে। বর্তমানে তাদের কর্মী সংখ্যা প্রায় ৮শ’। যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকতো তাহলে যে পরিমাণ অর্ডার আসতো তাতে তারা আরও প্রায় ৮শ’ নতুন শ্রমিককে চাকরি দিতে পারতেন। উল্লেখ্য, জানুয়ারিফেব্রুয়ারি মাসেই মূলত পুরো বছরের পোশাক রফতানির অর্ডার আসে বাংলাদেশে। আর প্রায় পুরো মাস ধরে চলমান অবরোধে ৪০ শতাংশ অর্ডার কম এসেছে।।