Home » প্রচ্ছদ কথা » খালেদা জিয়ার সঙ্কটের চার কারণ

খালেদা জিয়ার সঙ্কটের চার কারণ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

cover২০০১০৬ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়া যে অসহায়ত্ব বরণ করেছিলেন তা অব্যাহত থেকেই গেছে। তখন তার অসহায়ত্বের কারণ ছিল তিনটি। এক, তার পুত্র তারেক জিয়ার সর্বগ্রাসী দাপট ও ক্ষমতা কাঠামো নিয়ন্ত্রণ; দুই, দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের কোন্দল ও অনৈক্য; তিন, জামায়াতের ফাঁদ, ২০০৭ সালের ১/১১ এর পরে এর সাথে যুক্ত হয় চতুর্থটি সরকারের সর্বগ্রাসী চাপ। বিএনপির একক ও অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নেতার এ অসহায়ত্ব ও সিদ্ধান্তহীনতার ক্ষেত্রে প্রথম ও তৃতীয় দুটি কারণ সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। অন্যটি তাকে নির্ভর করে তুলেছে কতিপয় সাবেক আমলা ও অরাজনৈতিক কর্মকর্তাদের ওপর। এই গ্রুপটি যতটা না রাজনৈতিক, তার চাইতে বেশি ভবিষ্যত ক্ষমতা ও সুবিধা প্রত্যাশী এবং তারেক জিয়ার বিশ্বস্ত অনুগামী হিসেবে খালেদা জিয়া এদের ওপর আস্থাবান। চেয়ারপারসনের কার্যালয় কার্যত: এই গ্রুপটির নিয়ন্ত্রণে। বেগম জিয়ার আনুষ্ঠানিক ডাক ছাড়া দলের সিনিয়র নেতারা তাঁর সাক্ষাত লাভে এদের কৃপার ওপর নির্ভরশীল।

খালেদা জিয়ার অসহায়ত্ব ও নির্ভরশীলতার এই বিষয়টি একেবারেই প্রকাশ্যে চলে আসে গত ৫ জানুয়ারীর পর থেকে। ঐদিন বিকেলে লাগাতার অবরোধ ঘোষণার পরে দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল এবং রিজভী আহমেদসহ অসংখ্য নেতাকর্মীর গ্রেফতার এবং কার্যালয়ে বসে খালেদা জিয়ার আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত কার্যত: বিএনপিকে ঘটনাপ্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। কার্যালয় ছেড়ে বেরোলে তাকে আর এখানে ফিরতে দেয়া হবে না, এমন ধারণাটি বদ্ধমূল হয়েছে। প্রায় দু’মাসব্যাপী বিরামহীন অবরোধহরতাল চলাকালে মিডিয়ায় ৭২ ঘন্টা বা ৪৮ ঘন্টা হরতালের ঘোষণা সম্বলিত প্রেস রিলিজ কেবল তাদের অস্তিত্বের জানান দিয়েছে। গুপ্তস্থানে অবস্থানরত যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ এখন বিএনপির মুখপাত্র। সিনিয়র নেতাদের কোন চিহ্ন মিলছে না, শুধুমাত্র কূটনীতিকদের সাথে আলাপআলোচনা আর দু’চারটে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ছাড়া। ধরেই নেয়া যায়, লন্ডনে বসে তারেক জিয়ার নির্দেশে পরিচালিত বর্তমান আন্দোলনের ভবিষ্যত খোদ খালেদা জিয়াও জানে না। এটা সুস্পষ্ট যে, গত ৬ বছরেও তারেক হাওয়া ভবনের ঘোর কাটাতে পারেননি এবং বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সংকটকালে নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা তার কতোটা ছিল, আগামী ইতিহাস তা নির্ধারন করে দেবে। আর এই সুযোগটি নিয়ে ফেলে জামায়াত।

যদিও মাঠ পর্যায়ে কর্মীরা চাঙ্গা ছিল। তৃণমূলে জনসমর্থন ছিল। সরকারের প্রতি জনসমর্থন ও আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকছিল। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার ইস্যুও ছিল। নৈতিকভাবে দুর্বল একটি সরকারের আগ্রাসী মনোভাব, হিংস্র আচরন, আন্দোলন আতংকসবই ছিল। ধাপে ধাপে গণআন্দোলন গড়ে তোলার অনুকূল শর্তও ছিল। কিন্তু বিএনপি নেতা খালেদা জিয়া এবং লন্ডন প্রবাসী দলের মূল নেতা এসব ইতিবাচক শর্তের ধারও ধারেননি। সরকারের আগ্রাসী ও আক্রমনাত্মক ভূমিকা, মামলা, হামলা, জেলজুলুম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ্যাকশন এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সমূলে উৎপাটনের বিরুদ্ধে বিএনপি বেছে নিয়েছে আন্দোলনের নামে নাশকতা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। বরাবরের মতোই কোনরকম জনসমর্থন ও জনসম্পৃক্ততা ছাড়াই হঠাৎ করে খালেদা জিয়া ৫ জানুয়ারি লাগাতার অবরোধের ডাক দিলেন। এমনকি এরসাথে তার দলীয় নেতাকর্মীদেরও সম্পৃক্ততা বা প্রস্তুতি ছিল বলে মনে হয়নি। লন্ডনে বসে তারেক জিয়ার নির্দেশে পরিচালিত এই আন্দোলনের সম্ভাব্য পরিণতিতে আগামী দিনে দল হিসেবে বিএনপি কোন পরিণতি বরণ করবে সেটিই দেখার বিষয় হবে।

এ কথা বলতেই হবে, এই সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে বিএনপি কখনোই জনসম্পৃক্ত কোনো আন্দোলন বা এমন কোনো কর্মকান্ড করেনি যাতে তাদের জনসম্পৃক্ততার সৃষ্টি হয়।

২০১৩ সালের নাশকতা ও সন্ত্রাসের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে কি করে একটি গণআন্দোলন সফল করা হবে, বিএনপি নেতৃত্ব সে শিক্ষাটিও গ্রহণ করেননি। ইতিহাস সাক্ষী হয়ে থাকবে, সমস্ত অনুকূল শর্ত বজায় থাকা সত্বেও এবং যৌক্তিক দাবির একটি আন্দোলন কিভাবে নাশকতা ও সন্ত্রাসের চোরাগলিতে ঢুকে পড়ে সমস্ত ইতিবাচক সম্ভাবনা নষ্ট করে দেয়!

বিএনপির ডি ফ্যাক্টো নেতা তারেক জিয়া সম্ভবত বুঝতে চাননি অথবা বুঝতে পারেননি, রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে ২০১৩ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে তার দল কিছুই অর্জন করতে পারবে না। একটি নিয়মতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপির সামনে খোলা পথ ছিল জনগনকে সংগঠিত করে ধাপে ধাপে আন্দোলন কর্মসূচি মাঠে নিয়ে আসা এবং সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলা। এর জন্য যে সাহসী নেতৃত্ব, দলীয় সমন্বয়, জোটের ভেতরে আস্থা, সর্বোপরি যে কোন আত্মত্যাগ ম্বীকারে দ্বিধাহীন চিত্ত, এর কোনটিই কি বিএনপির ছিল? বিরাজমান পরিস্থিতি বলে দিয়েছিল, একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন আদায়ে গণআন্দোলন গড়ে তোলার সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিদ্যমান বা অপেক্ষমান। এ কারণে সরকার ছিল সন্ত্রস্ত, বলেই সর্বগ্রাসী আক্রমনাত্মক চরিত্র বজায় রেখেছে, অব্যাহত বাগাড়ম্বর করে আস্থাহীনতার জানান দিয়েছে। সর্বক্ষণ অদেখা ভয় তাদের তাড়া করে ফিরেছে। যে কোন সংকটে, বর্তমানেও জঙ্গীবাদ এবং যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। এর বিপরীতে বিএনপি কখনই এ সকল ইস্যুতে তার সুস্পষ্ট অবস্থান জনগনের সামনে তুলে ধরেনি। উল্টো জামায়াতের বক্তব্যএজেন্ডা বাস্তবায়নে তাদের সহযাত্রী হিসেবে সরকারের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত করতে সুযোগ করে দিয়েছে।

বিএনপি সম্ভবত অনুধাবন করতেই সক্ষম নয় যে, দল হিসেবে জন্মের পরে গত ছয় বছর বৈরী পরিস্থিতি এবং সংকটকালীন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সংকট এবং বৈরীতা অধিকতর সৃষ্টিশীল ও সক্ষমতার সুযোগ সৃষ্টি করে। পুরোনো সবকিছু ঝেড়ে ফেলে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ তৈরী করে। তবে বর্তমানের বিএনপির চাইতেও দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামো, বৈরী অবস্থাসহ সামগ্রিক অগোছালো পরিস্থিতি নিয়েই আন্দোলন করে, মাঠেময়দানে থেকে তারা ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত কিভাবে একটি শক্তিশালী বিএনপিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সেজন্য দরকার হয় ধীশক্তি সম্পন্ন দুরদর্শী নেতৃত্ব। যুগান্তকারী কৌশল ও কর্মসূচি। মাঠে নেমে জনগনকে সংগঠিত করে সামর্থ্য প্রমানের সক্ষমতা এবং ত্যাগের মানসিকতা। এর কোনকিছু না থাকায় বিএনপি আন্দোলনের নামে বেছে নিয়েছে নাশকতার মত আত্মধ্বংসী প্রবণতা। যার অনিবার্যতায় খোদ রাজধানীতে এখন বিএনপি পরিনত গুপ্ত বিবৃতিসর্বস্ব একটি দল হিসেবে। দলের প্রধান নেতা দলীয় কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছেন কিংবা তিনি কার্যালয় ছেড়ে বেরোতে চাচ্ছেন না, পাছে তাকে নিজ গৃৃহে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়। বেগম জিয়ার জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জিয়া অরফানেজ দুর্নীতি মামলায় হাজির না হওয়ায় আদালতের গ্রেফতারী পরোয়ানা। এক্ষেত্রে আগামী ৪ মার্চ তিনি আদালতে আত্মসমর্পন করবেন নাকি কার্যালয়ে অবস্থান করে গ্রেফতার বরণ করবেন, সেটি এখন দেখার বিষয়। তবে এটি মোটামুটি নিশ্চিত যে, কার্যালয় ছেড়ে বেরোলে তাকে আর এখানে ফিরতে দেয়া হবে না, সম্ভবত নিজগৃহে অবরুদ্ধ করে ফেলা হবে। ভুল রাজনৈতিক কৌশল, কর্মসূচি এবং লক্ষ্যভেদী নেতৃত্ব না থাকলে দেশের অন্যতম বৃহৎ একটি দল কতোটা অসহায় ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে, তার একটি ঐতিহাসিক নমুনা হিসেবে বিএনপি ভবিষ্যতে আলোচনায় আসতেই থাকবে।

সামগ্রিক পর্যালোচনায় একটি বিষয় বারবার উঠে আসবে, পাবলিক পারসেপশন হচ্ছে, বিএনপি কেন আন্দোলনের নামে নাশকতা ও সহিংসতার পথে ধাবিত হলো? কেন জনগনের ওপর তাদের আস্থা ছিল না? বিএনপির জোটসঙ্গী জামায়াতের রাজনীতির সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা রয়েছে।

সরকার তাদের নিষিদ্ধ করেনি এবং নানা রাজনৈতিক খেলা অব্যাহত রেখেছে। তারাও এই সুযোগে বিএনটির কাঁধে ভর করে যে কোন সুযোগে দেশজুড়ে সহিংসতা ও রক্তক্ষয় ঘটাচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই, যে কোনভাবে সরকারের পতন ঘটানো। না হলে তাদের শীর্ষ নেতৃত্বের ফাঁসিতে ঝোলার সম্ভাবনার পাশাপাশি দল হিসেবে তারা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়তে পারে। তারা এও জানে, তাদের সুশিক্ষিত ক্যাডার ও জনগোষ্ঠির নির্দিষ্ট একটি অংশ ছাড়া ব্যাপক জনসমর্থন নেই। এককভাবে তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যেতে পারবে না। সেজন্যই কখনও সামরিক সরকারের কাঁধে ভর করেছে, আওয়ামী লীগের সাথে যুগপৎ পথ চলেছে। বিএনপির কাঁধে ভর করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। এখন জোটসঙ্গী হিসেবে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সাফল্যের সাথে বিএনপিকে ব্যবহার করছে এবং নাশকতা ও সহিংসতার সকল দায় নিতে হচ্ছে বিএনপিকেই।

জামায়াত সব সময়ই তৎপর থেকেছে, বিএনপির মধ্যে অপেক্ষাকৃত উদার ও প্রগতিশীল অংশটিকে দুর্বল করে উগ্র ডানপন্থীদের বিএনপি নেতৃত্বে আনতে। এজন্য তারা গুলশান অফিসের গ্রুপটির মাধ্যমে তারেককে হাত করে নিয়েছে। তারেক বন্দনাকে ঢাল বানিয়ে জামায়াতী প্রচারনা তৃণমূলে বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে যেমন তারেকপ্রিয়তা বাড়িয়েছে, তেমনি সেই সুযোগ নিয়েছে জামায়াত। মাঠ পর্যায়ে নেতাকর্মীদের বশীকরনে এটি কাজে লাগানোয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিএনপিজামায়াতের স্থানীয় ঐক্য সুদৃঢ় হয়েছে। বৃহত্তর রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, যশোহর, চট্টগ্রাম ও সিলেট জেলায় জামায়াতী এই কৌশল সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়েছে। যা আগামীতে বিএনপির রাজনীতির ক্ষেত্রে অনেক বেশি নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে। অন্যদিকে, নাশকতা, আতংক ছড়ানো ছাড়া এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে নৈরাজ্যই জামায়াতের একমাত্র এজেন্ডা। এজন্যই তারা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে নৈরাজ্যিক এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

চতুর্মুখী চাপ এবং দলের ভেতরে নানা ধরনের গ্রুপিং বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি ও তার প্রধান নেতা খালেদা জিয়াকে ক্রমশ: আটকে ফেলছে চক্রান্তের চার দেয়ালের মাঝে। পুত্র তারেক জিয়ার ভুল রাজনীতি, বিএনপির ওপর জামায়াতের প্রভাব, দলের মধ্যে অনৈক্য ও ব্লেম গেম এবং সরকারের চাপচার রকম অসহায়ত্বের কবলে আটকা পড়ে আছে সঠিক রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে বিএনপির বেরিয়ে আসা। শুধুমাত্র ভোটের দাবি নিয়ে আন্দোলন, যদি না সেখানে জনইস্যু সম্পৃক্ত থাকে, তাহলে তা কার্যকর করা যায় না। ২০১৩ সাল থেকে শিক্ষা না নিয়ে বাস্তবতাবর্জিত বিএনপির দেয়ালবন্দী রাজনীতি দেশকে ক্রমশ: শূন্যতায় ঠেেেল দিচ্ছে। এই নতুন শূন্যতা দেশে যে একক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের সূচনা ঘটিয়েছেতার শেষ কোথায়? এর জবাবদিহির জন্য আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপিকেও আগামীতে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে, যদি দল হিসেবে ততদিন তারা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়।।